হরমুজ নিয়ে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র পাল্টাপাল্টি হামলায় ঝুঁকিতে সমঝোতা স্মারক

· Prothom Alo

হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত তীব্র হচ্ছে। সোমবারও দুই দেশ একে–অপরের বিভিন্ন নিশানায় হামলা চালিয়েছে। এদিনই ইরানের বন্দরের ওপর আবার নৌ অবরোধ বলবৎ করার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরান বলছে, হামলাসহ নানা পদক্ষেপে মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র গত মাসে সই হওয়া সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘন করেছে। এমনটি চলতে থাকলে সমঝোতা স্মারকের শর্ত মানবে না তেহরান।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতিতে যায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। এর পর থেকে সংঘাত বলতে গেলে বন্ধ ছিল। তবে গত সপ্তাহে হরমুজে জ্বালানিবাহী তিনটি জাহাজে হামলার পর উত্তেজনা আবার চরমে পৌঁছায়। গত সপ্তাহের রোববার থেকে থেমে থেমে পাল্টাপাল্টি তীব্র হামলা চালায় তেহরান ও ওয়াশিংটন। শনিবার যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালানোর পর হরমুজ বন্ধের ঘোষণা দেয় তেহরান।

Visit betsport24.es for more information.

ইরান হরমুজ বন্ধ ঘোষণা করলেও তা চালু আছে বলে দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই জলপথে ইরানের হামলার সক্ষমতা কমাতেই রোববার রাত ও সোমবার দেশটির বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে বলে দাবি মার্কিন বাহিনীর। এসব হামলায় ইরানে অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন। জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে কুয়েত, বাহরাইন, ওমান ও জর্ডানে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলার দাবি করেছে তেহরান।

সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল দিকে মোড় নিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। কারণ, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এরই মধ্যে যুদ্ধবিরতি বাতিল করার ঘোষণা দিয়েছেন। ১৭ জুন সমঝোতা স্মারকে সইয়ের পর নতুন করে আলোচনার আভাসও পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে তেলের বাজারে আবারও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। গতকাল ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম প্রায় ৪ শতাংশ বেড়েছে।

কাতারের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির শিক্ষক পল মুসগ্রেভ আল–জাজিরাকে বলেন, সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর সবচেয়ে বড় সংঘাতে জড়িয়েছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। আলোচনা যখন আশার আলো দেখাচ্ছিল, তখন হামলার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে। এখন যদি ইরান সমঝোতা স্মারক থেকে সরে যায়, তাহলে সংঘাত আরও বাড়তে পারে, যার পরিণতি ভালো হবে না।

সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে পিছিয়ে থাকলেও যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালিকে নিজেদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার বানিয়েছে তেহরান। ইরান চায় এই জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

ঝুঁকিতে সমঝোতা স্মারক

সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে পিছিয়ে থাকলেও যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালিকে নিজেদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার বানিয়েছে তেহরান। ইরান চায় এই জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকের পঞ্চম দফায় বলা হয়েছে, ইরান হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচলের ব্যবস্থা করবে। পাশাপাশি এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনা করবে ইরান ও ওমান।

তবে সোমবার নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরের ওপর আবার অবরোধ আরোপ করতে যাচ্ছে। হরমুজ দিয়ে নিরাপদে জাহাজ চলাচলের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ফি’ দিতে হবে। এর আগে ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমরা হরমুজের নিয়ন্ত্রণ নিতে যাচ্ছি। যুক্তরাষ্ট্রই এই জলপথের অভিভাবক হবে। এতে যে ব্যয় হবে, তার জন্য আমাদের অর্থ পাওয়া উচিত। হরমুজ পাহারা দেওয়ার জন্য আমরা অর্থ নিতে যাচ্ছি।’

যুক্তরাষ্ট্রের এ পদক্ষেপ সমঝোতা স্মারকের লঙ্ঘন বলে মনে করছে তেহরান। বিশ্লেষকেরা বলছেন, স্মারকের প্রথম দফায় যে হামলা বন্ধের কথা বলা হয়েছিল, গত কয়েক দিনের পাল্টাপাল্টি হামলায় তা–ও এরই মধ্যে লঙ্ঘন হয়েছে। এ ছাড়া ১০ নম্বর দফায় ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। যদিও এর পর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ওয়াশিংটন।

এমন পরিস্থিতিতে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, ‘যদি যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ বন্ধের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সই হওয়া সমঝোতা স্মারক মেনে চলবে না। প্রতিবারই যখন অপর পক্ষ তাদের প্রতিশ্রুতি পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে, তখন আমরাও আমাদের প্রতিশ্রুতি পালন করিনি। ভবিষ্যতেও আমরা একইভাবে কাজ করে যাব। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ খোলা হবে না।’

মার্কিন ড্রোনবহর ধ্বংসের দাবি

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) ভাষ্য, রোববার রাতে ইরানের যেসব লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে, তার মধ্যে দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, উপকূলীয় রাডার স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন স্থাপনা ও নৌযান রয়েছে। এসব হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান ও যুদ্ধজাহাজ ব্যবহার করা হয়েছে। এ ছাড়া রোববার রাতে প্রথমবারের মতো ‘একমুখী’ সামুদ্রিক ড্রোন ব্যবহার করেছে তারা।

যুক্তরাষ্ট্রের এমন হামলার সময় হরমুজ প্রণালির উপকূলে ইরানের বন্দর আব্বাস ও কেশম দ্বীপে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। ইরানের সংবাদমাধ্যম মেহর নিউজের খবরে বলা হয়েছে, ইরানের পশ্চিমাঞ্চলে খুজেস্তান প্রদেশে আবাদান শহরে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে দুজন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া ইসফাহান প্রদেশের গভর্নরের কার্যালয় জানিয়েছে, হামলায় সেখানে একজন নিহত হয়েছেন।

এসব হামলার জবাবে রোববার রাত ও সোমবার নতুন করে বাহরাইন ও কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার দাবি করেছে ইরান। দেশটির সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, হামলায় বাহরাইনে একটি মার্কিন ড্রোনবহর ধ্বংস হয়েছে। এ ছাড়া গতকালের হামলায় ওমানে রাডার ব্যবস্থা এবং জর্ডানের প্রিন্স হাসান বিমানঘাঁটির জ্বালানি ট্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি ইরানি বাহিনীর।

ইরানের ওপর আবারও মার্কিন নৌ অবরোধ, জাহাজ থেকে টোল নেওয়ারও ঘোষণা ট্রাম্পের

কোন পর্যায়ে আলোচনা

সমঝোতা স্মারকে সইয়ের পর সুইজারল্যান্ড ও কাতারে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই দফা আলোচনা হয়। পরবর্তী ধাপের আলোচনা কবে হবে, তা অনিশ্চিত। যুদ্ধবিরতি ‘শেষ’ ঘোষণা করলেও গত সপ্তাহে ট্রাম্প বলেছিলেন, তেহরানের অনুরোধে একটি চূড়ান্ত চুক্তির জন্য আলোচনায় রাজি হয়েছেন তিনি। তবে ইরানের ভাষ্য, এমন কোনো আবেদন তাদের পক্ষ থেকে করা হয়নি।

যদিও ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে দেশটির গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, তেহরানে কাতারি মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে আলোচনায় রাজি হয়েছে তারা। এর আগে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছিল, হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল পরিচালনা নিয়ে শনিবার মাসকাটে ওমানের সঙ্গে আলোচনায় বসেছিল তারা। তবে ওমানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপ থাকায়, ওই আলোচনা বিফলে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান কুইন্সি ইনস্টটিউট ফর রেসপন্সিবল স্টেটক্র্যাফটের গবেষক ট্রিটা পারসি আল–জাজিরাকে বলেন, সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে কোনো পক্ষই বাস্তবতা নিজেদের অনুকূলে নিতে পারবে না। আশা করা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান বুঝতে পারবে সমস্যা সমাধানের জন্য সমঝোতার বিকল্প নেই। তখন তারা আবার আলোচনার টেবিলে ফিরবে।

ইরানে বর্তমান হারে হামলা চালালে মার্কিন অস্ত্রমজুতে টান পড়বে

Read full story at source