ট্রাম্পের কঠিন শর্ত, সৌদি আরব এখন কী করবে
· Prothom Alo

২২ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিসচিব ক্রিস রাইট এবং সৌদি জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুল আজিজ বিন সালমান একটি বহুল প্রতীক্ষিত ‘সেকশন ১২৩’ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এর মধ্য দিয়ে দুই দেশের মধ্যে বেসামরিক পারমাণবিক প্রযুক্তি ও উপাদান বেচাকেনার একটি আইনগত ভিত্তি তৈরি হলো। ওয়াশিংটন এই চুক্তিকে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য শতকোটি ডলারের বাণিজ্য এবং কয়েক দশকের এক দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার সূচনা হিসেবে উপস্থাপন করেছিল।
তবে এর ঠিক এক দিন পরই দৃশ্যপট বদলে দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। চুক্তি স্বাক্ষরের মূল ঘোষণার বাইরে গিয়ে তিনি একটি নতুন রাজনৈতিক শর্ত জুড়ে দেন। ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়ে দেন, সৌদি আরবকে আব্রাহাম আকোর্ডের আওতায় ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে হবে। তা না হলে এই চুক্তি কার্যকর হবে না।
Visit esporist.org for more information.
মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই চরমপত্র একটি সম্পন্নপ্রায় জ্বালানি চুক্তিকে রাজনৈতিক শর্তের বেড়াজালে আটকে দিয়েছে। এতে করে রিয়াদ, মার্কিন কংগ্রেস এবং সম্ভাব্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ট্রাম্পের দেওয়া আলটিমেটাম হয়তো এক মহা কূটনৈতিক চুক্তির পথ খুলতে পারে, আবার বহু পরিশ্রমে দাঁড় করানো এই পারমাণবিক শক্তি চুক্তিকে এক লহমায় ভেস্তেও দিতে পারে। দিন শেষে এই চুক্তির ভাগ্য নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে তার পারমাণবিক বাণিজ্য, নিরাপত্তার কড়াকড়ি এবং বাস্তবসম্মত কূটনীতিকে একই সুতোয় বাঁধতে পারছে।
আইনি কাঠামো, সুযোগ ও ভবিষ্যৎ সময়সীমা
যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৪৬ সালের অ্যাটমিক এনার্জি অ্যাক্টের ‘সেকশন ১২৩’ অনুযায়ী, যেকোনো দেশের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি করতে হলে ৯টি শর্ত মেনে চলতে হয়। এ ছাড়া জ্বালানি পুনর্নবীকরণ বা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতি বাধ্যতামূলক। এই চুক্তি নিজে থেকেই কোনো পারমাণবিক চুল্লি তৈরির চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় না; বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক সরঞ্জাম, অবকাঠামোগত লাইসেন্স, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তার দুয়ার খুলে দেয়।
সৌদি আরবের জন্য এই চুক্তির অর্থ হলো, আমেরিকান রিঅ্যাক্টর, প্রযুক্তি ও রেগুলেটরি সুবিধার নিয়ন্ত্রণ পাওয়া। আর ওয়াশিংটনের জন্য এটি বিপুল অঙ্কের প্রযুক্তি রপ্তানি, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের কর্মসংস্থান এবং মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি আধিপত্য ধরে রাখার বড় সুযোগ।
তবে আলোচনার সবচেয়ে জটিল বিষয়টি হলো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যে চুক্তি হয়েছিল, তাকে ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ বলা হয়। কারণ, সংযুক্ত আরব আমিরাত স্বেচ্ছায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের পথ বন্ধ রেখেছিল।
কিন্তু সৌদি আরবের ক্ষেত্রে এই পথটি সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি। ওয়াশিংটন ও রিয়াদ হয়তো সৌদি ভূমিতেই মার্কিন প্রযুক্তি ব্যবহারে একটি সর্বাধুনিক ও নিবিড় নিয়ন্ত্রণে থাকা গোপন ব্যবস্থার মাধ্যমে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের পথ খোলা রাখতে চাইছে। এটি সাময়িক ঝুঁকি কমালেও সৌদি ভূখণ্ডে যেকোনো ধরনের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ব্যবস্থা অনুপ্রসারণ ঝুঁকির সৃষ্টি করে।
এই কাঠামোগত চুক্তির মেয়াদ ধরা হয়েছে প্রায় ৩০ বছর। বড় ধরনের পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণ এবং তা থেকে বিদ্যুৎ পাওয়ার প্রক্রিয়াটি দীর্ঘমেয়াদি। এতে সৌদি আরবকে প্রযুক্তি চয়ন, অর্থায়ন নিশ্চিতকরণ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার দক্ষতা বাড়াতে দীর্ঘ সময় কাজ করতে হবে। এর বাণিজ্যিক সুবিধা পাবে ওয়েস্টিংহাউজের মতো খ্যাতনামা মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো।
সৌদি আরবের লাভ ও যুক্তরাষ্ট্রের সুযোগ
সৌদি আরবে জনসংখ্যা, শিল্পকারখানা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ (কুলিং), পানি শোধন (ডি স্যালাইনেশন) এবং ‘ভিশন ২০৩০’ প্রকল্পের দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদাও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। দেশটির অভ্যন্তরীণ জ্বালানি হিসেবে খনিজ তেল ও গ্যাস পোড়ানো কমিয়ে আনতেই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি হতে পারে একটি পরিবেশবান্ধব ও নির্ভরযোগ্য বিকল্প।
বিশ্বে সুপেয় পানির সবচেয়ে বড় উৎপাদক হওয়ায় দেশটি পানি শোধন প্রক্রিয়ায় পারমাণবিক শক্তিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে যেমন বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে, তেমনি এর উৎপাদিত তাপ পানি শোধনে সরাসরি ব্যবহার করা সম্ভব। এটা ক্ষতিকর গ্যাস নিঃসরণ বহুলাংশে কমিয়ে আনবে।
তবে দ্রুত বিস্তার পাওয়া সৌরশক্তি ও প্রাকৃতিক গ্যাসনির্ভর বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যে পারমাণবিক শক্তিকে ঠিক কতটুকু প্রাধান্য দেওয়া হবে, সেই সিদ্ধান্ত এখনো সৌদিকে নিতে হবে।
অপর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই প্রকল্পের সুফল প্রচুর—জ্বালানি সরবরাহ, রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ খাতেই কেবল মার্কিন ব্যবসার বড় পথ খুলবে না, বরং যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত ও নজরদারি জোরদারে সাহায্য করবে। তা ছাড়া সৌদির বিনিয়োগ মার্কিন পারমাণবিক সরবরাহ খাতের অর্থনীতিকেও শক্তিশালী করবে।
প্রধান চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকি
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো ‘পারমাণবিক অস্ত্রের প্রসার’। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সঙ্গে সৌদি আরবের সুরক্ষামূলক চুক্তি থাকলেও দেশটি এখনো ‘অ্যাডিশনাল প্রটোকল’ গ্রহণ করেনি। অথচ পারমাণবিক কর্মসূচির বাইরে কোনো গোপন তৎপরতা চলছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের ব্যাপক এখতিয়ার দেয় এই প্রটোকল।
উদ্বেগের কারণটা পরিষ্কার, রিঅ্যাক্টরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের যে প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়, তা দিয়ে পারমাণবিক অস্ত্রও তৈরি করা সম্ভব। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান আগেই হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন, ইরান যদি পারমাণবিক বোমা বানায়, তবে সৌদি আরবও একই পথে হাঁটবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতি, দ্বিপক্ষীয় সুরক্ষা চুক্তি, আইএইএর পর্যবেক্ষণ এবং রপ্তানি লাইসেন্সিংয়ের মাধ্যমে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। তবে এর জন্য প্রয়োজন অবাধ প্রবেশাধিকার, স্বচ্ছ ও কঠোর প্রয়োগ।
খরচ আরেক বড় বাধা। বিশেষ করে যেসব দেশ প্রথমবারের মতো পারমাণবিক খাতে নামছে, তাদের ক্ষেত্রে সময়মতো কাজ শেষ না হওয়া এবং বাজেট উপচে পড়ার ঝুঁকি থাকে। এ জন্য সৌদি আরবের একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা দরকার, যেখানে পর্যাপ্ত দক্ষ লোকবল থাকবে।
আমেরিকান কংগ্রেস দীর্ঘ ৯০ কার্যদিবস ধরে এই চুক্তি পর্যালোচনার সুযোগ পাবে। মার্কিন আইনপ্রণেতাদের নজর থাকবে মূলত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও নিরাপত্তা সুরক্ষার দিকে।
একই সঙ্গে ইসরায়েলের উদ্বেগও এখানে বেশ জোরালো। সৌদি আরবের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নতুন কোনো আঞ্চলিক পারমাণবিক প্রতিযোগিতার জন্ম দেবে কি না, সেই ভয়ে ইসরায়েল শক্ত শর্ত, কঠোর পরিদর্শন এবং আলোচনার টেবিলে ‘সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ’-এর শর্ত বেঁধে দেবে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতা
আমেরিকার প্রস্তাব যদি সৌদির কাছে আকর্ষণীয় মনে না হয়, তবে তারা খুব সহজেই রাশিয়ার রোসাটম, চীনের সিএনএনসি, দক্ষিণ কোরিয়ার কেপকো কিংবা ফ্রান্সের মতো সরবরাহকারীদের বেছে নিতে পারে। রাশিয়া ও চীন কোনো রাজনৈতিক শর্ত ছাড়াই প্রকল্প অর্থায়ন ও সম্পূর্ণ পারমাণবিক জ্বালানি সেবা দেওয়ার প্রস্তাব দিতে প্রস্তুত। এটা রিয়াদে তাদের অবস্থান শক্ত করবে এবং ওয়াশিংটনের তদারকি কমিয়ে দেবে।
তাই চরম এক দর–কষাকষির মুখে দাঁড়িয়েছে ওয়াশিংটন। অতিরিক্ত কড়া শর্ত আরোপ করলে রিয়াদ হয়তো শিথিল শর্তের অন্য কোনো দেশের দিকে ঝুঁকবে, আবার খুব বেশি নমনীয়তা দেখালে পারমাণবিক অপ্রসারণের বৈশ্বিক নীতিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।
আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট
ইরানের সঙ্গে নতুন সংঘাত ও তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে অনিশ্চয়তার মধ্যেই এই চুক্তির প্রসঙ্গটি এসেছে। রিয়াদের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক সহযোগিতা একদিকে আমেরিকান সামরিক সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেয়, অন্যদিকে চীন বা রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা কমায়।
তবে ২৩ জুলাই ট্রাম্পের আলটিমেটাম এই বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তিকে কেবল এক সাধারণ বাণিজ্যিক সম্পর্কে সীমাবদ্ধ রাখেনি, তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইসরায়েলের সঙ্গে ‘সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ’ না হলে এই ডিল বাতিল। এর মাধ্যমে ‘আব্রাহাম একর্ডস’-কে চুক্তির মূল শর্ত বানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এতে ওয়াশিংটনের হাতে হয়তো বড় রাজনৈতিক দর–কষাকষির সুযোগ তৈরি হয়েছে, কিন্তু এতে রিয়াদের নমনীয় হওয়ার পথ সংকুচিত হয়ে গেছে। ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের সুস্পষ্ট অগ্রগতি ছাড়া এমন কোনো চুক্তিতে রাজি হতে সৌদি নেতৃত্ব নারাজ, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান যুদ্ধের এই সংকটময় মুহূর্তে। তাই এমন প্রকাশ্য আলটিমেটাম আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার বদলে অচলাবস্থা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
নিয়মনীতি শিথিল হলে ইরান একে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নিজের পারমাণবিক কর্মসূচির পক্ষে সাফাই গাইবে; এমনকি মিসর ও তুরস্কের মতো দেশগুলোও একই সুবিধা দাবি করে বসতে পারে।
শেষ পর্যন্ত এটি মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করবে, নাকি এক বিপজ্জনক পারমাণবিক প্রতিযোগিতার সূচনা করবে, তাই চুক্তির বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবে।
সুযোগ বনাম ঝুঁকি
চুক্তিটির সুফল স্পষ্ট: সৌদি বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ, পানি শোধন ও শিল্পায়ন দ্রুততর হওয়া আমেরিকার জন্য নতুন বাণিজ্যিক সুযোগ উন্মোচন এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার। প্রযুক্তিগত স্বচ্ছতাহীন অন্য কোনো দেশের হাতে সৌদির বাজার ছেড়ে দিয়ে আমেরিকার সরে আসা কখনোই বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।
ট্রাম্পের দেওয়া আলটিমেটাম হয়তো এক মহা কূটনৈতিক চুক্তির পথ খুলতে পারে, আবার বহু পরিশ্রমে দাঁড় করানো এই পারমাণবিক শক্তি চুক্তিকে এক লহমায় ভেস্তেও দিতে পারে। দিন শেষে এই চুক্তির ভাগ্য নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে তার পারমাণবিক বাণিজ্য, নিরাপত্তার কড়াকড়ি এবং বাস্তবসম্মত কূটনীতিকে একই সুতোয় বাঁধতে পারছে।
উমুদ শোকরি জ্বালানিবিশেষজ্ঞ
মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়, ইংরেজি থেকে অনূদিত