অনলাইনে শিশুর কোরআন শিক্ষা: অভিভাবকের ৫ করণীয়

· Prothom Alo

বড় শহরগুলোতে ব্যস্ত জীবনযাত্রার কারণে কিংবা প্রবাসে বসবাসরত বাঙালি পরিবারগুলোর জন্য সন্তানদের কোরআন শিক্ষার এক বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে অনলাইন মাদরাসা।

Visit newsbetting.bond for more information.

ঘরে বসেই স্কাইপ, জুম কিংবা হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে দেশ-বিদেশের দক্ষ কারী বা শিক্ষকের কাছ থেকে পবিত্র কোরআন শুদ্ধভাবে শেখার এই সুযোগটি নিঃসন্দেহে এক বিরাট বৈপ্লবিক পরিবর্তন। এটি যেমন একদিকে সাশ্রয়ী, অন্যদিকে সময় বাঁচায়।

তবে এই চমৎকার সুযোগটির ওপিঠে ভয়াবহ অন্ধকার বাস্তবতার জন্ম হয়েছে, যা নিয়ে অধিকাংশ অভিভাবক অসচেতন। স্ক্রিনের ওপারে ‘কোরআন শিক্ষক’ ব্যক্তিটি যে সবসময় নিরাপদ নাও হতে পারেন—এই নির্মম সত্য মেনে নেওয়া আমাদের রক্ষণশীল সমাজের জন্য বেশ কঠিন।

অনলাইন ক্লাসের আড়ালে শিশুদের সাইবার গ্রুমিং, মানসিক ও যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটতে পারে, তাই প্রতিটি মুসলিম পিতামাতাকে সতর্ক থাকতে হবে; যেন শিক্ষার আড়ালে শিশু কোনো ছদ্মবেশী শিকারীর শিকার না হয়।

স্ক্রিনের ওপারে ‘কোরআন শিক্ষক’ ব্যক্তিটি যে সবসময় নিরাপদ নাও হতে পারেন—এই নির্মম সত্য মেনে নেওয়া আমাদের রক্ষণশীল সমাজের জন্য বেশ কঠিন।

অভিভাবকের ধর্মীয় দায়বদ্ধতা

সন্তান মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে পিতামাতার কাছে একটি পবিত্র আমানত। তার শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা বজায় রেখে তাকে আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব সরাসরি অভিভাবকের।

মহানবী (সা.) বলেছেন, “তোমাদের প্রত্যেকেই একেকজন দায়িত্বশীল, আর তোমাদের প্রত্যেককেই নিজের অধীনস্থদের দায়িত্ব সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭১৩৮)

সন্তানকে কোরআন শিক্ষা দেওয়া যেমন ভালো কাজ, তেমন তাকে যেকোনো ধরনের ক্ষতি থেকে রক্ষা করাও কোরআনেরই নির্দেশ। বলা হয়েছে, “হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো। (সুরা তাহরিম, আয়াত: ৬)

সন্তান যখন ঘর ছাড়ে: পরিবারের সংকটে ইসলামের সমাধান

অভিভাবকের ৫ করণীয়

অনেক সময় অতি ভক্তির কারণে অভিভাবকেরা ধরে নেন যে যিনি কোরআন শেখাচ্ছেন তিনি কোনো অন্যায় করতে পারেন না। এর সুযোগ নেয় অপরাধীরা। এ ক্ষেত্রে অভিভাবকের জন্য কিছু কঠোর সুরক্ষানীতি বা বাস্তবায়ন করা জরুরি।

সন্তানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং অনলাইন ক্লাসকে নিরাপদ রাখতে কয়েকটি নিয়ম বাধ্যতামূলক করা উচিত:

১. যোগাযোগ অভিভাবকের হাতে রাখা

অনলাইন ক্লাসের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে ব্যক্তিগত যোগাযোগের সুযোগ থাকা যাবে না। হোয়াটসঅ্যাপ, ইমেইল কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যেকোনো আইডির নিয়ন্ত্রণ থাকবে পিতামাতার হাতে। শিক্ষক যেন কখনোই কোনো অসিলায় সরাসরি শিক্ষার্থীর সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে চ্যাট বা কথা বলতে না পারেন। 

হোমওয়ার্ক বা পড়ার অডিও-ভিডিও ক্লিপ পাঠানোর প্রয়োজন হলে, তা শিশুর ব্যক্তিগত ডিভাইস থেকে না পাঠিয়ে অভিভাবকের নিজস্ব অ্যাকাউন্ট থেকে পাঠাতে হবে।

সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২১৬৫কোনো পুরুষ যখনই কোনো নারীর সঙ্গে নির্জনে একাকী হয়, তখন তাদের তৃতীয়জন হয় শয়তান।

২. তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করা

শিক্ষার্থীর সঙ্গে সম্পর্ক থাকতে হবে পেশাদার ও শিক্ষকসুলভ। ক্লাসের ফাঁকে বা আড্ডার ছলে শিশু যেন তার স্কুলের নাম, বাসার ঠিকানা, পরিবারের সদস্যদের কর্মস্থল, কিংবা সাপ্তাহিক যাতায়াতের রুটিনের মতো সংবেদনশীল তথ্য শেয়ার না করে, সে বিষয়ে তাকে সতর্ক করতে হবে।

সাইবার অপরাধীরা এসব তথ্য ব্যবহার করে পরবর্তী সময়ে ব্ল্যাকমেইল বা সশরীরে শিশুর ক্ষতি করার পরিকল্পনা করে।

৩. ক্লাস হবে উন্মুক্ত স্থানে

অনলাইন কোরআন ক্লাসের সবচেয়ে বড় শর্ত হলো, ক্লাসটি কখনোই বন্ধ ঘরের ভেতরে একা একা নেওয়া যাবে না। ড্রয়িংরুম, ডাইনিং স্পেস বা এমন কোনো উন্মুক্ত স্থানে কম্পিউটার বা ল্যাপটপ রাখতে হবে, যেখানে পরিবারের অন্য সদস্যদের নিয়মিত যাতায়াত আছে।

স্ক্রিনে কী দেখানো হচ্ছে এবং শিক্ষক কী কথা বলছেন, তা যেন অভিভাবকেরা দূর থেকেও স্পষ্ট শুনতে ও দেখতে পান। ইসলামে ‘খালওয়াহ’ বা কোনো পরপুরুষের সঙ্গে নারীর নির্জনে অবস্থানকে যেভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, ডিজিটাল মাধ্যমে ক্যামেরার ওপারে একা থাকাও এক ধরনের ‘ডিজিটাল নির্জনতা’ তৈরি করতে পারে।

যেদিন সম্পদ ও সন্তান কোনো কাজে আসবে না

রাসুল (সা.) বলেছেন, “কোনো পুরুষ যখনই কোনো নারীর সঙ্গে নির্জনে একাকী হয়, তখন তাদের তৃতীয়জন হয় শয়তান।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২১৬৫)

যদি কোনো শিক্ষক অভিভাবকের উপস্থিতিতে আপত্তি জানান বা সন্তানকে একা ক্লাস নেওয়ার কথা বলেন, তবে তা একটি বড় ‘রেড ফ্ল্যাগ’ এবং অবিলম্বে বিকল্প শিক্ষক খোঁজা উচিত।

৪. ছবি ও ভিডিও আদান-প্রদান নিষিদ্ধকরণ

অনলাইন ক্লাসের কোনো সেশন শিক্ষক রেকর্ড করতে পারবেন না এবং শিক্ষার্থীর কোনো ছবি বা ব্যক্তিগত ভিডিও শিক্ষকের কাছে পাঠানো যাবে না। অনেক সময় পড়া আদায়ের নামে বা পুরস্কার দেওয়ার বাহানায় ছবি চাওয়া হতে পারে, যা কঠোরভাবে প্রতিহত করতে হবে।

শিক্ষক যদি কোনো অডিও বা ভিডিও লেকচার সন্তানকে শুনতে বা দেখতে দিতে চান, তবে তা সরাসরি অভিভাবকের আইডিতে পাঠাতে হবে।

অবহেলার কারণে যদি একটি শিশুর মনস্তাত্ত্বিক বা শারীরিক ক্ষতি হয়ে যায়, তবে সেই ক্ষত তাকে সারাজীবন তাড়া করে বেড়াবে, এমনকি ধর্মের প্রতিও তার মনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিতে পারে।

৫. সন্তানকে শারীরিক সীমানা শেখানো

আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে শিশুদের নিরাপদ ও অনিরাপদ স্পর্শের বিষয়ে খুব একটা শেখানো হয় না। কিন্তু অনলাইন ক্লাসের ক্ষেত্রেও শিশুকে শারীরিক সীমানা বুঝিয়ে দেওয়া জরুরি। শিশুকে স্পষ্ট বলতে হবে যে, স্ক্রিনে কেবল তার মুখমণ্ডল এবং হাত দুটি দৃশ্যমান থাকবে।

এর বাইরে শরীরের অন্য কোনো অংশ দেখানোর অনুরোধ করা হলে সে যেন তৎক্ষণাৎ ‘না’ বলে এবং স্ক্রিন বন্ধ করে দেয়। ক্যামেরার ওপারে শিক্ষকও যেন শালীন পোশাকের বাইরে অন্য কোনোভাবে নিজেকে উপস্থাপন না করেন, সে বিষয়েও শিশুকে সচেতন রাখতে হবে।

অস্বস্তি বা ভয় লাগলে সঙ্গে সঙ্গে কল কেটে দেওয়ার স্বাধীনতা শিশুকে দিতে হবে।

শিক্ষকের সঙ্গে পেশাদার যোগাযোগ

এই নিয়মগুলো কোনো গোপন বিষয় নয়। ক্লাস শুরু করার আগেই অভিভাবক হিসেবে আপনার স্পষ্ট অবস্থান এবং শর্তগুলো শিক্ষকের কাছে লিখিতভাবে বা মৌখিকভাবে জানিয়ে দেওয়া উচিত। এতে কোনো অপরাধী মানসিকতার মানুষ থাকলে সে শুরুতেই সতর্ক হয়ে যাবে।

কোনো ছদ্মবেশী অপরাধীর হাত থেকে সন্তানকে রক্ষা করা, তার তাজবীদের ভুল সংশোধনের চেয়ে শতগুণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অবহেলার কারণে যদি একটি শিশুর মনস্তাত্ত্বিক বা শারীরিক ক্ষতি হয়ে যায়, তবে সেই ক্ষত তাকে সারাজীবন তাড়া করে বেড়াবে, এমনকি ধর্মের প্রতিও তার মনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিতে পারে।

‘হে আমার সন্তান, নামাজ কায়েম করো’

Read full story at source