বিশ্বজুড়ে আবারও লা ফুরিয়া রোহা, স্প্যানিশ মহাকাব্য
· Prothom Alo
লা ফুরিয়া রোহা (La Furia Roja), স্প্যানিশ শব্দটির বাংলা অর্থ দাঁড়ায় ‘লাল উন্মাদনা বা লাল তাণ্ডব’।
Visit michezonews.co.za for more information.
নামটার বয়স শতাব্দীর বেশি। ১৯২০, বেলজিয়াম। অ্যান্টওয়ার্প অলিম্পিকে স্প্যানিশদের শরীরনির্ভর ও আক্রমণাত্মক খেলার কারণে তাদের এই নাম জুটে। কালের বিবর্তনে শারীরিক ফুটবল খেলা স্পেন এখন খেলে শৈল্পিক ফুটবল। নিজেদের মধ্যে বল আদান–প্রদান করে। শিল্পীর তুলিতে যেন একেকটা আঁচড়। তবে শতবর্ষ আগের তাণ্ডব চালানো দলটি এখনো একই কাজ করে। লাল তাণ্ডব। তখন বাহুবলে তটস্থ করে আর এখন মন্ত্রমুগ্ধ করে।
দলটি নিজেদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেছিল ২০১০ সালে। তত দিনে তারা ঘরের মাঠে করে ফেলেছে বিশ্বকাপ আয়োজন। মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা জিতে নিয়েছে। প্রথমবার ঘরের মাঠে। পরেরবার থামতে হয়েছে ফাইনালে গিয়ে, মিশেল প্লাতিনির স্বাগতিক ফ্রান্সের বিপক্ষে ’৮৪–তে। আর শেষবার দক্ষিণ আফ্রিকার বিমান ধরার বছর দুই আগে।
বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দে ভাসছে স্পেনতবে বিশ্বকাপটা কেমন যেন দূরে দূরেই থেকে যাচ্ছিল। ১২ বার অংশগ্রহণ করে ৪ বার ফিরতে হলো কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে। এর বাইরে সর্বোচ্চ সাফল্য চতুর্থ হওয়া, তা–ও ১৯৫০ সালে। উরুগুয়ের বিপক্ষে ড্র দিয়ে শুরু। অতঃপর ব্রাজিলের বিপক্ষে ৬-১ গোলে বিধ্বস্ত হওয়ার পর সুইডেনের বিপক্ষে ৩-১ গোলের পরাজয়। চার দলের মধ্যে চতুর্থ হওয়া বৈ আর কোনো উপায় ছিল না।
ফলে দক্ষিণ আফ্রিকায় সেবার দলটার সামনে এসেছিল উৎসব করারই উপলক্ষ। টানটান উত্তেজনা শেষে তারা শেষটা রাঙিয়েছিল দারুণভাবেই। সকার সিটি স্টেডিয়ামে ১১৬তম মিনিটে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার গোল। বিশ্বজুড়ে স্প্যানিশ সুবাস। লাল তাণ্ডব।
বছর দুই বাদে আবারও ইউরোপজুড়ে লাল তাণ্ডব। ইউরোপসেরা হয়ে বিশ্বসেরা, বিশ্বসেরা হয়ে ইউরোপসেরা। ইতিহাসের প্রথম (এবং এখন অবধি একমাত্র) দল হিসেবে ইউরোপিয়ান শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট মাথায় ধরে রাখা।
পরের বছরই কনফেডারেশন কাপ। লুপ্ত হওয়ার আগে আকর্ষণ হারালেও সেবারও ছিল জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। তবে সেবারই সম্ভবত লেখা হয়ে গিয়েছিল স্প্যানিশ সাম্রাজ্যের পতন। স্বাগতিক ব্রাজিলের বিপক্ষে ফাইনালে ৩-০ গোলের আত্মসমর্পণ।
বিশ্বকাপ জয়ের স্মারক হিসেবে জাল কেটে নিচ্ছেন স্পেন দলের খেলোয়াড়–স্টাফরাএরপর গল্পটা ভুলে যাওয়ার মতো না হলেও অন্তত বুক ফুলিয়ে বলার মতোনও না। ২০১৪, ছয় দশক বাদে আবারও ব্রাজিলে বসল বিশ্বকাপ। স্পেন নিজেদের উদ্বোধনী খেলায় মুখোমুখি হলো নেদারল্যান্ডসের। যেন যেখানটায় শেষ, সেখান থেকেই শুরু। হয়েছিলও তাই বটে, তবে উল্টো হয়ে। ৫-১ গোলের লজ্জায় হতে হলো লাল। এরপর চিলির বিপক্ষে হার ছিটকে দিল আসর থেকে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পাওয়া জয়টাকে স্রেফ সান্ত্বনা বৈ আর কিই-বা বলা যায়!
রাশিয়াতেও গল্পটা একই, ব্যর্থতায় ঘেরা। হুয়ান লোপেতেগুই দলটাকে গুছিয়েই এনেছিলেন বেশ। তবে আসর শুরুর সপ্তাহখানেক আগে বিতর্কের জন্ম দিয়ে স্বাক্ষর করলেন রিয়াল মাদ্রিদের সঙ্গে চুক্তি। ফলে দায়িত্ব গিয়ে বর্তালো ফার্নান্দো হিয়েরার ওপর। হিয়েরার করার ছিল না তেমন কিছুই, তবু লড়েছিল স্পেন মোটামুটি। নিজেদের উদ্বোধনী যাত্রায় ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে থামানোর ছিল না কোনো সমাধান। পরের খেলায় ইরানের বিপক্ষে কষ্টার্জিত জয়, শেষটা মরক্কোর বিপক্ষে ড্র। দুটি ড্র নিয়ে গ্রুপ সেরা হয়ে পরবর্তী পর্বে যাওয়া মাত্রই খেতে হয়েছিল হোঁচট। স্বাগতিকদের বিপক্ষে টাইব্রেকারে পরাজয়।
চার বছর পরও একই ভাগ্য বরণ করতে হলো দলটাকে। কোস্টারিকাকে ৭-০ গোলে গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর জার্মানির বিপক্ষে ড্র আর জাপানের সঙ্গে হার। শেষ ষোলোতে টাইব্রেকারে মরক্কোর স্পেন-বধ।
২০১০ বিশ্বকাপ জয়ের পর স্পেনের খেলোয়াড়দের উল্লাস।শুধু বিশ্ব আসরেই নয়, স্পেন একই সঙ্গে কর্তৃত্ব হারিয়েছিল ইউরোপেও। চেক প্রজাতন্ত্র আর তুরস্কের বিপক্ষে জয়ের পর গ্রুপের শেষ ম্যাচে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে পরাজয়, শেষ ষোলোতে ইতালির বিপক্ষেও একই ফল। মাথা ছাড়া হলো ইউরোপিয়ান মুকুট।
ইউরোপের ১১টি ভিন্ন শহরে আয়োজিত হওয়া পরবর্তী আসরেও ব্যাপ্তি বাড়লেও পাল্টায়নি পরিণতি। সুইডিশ ও পোলিশদের বিপক্ষে কষ্টার্জিত দুই ড্রয়ের পর স্লোভাকিয়ার বিপক্ষে বড় জয় মিললেও আদতে তা ছিল শুভংকরের ফাঁকি। সে ফাঁকি আরও স্পষ্ট হয় পরবর্তী পর্বে। ক্রোয়েশিয়াকে অতিরিক্ত সময় গিয়ে পরাজিত করার পর সুইসদের বিপক্ষে জয় টাইব্রেকারে। তবে ইতালির সামনে আর টিকল না কোনো বাধাই। টাইব্রেকার অবধি নিলেও জুটল কপালে পরাজয়। সেমি থেকেই বিদায়।
এরপর কাতারের গল্প তো হলোই, তবে কাতার থেকেই যেন ফিরল স্পেন এক অনন্য সবক নিয়ে। লুইস এনরিকেকে সরিয়ে দায়িত্ব দেওয়া হলো বহুদিন ধরে যুব পর্যায়ে কাজ করে আসা লুইস দে লা ফুয়েন্তেকে। তাতেই বাজিমাত। অপরাজিত থেকে শিরোপা পুনরুদ্ধার করল স্পেন। আবারও হলো ইউরোপসেরা। রেকর্ড চতুর্থবারের মতো।
বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে সতীর্থদের সঙ্গে বিজয় উদ্যাপন করছেন স্পেনের অধিনায়ক রদ্রি’১৬-এর শোধ তুলে ক্রোয়াটদের পরাজিত করে আসর শুরু করা দলটি গ্রুপ পর্বে তিন জয় তুলে নিয়েছিল কোনো গোল হজম না করেই। এর মধ্যে ছিল ইতালির বিপক্ষে ’২০- এর শোধটাও। নকআউটের চার ম্যাচে একটি করে চারটি গোল হজম করলেও স্বাগতিক জার্মানির বিপক্ষে ম্যাচটি বাদে বাকি তিন ম্যাচেই জয় নিশ্চিত করেছে মূল সময়ের মধ্যেই। সাত ম্যাচে সাত জয়। স্পেন যেন আগমনী বার্তাই দিল। আভাস দিল লাল তাণ্ডবের।
অতঃপর ২০২৬। কেপ ভার্দের বিপক্ষে থমকে গেলেও আর দমাতে পারেনি কেউই। সৌদি আরবের বিপক্ষে ৪-০ গোলের বড় জয়। দুবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ের বিপক্ষেও জয়। কোনো গোল হজম না করেই পরবর্তী পর্ব নিশ্চিত করার পর সে যাত্রাটাও শুরু করল জয় দিয়েই, হেসেখেলে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে। ব্যবধান, ৩-০। এরপর শেষ ষোলোতে পর্তুগালের বিপক্ষে একমাত্র গোলে জয়। কোয়ার্টারে বেলজিয়াম একটি গোল শোধ দিলেও পারেনি জয়রথ ঠেকাতে। আসরে ওই একবারই বল গেল স্পেনের জালে। সেমিতে পরাক্রমশালী ফরাসি আক্রমণ মুখ থুবড়ে পড়ল।
আর ফাইনালে? শিরোপা ধরে রাখার লক্ষ্য নিয়ে মার্কিন মুলুকে পা রাখা আর্জেন্টিনা না পেল বলের দেখা, না পেল দিশা। ফলাফল? বিশ্বজুড়ে আরও একবার স্প্যানিশ সৌরভ। সঙ্গে লাল তাণ্ডব।
মহীনের ঘোড়াগুলো চলেছিল আবার বছর কুড়ি পরে। তবে দে লা ফুয়েন্তে অত সময় নেননি। বছর ষোলো পরেই দিলেন ছড়িয়ে, বিশ্বজুড়ে। স্প্যানিশ সৌরভ। লাল তাণ্ডব। লা ফুরিয়া রোহা।
মুক্তিযুদ্ধ ও গবেষণা সম্পাদক, চট্টগ্রাম বন্ধুসভা