যেভাবে ইংল্যান্ডকে এলোমেলো করে দিলেন মেসি

· Prothom Alo

আর্জেন্টিনা গোল করেছে দুটি। একটি এনজো ফার্নান্দেজ, অন্যটি লাওতারো মার্তিনেজ। গোলদাতার তালিকায় তাঁর নাম নেই। তবু সবাই জানেন, সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার জয়ের নায়ক লিওনেল মেসিই।

ম্যাচের ৫৫ মিনিট পর্যন্ত তাঁকে প্রায় আটকেই রেখেছিল ইংল্যান্ড। এরপর যা হলো, তা যেন এক খেলোয়াড়ের হাতে পুরো ম্যাচের চিত্রনাট্য বদলে যাওয়ার গল্প।

Visit extonnews.click for more information.

টমাস টুখেলের দল হয়তো ম্যাচ শেষে স্কোরলাইন দেখেছে ২–১। কিন্তু মাঠের ভেতরে তারা আসলে হেরেছে একজন মেসির কাছেই।

ক্যারিয়ারে এর আগে কখনো ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হননি মেসি। তাঁর অভিষেকের পর আর্জেন্টিনা যে একবার (২০০৫ সালে) ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হয়েছিল, সেদিন তিনি লাল কার্ডের নিষেধাজ্ঞায় মাঠে ছিলেন না। অবশেষে ৩৯ বছর বয়সী মেসিকে প্রথম দেখায় ইংলিশদের যে অভিজ্ঞতা হলো, এমন কিছু নিশ্চয়ই ভুলে যেতে চাইবে তারা।

প্রথমার্ধে মেসিকে মাঝমাঠেই আটকে রেখেছিল ইংল্যান্ড। বল পেলে কয়েকটি চমৎকার টাচ দেখিয়েছেন, কিন্তু ম্যাচে তাঁর প্রভাব চোখে পড়ার মতো ছিল না। ইংল্যান্ডও খেলছিল পরিকল্পনামাফিকই। ৫৫ মিনিটে অ্যান্থনি গর্ডনের গোলে এগিয়েও যায় তারা। এরপরই আসলে দিক বদলাতে শুরু করে ম্যাচের স্রোতোধারা।

দ্বিতীয়ার্ধে মাঠের মেসির অবস্থান বদলে ফেলা হয়

গোল হজম করার পর আর্জেন্টিনা কোচের কৌশল না পাল্টে উপায় ছিল না। সেই কৌশলে ঝুঁকিও ছিল। লিওনেল স্কালোনি মেসিকে মাঠের ডান দিকে সরিয়ে দেন। স্কালোনির এই একটি সিদ্ধান্তই ইংল্যান্ডের পুরো রক্ষণ-পরিকল্পনা ভেঙে দেয়। ম্যাচ শেষে এমিলিয়ানো মার্তিনেজও স্বীকার করেছেন kf, ‘মেসিকে উইংয়ে নিয়ে আসাটাই ছিল আমাদের জন্য টার্নিং পয়েন্ট।’

ওদিকে ইংল্যান্ড কোচ টুখেল তখন রক্ষণ আরও শক্ত করতে ডিফেন্ডার নামাতে শুরু করেন। উদ্দেশ্য ছিল এগিয়ে থাকা স্কোরলাইন ধরে রাখা। কিন্তু সেটিই বুমেরাং হয়। ইংল্যান্ড ক্রমেই নিজেদের অর্ধে গুটিয়ে যায়, আর বলে দখল বাড়ে আর্জেন্টিনার।

মেসির পায়ের আওয়াজে দুঃখী মানুষের আনন্দ

এতটাই যে ৫৫ থেকে ৯২ মিনিটের মধ্যে ৮৮ শতাংশ বলই ছিল আর্জেন্টিনার দখলে। এর মধ্যে ম্যাচের ৬৬ থেকে ৮৪ মিনিট—এই ১৮ মিনিটে ইংল্যান্ডের সঠিক পাস ছিল মাত্র ২টি। দুটিই গোলকিপার জর্ডান ও পিকফোর্ড সেন্টারব্যাক জন স্টোনসের একে অপরকে দেওয়া ফিরতি পাস।

মূলত এ সময়টাতেই ম্যাচের নাটাই নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন মেসি। বল পেলেই একজন, দুজন, কখনো তিনজন ইংলিশ ফুটবলারকে নিজের দিকে টেনে নিয়েছেন। ডান প্রান্ত থেকে কখনো ভেতরে ঢুকেছেন, কখনো বক্সের সামনে এসে জায়গা তৈরি করেছেন, আবার কখনো এমন পাস দিয়েছেন, যা পুরো ইংলিশ রক্ষণকে এলোমেলো করে দিয়েছে।

ইংল্যান্ডের প্রথম গোলের পর মেসিই ম্যাচের নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠেন

পরিসংখ্যানই বলে দেয়, ইংল্যান্ড আসলে কতটা অসহায় ছিল। ম্যাচে মেসির সফল ড্রিবল ছিল ৯টি। পুরো ইংল্যান্ড দল মিলে করেছে মাত্র ৭টি। অর্থাৎ, একাই পুরো ইংল্যান্ড দলের চেয়েও বেশি ডিফেন্ডার কাটিয়েছেন তিনি।

ইংল্যান্ডের বক্সে মেসির টাচ ছিল ৭টি, যা পুরো ইংল্যান্ড দলের সমান। গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন ৪টি, এটিও পুরো ইংলিশ দলের সমান। ম্যাচে সবচেয়ে বেশি ৯টি ক্রসও এসেছে তাঁর পা থেকেই।

মেসি মাঠে কেন এত হাঁটেন

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার, আর্জেন্টিনার দুটি গোলের পেছনেই ছিল তাঁর সরাসরি অবদান। ৮৫ মিনিটে কর্নার থেকে তাঁর পাস পেয়ে দূরপাল্লার শটে সমতা ফেরান এনজো। এরপর যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে তাঁর ক্রস থেকেই হেডে জয়সূচক গোল করেন লাওতারো মার্তিনেজ।

ইংল্যান্ডের সাবেক ডিফেন্ডার মিকা রিচার্ডস তাই বলছিলেন, ‘সে মাঠের মধ্যে হেঁটে বেড়ায়, কিন্তু বল পায়ে আসামাত্রই জ্বলে ওঠে। এখানেই তার প্রতিভা। আর এটা প্রায়ই ম্যাচে পার্থক্য গড়ে দেয়।’

মেসির এই ‘হেঁটে বেড়ানো’ নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। হাঁটতে হাঁটতেই তিনি প্রতিপক্ষের অবস্থান পড়েন, শক্তি সঞ্চয় করেন, তারপর ঠিক মুহূর্তে আঘাত করেন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেটিই আবার দেখা গেল।

আরও একবার আর্জেন্টিনার জয়োৎসবের কেন্দ্রবিন্দু লিওনেল মেসি

ইংল্যান্ডের সাবেক গোলকিপার জো হার্টের বিশ্লেষণও একই রকম, ‘আমরা মেক্সিকো আর নরওয়ের বিপক্ষে যেভাবে রক্ষণ লক করে রেখেছিলাম, সে রকমই করতে চেয়েছি। কিন্তু তাতে করে মেসি পুরোপুরি স্বাধীন হয়ে যায়। আর সেই তালা খোলার চাবি তো তাঁর কাছেই ছিল। শেষ ১৫ মিনিট সে একাই ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করেছে।’

ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি কেইনও স্বীকার করেছেন, মেসির কারণেই দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচ থেকে ছিটকে পড়েছে তাঁর দল, ‘আমরা দীর্ঘ সময় ওকে ভালোভাবেই আটকে রেখেছিলাম। কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে যা হয়, বল পেলেই তারা নতুন কিছু তৈরি করতে পারে। এমনি এমনি তো তিনি ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হননি।’

সম্ভবত এটাই মেসির সবচেয়ে বড় পরিচয়।

মেসির সঙ্গে কী নিয়ে লেগেছিল বেলিংহামের

Read full story at source