যাত্রাপালা দেখে মনে হয়েছিল, অভিনেতারাই পৃথিবীর সর্বশক্তিমান মানুষ
· Prothom Alo
প্রখ্যাত নাট্যকার, অভিনেতা ও নির্দেশক মামুনুর রশীদ। তিনি এ দেশের নাট্য আন্দোলনে এক অগ্রণী ব্যক্তিত্ব। ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলো অনুষ্ঠানের এবারের আয়োজনের অতিথি এই নাট্যজনের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক আনিসুল হক। দীর্ঘ এই সাক্ষাৎকারে নিজের শৈশব, বেড়ে ওঠা, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি আর নাটকের সঙ্গে আজীবন জড়িয়ে যাওয়ার গল্প বলেছেন তিনি।
Visit umafrika.club for more information.
ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলোয় সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছি। আজ আমরা এসেছি বাংলাদেশের অগ্রগণ্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, পথিকৃৎ নাট্যজন মামুনুর রশীদের কাছে। মামুনুর রশীদ ভাই, আপনাকে স্বাগত জানাই।
মামুনুর রশীদ: ধন্যবাদ।
আমরা এই অনুষ্ঠান শৈশব দিয়ে শুরু করি; কিন্তু আপনারটা শুরু করব ফুটবল দিয়ে। শুনতে পেলাম আপনি নাকি আর্জেন্টিনার সমর্থক?
মামুনুর রশীদ: আর্জেন্টিনার সমর্থক হওয়ার একটা বড় কারণ হচ্ছে, চে গুয়েভারার জন্ম হয়েছিল আর্জেন্টিনায়। সে কারণেই আমি আর্জেন্টিনার সমর্থক। তারপরে তো ম্যারাডোনা ছিল সেই দলে এবং মানে বিশ্বের ফুটবল সংস্কৃতিতে ম্যারাডোনা ও আর্জেন্টিনা একটা বড় ধরনের উজ্জ্বল নাম হয়ে আছে। খেলা দেখতেও ভালো লাগে।
খেলা দেখতে ভালো লাগে, আর ম্যারাডোনার তো ওই যে ঐতিহাসিক সেই যুদ্ধের সময় ইংল্যান্ডের সঙ্গে, ওইটা একটা সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক স্টেটমেন্টও ছিল।
মামুনুর রশীদ: হ্যাঁ, অবশ্যই। ইংল্যান্ডের সঙ্গে ওদের যে দ্বীপ, তার একটা যুদ্ধ চলছে আবার মাঠে খেলা চলছে। আমরা দেখেছি খুবই ইয়ে করে।
আবার মেসির খেলা এত ভালো যে মুগ্ধ না হয়ে, বিস্মিত না হয়ে পারা যায় না।
মামুনুর রশীদ: ব্রাজিলও ভালো, আমি পেলেরও খুব সমর্থক। পেলে, ওরে বাপরে! তার খেলা দেখে আমরা যে কী মুগ্ধ হতাম!
এবার যেমন ইরানকে ওই জন্য অন্তর থেকে একটা সমর্থন এসেই যায়। এত অত্যাচার করছে টিমটার ওপর। এক দিন আগে যেতে পারবে, খেলা শেষ হওয়ার দুই ঘণ্টার মধ্যে বের হয়ে যেতে পারবে। তারপরও তারা ভালোই খেলছে।
মামুনুর রশীদ: হ্যাঁ এবং একটা জিনিস নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছ যে মাঠে কী পরিমাণ সমর্থক তাদের! যখন ইরানের পায়ে বল আছে, যখন ইরানের কোর্টে বল, তখন সমস্ত মাঠ ভেঙে পড়ছে তাদের সমর্থনে। তার মানে এখনো নির্যাতিতের পক্ষে মানুষ দাঁড়ায়, নিগৃহীতের পক্ষে দাঁড়ায়।
হ্যাঁ, ফুটবল সমর্থনের ক্ষেত্রে ওইটা হয়। বড় দলের বাইরে আমরা ছোট দলগুলোকে সমর্থন করতেই থাকি সব সময়। তো আপনার জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি, টাঙ্গাইলের তল্লা গ্রামে।
মামুনুর রশীদ: না, টাঙ্গাইলের পাইকড়ায়। পাইকড়া হচ্ছে আমার মাতুলালয়। সেই মাতুলালয়ে জন্ম আমার।
তারপর সেখান থেকে…
মামুনুর রশীদ: সেখান থেকে তো আমার বাবা চাকরি করতেন, মানে পোস্ট অফিসে। পোস্টমাস্টার ছিলেন। ওনার পোস্টিং ছিল ফুলপুরে, ময়মনসিংহের অন্তর্গত। সেই ফুলপুরে আমার প্রথম লেখাপড়া শুরু হয়, হাতেখড়ি।
আপনার আব্বার নাম কী?
মামুনুর রশীদ: হারুনুর রশীদ খান।
আর আপনার আম্মার নাম?
মামুনুর রশীদ: রোকেয়া খানম।
বাবা বলতেন না আব্বা বলতেন?
মামুনুর রশীদ: আব্বা বলতাম। আর মাকে মা বলতাম। মা এখনো জীবিত আছেন এবং একটা জিনিস ভেবে দেখো যে মায়ের জন্ম ত্রিশের দশকে, ১৯৩০-এর দশকে। তখন তাঁর নাম রেখেছিলেন রোকেয়া। তার মানে বেগম রোকেয়ার প্রভাবটা আমাদের মধ্যবিত্ত সমাজে কী ব্যাপক ছিল। তাঁর ফুফুরা নাম রেখেছিলেন। তাঁর ফুফুরা মানে হচ্ছে আরেক আগের জেনারেশন, মানে বেগম রোকেয়ার সমবয়সী হবে। তো তখন রেখেছিলেন রোকেয়া। এটা আমার কাছে খুবই আনন্দের এবং বিস্ময়ের যে ওই সময়ে বেগম রোকেয়া কী রকম জনপ্রিয় ছিলেন।
এর প্রভাবটা কত ইতিবাচকভাবে আমাদের মধ্যে পড়ল।
মামুনুর রশীদ: এবং সেই প্রভাবটা আমরা যারা ষাটের দশকের ছাত্র, পঞ্চাশের দশক থেকে লেখাপড়া শুরু হলেও কিন্তু ষাটের দশকের আমরা যারা ছাত্র তাদের কাছে বেগম রোকেয়া কী রকম উজ্জ্বল, উজ্জ্বলতর নাম। এবং নারী স্বাধীনতার কথা যখনই আসে তখন কিন্তু বেগম রোকেয়ার নামটা আমরা...
নিশ্চয়ই, আমাদের বাংলাদেশের বা দুই বাংলারই মুসলমান নারীরা যে লেখাপড়া করলেন এটা তো বেগম রোকেয়ার প্রায় একার চেষ্টায় শুরু হলো।
মামুনুর রশীদ: শুরু হলো এবং শুরু হলো একটি অনন্যতর জায়গা থেকে। রংপুরের এক গ্রাম, সেখানে তিনি লিখছেন তাঁর লেখায় যে ‘আমরা সকাল হলো এটা বুঝতে পারতাম পাখির কিচিরমিচির দিয়ে।’ তার মানে চারদিকে গাছপালা এর মধ্যে...এখনো আছে। পায়রাবন্দে গেলে আপনি এখনো মুগ্ধ হবেন। পায়রাবন্দে এখনো সেই অবস্থা আছে এবং আমি যতই পড়ি ‘সুলতানাস ড্রিম’, ইংরেজিতে লেখা, ততই অবাক হই।
সারা পৃথিবীতে কিন্তু বেগম রোকেয়ার মূল্যায়নটা নতুনভাবে শুরু হয়েছে। যেটা জীবনানন্দ দাশের ক্ষেত্রেও হয়েছে। লালনের ক্ষেত্রেও পুনরাবিষ্কার ঘটছে।
মামুনুর রশীদ: হ্যাঁ এবং আমি এর মধ্যে আমেরিকায় গিয়েছিলাম এবং সেখানে ক্লিনটন সিলি ওনার সর্বশেষ বই ‘বরিশাল অ্যান্ড বিয়ন্ড’, সেটার প্রকাশনা উৎসব হচ্ছিল। আমিও তার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিলাম; কিন্তু যান্ত্রিক কারণে যোগাযোগটা হলো না। তো সেখানেও জীবনানন্দ দাশের উনি নিজেও অনুবাদ করে সারা বিশ্বে একটা পরিচিতি করিয়েছেন। মানে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়েরও কিন্তু একটা নতুন...
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আরেকটু দরকার। এত ভালো লিখেছেন! আমি তো ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’র কোনো তল পাই না। আমি অনেকবার পড়েছি এবং তল পাই না।
মামুনুর রশীদ: তল পাই না। এবং এই যে তিন বন্দ্যোপাধ্যায়…
জি।
মামুনুর রশীদ: মানিক, বিভূতি, তারাশঙ্কর। এই তিন বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাংলা সাহিত্যে যে অবদান, আমার মনে হয় যে এগুলো যদি তখন অনুবাদ হতো তাহলে এঁরা নোবেল পুরস্কার পেতেন।
মামুনুর রশীদের মতে, মানিক, বিভূতি, তারাশঙ্কর—এই তিন বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাংলা সাহিত্যে যে অবদান, তা অনুবাদ হলে এঁরা নোবেল পুরস্কার পেতেনতারাশঙ্করের নাম ১৯৭১-৭২ সালে নোবেলের শর্টলিস্টে এসেছিল, এটা এখন বের হয়েছে।
মামুনুর রশীদ: আচ্ছা। বিভূতিভূষণের পাওয়া উচিত ছিল নোবেল পুরস্কার।
জি, এই তিনজনই পেতে পারতেন।
মামুনুর রশীদ: কী ব্যাপক তাঁর অভিজ্ঞতা এবং একটা ঔপন্যাসিক তিন লাইনের মধ্যে তিনটা জেনারেশনের কথা বলে দিচ্ছে ‘পথের পাঁচালী’তে। তিনটা জেনারেশনের কথা বলে দিচ্ছে।
আচ্ছা আমরা আপনার শৈশবের মধ্যে আসি। আপনার প্রাইমারি স্কুল কোথায়?
মামুনুর রশীদ: আমার প্রাইমারি স্কুল এই যে বললাম ফুলপুরে শুরু হয়েছিল।
তারপরে?
মামুনুর রশীদ: তারপর আমার বাবা ট্রান্সফার হয়ে গেলেন। চলে এলেন টাঙ্গাইলে। টাঙ্গাইল তখন মহকুমা। এসে ভর্তি হলাম বল্লা স্কুলে। বল্লা বলে একটা জায়গা আছে, খুব বর্ধিষ্ণু গ্রাম এবং তন্তুবায় সম্প্রদায়ের গ্রাম। ওখানে থেকে তারপরে আবার চলে গেলাম, ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় চলে গেলাম এলেঙ্গা। এলেঙ্গা তো এখন সবাই চেনে, বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের গেট।
হ্যাঁ, আমরা যখন রংপুর থেকে আসি। এলেঙ্গা এলে মনে হয়…
মামুনুর রশীদ: এলেঙ্গা এবং এলেঙ্গা তখন…আজকে যে এলেঙ্গা দেখো, আমি যখন ছাত্র ছিলাম একটি দোকানও ছিল না ওখানে। একটি কিছু ছিল না, একটা টং ছিল। ছোট্ট একটা টং ছিল এবং ওখান দিয়ে সারা দিনে দুটো বাস যেত।
ওই সময় টাঙ্গাইল থেকে ঢাকায় আসতে কতক্ষণ লাগত?
মামুনুর রশীদ: সারা দিন। সকালবেলায় আমরা রওনা দিতাম, ময়মনসিংহে যেতাম। ময়মনসিংহ থেকে একটা লোকাল ট্রেন ছিল বেলা ১১টার সময়, ১১টা-সাড়ে ১১টায়। ওইটা সন্ধ্যা ছয়টার দিকে এসে ঢাকায় পৌঁছাত।
এখন বলেন আপনার ম্যাট্রিক, মাধ্যমিক পরীক্ষা যেটা বলি, সেটা কত সালে কোন স্কুল থেকে?
মামুনুর রশীদ: আমি ’৬৩ সালে ওই বল্লা করোনেশন, আবার আমার বাবা বল্লায় ট্রান্সফার হলেন এবং বল্লা করোনেশন হাই স্কুল, ১৯১১ সালে প্রতিষ্ঠা। সেই স্কুল থেকে আমি এসএসসি করলাম, প্রথম এসএসসি।
তার আগে ম্যাট্রিক বলত।
মামুনুর রশীদ: ’৬২ এবং ’৬৩। একে এন্ট্রান্স বলত। ’৬২ সাল পর্যন্ত ম্যাট্রিকুলেশন এবং ’৬২ সালে ক্লাস নাইনে একবার পরীক্ষা দিতে হতো এবং ক্লাস টেনে আবার পরীক্ষা দিতে হতো আবার পরবর্তী বছরগুলোতে এটা উঠে যায়। তখন একটাই পরীক্ষা। তোমরা যে পরীক্ষা দিয়েছ আর কি, একটা করে পরীক্ষা হতো।
তারপর আপনার কলেজ কোথায়?
মামুনুর রশীদ: আচ্ছা, এরপরে আমি ভর্তি হলাম অ্যাগ্রিকালচার ইউনিভার্সিটিতে। কিন্তু বেশি দিন থাকলাম না।
তখন কি সেটা ম্যাট্রিক করেই করা যেত?
মামুনুর রশীদ: ম্যাট্রিক করেই করা যেত। তারপরে ঢাকায় এলাম। নানান সংকট আমার, অর্থনৈতিক সংকট…
নাট্যজন ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সংগঠক মামুনুর রশীদও, আপনি তো পলিটেকনিক পড়েছেন।…আপনি ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন।
মামুনুর রশীদ: হ্যাঁ, ইঞ্জিনিয়ার। তারপরে তো পলিটেকনিক পাস করলাম।
সেটা ঢাকায়?
মামুনুর রশীদ: ঢাকায়। ঢাকা পলিটেকনিক। তখন পলিটেকনিক ছিল মাত্র…ওটার নামই ছিল ইস্ট পাকিস্তান পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট। একটা ছিল, আমাদের সময় বোধ হয় দুটো হলো।
ক্যাম্পাসটা কোথায় ছিল?
মামুনুর রশীদ: ক্যাম্পাসটা তেজগাঁওয়ে। তেজগাঁওয়ে খুব সুন্দর বিশাল জায়গাজুড়ে একটা অডিটোরিয়াম ছিল, যে অডিটোরিয়ামটা আমার নাটক শেখার...
হ্যাঁ, সেটাই আমি বলছি। আপনি প্রথম মঞ্চে উঠলেন নাটক করতে কবে?
মামুনুর রশীদ: আচ্ছা, এটা আরও আগে। সেটা স্কুলে থাকতেই হয়েছে আর এখানে এসে আমি নাটক লিখতাম। হ্যাঁ, আমার এই যাত্রাপালা দেখে দেখে আমার মনে হয়েছিল যে অভিনেতারা পৃথিবীর সর্বশক্তিমান একটা লোক। মানুষকে হাসাচ্ছে, কাঁদাচ্ছে এবং যা বলছে বিশ্বাস করছি। এই যে ‘ইরানের খরজুবীথি’ আমাদের কল্পনায় ভেসে আসত, ইরানের খরজুবীথি মানে খেজুরগাছের সারি। ‘সোহরাব রুস্তম’ পালা দেখে আমি এত মুগ্ধ হয়েছিলাম এবং শেষ দৃশ্যে যে করুণ পরিণতিটা হলো এটা দেখে আমরা কেঁদেছি, দর্শকেরা কেঁদেছে। তো তখন আমার মনে হয়েছিল যে এই সোহরাব রুস্তমকে হত্যা করল, সোহরাব গা ঝাড়তে ঝাড়তে চলে গেল; তবে আমার কল্পনায়, আমার চিন্তায় কিন্তু রয়ে গেল সোহরাব মারা গেছে। অর্থাৎ ওরা যা কিছু করছে তা–ই আমরা বিশ্বাস করছি। এ রকম শক্তিশালী।
এরপরে আমার ধারণা হলো যে আবার এই ওরা যা কিছু অভিনয় করে এটা প্রম্পট করা হয়। তার পেছনে একজন লেখক আছে। তখন তো নাট্যকার বুঝি নাই, লেখক। এই লেখকটা আরও শক্তিশালী। কাজেই ঢাকায় আসার পরে আমি খুঁজতাম যে এই আকাশবাণী শুনতাম সেখানে নাটক হতো, ঢাকা রেডিওতে নাটক হতো, অসাধারণ সব নাটক। এবং আমার ধারণা হয়েছিল যে ঢাকায় বোধ হয় কলকাতার মতোই প্রতিদিন নাটক হয়। কিন্তু খুব হতাশ হলাম আমি। এই মাহবুব আলী ইনস্টিটিউট একটা ছিল, ওখানে মাঝেমধ্যে নাটক হতো আর স্কুল–কলেজ–বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা বার্ষিক নাটক হতো। তো আমি নাটক লিখলাম ১৯৬৫ সালের প্রথম দিকে, নাটকটি মঞ্চস্থ হলো আমাদের কলেজে, পলিটেকনিকে।
আপনার তখন ১৭ বছর বয়স।
মামুনুর রশীদ: হ্যাঁ, সেই নাটকটা খুব জনপ্রিয় হলো এবং...
নাম কী?
মামুনুর রশীদ: ‘মহানগরীতে একদিন’। বাহ! সুন্দর। মনে আছে এখনো। তারপরে তো সেই নাটক হওয়ার পর মাথায় ঢুকে গেল যে নাটকই লিখতে হবে। ইতিমধ্যে টেলিভিশন এসে গেছে ’৬৪ সালের শেষের দিকে। টেলিভিশনে, এখন টেলিভিশনের নাটক হয় সেই নাটক দেখি এবং একটা স্বপ্নের মতো জায়গায় দাঁড়িয়ে গেল যে মঞ্চে নাটক করব, টেলিভিশনেও নাটক লিখব। তো ১৯৬৮ সালের দিকে টেলিভিশনে নাটক লেখা শুরু করলাম। নাটকের নামটা এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না। কিন্তু প্রযোজকের নামটা মনে আছে, আবদুল্লাহ ইউসুফ ইমাম।
আপনি নাটকটা লিখে তাঁর সঙ্গে দেখা করলেন কীভাবে?
মামুনুর রশীদ: এইটা একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া। প্রথমে আবদুল্লাহ আল মামুনের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করলাম। জামান আলী খানের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করলাম। নাটক দিলাম। তারপরে জামান আলী খান বললেন যে ‘এক কাজ করেন, আপনি তো নাটক লিখছেন, আমি বলে দিচ্ছি আপনি আমজাদ হোসেনের কাছে যান।’ আমজাদ হোসেনের পেছনে অনেক ঘুরলাম, নাটক আর হয় না।
‘তুম্বা ও প্রতিবেশী' নাটকে অভিনয় করেছেন মামুনুর রশীদআমজাদ হোসেন তখন আবার জহির রায়হানের পেছনে ঘুরতেন নাকি?
মামুনুর রশীদ: আমজাদ ভাইয়ের সঙ্গে জহির রায়হানের অনেক ইয়েও ছিল। তখন ‘বেহুলা’ হচ্ছে। ‘বেহুলা’র গান কম্পোজ করছেন আলতাফ মাহমুদ। আমি সেখানে একটা বালক হিসেবে অবাক বিস্ময়ে দেখছি যে একটা গান কী করে কম্পোজ হয়। তো আমজাদ ভাইয়ের সঙ্গে অনেক ঘোরাঘুরি করলাম, হলো না। শেষে আবদুল্লাহ ইউসুফ ইমামকে আমি একটা পাণ্ডুলিপি দিলাম। উনি তখন মঞ্চে অভিনয় করতেন, এর আগে ফিল্ম করেছেন। খুব আবেগপ্রবণ লোক। উনি স্ক্রিপ্ট পড়ে বললেন, ‘তুমি দেখা করো আমার সঙ্গে বাসায়।’ গোপীবাগের বাসায় গেলাম। উনি বললেন যে ‘ঠিক আছে, তুমি লেখো। আমার সামনে লেখো।’ এই একটা কঠিন কাজ। সামনে লিখব কী করে!
আপনার প্রথম টেলিভিশন নাটক লেখার কথা বলছিলেন যে ইমাম সাহেব বললেন, এখানে বসে লেখো।
মামুনুর রশীদ: হ্যাঁ, লিখতাম, পড়ে শোনাতাম। ‘ঠিক আছে, তবে একটু আরেকটু বাড়াও বা একটু কমাও’ এই বলতেন। এবং উনি খুব মানে ‘শেষ অঙ্ক’ নাটকটার নাম, উনি খুব খুশি হলেন। এরপর বেশ কিছু নাটক ওনার প্রযোজনায় করেছি। এরপরে তো অনেক প্রযোজকের নাটক করেছি। সৈয়দ সিদ্দিক হোসেন এবং শেষে এসে একটা বড় কাজ এল সেটা হচ্ছে তোমার শহীদুল্লা কায়সারের ‘সংশপ্তক’ করব। আবদুল্লাহ আল মামুন আমাকে বললেন যে এইটা…প্রথমবার এটা। হ্যাঁ, ‘সংশপ্তক’ তো দুইবার হয়েছে। বললেন যে ‘তোমাকে এটা করতে হবে।’ আমি তো এই এত বড় উপন্যাস এটার নাট্যরূপ, তার ওপরে আবার শহীদুল্লা কায়সার একটা স্বপ্নের মানুষ।
তিনি তখন জীবিত?
মামুনুর রশীদ: তিনি তখন জীবিত এবং আমার কাজ হচ্ছে যে আমি নাট্যরূপ দিয়ে ওনাকে নিয়ে সকালবেলায় শোনাতাম। কায়েতটুলীর বাসায়। একটা বড় অ্যাট্রাকশন ছিল আমার যে সকালবেলায় শহীদুল্লা কায়সার ছানা খেতেন। আমি গেলে আমাকেও একটু ছানা দিতেন। তো এই ছানা খেতাম। তারপরে আমি চেষ্টা করতাম, আমি যতটুকু লিখেছি এটা শোনাব। কিন্তু উনি এত ব্যস্ত ছিলেন যে ফোনের পর ফোন আসতে শুরু করত এবং ওনার একটা বড় কাজ ছিল সকালবেলায় যে শমী, শমী কায়সার, ওকে দুধ খাওয়াতেন।
তখন তো ও অনেক শিশু। হ্যাঁ, দুগ্ধপোষ্য শিশু।
মামুনুর রশীদ: দুধ খাওয়া, দুধ খাওয়াতেন। খাওয়া শেষে বলতেন যে ‘আচ্ছা শোনো, রাখো, চলো সংবাদ অফিসে যাই।’ তো ওনারও একটা ফক্সভাগেন গাড়ি ছিল, উনি নিজেই চালাতেন। সংবাদে নিয়ে যেতেন। সংবাদে নিয়ে ওনার রুমে...
সংবাদের অফিসটা তখন পুরান ঢাকায়?
মামুনুর রশীদ: হ্যাঁ, বংশালে। সেই… পথ ধরে ওনার রুমে ঢুকতাম। এখানে কিছু পড়ে আছে, ওখানে একটা পড়ে আছে! এই করে ওনার রুমে ঢোকার পরে আর সময় হতো না। চারদিক থেকে লোকাল পত্রিকা আসা শুরু করত। তিনি হয়তো আমাকে বললেন, ‘তো ঠিক আছে, এটা করে ফেলো।’ করে ফেলতাম। উনি দেখতেন নাটকটা। ফতেহ লোহানী অভিনয় করতেন। একবার একটা বিঘ্ন ঘটল। ফতেহ লোহানী অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চলে গেলেন। এখন আমরা কী করব? তখন আমি আর আবদুল্লাহ আল মামুন মিলে একটা কাজ করলাম। যে ‘রমজান’ (চরিত্রটা) সেটা এ টি এম শামসুজ্জামান করত। রমজানের একটা বাক্যে উল্লেখ ছিল যে সে রেঙ্গুনে গিয়ে অনেক কুকীর্তি করে এসেছে। আমরা রেঙ্গুনে চলে গেলাম। রেঙ্গুনে একটা সেট বানানো হলো। লোহানী ভাই (অসুস্থ হওয়ার আগ পর্যন্ত) বেশ কটি পর্ব রেঙ্গুনে করলাম। শহীদুল্লা কায়সারকে যে কিছু জিজ্ঞেস করব, উনি তো তখন ছিলেন না। উনি ছিলেন রাওয়ালপিন্ডিতে। ফিরে আসার পর বোধ হয় কেউ তাঁকে বলেছে, ‘আরে আপনার উপন্যাসে না এ রকম একটা রেঙ্গুন করে ফেলছে।’ তো উনি খুব ক্ষুব্ধ হয়ে ফোন করলেন আবদুল্লাহ আল মামুনকে, ‘কী করেছ তোমরা? আমার উপন্যাসে তো ওলটপালট করছ তোমরা।’ মামুন ভাই বললেন, ‘আমরা তাহলে আসি, আপনাকে স্ক্রিপ্টগুলো দেখাই।’ ‘স্ক্রিপ্ট দেখে কী হবে?’ ‘তাহলে আপনি নাটকটা দেখেন।’ ‘আচ্ছা ঠিক আছে।’ সে সময় তো নাটক দেখার জন্য টেলিভিশনে আসতে হতো। মোটা মোটা একেকটা টেপ। শহীদুল্লা কায়সার টেলিভিশনে নাটকটা দেখে খুব খুশি হলেন। খুশি হয়ে আমার পিঠ চাপড়ালেন। বললেন, ‘স্ক্রিপ্টগুলো আমাকে দাও।’ বললাম, কেন, কায়সার ভাই? উনি বললেন, ‘আমার পরবর্তী সংস্করণে এগুলো আমি যুক্ত করব।’
আপনার তো তখন বয়স বেশি না…
মামুনুর রশীদ: না না; ১৮–১৯ বছর বয়স। আমি তো খুব খুশি হলাম। এরপর ‘সংশপ্তক’টা একাত্তরের প্রথম দিকেই বন্ধ হয়ে গেল। তখন আন্দোলন, গণ–আন্দোলন চারদিকে। শিল্পীরা আসতে পারছেন না, ধর্মঘট… এই–সেই!
আপনি যে আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লেন, এমএ করলেন, এগুলো কত সালে করলেন?
মামুনুর রশীদ: কাছাকাছি সময়েই। ৬৮–৬৯-এর দিকে।
নাট্যকার, অভিনেতা ও নির্দেশক মামুনুর রশীদঢাকায় প্রথম সংগঠিতভাবে মঞ্চনাটক করলেন কবে?
মামুনুর রশীদ: ’৭২ সালে। ‘আরণ্যক’। ‘আরণ্যক’ দিয়েই শুরু করলাম।
আচ্ছা। তার আগে আমরা একটু মুক্তিযুদ্ধে যাই। মুক্তিযুদ্ধের সময় তো আপনি বীর মুক্তিযোদ্ধা।
মামুনুর রশীদ: ২৫শে মার্চে আমি ঢাকায়। ওই দিন আমি আটকা পড়ে গিয়েছিলাম সামাদ সাহেবের বাড়িতে। মানে রোজী সামাদের বাড়িতে। তখন ‘সূর্যগ্রহণ’ বলে একটা ছবির স্ক্রিপ্ট করছিলাম আমি। তো আটকা পড়ে গেলাম। থেকে গেলাম সেই ভয়ংকর রাতে। ওনার বাসাটা ছিল গ্রিন রোডে। এখন যে বেতের কিছু দোকানটোকান আছে, ওই জায়গায় ছিল বাসা। একেবারে রাস্তার পাশে। আমরা ট্যাংকের শব্দ শুনতে পাচ্ছি; ট্যাংক দিয়ে যে ব্যারিকেড উঠিয়ে দিচ্ছে, সেগুলো শুনতে পাচ্ছি; গুলির শব্দ শুনতে পাচ্ছি। আর খুঁজছি যে পেছন দিকে কোনো রাস্তা আছে কি না। কারণ, রোজী সামাদ তখন খুব জনপ্রিয় অভিনেত্রী। যদি ওরা যদি এটা জানতে পারে, যেকোনো সময় আক্রমণ করতে পারে। তো পেছন দিক থেকে ওনাকে বের করে দেওয়া যায় কি না, এ রকম ভাবছিলাম। খাইনি সারা রাত। পরদিনও খাইনি। পানি খাচ্ছি শুধু। এমন ভয়! তারপর তো ২৬ তারিখ গেল। ২৭ তারিখে দুই ঘণ্টার জন্য কারফিউ শিথিল হলো। আমি তখন থাকতাম গুলিস্তানের একটা রেলওয়ে ডিভিশনাল মেডিকেল অফিসারের বাড়িতে। মেডিকেল অফিসার আমার এক বন্ধুর ভগ্নিপতি। তো, সেদিন সামাদ সাহেবের বাড়ি থেকে ওখানে চলে আসব। পথে কতগুলো লোমহর্ষক ঘটনা দেখলাম। আমার কেন কৌতূহল হলো যে নিউমার্কেটের কাঁচাবাজারে যাই। কাঁচাবাজারে গিয়ে দেখলাম, যাঁরা মাংস কাটার কাজ করেন, কসাই, তাঁদের গুলিবিদ্ধ হাত পড়ে আছে। বেশ কয়েকজনের। গরুর রক্ত–মানুষের রক্ত একাকার হয়ে গেছে। এরপর গেলাম নীলক্ষেতে। এখন যে পেট্রলপাম্প আছে, সেখানে দেখলাম, ঝাঁঝরা করে রেখে গেছে একটা ঘর। ভেতরে দেখলাম যে দুজন মানুষ নিহত পড়ে আছে। হাজার হাজার মানুষের এ শহর ছেড়ে যাওয়ার মিছিল। ইকবাল হলের ওখানে গিয়েও একটু ঘুরলাম। কিছু দেখতে পেলাম না তখন।
আমার বন্ধু ছিল কালি রঞ্জন শীল। সে তখন জগন্নাথ হলে থাকত। ওখানে গিয়ে শুনলাম যে অনেক মৃতদেহ পড়ে আছে। আমাদের বন্ধু শীলও ওর মধ্যে আছে। পরবর্তীকালে অবশ্য জেনেছি যে তাকে লাইনে দাঁড় করিয়েছিল, কিন্তু সে গুলিবিদ্ধ হয়নি।
তখন গুলি করল, সবাই পড়ে গেছে, ও পড়ে গেছে, ওর আর লাগেনি!
মামুনুর রশীদ: হ্যাঁ। এসব ঘটনা তো সবাই জানে। এরপর তো, আমার ওই আবাসস্থলে গিয়ে পৌঁছালাম। তারা সবাই প্রস্তুতি নিচ্ছিল যে চলে যাবে ওপারে, জিঞ্জিরায়। তো, ২৮ তারিখ কি ২৯ তারিখে আমরা জিঞ্জিরায় গেলাম।
ও; তাহলে তো আপনারা জিঞ্জিরার গণহত্যারও সাক্ষী।
মামুনুর রশীদ: শুভাঢ্যা। শুভাঢ্যায় গিয়ে আমরা উঠলাম। ওদেরই পরিচিত এক ভদ্রলোকের বাড়িতে। সেখান থেকে নৌকাযোগে যেখানে যাব, ওদের বাড়ি শাইনপুকুরে। নৌকা ঠিক করা হয়েছে। এখন শাইনপুকুরে যেতে লাগে দুই ঘণ্টা। তখন লাগত ১৮ ঘণ্টা। নদীপথই ছিল একমাত্র উপায়। আমরা যখন একটা নদী পার হয়ে মেঘনার দিকে যাচ্ছি, তখন শুনলাম যে ব্যাপক গোলাগুলি। আমাদের যে আশ্রয়দাতা, সেই ভদ্রমহিলা দৌড়ে আসছেন তাঁর শিশুপুত্রকে নিয়ে। সঙ্গে সঙ্গে নৌকা পাড়ে ভেড়ানো হলো; ওনাকে তোলা হলো। তোলার পরই তিনি সংজ্ঞা হারালেন। এর মধ্যে অনেক বৃদ্ধা–বৃদ্ধ, পরিবারের অনেকেই যাচ্ছে, তারপরে গিয়ে ওপারে উঠলাম। শাইনপুকুর পদ্মার পাড়; সেখান থেকে গেলাম নবাবগঞ্জ আজিজপুরে। আজিজপুর থেকে একপর্যায়ে ঢাকায় এলাম। ঢাকায় এসে মনে হলো যে টাঙ্গাইলে যাই। কিন্তু শুনলাম যে রাস্তায় প্রচুর তল্লাশি হয়। আমিও তল্লাশির সম্মুখীন হলাম। সব দেখলটেখল, দেখেটেখে কী কারণে ছেড়ে দিল। দুই–একজনকে সম্ভবত রেখে দিল। টাঙ্গাইলে গিয়ে দেখলাম, আমাদের বাড়িটা, যেখানে আমরা থাকতাম, সেটা শূন্য পড়ে আছে। একটা তালা লাগানো; দু–একটা মুরগি ঘুরে বেড়াচ্ছে। তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। আমার বাবা তখন টাঙ্গাইলে হেড পোস্ট অফিসের পোস্টমাস্টার। আমি সেখানে গেলাম। পোস্ট অফিসটা বন্ধ। সেটার পেছনে একটা মেসের মতো জায়গা ছিল, সেখানে লোকজন আছে। তারা বলল, ‘মাস্টার সাহেব যে কোথায় গেছেন, আমরা তো বলতে পারব না।’ আমি বললাম যে আমি এখন কী করব? তারা বলল, ‘কী আর বলব তোমাকে!’ তখন আমার মনে হলো, আমার মামাবাড়ি সেখান থেকে ৬ মাইল দূরে। কিন্তু সন্ধ্যার সময় শহরে কোনো যানবাহন নেই। শুধু আর্মির কিছু গাড়ি যাতায়াত করছে। তার ভেতর দিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে গিয়ে রাত ৯টা-১০টার দিকে পৌঁছালাম মামাবাড়িতে। সেখানে দেখলাম যে হ্যাঁ, আমার মা, বাবা, ভাইবোনেরা সবাই আছে। তারা ধরে নিয়েছিল যে আমি হয়তো মারাই গেছি।
সেখানেও একটা সাংঘাতিক একটা দৃশ্যের অবতারণা হলো। তিন–চার দিন পরই আবার সেনাবাহিনী ওই গ্রামে আক্রমণ করল। আমরা পাহাড়ে গিয়ে উঠলাম। তখন জানলাম যে কাদের সিদ্দিকী বলে এক তরুণ; তিনি সংগঠিত করার চেষ্টা করছেন। তো তাঁকে খবর দিলাম। তাঁর খুব ঘনিষ্ঠ একজন আমাদের সাথে ছিল। কাদের সিদ্দিকী এলেন। আসার পরে ওনার সঙ্গে কথাবার্তা হলো। তরুণ একজন; তাঁর হাতে একটা গান।
আমাদের গ্রামের বাড়ি ভাবনদত্ত; সেটা হচ্ছে ঘাটাইল থানায়। ওই জায়গা থেকে প্রায় ১০ মাইল দূরে। সেখানে গেলাম। সেখানে যাওয়ার পর ওখানকার কুম্ভকারেরা এসে বলল, ‘দাদা, আমাদের এখানে একটা যুদ্ধ হয়েছিল। আমরা অনেক অস্ত্র গোলাবারুদ পেয়েছিলাম। আমাদের যেটাকে পুন বলে, ওইটাকে বলে ফার্নেস। ফার্নেসের ভেতরে ঢুকিয়ে রেখে ওটা কাদা দিয়ে লেপে গাছ বুনে দিয়েছি। এখন আপনারা যদি মুক্তিবাহিনী করেন বা যুদ্ধ করেন, তাহলে আপনারা নিয়ে যেতে পারেন।’ আমরা আবার কাদের সিদ্দিকীকে খবর দিলাম। উনি এলেন ওনার দলবল নিয়ে। আমরা গিয়ে সেই সব অস্ত্র উদ্ধার করে ওনাকে দিলাম। প্রথমে এলএমজি, কয়েক বস্তা গুলিসহ আরও কিছু অস্ত্রশস্ত্র। এরপরই মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হলো আমাদের ওখানে। তো, ওই প্রাথমিক পর্যায়ে আমি কাজকর্ম করি আর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র শুনি। আমারই সব পরিচিতজন। তখন সিদ্ধান্ত নিলাম যে ভারতে যাব।
কোন বর্ডার দিয়ে আপনি ভারতে ঢুকলেন?
মামুনুর রশীদ: আমি গেলাম কুমিল্লার সিঅ্যান্ডবি বর্ডার দিয়ে।
এই দিক দিয়ে?
মামুনুর রশীদ: হ্যাঁ। তারপর আগরতলা। আগরতলা হয়ে কলকাতা।
আরণ্যক প্রযোজিত ‘চে’র সাইকেল’ নাটকে চঞ্চল চৌধুরী ও মামুনুর রশীদপ্লেনে?
মামুনুর রশীদ: না। সে এক জার্নি বটে! প্রথমে আগরতলা থেকে ট্রাকে উঠলাম। করিমগঞ্জ বলে একটা জায়গা আছে, সেখানে গিয়ে নামলাম। নামার পরে ট্রেন। ট্রেনে তিন দিন লাগল কলকাতায় যেতে।
তারপর আপনি আমাদের স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে?
মামুনুর রশীদ: হাসান ইমামের সাথে দেখা হলো প্রথমেই। উনি বললেন, ‘আয়।’ যেখানে রেকর্ডিং হয়, সেখানে গেলাম। আমার একটা নাটক হয়েছিল মার্চ মাসের প্রথম দিকে, টেলিভিশনে, আবার আসিব ফিরে। সেই নাটকের পাণ্ডুলিপিটা আমি নিয়ে গেছিলাম। ওখানে এটা রেডিওর উপযোগী করে ‘মৃত্যুহীন প্রাণ’ নাম দিয়ে আমার স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে কাজ শুরু হলো। এরপর আরও নাটক লিখেছি; ধারাবাহিক নাটক।
আচ্ছা। ’৭২–এ আপনি ‘আরণ্যক’ করেছেন। সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে অরেকটা কথা জানতে চাই। কবি আবুল হাসান, কবি নির্মলেন্দু গুণ আর আপনি—আপনারা তিনজন যে একই বাসায় থাকতেন, সেই সব কথা একটু শুনি।
মামুনুর রশীদ: নির্মলেন্দু গুণের সাথে আমার পরিচয় হলো শ্যামগঞ্জে। ময়মনসিংহের একটা জায়গা। ওর বাড়ি বারহাট্টায়। আমাদের এক কমন ফ্রেন্ড ছিল দেলোয়ার হোসেন; নির্মলেন্দু গুণের সাথে আনন্দমোহন কলেজে পড়ত। তো, ওরা শ্যামগঞ্জে একটা বিচিত্র অনুষ্ঠান করবে। আমাকে বলেছিল কিছু শিল্পী জোগাড় করে দিতে। তখন অজিত রায়, খন্দকার ফারুক আহমেদ—এদের সঙ্গে আমার খুবই বন্ধুত্ব। তো, তাদের নিয়ে আবদুল আলিমও গেছিলেন। তাদের নিয়ে ওখানে গেলাম। ওই সময় আমি লিখি—‘স্বপ্নে পাওয়া বন্ধু’; এ কারণে যে রাতে আমাকে একটা চকিতে শুতে দিল। শুয়ে দেখি যে আরেকজন লোক আছে। লোকটাকে চিনি না। সকালবেলায় সে একটু কাত হয়ে বলল, ‘আপনি মামুনুর রশীদ?’ আমি বললাম, ‘জি। আপনি?’ ‘আমি নির্মলেন্দু গুণ।’ এই দুজনের সাথে সম্পর্ক হলো এবং ওকে আমি ঢাকায় নিয়ে এলাম। আমি তখন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে পড়ি।
আপনিই তাঁকে ঢাকায় এনেছেন? এ তো বাংলা সাহিত্যে আপনার গুরুতর অবদান।
মামুনুর রশীদ: গুরুতর অবদান ওর বইয়ে আছে, এটাই। আমি বললাম যে তুমি ঢাকায় আসো। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের সাথে আমার পরিচয় ছিল আগে থেকেই। তো প্রথমে সায়ীদ ভাইয়ের ওখানে গুণকে নিয়ে গেলাম এই বলে যে এ এক কবি। তো সায়ীদ ভাই বললেন, ‘তাহলে আপনাকে একটা চাকরি দিই।’ ‘কী চাকরি?’ ‘বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করার চাকরি।’ একটা সাইকেলও দিলেন উনি। সাইকেলটা কয়েক দিন পর সে হারিয়ে ফেলল।
তো, গুণ আমার এখানেই পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের হোস্টেলে থাকে। এ রকম করতে করতে বন্ধুত্ব শুরু হলো। এর মধ্যে হাসানও এসে জুটল। তারপর আমার পলিটেকনিকের জীবন শেষ হয়ে গেল।
এরপর আমরা টেলিভিশনে নাটক লেখা শুরু করি। আয় রোজগার হচ্ছে। তো, এলিফ্যান্ট রোডে আমরা একটা ছোট্ট ঘর ভাড়া নিলাম। ভাড়া আমি করেছি; ওরা আমার আশ্রিত। খাটটা তো আমার। খাটে আমি থাকি; কোনো দিন নির্মলেন্দু গুণ থাকে; কোনো দিন আবুল হাসান থাকে। আরেকজন মাটিতে। তখন নির্মলেন্দু গুণের ওই ‘হুলিয়া’ কবিতা লেখা হচ্ছে। আবুল হাসানের কবিতা লেখা শুরু হয়েছে। দুজনের মধ্যে দ্বন্দ্ব আর মধুর সম্পর্ক; এটা দেখছি। এ–ই করতে করতে ’৭১ সাল এসে পড়ল। ’৭১ সাল আসার পর তো আমাদের ঘরবাড়ি সব ছেড়ে দিতে হলো। আমি চলে গেলাম কলকাতায়। নির্মলেন্দু গুণও চলে গেল কলকাতায়। আবুল হাসানকে আমরা আর খুঁজে পেলাম না। কোথায় গেল সে আবুল হাসান! ফিরে আসার পর ওর সাথে দেখা হলো।
আচ্ছা, এবার আপনি বলেন—আরণ্যকের প্রথম নাটক প্রযোজনা কোনটি ছিল?
মামুনুর রশীদ: ‘কবর’।
মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’ দিয়ে শুরু করলেন।
মামুনুর রশীদ: মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’। এর মধ্যে একটু বলা দরকার, সেটা হচ্ছে কলকাতায় থাকার সময় মুস্তাফা মনোয়ারের সাথে দেখা হলো। তিনি বললেন, ‘এই তুমি একটা নাটক লেখো।’ তখন আমি একটা নাটক লেখা শুরু করি। সেই নাটক প্রতিদিন লিখি, আর মুস্তাফা মনোয়ারকে শুনাই। উনি আবার কারেকশন দেন। এই করতে করতে অক্টোবরের দিকে নাটকটা লেখা শেষ হলো। ওখানকার আমরা যারা শিল্পী রিহার্সালও শুরু করলাম। এর মধ্যে আবিষ্কার করলাম আলী যাকেরকে। আলী যাকের তখন নিউজ পড়ে। আমি একটা সিরিয়াল শুরু করেছিলাম—‘মুক্তির ডায়েরি’—রেডিওতে। আমি বললাম, ‘তুমি কি অভিনয় করবা?’ কয় ‘আমি তো অভিনয় পারি না।’ ‘দেখ না একটু চেষ্টা করে। তোকে একটা আর্মি অফিসারের ভূমিকা দিলাম।’ আলী যাকের খুব চমৎকার অভিনয় করল। তারপর ওকে নিয়ে আসলাম মঞ্চ নাটকের রিহার্সালে। মোটামুটি রিহার্সাল শুরু হলো। এর মধ্যে দেশ স্বাধীন হয়ে গেল। আর এই নাটক করা হলো না। তো তখনই আমাদের কমিটমেন্ট হয়েছিল। একসাথে নাটক দেখতাম, নাটক দেখে খুব উজ্জীবিত হতাম। উৎপল দত্তের সাথে দেখা করতাম। শম্ভু মিত্র, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়—এঁদের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ করতাম। ওনারা নাটক দেখাতেন। তো ওইটা একটা বড় ব্যাপার হয়ে দাঁড়াল যে দেশে গিয়ে আমরা কী করব? দেশে গিয়ে আমরা নিয়মিত নাটক করব। তারপর আমরা ডিসেম্বরে এলাম। আসার পর ভাবছিলাম, কী নাটক করা যায়? তখন দেখলাম যে ‘কবর’ নাটকটা করা যায়। কারণ, তার আগেই মুনীর চৌধুরী নিহত হয়েছেন; শহীদ হয়েছেন আলবদরের হাতে। এই মুনীর চৌধুরী...
আপনারা করলেন আরণ্যক, এদিকে ঢাকা থিয়েটার—এগুলো তো একই সময়ের?
মামুনুর রশীদ: না, একটু পরের। ওরা একটু পরে করে।
তাহলে আপনারটাই প্রথম বাংলাদেশে ঢাকার মঞ্চে গ্রুপ থিয়েটার।
মামুনুর রশীদ: হ্যাঁ, গ্রুপ থিয়েটার। সেই সময় এতে একটা বড় আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে।
ড্রামা সার্কেল কি আগে থেকে ছিল?
মামুনুর রশীদ: ড্রামা সার্কেল তো পাকিস্তান আমলের। তখন ‘নাগরিক’ও চেষ্টা করেছিল, কিন্তু নাটক নামাতে পারে নাই। এইটা একটা হলো, আর বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক নাট্যচর্চা হলো, যেটার আউটকাম হচ্ছে নাসির উদ্দিন ইউসুফ, সেলিম আল দীন তারপর মো. হামিদ।
লিয়াকত আলী লাকী?
মামুনুর রশীদ: লিয়াকত আলী লাকী আরও অনেক পরের। তারপর নাট্যকেন্দ্র, নাট্যচক্র তৈরি হলো, মো. হামিদ যেটা করেছিলেন। তারপর একদিকে নাটক প্রযোজনা, আরেক দিকে থিয়েটার পত্রিকা। এটা আমাদের একটা বড় ধরনের...রামেন্দু মজুমদারের অবদান; এখনো সেটা চলছে।
আচ্ছা, আপনি তো টেলিভিশনে অসংখ্য নাটক লিখেছেন, রেডিওতেও। আপনার নিজের লেখা নাটকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় এক–দুটি নাটকের নাম বলতে বললে কী বলবেন?
মামুনুর রশীদ: এটা এইভাবে বলা মুশকিল। ধরো, আমার যে নাটকটা খুব আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল, সেটা বলতে পারি।
‘এখানে নোঙর’।
মামুনুর রশীদ: ‘এখানে নোঙর’ খুব আলোড়ন সৃষ্টি করল। ‘শ্বেতকাহিনী’, এরপর ‘একটি সেতুর গল্প’ সাম্প্রতিক এবং এরপর ‘বাঁচা’—এ রকম অনেক নাটক হলো আরকি।
আপনার একটা নাটকে একটা অপূর্ব সংলাপ ছিল। ওই যে ‘ভাগ্যবানের বউ মরে অভাগার মরে গরু’। আরেকটা ডায়ালগ ছিল, ‘মানুষ কেন বলছেন, এত মেয়ে মানুষ, পুরুষের হাতের ময়লা’। এটা মনে হয়, আমাদের ওই যে আপাটা—নিশাত আপা না? মারা গেলেন। হ্যাঁ, উনি অভিনয় করেছিলেন। ওই যে অপারেটরের দায়িত্ব পেয়েছিল, টেলিফোন অপারেটর—ওইটা খুব সুন্দর নারীবাদী নাটক। ওই সময়ে চিন্তাটা তো নতুন, নারীবাদ তো তখন বাংলাদেশে ভালোমতো এসে পৌঁছায় নাই। আপনি তখন খুব সুন্দর নাটক করেছেন। মনে আছে আপনার?
মামুনুর রশীদ: হ্যাঁ। ওই সময়ে একটা সিরিয়াল করেছিলাম ‘সময় অসময়’। খুব সুন্দর সিরিয়াল। ওই যে মধু পাগলা…
হ্যাঁ, সুন্দর হতো। আর মঞ্চে আপনার নিজের লেখা নাটকের মধ্যে কোনটা?
মামুনুর রশীদ: প্রথম আলোড়ন সৃষ্টি করল যে নাটকটি, সেটি হচ্ছে ‘ওরা কদম আলী’। ‘ওরা কদম আলী’র পর একটা ট্রিলজির মতো করলাম—‘ওরা কদম আলী’, ‘ওরা আছে বলেই’ এবং ‘ইবলিশ’। এই তিনটিই খুব আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল সত্তরের দশকের ’৭৬ সাল থেকে। ’৭৬ থেকে ’৮২ সাল পর্যন্ত এই তিনটি নাটক খুব আলোড়ন সৃষ্টি করল। এরপর তো অসংখ্য নাটক করেছি।
ফিল্ম করেছেন, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন, একুশে পদক পেয়েছেন। তো এখন বাংলাদেশের যে পরিস্থিতি, এর আগের সরকার যখন জুলুমের একটা শাসন তৈরি করেছিল, ওই সময় আপনি লিখেছিলেন প্রথম আলোতে—বেশ প্রতিবাদী লেখাই লিখতেন। একটা সময় জয়নুল আবেদিনকে উদ্ধৃত করে বললেন যে আমাদের ‘রুচির দুর্ভিক্ষ’ চলছে। মনে আছে আপনার সেই প্রসঙ্গটা, একটু বলবেন?
মামুনুর রশীদ: রুচির দুর্ভিক্ষ তখন আমরা সবাই দেখেছি, তুমিও দেখেছ। ইউটিউবে নাটকের নামে, চলচ্চিত্রের নামে যথেচ্ছাচার হচ্ছে। এবং রুচি–জনরুচিরও একটা অধঃপতন হয়েছে। এই তখন আমি বলেছিলাম যে দেশে একটা রুচির দুর্ভিক্ষ চলছে, যেখানে হিরো আলম একটা বড় ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছে।
এখন বাংলাদেশে যে ডানপন্থার উত্থান! আমাদের বাংলাদেশ তো উদার; আমরা ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা ধর্ম পালন করি, আমরা পরিবারগুলি ধর্মীয় আচার–অনুষ্ঠান–প্রথা—সব মান্য করি। কিন্তু হিন্দু–মুসলিম–বৌদ্ধ–খ্রিষ্টান, আমাদের আদিবাসী, আমাদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, আমাদের এখানে উর্দুভাষী অনেক মানুষ আছেন, সবাই মিলে সুখে–শান্তিতে থাকবে—এটাই তো আমাদের স্বপ্ন–কল্পনা। ওরকমই একটা দেশ ছিল। আর এখানে সুফি প্রভাবও খুব বড়। এখানে তো প্রধানত সুফি সাধকেরাই ইসলাম ধর্মটা প্রচার করেছিলেন। আমি তো লিখেছি, আমার আব্বা ওই সুফি ঘরানার মানুষ ছিলেন, দরবেশ ছিলেন, নামাজ পড়তেন। আবার আমরা গান করি, নাটক করি, আমিও ছোটবেলায় নাটক লিখতাম, নাটক করতাম, বাবা খুবই উৎসাহিত করতেন, খুশি হয়ে যেতেন যে আমি নাটক লিখেছি, সেটা মঞ্চস্থ হচ্ছে। সেই বাংলাদেশটাকে আমরা ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেললাম?
মামুনুর রশীদ: হ্যাঁ এবং হারিয়ে ফেললাম, এটার কারণ হচ্ছে শাসকগোষ্ঠী। কারণ হচ্ছে শাসকগোষ্ঠী দেখেছে যে ধর্মকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব। সেক্যুলার পলিটিক্স যাঁরা করেন, তাঁরাও কিন্তু এটা ব্যবহার করতে শুরু করেছেন।
খুবই অপব্যবহার করেছে। তাদের অপকর্মগুলো ঢাকার জন্য ধর্মকে আবরণ হিসেবে বা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে গিয়ে বাংলাদেশের যে অসাম্প্রদায়িক প্রীতিময় একটা সমাজ ছিল, এটাকে নষ্ট করে দিয়েছে।
মামুনুর রশীদ: এই যে ধরো আমার জন্ম তো পাকিস্তান হওয়ার একটু পরে। স্কুলে যখন পড়ি, তখন দেখতাম—ভারতে আমাদের হিন্দু বন্ধুরা চলে যাচ্ছে, চলে যাচ্ছে শিক্ষকেরা, চলে যাচ্ছে ভালো ভালো শিল্পীরা এবং তাতে একটা বড় ধরনের শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন এই শূন্যতাকে কিন্তু অনেকটা পূরণ করে এনেছে। একটা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের যে চেতনা, সেটাকে কিন্তু ধারণ করা শুরু হলো এবং তুমি খেয়াল করে দেখো, তারপর কী পরিমাণ কবি–সাহিত্যিক–ঔপন্যাসিক–গল্পকার–গায়ক–কম্পোজার তৈরি হয়েছে ষাটের দশকজুড়ে।
হ্যাঁ, এঁদের আমি বলি—’৫২ সালের জাতক; জাতক মানে যাঁরা এটাকে জন্ম দিয়েছেন এবং যাঁরা এর মাধ্যমে জন্ম নিয়েছেন। হাসান হাফিজুর রহমানরাও যেমন ছিলেন। পরবর্তীকালে আপনাদের ব্যাচটা বাংলাদেশটাকে তৈরি করলেন।
মামুনুর রশীদ: এই যে তৈরি করল, এর সামগ্রিক চেতনা কিন্তু অসাম্প্রদায়িক। আর যে সুফি আদর্শের কথা বললে, সেটা কিন্তু একটা চমৎকার ব্যাপার এবং যার অনুপ্রেরণায় কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ। যেমন আমি একটা গল্প, না গল্প নয়, একটা ঘটনা মাঝে মাঝেই বলি। ওই যে বলেছি, আমি টাঙ্গাইলের গ্রামে গেলাম। ওই গ্রামে আমার একটা বন্ধু ছিল—ঠাকুরদাস। একদিন যুদ্ধবিধ্বস্ত অবস্থায় পাহাড়ে গিয়েছিলাম। সেখান থেকে ফিরে এসেছি সবাই—আমরা ক্ষুধার্ত, ডাল আর ভাত রান্না হচ্ছে। আমি আর ঠাকুরদাস পাশাপাশি শুয়ে একটু ঝিমুচ্ছি, ক্লান্তি এসেছে তো। ঠাকুরদাস হঠাৎ বলে উঠল, ‘বন্ধু, এই যে এত যুদ্ধবিগ্রহ, এত কষ্ট করছি আমরা, এরপরও কি এই দেশে থাকতে পারব?’ আমি খুব খেপে গেলাম ওর ওপর, ‘তুই বলিস কী! একটা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ করার জন্যই তো আমরা যুদ্ধ করছি, কার জন্য যুদ্ধ করছি? তুই যাতে থাকতে পারিস, আমি যাতে থাকতে পারি, আরও যারা আছে, সবাই যাতে থাকতে পারে এই দেশে তার জন্যই তো যুদ্ধটা।’ ও আমার ধমক খেয়ে একটু থামল। থেমে আস্তে করে বলল, ‘তারপরও বন্ধু বুকটার মধ্যে কী রকম জানি একটা হাহাকার।’ সেই ঠাকুরদাস কিন্তু ’৭৫-এর পর থাকতে পারে নাই এই দেশে। ঠাকুরদাস এখন কোথায় আছে, আমি জানি না। তো এই যে এটা হলো, মুক্তিযুদ্ধের পরেও এই ঘটনাগুলি ঘটল, এই দেশ থেকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় যে চলে যেতে শুরু করল—এর রাজনৈতিক কারণটা কী? সেই কারণ যদি অনুসন্ধান করি, আমরা তাহলে দেখব যে হয়তো তারা বিশ্বাসও করে না, কিন্তু তারা ধর্মকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছে এবং ব্যবহার করতে করতে এত শক্তিশালী হয়ে গেছে যে এখন আমরা সেই অসাম্প্রদায়িকতার কথা ভুলে যেতে বসেছি।
সেখান থেকে আমাদের বাংলাদেশকে আবার আমাদের সম্প্রীতিময় বাংলাদেশ করতে হবে। একটা নতুন গণতন্ত্র, একটা আশাবাদ তৈরি হয়েছে—এই সরকার স্কুল–কলেজে খেলাধুলা–সংস্কৃতির চর্চায় গুরুত্ব দিতে চায়। সেসব ক্ষেত্রে মনে হয়, আমাদের সংস্কৃতিকর্মী, আমাদের নাট্যজনদের একটা ভূমিকা পালন করতে হবে।
মামুনুর রশীদ: অবশ্যই। আমি ইতিমধ্যে একটা বড় লেখা লিখেছি সমকালে। বেশ বড় লেখা। কয়েক সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে। এর আগে ১৭ মাসের যে সরকার ছিল, তারা তো ক্রীড়া ও সংগীত শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ করে দিয়েছিল। সেই জায়গা থেকে এই সরকার চেষ্টা করছে। ফলে আমাদের তাদের সাহায্য করা উচিত। কিন্তু আমি কিছু সাবধানবাণী উচ্চারণ করেছি। সেটা হচ্ছে, কত লক্ষ প্রাইমারি স্কুল আছে, এত বিপুলসংখ্যক সংগীত শিক্ষক আমরা পাব কি না, চিত্রকলার জন্য চারুশিল্পী পাব কি না। হয়তো সংকট দেখা দেবে, তারপরও পাওয়া যাবে। কিন্তু এখানে যেন দুর্নীতিটা না হয়। যেমন ১৬ লাখ টাকা দিয়ে প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষকেরা চাকরি নিয়েছেন। এটা তো সর্বনাশ। এটা নিয়ে অনেকে ভালো ভালো সাবধানবাণী উচ্চারণ করেছেন। আমি যেমন গ্রামের স্কুলে পড়েছি, তোমার সৌভাগ্য হয়েছে হয়তো রংপুর জিলা স্কুলে পড়ার। গ্রামের সেই স্কুলগুলো ছিল পাতার বেড়ার, ছিল বাঁশের বেড়ার, রাত্রিবেলায় সেখানে শিয়াল থাকত। আর শিক্ষকেরা তো ঠিকমতো খেতে পেত না, বেতনও ছিল কম। তার ওপর সেই বেতন প্রতি মাসে একসাথে পেত না। অথচ ক্লাসরুমে যখন তারা ঢুকত, একেকটা যেন সিংহ—অসাধারণ মূল্যবোধ, আদর্শবাদিতা ও শিক্ষাজ্ঞানসম্পন্ন। আমার মনে পড়ে, ছয় মাইল সাইকেল চালিয়ে আমাদের হেডমাস্টার স্কুলে আসতেন। মানে রোদ–বৃষ্টি–ঝড়ঝাঁপটার মধ্যেও ঠিক ওয়ার্নিং বেলটা যখন বাজত, তার সাইকেলের চাকাটা আমাদের স্কুলের সীমানায় এসে পৌঁছাত।
খুব সুন্দর বললেন। আমরা সেই বাংলাদেশ চাই, যেই বাংলাদেশে এ রকম আদর্শবাদী শিক্ষক, সংস্কৃতিমনস্ক শিক্ষক, ক্রীড়া শিক্ষকেরা শিক্ষা দেবেন। নিশ্চয়ই সংগীতের এত শিক্ষক পাওয়া যাবে না। কিন্তু প্রাইমারি স্কুলে সংগীতের চর্চায় শিশুদের উদ্বুদ্ধ করতে যে পণ্ডিত হতে হবে, তা তো নয়। যেমন আমাদের মেয়েরা ফুটবল খেলছে, খুবই ভালো করছে। সারা বাংলাদেশে এ রকম খেলাধুলা–সংস্কৃতির চর্চা, নাট্যচর্চা ও বই পড়ার চর্চা ছড়িতে দিতে পারি। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের যে বই পড়া আন্দোলন, সেটাকেও আমরা সব জায়গায় ছড়িয়ে দিতে পারি।
মামুনুর রশীদ: সায়ীদ ভাই সম্পর্কে নানান কথা ফেসবুকে লেখা হচ্ছিল। পরে আমি একটা বড় লেখা লিখেছি এবং সেখানে আমি বলেছি, আলোকিত মানুষ চাই। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের যে ভূমিকা, যে মুক্তচিন্তা ষাটের দশকে তিনি শুরু করেছিলেন, এখনো চলছে, এখনো ওনার বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র কীভাবে চলছে! সেটা খুব প্রাচুর্যময় একটা জায়গা হয়েছে। কিন্তু উনি তো তাঁর ওই অবস্থান ছাড়েন নাই যে আলোকিত মানুষ চাই।
২৫ থেকে ৩০ লাখ ছেলেমেয়ের কাছে বাছাই করা ১০টি বই নিয়ে প্রতিবছর যাওয়া, তার একটা সুফল তো বাংলাদেশ অবশ্যই পাবে। তো সেই আশাবাদ ব্যক্ত করে আপনাকে অনেক ধন্যবাদ জানিয়ে আমরা শেষ করছি।
মামুনুর রশীদ: ধন্যবাদ আপনাকেও।
সুধী আমরা এতক্ষণ একজন আলোকিত মানুষের কথা শুনলাম। মামুনুর রশীদ আমাদের অগ্রগণ্য অগ্রজ নাট্যজন, পথিকৃৎ ব্যক্তিত্ব। তাঁর জীবনের পথচলার এই গল্প আমাদের পথচলা সমৃদ্ধ করুক, বাংলাদেশ সম্প্রীতিময় আলোকিত বাংলাদেশ হয়ে উঠুক। সবাই ভালো থাকবেন।