ছুরি মাছ এত লম্বা কেন

· Prothom Alo

বাজারের ঝুড়িতে ছুরি মাছ দেখলে চোখটা আটকে যায় এর দৈর্ঘ্যে। মাথাটা দেখলে বোঝা যায় শুরু কোথায়। কিন্তু শেষ খুঁজতে বেশ খানিকটা চোখ সরানো লাগে। ছুরি মাছে রুপালি চকচকে চ্যাপটা শরীর, অস্বাভাবিক দৈর্ঘ্য। মাছওয়ালাকে এই মাছের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে ঠিকঠাক উত্তর মেলে না। তাঁরা বলেন, ‘ছুরি মাছ এমনই হয়। এই মাছের গড়নটাই এমন।’ কিন্তু এমন কেন, এ প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে মাছটা যেভাবে চলে আর যেভাবে শিকার ধরে, তার মধ্যে।

Visit somethingsdifferent.biz for more information.

নাম দিয়েই শুরু করা যাক

বাংলায় ছুরি মাছ, ইংরেজিতে হেয়ারটেইল বা রিবনফিশ। নাম দুটিই আসলে শরীরের বর্ণনা থেকে এসেছে। ছুরির মতো চ্যাপটা ধারালো বলে বাংলা নাম, চুলের মতো সরু লেজ বলে ইংরেজি নাম। বিজ্ঞানীরা একে রাখেন ট্রাইকিউরিডি পরিবারে। বাংলাদেশের উপকূলে যে প্রজাতিটা সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়, তার নাম Lepturacanthus savala, কখনো কখনো Trichiurus lepturus। নাম যা-ই হোক না কেন, দেখতে প্রায় একই রকম। লম্বা, চ্যাপটা, রুপালি, মাথার কাছে বড় বড় দাঁত।

পাঙাশ মাছ এত দ্রুত বড় হয় কীভাবে

লম্বা শরীর, আসলে একটা অস্ত্র

শরীরটা এত লম্বা কেন, তার একটা উত্তর লুকিয়ে আছে শিকার ধরার ভঙ্গিতে। ছুরি মাছ পানির মধ্যে খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, মাথা ওপরে, লেজ নিচে ঝুলিয়ে। এভাবে দাঁড়িয়ে চারপাশে চোখ রাখে, আর ছোট মাছ বা চিংড়ি কাছে এলেই বিদ্যুতের মতো ছোবল দেয়। খাড়া হয়ে ভেসে থাকতে হলে শরীর লম্বা আর ফিতার মতো চ্যাপটা হওয়াটা কাজে লাগে, ভারসাম্য রাখা সহজ হয় তাতে। একটা লম্বা রুলার বা স্কেল পানিতে খাড়া রাখা যতটা সহজ, একটা গোলগাল বল ততটা সহজ না। ছুরি মাছের শরীরও অনেক এই যুক্তিতে চলে।

সাঁতারের ধরনটাও অন্য রকম। পাখনা বলতে গেলে নেই, শুধু পিঠ বরাবর একটা লম্বা-পাতলা পাখনা আছে যেটা শরীরজুড়ে ঢেউয়ের মতো নড়ে, সাপের চলার ভঙ্গির মতো। এই নড়াচড়াকে বলে আন্ডুলেটরি মুভমেন্ট। এতে শক্তি খরচ কম হয়, তাই মাছটা অনেকক্ষণ ভেসে থাকতে পারে। আবার দরকারে হঠাৎ গতি তুলতেও পারে। শরীর যত লম্বা, ঢেউ তোলার জায়গা তত বেশি।

কক্সবাজারের টেকনাফে এক ব্যক্তির টানাজালে ধরা পড়েছে ৮ লাখ টাকার ছুরি মাছ। গতকাল বিকেলে সৈকতের মহেশখালীয়া নৌঘাটে

গভীর পানির অন্ধকারে বেঁচে থাকার কৌশল

দিনের বেলা ছুরি মাছ থাকে পানির গভীরে। ২০০ থেকে ৫০০ মিটার নিচে। যেখানে আলো প্রায় পৌঁছায় না। রাত নামলে ওপরে উঠে আসে। খাবারের খোঁজ করে। এই ওঠানামাকে বলে ভার্টিক্যাল মাইগ্রেশন। ওই অন্ধকারে খাবার নিয়মিত মেলে না, কখনো অনেকক্ষণ কিছুই আসে না সামনে। যে মাছ একবার সুযোগ পেলে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে আর তারপর অনেকক্ষণ না খেয়ে টিকে থাকতে পারে, ওরই এখানেই সুবিধা। লম্বা-পাতলা শরীরে পেশি কম, তাই খরচও কম। কম খাবারে বেশি দিন চলে যায়।

দাঁতের গঠনটাও আলাদা করে দেখার মতো। ছুঁচালো, বাঁকা, কাঁটার মতো ভেতরের দিকে হেলানো। একবার শিকার মুখে গেলে আর বেরোনোর পথ থাকে না। ছোট মাছ, চিংড়ি, এমনকি নিজের প্রজাতির ছোট সদস্যও রেহাই পায় না মাঝেমধ্যে। দ্রুত মোড় নেওয়া আর ছোট জায়গায় ঘুরে শিকার তাড়া করার জন্য এই লম্বাটে আকৃতি বেশ সুবিধাজনক।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় মিঠাপানির মাছ কোনটি

রুপালি চামড়া, আঁশ নেই বললেই চলে

ছুরি মাছের গায়ে হাত দিলেই টের পাওয়া যায়, সাধারণ মাছের মতো শক্ত আঁশ এর নেই। বদলে একটা পাতলা রুপালি আস্তরণ, গুয়ানিন স্তর বলে যেটাকে। এই স্তরই মাছটাকে আয়নার মতো চকচকে করে রাখে। গভীর পানিতে এই চকচকে রংটাই আসলে লুকিয়ে থাকার কৌশল। চারপাশের সামান্য আলো গায়ে পড়ে প্রতিফলিত হয়ে যায়, মাছটা প্রায় মিশে যায় পানির সঙ্গে। শিকারি চোখে পড়ে না, শিকারও টের পায় না কখন কাছে চলে এসেছে বিপদ। তবে এই আস্তরণ খুবই নরম। বাজারে বেশি নাড়াচাড়া করলেই উঠে আসে হাতে, তাই বিক্রেতারা সাবধানে ধরেন।

মানিয়ে নেওয়ার ইতিহাস

ছুরি মাছের শরীর আসলে নিজের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার একটা লম্বা ইতিহাস বহন করে। লাখ লাখ বছর ধরে যে প্রাণী যে পরিবেশে থাকে, তার শরীরও ধীরে ধীরে সেই পরিবেশের সঙ্গে মিলে যায়। গভীর পানির অন্ধকার, খাড়া হয়ে শিকার ধরার কৌশল—এসব মিলিয়েই ছুরি মাছের শরীর এমন লম্বা আর চ্যাপটা হয়ে উঠেছে। অন্য কোথাও থাকলে হয়তো গঠনটাও আলাদা হতো।

পৃথিবীর একেবারে ভিন্ন প্রান্তে বাস করা অনেক মাছের মধ্যে এই একই রকম লম্বাটে শরীর চোখে পড়ে, অথচ এদের মধ্যে সরাসরি কোনো আত্মীয়তা নেই। ইল মাছ কিংবা বেল্ট মাছ, ছুরি মাছের চেয়ে অনেক দূরের প্রজাতি হয়েও দেখতে প্রায় একই রকম চ্যাপটা লম্বা। বিজ্ঞানীরা একে বলেন কনভারজেন্ট ইভোল্যুশন। ভিন্ন প্রজাতি আলাদা পথ ধরে একই সমাধানে পৌঁছে গেছে, এমনটাই বলা যায়।

দাঁত মাজার ব্রাশের মাইক্রোপ্লাস্টিক পেটে গেলে কী ক্ষতি

বঙ্গোপসাগরে ছুরি মাছ

বঙ্গোপসাগরের উপকূলে ছুরি মাছ বেশ চেনা একটা নাম। কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, বরিশালের বাজারে সহজেই চোখে পড়ে। জেলেরা ধরেন সাধারণত জাল দিয়ে, রাতের বেলা, যখন মাছটা ওপরের দিকে উঠে আসে খাবারের টানে। দামে তুলনামূলক সস্তা, কিন্তু ভাজা করে খাওয়ার চল আছে অনেক বাড়িতেই। কাঁটা কম বলে অনেকে পছন্দও করেন বেশি।

সমুদ্রবিজ্ঞানীরা অবশ্য বলছেন, অতিরিক্ত মাছ ধরার চাপে এ মাছের সংখ্যা কিছু জায়গায় কমছে। বংশবৃদ্ধি তুলনামূলক দ্রুত বলে পরিস্থিতি এখনো সংকটজনক নয়, তবে নজর রাখা দরকার বলছেন তাঁরা।

সূত্র: ফিশ বেজ, সায়েন্স ডিরেক্ট, ফিজিকস ওয়ার্ল্ড

চ্যাং আর টাকি কি একই মাছ

Read full story at source