সংসদ সদস্যকে দিয়ে ‘উদ্বোধনী অনুষ্ঠান’ করিয়ে সাড়ে তিন কিলোমিটার সড়কের ইট চুরি
· Prothom Alo

সাড়ে তিন কিলোমিটার পুরোনো ইটের রাস্তা পাকা করা হবে—এমন কথা বলে আয়োজন করা হয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। তাতে উপস্থিত হন সংসদ সদস্য, দলীয় নেতা-কর্মী ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি। সবাইকে মিষ্টিমুখ করিয়ে উন্নয়নকাজ ‘শুরু’ করা হয়। পরদিন থেকেই একে একে রাস্তার সব ইট তুলে ফেলা হয়।
Visit lej.life for more information.
তবে এরপর আর কাজ এগোয়নি। কথিত ঠিকাদার ও তার লোকজনকেও এলাকায় দেখা যায়নি। পরে এলাকাবাসী বুঝতে পারেন, পাকা রাস্তা নির্মাণের নামে আয়োজনটি ছিল সাজানো; উদ্দেশ্য ছিল পুরোনো রাস্তার ইট চুরি করে নিয়ে যাওয়া।
জামালপুর সদর উপজেলার রশিদপুর ইউনিয়নের গজারিআটা গ্রামে গত মে মাসে এই ঘটনা ঘটে। একই কায়দায় আরেকটি সড়কের ইট চুরির চেষ্টার সময় গত ১৬ জুন ওই চক্রের ১১ সদস্যকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। অভিনব এই চুরি নিয়ে সম্প্রতি ফেসবুকে লেখালেখি করায় বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, সংসদ সদস্যসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিরা সড়কের কাজের উদ্বোধন করায় ইট খুলে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে তাঁদের কোনো সন্দেহ হয়নি। উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, ওই সড়কের উন্নয়নকাজের কোনো দরপত্র হয়নি। এলাকাবাসী বিষয়টি না জানানোয় তাঁরাও সেখানে কাজ করার বিষয়টি জানতে পারেননি। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি জানতে পারেন।
গ্রেপ্তার চক্রের মূল হোতা আবদুল মান্নান (৫০)। তিনি সদর উপজেলার দিগপাইত ইউনিয়নের হবদেশ গ্রামের আমেছ আলীর ছেলে। তিনি দীর্ঘদিন ঢাকায় ছিলেন। ওই ঘটনার কয়েক দিন আগে এলাকায় ফিরে ঠিকাদার হিসেবে পরিচয় দেন। তবে তিনি একজন প্রতারক বলে জানিয়েছে পুলিশ। সম্প্রতি তিনি জামিনে কারামুক্ত হয়ে গা ঢাকা দিয়েছেন।
জামালপুরের নারায়ণপুর পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের উপপরিদর্শক মো. মঞ্জুরুল খান প্রথম আলোকে বলেন, গজারিআটা গ্রামের ঘটনায় মামলা হয়নি। তবে একই কায়দায় চাঁদপুর এলাকায় ইট ওঠানোর সময় চক্রটির ১১ জনকে আটক করেন এলাকাবাসী। তাঁদের সবার বিরুদ্ধে মামলা করে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। তাঁরা সবাই এখন জামিনে আছেন। এ ঘটনার তদন্ত চলছে।
সড়ক পাকা করার কাজের ‘উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে’ ছিলেন জামালপুর-৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য শাহ্ মো. ওয়ারেছ আলী (মামুন)। শুরুর দিকে কথিত ঠিকাদারের প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পারেননি দাবি করে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, রাস্তার উন্নয়নকাজের বিষয়টি এলাকাবাসী তাঁকে প্রথমে জানান। তাঁরা সেখানে থাকতে বলায় তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। এরপর এ ঘটনার মূল হোতা আবার তাঁকে আরেকটি রাস্তার কাজের বিষয়ে জানান। তখন তিনি এলজিইডির প্রকৌশলীসহ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে রাস্তার দরপত্রের বিষয়ে জানতে চান। তাঁরা দরপত্র না হওয়ার বিষয়টি জানালে তাঁর সন্দেহ হয়। তিনি সঙ্গে সঙ্গে এলাকায় লোক পাঠিয়ে খোঁজখবর নেন। পরে দলীয় নেতা-কর্মীদের দিয়ে চক্রের মূল হোতাসহ ১১ জনকে ধরে পুলিশে দেন। তিনি তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করিয়ে কারাগারে পাঠানো ব্যবস্থা করেন।
সবুজ মিয়া, গজারিআটা গ্রাম, জামালপুর সদরএই রাস্তা দিয়ে এখন চলাচল করাই কষ্টকর। বর্ষা থাকায় দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। কোথাও কোথাও রাস্তা চেনারও উপায় নেই। অথচ কয়েক মাস আগেও এখানে ইটের রাস্তা ছিল।পুলিশ ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সদর উপজেলার রশিদপুর ইউনিয়নের ভাঙ্গুরিঘাট থেকে ময়নার মোড় পর্যন্ত সাড়ে তিন কিলোমিটার সড়কটি পাকাকরণের জন্য গত ১২ মে ময়নার মোড় এলাকায় উদ্বোধন করা হয়। অনুষ্ঠানে জানানো হয়, ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে সড়কটির নির্মাণকাজের দায়িত্ব পেয়েছে ঢাকার একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। সাব-ঠিকাদার হিসেবে কাজটি করবেন আবদুল মান্নান। পরদিন থেকেই মান্নানের লোকজন সড়কের পুরোনো ইট তুলে বিভিন্ন গাড়িতে করে অন্যত্র সরিয়ে নেন। কিন্তু সড়কের কাজ শুরু না হওয়ায় এলাকাবাসীর সন্দেহ হয়। পরে তাঁরা প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পারেন।
জামালপুরে দিনে-দুপুরে অভিনব কৌশলে সড়কের ইট চুরি করে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। গতকাল শনিবার দুপুরে সদর উপজেলার গজারিআটা গ্রামেরশিদপুর ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য জামিল হাসান উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমরা কিছুই বুঝতে পারিনি। বোঝার উপায় ছিল না। কারণ, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এমপি সাহেব ও ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতিসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন। এমপি সাহেব আসার খবরে আমি সেখানে গিয়েছিলাম। বিশ্বাস করেন, এমন প্রতারণা হবে—আমরা একটুও বুঝতে পারিনি। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামের মানুষ। কারণ, রাস্তাটি দিয়ে চলাচল করার উপায় নাই।’
তবে ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আবুল হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক আজহারুল ইসলাম উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে থাকার কথা অস্বীকার করেছেন। সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. রুহুল আমিন বলেন, উদ্বোধনের সময় সংসদ সদস্যের যাওয়ার খবরে তিনিও গিয়েছিলেন। তখন তাঁরা প্রতারণার বিষয়টি টের পাননি। এটা দুর্ধর্ষ চুরির ঘটনা। বিষয়টি হাস্যকরও।
এ ঘটনার পর একই কৌশলে উপজেলার চাঁদপুর এলাকার আরেকটি সড়কের ইট সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেয় চক্রটি। আগের মতো স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতাদের উপস্থিতিতে সড়কের উন্নয়নকাজের উদ্বোধনের আয়োজন করা হয়। এরপর সেখানেও পুরোনো ইট খুলে নেওয়ার কাজ শুরু করেন মান্নান ও তাঁর লোকজন। এর মধ্যে গজারিআটা গ্রামের খবর চাঁদপুর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে এলাকাবাসী মান্নানের কাছে প্রকল্পের কার্যাদেশ, চুক্তিপত্রসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখতে চান। কিন্তু তিনি কোনো বৈধ নথি দেখাতে পারেননি। একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী মান্নান ও তাঁর লোকজনকে ধরে পুলিশে দেন।
জামালপুর সদরের ইউএনও নাজনীন আখতার বলেন, উদ্বোধনের বিষয়টিও তিনি জানতেন না। একদিন সংসদ সদস্য তাঁর কাছে জানতে চান। পরে তিনি খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারেন, সেখানে কোনো কাজ হচ্ছে না। পরে বিষয়টি তিনি সংসদ সদস্যকে জানান। পরে প্রতারক চক্রকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা গ্রেপ্তার করে। ওই ঘটনায় মামলাও হয়েছে।
বিষয়টি ফেসবুকের মাধ্যমে দেখেছেন বলে জানিয়েছেন এলজিইডির জামালপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী রোজদিদ আহম্মেদ। ওই রাস্তায় কোনো উন্নয়নকাজের দরপত্র হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইট না থাকায় চলাচলে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন মানুষ। তাঁরা দ্রুত সময়ের মধ্যে ওই রাস্তা করে দেওয়ার উদ্যোগ নেবেন।
প্রতারক চক্র রাস্তার ইট খুলে নিয়ে যাওয়ায় রশিদপুর ইউনিয়নের ভাঙ্গুরিঘাট থেকে ময়নার মোড় পর্যন্ত সাড়ে তিন কিলোমিটার সড়কে চলাচল করতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের।
শনিবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, সাড়ে তিন কিলোমিটার সড়কের কোথাও একটি ইটও নেই। পুরো সড়কটি এখন কাদাপানিতে পরিণত হয়েছে। মোটরসাইকেল, অটোরিকশা কিংবা অন্য কোনো যানবাহন চলাচল করতে পারছে না। অনেককে জুতা-স্যান্ডেল হাতে নিয়ে কাদা মাড়িয়ে গন্তব্যে যেতে দেখা যায়।
গজারিআটা গ্রামের সবুজ মিয়া ধানের বস্তাবোঝাই সাইকেল কাদার মধ্যে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছিলেন। কিছু দূর পরপরই সাইকেলের চাকা কাদায় আটকে যাচ্ছিল। হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, ‘এই রাস্তা দিয়ে এখন চলাচল করাই কষ্টকর। বর্ষা থাকায় দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। কোথাও কোথাও রাস্তা চেনারও উপায় নেই। অথচ কয়েক মাস আগেও এখানে ইটের রাস্তা ছিল। এখন কাদাপানিতে প্রতিদিনই দুর্ভোগ হচ্ছে।’