সময় ও মানুষের গল্প
· Prothom Alo

আপাদমস্তক শিল্পী জহির রায়হান সৃজনের নিরন্তর অন্বেষণে চলচ্চিত্র ও সাহিত্য—উভয় ক্ষেত্রেই দীপ্ত উপস্থিতি রেখে গেছেন। সমাজসচেতন এই কথাশিল্পীর সাহিত্যযাত্রার সূচনা কবিতার মাধ্যমে। তাঁর প্রথম এবং জীবদ্দশায় প্রকাশিত একমাত্র গল্পগ্রন্থ সূর্যগ্রহণ প্রকাশিত হয় ১৯৬২ সালে। তবে তাঁর রচিত বহু গল্প দীর্ঘদিন অগ্রন্থিত অবস্থায় বিভিন্ন সাময়িকপত্রে ছড়িয়ে ছিল এবং মৃত্যুর পর ধীরে ধীরে সেগুলোর সন্ধান পাওয়া যায়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি কাজী জাহিদুল হকের সংগ্রহ ও সম্পাদনায় সাতটি অগ্রন্থিত গল্প নিয়ে প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয় যখন যন্ত্রণা। পরবর্তীকালে আরও পাঁচটি গল্প, ‘জিয়নকাঠি’, ফাটল, ‘বারো ঘরের ঘরনি’, ‘কয়েকটি নদী’ ও ‘একটি সমুদ্র’ এবং ‘অজগর’ উদ্ধার করা সম্ভব হয়। এগুলো ১৯৫৫ থেকে ১৯৭০ সালের মধ্যে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। এই অমূল্য সংযোজনগুলোর মধ্য থেকে একটি গল্পের নাম অনুসারে কাজী জাহিদুল হকের সুচারু সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে বর্তমান সংকলন কয়েকটি নদী ও একটি সমুদ্র।
জহির রায়হানের ছোটগল্প মানবজীবনের বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতাকে সহজ, সাবলীল ও হৃদয়গ্রাহী ভাষায় উপস্থাপন করেছে। বিশেষত শহরকেন্দ্রিক মধ্যবিত্ত জীবনের সংকট, দ্বন্দ্ব ও জটিল সম্পর্কের নানা অনুষঙ্গ তাঁর গল্পে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। মানুষ ও তার চারপাশের সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশই তাঁর গল্প সৃষ্টির প্রধান উপজীব্য। বাঙালির জাতীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন-সংগ্রামে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের ফলে অর্জিত অভিজ্ঞতা তাঁর সাহিত্যকে দিয়েছে স্বতন্ত্র গভীরতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা। ১৯৫৫ থেকে ১৯৭০ সালের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার পটভূমিতে রচিত এসব গল্পে উঠে এসেছে মানুষের নিরন্তর জীবনসংগ্রাম, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের নির্মমতা, মহাজনি শোষণের কশাঘাত, মানসিক টানাপোড়েন, সমাজে নারীর অনিশ্চিত ও ভঙ্গুর অবস্থান, প্রেমের আবেগ এবং মৃত্যুচেতনার গভীর অনুরণন।
Visit afsport.lat for more information.
জহির রায়হানের বই ‘কয়েকটি নদী ও একটি সমুদ্র’–এর প্রচ্ছদ‘ফাটল’ গল্পে ইমাম সাহেবের জীবনসংগ্রাম এবং মসজিদ গড়ে তোলার পরিশ্রম ফুটে উঠেছে। সরদার সাহেব কানপুর থেকে বড় ইমাম আনার পর তার কাজের ইতি হলেও ইমাম সাহেব স্রষ্টার প্রতি অবিচল আস্থা রাখেন, দীর্ঘশ্বাস ছাড়া আর কোনো অভিযোগ-অনুযোগ নেই।
‘জিয়নকাঠি’ গল্পে গ্রামীণ সমাজে মহাজনি শোষণের নির্মম চিত্র ফুটে উঠেছে। চায়ের দোকানদার রমজান এই অন্যায়ের নীরব সাক্ষী। মহাজন চাচা মিয়ার বিরুদ্ধে নবীনগর-চৌদ্দগ্রামের এক বৃদ্ধ মামলা লড়ছে। বৃদ্ধের বাবার নেওয়া মাত্র ত্রিশ টাকার ঋণ সুদে-আসলে বছরের পর বছর পরিশোধ করেও শেষ হয়নি। অসহায় বৃদ্ধের আক্ষেপ—ত্রিশ টাকার দেনা শোধ করতে করতেই জীবন ফুরিয়ে গেল। অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় মহাজন তার বিরুদ্ধে মিথ্যা চুরির মামলা সাজিয়ে জেলে পাঠানোর ষড়যন্ত্র করে এবং মিথ্যা সাক্ষীর সহায়তায় তাতে সফলও হয়। কিন্তু এই ঘটনা ও ঘটনাসঞ্জাত পরিণতিতে বৃদ্ধের ‘একরত্তি মাইয়াটার’ আশু অসহায়ত্ব ও দুর্দশার চিন্তা রমজানের বিবেককে নাড়া দেয়। ভয়ভীতি ও নীরবতা ভেঙে সে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে দাঁড়িয়ে সাহস ও মানবিকতার পরিচয় দেয়।
‘ফাটল’ গল্পে ইমাম সাহেবের জীবনসংগ্রাম এবং মসজিদ গড়ে তোলার পরিশ্রম ফুটে উঠেছে। সরদার সাহেব কানপুর থেকে বড় ইমাম আনার পর তার কাজের ইতি হলেও ইমাম সাহেব স্রষ্টার প্রতি অবিচল আস্থা রাখেন, দীর্ঘশ্বাস ছাড়া আর কোনো অভিযোগ-অনুযোগ নেই। ‘বারো ঘরের ঘরনি’ গল্পে আমেনার ভঙ্গুর জীবনচিত্র প্রতিফলিত, যা সমাজের নিরাশ্রয় নারীর অব্যক্ত যন্ত্রণা তুলে ধরে।
সিনেম্যাটিক ঢঙে নির্মিত এই দীর্ঘ গল্প ক্রমে পাঠককে টেনে নেয় রহস্য ও বিভ্রমের জগতে। মামলার কার্যক্রম চলতেই থাকে আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ঘনীভূত হয় অনিশ্চয়তা।
‘কয়েকটি নদী ও একটি সমুদ্র’ গল্পের শুরুতেই দেখা যায়, রোমানা নামে পনেরো বছর বয়সী এক কিশোরীর আত্মহত্যার খবর প্রকাশিত হয় দৈনিক পত্রিকায়। সংবাদে ইঙ্গিত দেওয়া হয়, ঘটনাটি যতটা সরল মনে হয়, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল। তদন্তে নেমে পুলিশ যেন কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বের করে ফেলে। রোমানার বাড়ি তল্লাশি করে তারা উদ্ধার করে তার নিজের হাতে লেখা একটি ডায়েরি এবং বহু বছর আগে কোনো এক মাসিক পত্রিকায় প্রকাশিত তার বড় বোন খুকীর আত্মজীবনীর একটি কপি। এসব সূত্র ধরে পুলিশ আদালতে মামলা করে। সিনেম্যাটিক ঢঙে নির্মিত এই দীর্ঘ গল্প ক্রমে পাঠককে টেনে নেয় রহস্য ও বিভ্রমের জগতে। মামলার কার্যক্রম চলতেই থাকে আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ঘনীভূত হয় অনিশ্চয়তা। কোনটি সত্য, কোনটি মিথ্যা—এই প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর খুঁজতে গেলে পাঠক যেন এক অন্তহীন বৃত্তে আবর্তিত হতে থাকে।
জহির রায়হান সম্পর্কে কৌতূহল দিন দিন বাড়ছে। এ সংকলন পাঠের মাধ্যমে দীর্ঘদিন অনাবিষ্কৃত জহির রায়হানের সৃষ্টিশীলতা ও শিল্পমানসের এক নতুন দিগন্ত পাঠক-গবেষকদের সামনে উদ্ভাসিত হবে সন্দেহ ব্যতিরেকে।
গল্পকারের পর্যবেক্ষণ, ‘তবু আমার মনে হয় ওরা যেন এক একটা নদী—খুকী, রোমানা, আসাদ আনিসা বেগম। ওদের উৎস যেখান থেকেই হোক না কেন। পরিণতি হলো সমুদ্র। আর সমুদ্র হলো এমন এক বিশাল অস্তিত্বের নাম, যেখানে মানুষ ঠাঁই পায় না।’
‘অজগর’ গল্পটি মধ্যবিত্ত জীবনের অর্থনৈতিক সংকট, সামাজিক মর্যাদার মোহ এবং নৈতিক অবক্ষয়ের এক তীক্ষ্ণ দলিল। শহরতলির এক ছোট্ট স্টেশনের স্টেশনমাস্টার সামান্য বেতনে বৃহৎ পরিবারের ব্যয়ভার বহন করতে গিয়ে দুর্নীতির আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু গল্পটি কেবল একজন ব্যক্তির দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে ওঠার কাহিনি নয়; বরং এমন এক সামাজিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি, যেখানে সীমিত আয়ের সঙ্গে অসীম চাহিদার সংঘাত মানুষকে ধীরে ধীরে গ্রাস করে।
জহির রায়হান সম্পর্কে কৌতূহল দিন দিন বাড়ছে। এ সংকলন পাঠের মাধ্যমে দীর্ঘদিন অনাবিষ্কৃত জহির রায়হানের সৃষ্টিশীলতা ও শিল্পমানসের এক নতুন দিগন্ত পাঠক-গবেষকদের সামনে উদ্ভাসিত হবে সন্দেহ ব্যতিরেকে।
কয়েকটি নদী ও একটি সমুদ্র
জহির রায়হান
সংকলক: কাজী জাহিদুল হক
প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন
প্রকাশ: নভেম্বর ২০২৫
প্রচ্ছদ: মাসুক হেলাল
পৃষ্ঠা: ৬৩; মূল্য: ২২০ টাকা