হলের খাবার নিয়ে আপত্তি, ‘থাপড়িয়ে দাঁত ফেলে দিব’ বলে শিক্ষার্থীকে ছাত্রদল নেতার মারধর

· Prothom Alo

সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহপরান হলের ক্যানটিনের খাবারের মান নিয়ে ওই হলের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে অভিযোগ জানান এক আবাসিক শিক্ষার্থী। এর জেরে ছাত্রদলের দুই নেতা তাঁকে মারধর করেন বলে অভিযোগ।

Visit somethingsdifferent.biz for more information.

গতকাল শনিবার রাত ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনের দোকানসংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

দুজনের মধ্যে হাসিবুর রহমান শাখা ছাত্রদলের সভাপতি রাহাত জামান এবং তারেক রহমান শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাড়ম সরকারের অনুসারী বলে ক্যাম্পাসে পরিচিত।

ওই শিক্ষার্থীর নাম খাইরুল খন্দকার। তিনি সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে অধ্যয়নরত।

ছাত্রদলের যে দুই নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁরা হলেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সহ-দপ্তর সম্পাদক ও পরিসংখ্যান বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী তারেক রহমান এবং একই বর্ষের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী ও শাখা ছাত্রদলের যোগাযোগবিষয়ক সম্পাদক হাসিবুর রহমান।

দুজনের মধ্যে হাসিবুর রহমান শাখা ছাত্রদলের সভাপতি রাহাত জামান এবং তারেক রহমান শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাড়ম সরকারের অনুসারী বলে ক্যাম্পাসে পরিচিত।

ভুক্তভোগী ও অভিযুক্ত ব্যক্তি সবাই শাহপরাণ হলের আবাসিক শিক্ষার্থী।

হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে অভিযোগ থেকে মারধর

প্রত্যক্ষদর্শী, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের সূত্রে জানা যায়, হলের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে খাইরুল কেন আপত্তিকর অভিযোগ তুলেছেন, সে জন্য শনিবার রাত পৌনে ১১টার দিকে তাঁকে ডাকেন হাসিবুর ও তারেক। তাঁদের মধ্যে বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। দুজন খাইরুলকে পেটান। তিনি বুক, মাথা ও হাতে গুরুতর আঘাত পান।

খাইরুল খন্দকার, ভুক্তভোগীআমি কেন প্রাধ্যক্ষের কাছে স্যরি বলি নাই, তা জানতে চায় হাসিবুব। আমাকে সে হুমকি দেয়। এ সময় তারেক বলে, “এই ব্যাটা তুই আমারে চিনস? থাপড়িয়ে দাঁত ফেলে দিব।”

ভুক্তভোগী খাইরুল খন্দকার ঘটনার বিষয়ে লিখিত বক্তব্যে বলেছেন, ১৬ জুলাই বৃহস্পতিবার তিনি হলের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ক্যানটিনের খাবারের বাজে অবস্থা নিয়ে প্রাধ্যক্ষকে ‘মেনশন’ দিয়ে অভিযোগ করেন। এর পরের দিন ১৭ জুলাই শুক্রবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে তারেক ও হাসিবুর তাঁকে প্রাধ্যক্ষের কাছে ‘স্যরি’ বলতে বলেন। শনিবার রাতে গেটে খাবার খেতে গেলে হাসিবুর তাঁকে ডেকে পাঠান।

খাইরুলের ভাষ্য, ‘তখন আমি কেন প্রাধ্যক্ষের কাছে স্যরি বলি নাই, তা জানতে চায় হাসিবুব। আমাকে সে হুমকি দেয়। এ সময় তারেক বলে, “এই ব্যাটা তুই আমারে চিনস? থাপড়িয়ে দাঁত ফেলে দিব।” তখন হাসিবুর ও তারেক আমাকে বেধড়ক মারধর করেন।’

পরে সেখানে উপস্থিত শিক্ষার্থীরা খাইরুলকে বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা গেলে আহত শিক্ষার্থীকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।

ছাত্রদল নেতাদের বক্তব্য

অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতা তারেক রহমানের ভাষ্য, ‘হলের গ্রুপে খাবারের বিষয়ে কথা বলায় প্রাধ্যক্ষ স্যার একটু মন খারাপ করছেন। তখন আমরা এ নিয়ে খাইরুলকে বুঝাচ্ছিলাম। কিন্তু সে জুনিয়র হয়েও আমাদের সঙ্গে খুব বাজে আচরণ করে। যেটা আমাদের কাছে সিনিয়র হিসেবে খুব খারাপ লাগছে। তখন এক কথা, দুই কথায় বিষয়টা বড় পর্যায়ে চলে গেছে। সে তেড়ে এসে আমার শরীরে তার হাত টাচ করে। তখন হাসিবুর বাধা দিতে গেলে সেটা হাতাহাতির পর্যায়ে চলে যায়। এতে হাসিবের চশমা ভেঙে গেছে, তার হাত কেটে গেছে, তার ফোনটা নষ্ট হয়ে গেছে।’

রাহাত জামান, সভাপতি, বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলএটি সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট হলের প্রাধ্যক্ষ ও তিনজন শিক্ষার্থীর মধ্যকার একটি বিষয়।

তবে অভিযোগের বিষয়ে ছাত্রদল নেতা হাসিবুর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকাবার কল দিলেও তিনি ধরেননি।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি রাহাত জামান বলেন, এটি সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট হলের প্রাধ্যক্ষ ও তিনজন শিক্ষার্থীর মধ্যকার একটি বিষয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।

প্রাধ্যক্ষ বললেন, সংশ্লিষ্টতা নেই

হোয়াইটসঅ্যাপ গ্রুপে খাইরুল খন্দকার যে অভিযোগ করেছিলেন, বিষয়টি নিয়ে হাসিবুর ও তারেকের সঙ্গে কথা বলেছিলেন বলে প্রাধ্যক্ষ স্বীকার করেছেন।

শাহপরাণ হলের প্রাধ্যক্ষ ইফতেখার আহমদ দাবি করেছেন, এ ঘটনায় তাঁর কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। তাঁর ভাষায়, ‘যখন ওই শিক্ষার্থী অভিযোগ করেছে, তখন ক্যানটিন পরিচালককে ডেকে এনে আমি আলাপ করেছি। তাঁকে ওই শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলতে বলেছি। এখানে আমার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সত্য নয়।’

তবে হোয়াইটসঅ্যাপ গ্রুপে খাইরুল খন্দকার যে অভিযোগ করেছিলেন, বিষয়টি নিয়ে হাসিবুর ও তারেকের সঙ্গে কথা বলেছিলেন বলে প্রাধ্যক্ষ স্বীকার করেছেন।

রাতে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল

শনিবার দিবাগত রাত তিনটার দিকে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী, ছাত্রশক্তির কয়েকজন নেতা–কর্মী ও ছাত্রদলের একাংশের নেতা–কর্মীরা ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করেন। এ ঘটনায় জড়িত নেতাদের শাস্তির দাবি জানান তাঁরা। পরে তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের অতিথি ভবনের সামনে গিয়ে অবস্থান ও বিক্ষোভ করেন। উপাচার্য খায়রুল ইসলাম শিক্ষার্থীদের সামনে এলে তাঁদের পক্ষ থেকে তিনটি দাবি তুলে ধরা হয়।

খায়রুল ইসলাম, উপাচার্যএ ঘটনায় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে এ ঘটনার তদন্তসাপেক্ষে যথাযথ বিচার নিশ্চিত করা হবে।

শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে দাবি তুলে ধরেন সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ফয়সাল হোসেন। শিক্ষার্থীদের তিনটি দাবির মধ্যে আছে—এক কার্যদিবসের মধ্যে মারধরের ঘটনার তদন্ত, জড়িত ব্যক্তিদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার এবং আহত শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। উপাচার্য দাবি পূরণের বিষয়ে আশ্বাস দিলে অতিথি ভবনের সামনে থেকে চলে যান বিক্ষোভাকারীরা।

এ বিষয়ে উপাচার্য খায়রুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ ঘটনায় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে এ ঘটনার তদন্তসাপেক্ষে যথাযথ বিচার নিশ্চিত করা হবে।’

Read full story at source