বিশ্বকাপের আনন্দে চরের শিশুদের নিয়ে ফুটবল উৎসব

· Prothom Alo

বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনা সারা বিশ্বে। খেলা দেখতে টিভি পর্দায় চোখ রাখেন কোটি মানুষ। কিন্তু পাবনার বেড়া উপজেলার ঢালারচরের মানুষগুলো ফুটবল উন্মাদনাকে বরণ করে নিয়েছেন অন্যভাবে। তাঁদের ছোট ছোট নৌকা আর টিনের ঘরের চালায় উড়ছে ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার পতাকা। জেলেরা যখন নদীতে জাল ফেলছেন, তখন তাঁদের নৌকার মাস্তুলে দোল খাচ্ছে সেই পতাকা। ঘরের স্ত্রীরা রান্নাঘরের কাজ করতে করতেও যেন এক পলক দেখে নিচ্ছেন পতাকার দিকে—বিশ্বকাপের স্বপ্ন তাঁদেরও। কিন্তু এই স্বপ্ন তাঁরা দেখছেন এক অনিশ্চিত জীবনের মাঝে।

ঢালারচরের এই মানুষদের মধ্যে বিশ্বকাপ ফুটবলের আনন্দ ছড়িয়ে দিতে চরের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে প্রীতি ফুটবল ম্যাচ আয়োজন করে দয়ালনগর বন্ধুসভা। ‘ক্রীড়াই শক্তি ক্রীড়াই বল, মাদক ছেড়ে খেলতে চল’ স্লোগানে এবং বিকে ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় গত ৩ জুলাই ঢালারচরের বালুচরে এই ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। এতে চরের শিশুরা ‘স্বপ্নগ্রাম ব্রাজিল’ ও ‘স্বপ্নগ্রাম আর্জেন্টিনা’ নামে দুই দলে ভাগ হয়ে অংশ নেয়।

Visit extonnews.click for more information.

ম্যাচ শুরুর আগে দুই দলের খেলোয়াড়েরা

ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে খেলার উদ্বোধন করেন বিকে ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান এম এ বাতেন খান। প্রধান অতিথি ছিলেন ইলা প্যাডের প্রতিষ্ঠাতা মামুনুর রশীদ। ‘স্বপ্নগ্রাম চর বয়েজ’ নামে পরিচিত স্থানীয় তরুণ ফুটবলাররা এই ম্যাচে অংশ নেয়।

প্রীতি ম্যাচ গোলশূন্য ড্রতে শেষ হয়। খেলা শেষে চর সম্প্রদায়ের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে বিকে ফাউন্ডেশন ও দয়ালনগর বন্ধুসভা। বন্ধুসভার উপদেষ্টা ইঞ্জিনিয়ার আবু সায়েম প্রামাণিক বলেন, ‘চরের সুবিধাবঞ্চিত শিশু–কিশোরদের মধ্যে বিশ্বকাপ ফুটবলের আনন্দ ছড়িয়ে দিতে আমাদের এই উদ্যোগ। এই শিশুরাই একদিন বড় খেলোয়াড় হবে, এই আমাদের প্রত্যাশা।’

উপস্থিত ছিলেন কমফোর্ট ফুড প্যান্ট অ্যাগ্রোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক জুলহাস উদ্দিন বাবু, দয়ালনগর বাহারুন্নেছা পাবলিক লাইব্রেরির সহসভাপতি তফিজ উদ্দিন খান, দয়ালনগর বন্ধুসভার আহ্বায়ক আকরাম হোসেন খান, যুগ্ম আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার টুটুল প্রামাণিক, সদস্যসচিব আনিছুর রহমান ফারুক, সদস্য সাইদুর রহমান খান, হাকিম, রবিউল, মেহেদী হাসান, কাজি ইব্রাহিমসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। খেলাটির ধারাভাষ্য দেন মেহেদী হাসান।

‘স্বপ্নগ্রাম আর্জেন্টিনা’ দলের খেলোয়াড়েরা

খেলার আড়ালে জীবনের সংগ্রাম
ঢালারচরের মৎস্যজীবী ও কৃষক পরিবারগুলোর কাছে যমুনা নদী শত্রু নয়। এটি একধরনের শক্তি, যার বিরুদ্ধে তারা লড়াই করা ছেড়ে দিয়েছে। বছরের পর বছর ধরে এই শক্তিশালী নদী তাদের বসতবাড়ি গ্রাস করে নিচ্ছে। এটি তাদের ফসল ও জমি কেড়ে নিচ্ছে। তারা দেখেছে প্রতিবেশীরা কীভাবে তাদের সবকিছু গুছিয়ে ভেতরের দিকে সরে গেছে। তারা একমাত্র পরিচিত ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। এখন আর কোনো রাগ নেই। শুধু ক্লান্তিকর এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি।

‘এটাই আমাদের জীবন’, বললেন শাহিন, একজন তরুণ জেলে ও ফুটবলার। যিনি ম্যাচ আয়োজনে সাহায্য করেন। ‘নদী নেয়, আর আমরা সরে যাই। এটা সব সময়ই এভাবে হয়েছে। আমরা আর কাঁদি না। আমরা আর প্রশ্ন করি না কেন। আমরা যা যা পারি সংগ্রহ করি এবং নতুন জায়গা খুঁজে নিই। কিন্তু ভেতরে ভেতরে এটি আমাদের প্রতিবার একটু একটু করে মেরে ফেলে। আমাদের শিশুরা বড় হয় জানে যে তাদের খেলার মাঠ আগামী বছর থাকবে না। এটা কেমন শৈশব?’

ফুটবল নিয়ে শিশুদের আনন্দ

ঢালারচরের এই মাঠ বছরের পর বছর ধরে অসংখ্য প্রীতি প্রতিযোগিতার সাক্ষী হয়েছে। কিন্তু এখন এটি সর্বোচ্চ আগামী দুই–তিন সপ্তাহ টিকে থাকবে। যমুনা এটিকে সম্পূর্ণ গ্রাস করবে। স্থানীয় সম্প্রদায়ের জন্য এটি কোনো চমক নয়। এটি এক নিরন্তর বাস্তুচ্যুতির চক্রের এক পূর্বানুমেয় অধ্যায়। পাবনা অঞ্চলে নদীভাঙন অবিরাম চলছে। পরিবারগুলো বহুবার স্থানান্তরিত হয়েছে। তারা শুধু ঘরবাড়িই নয়, স্কুল, মসজিদ ও তাদের পূর্বপুরুষদের কবরও ছেড়ে চলে গেছে।

এই নীরব হতাশার মধ্যে ক্রীড়া একটি বিরল জীবনরেখা হয়ে উঠেছে। এক বিকেলের জন্য জাল সরিয়ে রাখা হয়েছিল, লাঙল মাঠে ফেলে রাখা হয়েছিল এবং চরের শিশুরা ফুটবলার হয়ে উঠেছিল। তাদের মধ্যে ছিল ১০ বছর বয়সী রাজু। সে একজন খণ্ডকালীন জেলে। সে তার বাবার সঙ্গে নদীতে সময় কাটায়, শ্রেণিকক্ষে নয়। অনেক চরশিশুর জন্য শিক্ষা অধরা স্বপ্ন। তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় উচ্চাকাঙ্ক্ষা দিয়ে নয়, নদীর অনিশ্চিত প্রকৃতি দিয়ে।

ফুটবল নিয়ে শিশুদের আনন্দ

‘আমরা এ রকম খেলতে পারি না, কখনোই না’, বলল রাজু। তার চোখ এখনো ম্যাচের স্মৃতিতে উজ্জ্বল। ‘বেশির ভাগ দিন নৌকায় থাকি, জাল ফেলি। স্কুল? আমি মাত্র কয়েকবার গিয়েছি। আমার বাবা বলেন, আবার যদি আমাদের চলে যেতেই হয় তাহলে স্কুলে যাওয়ার কোনো মানে হয় না। কিন্তু গতকাল সবকিছু ভুলে গিয়েছিলাম। আমি আর্জেন্টিনার হয়ে তারকা খেলোয়াড় ছিলাম। আমি একটি গোল করেছি। কিছুক্ষণের জন্য আমি জেলের ছেলে ছিলাম না। আমি ছিলাম একজন চ্যাম্পিয়ন।’

চরের শিশুরা এ ধরনের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সুযোগ খুব কমই পায়। তাদের দিন কেটে যায় বেঁচে থাকার সংগ্রামে। তারা বিপজ্জনক স্রোতে মাছ ধরে। জাল মেরামতে সাহায্য করে। জ্বালানির জন্য কাঠ সংগ্রহ করে। শিক্ষা তাদের কাছে দূরের স্বপ্ন। কিন্তু এদিন তারা অন্য কিছু পেয়েছিল। পেয়েছিল আনন্দ।

Read full story at source