গুরুপূর্ণিমা: গুরুর চরণে প্রণাম
· Prothom Alo

গুরুপূর্ণিমা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রাচীন ও পবিত্র বৈদিক উৎসব। গুরু-শিষ্যের মহান সম্পর্কের ওপর আধারিত এই উৎসবের প্রচলন প্রাচীনকাল থেকেই। গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে একটি পূর্ণ দিন উৎসর্গ করার এই রীতি থেকে প্রাচীন আর্য সমাজে গুরুর অপরিহার্য ও সর্বোচ্চ স্থানটি অনুধাবন করা যায়।
বৈদিক যুগ থেকেই আষাঢ় মাসের পূর্ণিমা তিথিতে এই উৎসব উদ্যাপিত হয়ে আসছে। গুরুকে সম্মান ও কৃতজ্ঞতা জানাতে এই তিথিতে শিষ্যরা গুরুর পূজা করেন এবং আধ্যাত্মিক পথে অগ্রসর হওয়ার জন্য ও জীবনে সমৃদ্ধি লাভের জন্য গুরুর কাছে প্রার্থনা করেন।
Visit extonnews.click for more information.
গুরুর আশীর্বাদে শিষ্যের জীবন আলোড়িত হয় এবং জ্ঞান, ভক্তি ও মোক্ষলাভের পথ উন্মুক্ত হয় বলে সনাতন ধর্মে বিশ্বাস করা হয়।
‘গুরু’ শব্দটি সংস্কৃত ‘গু’ এবং ‘রু’ এই দুটি শব্দ দ্বারা গঠিত। সংস্কৃতে ‘গু’ শব্দের অর্থ অন্ধকার। ‘রু’ শব্দের অর্থ সেই অন্ধকারের বিনাশকারী। সুতরাং যিনি হৃদয়ের অজ্ঞতারূপ অন্ধকার দূর করে জ্ঞানের আলো দেখান, তিনিই গুরু। শাস্ত্রে আছে:
‘ওঁ অজ্ঞান-তিমিরান্ধস্য জ্ঞানাঞ্জন-শলাকায়া। চক্ষুরুন্মীলিতং যেন তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ।।’
অর্থাৎ অন্ধকার সরিয়ে যিনি আমাদের জ্ঞানের দিকে নিয়ে যান, তিনিই ‘গুরু’ বলে অভিহিত হন।
সনাতন ধর্মে গুরুপূর্ণিমা তিথিটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, পরমেশ্বর শিব দক্ষিণামূর্তি রূপ ধারণ করে এই তিথিতে সনক, সনন্দন, সনাতন ও সনৎকুমার—সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার এই চার মানসপুত্রকে বেদের গুহ্য জ্ঞান দান করেছিলেন।
পরমেশ্বর শিবের দক্ষিণামূর্তি রূপ হলো তাঁর আদিগুরু বা পরমজ্ঞানের রূপ। আদিগুরু শিব অজ্ঞানতার অন্ধকার দূর করে শিষ্যদের জ্ঞানের আলোর পথে নিয়ে যান। এই পবিত্র তিথিটি তাই পরমেশ্বর শিবের প্রতি সমর্পিত ও গুরুপূর্ণিমা নামে বিখ্যাত।
দক্ষিণামূর্তি রূপে শিবকে সব বিদ্যা, যোগ, সংগীত ও শাস্ত্রের শিক্ষক হিসেবে পূজা করা হয়। দক্ষিণামূর্তি শিব সর্বোচ্চ তত্ত্বজ্ঞানের প্রতিমূর্তি, যিনি মৌনতায় জ্ঞানদানকারী গুরুরূপে আত্মপ্রকাশ করেন। তিনি সম্পূর্ণ নীরবতায় ধ্যানমগ্ন থেকে অন্তর্জ্ঞান দ্বারা শিষ্যদের বোধোদয় ঘটান।
রাখিবন্ধন: ভেদাভেদ ভুলে মানবতার উৎসবতিনি একটি বটবৃক্ষের (জ্ঞানবৃক্ষ) নিচে ব্যাঘ্রচর্ম বা মৃগচর্মের আসনের ওপর দক্ষিণ দিকে মুখ করে উপবিষ্ট থাকেন। দক্ষিণ দিকে মুখ করে ধ্যান করেন; কারণ, দিকটি পরিবর্তন, আধ্যাত্মিক রূপান্তর ও অভ্যন্তরীণ উপলব্ধির প্রতীক। চতুর্ভুজ দক্ষিণামূর্তির ওপরের ডান হাতে থাকে জপমালা (জ্ঞান ও ধ্যানের প্রতীক) এবং বাঁ হাতে অগ্নিশিখা (মোহ বা অজ্ঞান দহনের প্রতীক)।
নিচের ডানহাতটি জ্ঞানমুদ্রা প্রদর্শন করে (আত্মজ্ঞান ও বোধের প্রতীক) এবং বাঁ হাতে থাকে বেদ/শাস্ত্র (শাস্ত্রজ্ঞান ও গুরুশিক্ষার প্রতীক)। দক্ষিণামূর্তি শিবের ডান পা ‘অপস্মার’ নামক এক বামন অসুরকে পদদলিত করে থাকে। এই অসুর মানুষের অজ্ঞতা বা অহংকারের প্রতীক। দক্ষিণামূর্তির ডান পা এই অসুরকে পিষে রাখা পরমজ্ঞান ও সত্যের মাধ্যমে অজ্ঞতাকে চিরতরে দমন করার প্রতীক।
বাঁ পা হাঁটু মুড়ে কোলে ভাঁজ করে রাখা থাকে। এটি ঐশ্বরিক জ্ঞান, ধ্যান ও অবিচল আত্মস্থতার প্রতীক। চরণে চারজন প্রাচীন ঋষি শিষ্য হিসেবে অত্যন্ত বিনীতভাবে বসে মৌন ব্যাখ্যার মাধ্যমে তাঁর কাছ থেকে পরমব্রহ্মজ্ঞান লাভ করেন।
গুরুপূর্ণিমা ‘ব্যাসপূর্ণিমা’ নামেও খ্যাত। সনাতনীরা বিশ্বাস করেন, ব্রহ্মসূত্র, মহাভারত, শ্রীমদ্ভাগবত এবং ১৮টি পুরাণের রচয়িতা কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস এই তিথিতেই মুনি পরাশর ও সত্যবতীর ঘরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। যমুনা নদীর এক দ্বীপে জন্ম নেওয়ায় তিনি ‘দ্বৈপায়ন’ নামে পরিচিত হন, আর গায়ের রং কৃষ্ণবর্ণ বা কালো হওয়ায় তাঁর পূর্ণ নাম হয় ‘কৃষ্ণদ্বৈপায়ন’।
কিংবদন্তি আছে, তিনিই বেদকে ঋক্, সাম, যজু ও অথর্ব—চারটি ভাগে বিভক্ত ও সংকলন করেছিলেন। বেদ বিভাজনের কৃতিত্বের কারণে তিনি ‘বেদব্যাস’ বা ‘ব্যাস’ নামে পরিচিত হন।
শারদীয় দুর্গোৎসব শেষে প্রথম পূর্ণিমা তিথিতে লক্ষ্মীপূজা হয়আষাঢ় মাসের পূর্ণিমা তিথিতে আধ্যাত্মিক ও শিক্ষাগুরুদের সম্মান জানাতে গুরুপূজার পাশাপাশি হিন্দুশাস্ত্র ও সংস্কৃতির অন্যতম ভিত্তি রচয়িতা বেদব্যাসের জন্মতিথি হিসেবে তাঁকে স্মরণ, মনন করা হয় এবং জ্ঞানের প্রতিমূর্তি হিসেবে পূজা করা হয়।
গুরুপূর্ণিমার দিন শিষ্যরা গুরুকে জ্ঞানের মূর্তি ও পরমব্রহ্মের প্রতীক রূপে শ্রদ্ধা ও পূজা করেন। শাস্ত্র ও গুরুপরম্পরার প্রথা অনুসারে এদিন বিভিন্ন ধর্মীয় আচার ও রীতিনীতি পালন করা হয়। শিষ্যরা খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে স্নান সেরে শুদ্ধ বস্ত্রে গুরুর ছবি বা চরণে ফুল, ধূপ ও মিষ্টি অর্পণ করে পূজা করেন। শিষ্যরা গুরুমন্ত্র উচ্চারণ করেন:
‘গুরুর্ব্রহ্মা গুরুর্বিষ্ণু গুরুর্দেবো মহেশ্বরঃ।
গুরুঃ সাক্ষাৎ পরং ব্রহ্ম তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ।।’
গুরুর চরণে প্রণাম করে গুরুদক্ষিণা নিবেদন করে আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন। অনেকে এই দিনে উপবাস বা ব্রত পালন করেন এবং অসহায় মানুষদের অন্ন ও বস্ত্র দান করেন। মন্দির ও আশ্রমে এদিন বিশেষ পূজার্চনা, ভজন-কীর্তন, শাস্ত্রপাঠ ও সৎসঙ্গের আয়োজন করা হয়।
গুরুপূর্ণিমা সব ধরনের গুরুদের প্রণাম ও শ্রদ্ধা জানানোর দিন। যাঁদের জ্ঞান, উপদেশ ও সৎশিক্ষা অজ্ঞানতার অন্ধকার দূর করে সত্য, ধর্ম ও আলোর পথে পরিচালিত করে, তাঁরা প্রত্যেকেই গুরু।
দীক্ষাগুরু, শিক্ষাগুরু এবং জীবনে জড়িয়ে থাকা এমন মানুষ, যাঁরা সৎ পরামর্শ, সৎ শিক্ষা ও সঠিক পথের দিশা দিয়েছেন জাতিধর্ম–নির্বিশেষে এদিন তাঁদের প্রত্যেককে প্রণাম ও শ্রদ্ধা জানানো হয়। পিতা-মাতাই মানুষের জীবনের প্রথম গুরু। গুরুপূর্ণিমার পুণ্যতিথিতে সন্তানেরা তাই পিতা-মাতার চরণ স্পর্শ করে আশীর্বাদ গ্রহণের মধ্য দিয়ে দিনটি শুরু করে।
গুরুপূর্ণিমা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি গুরু-শিষ্যপরম্পরার চিরন্তন আদর্শকে স্মরণ করার দিন। সর্বোপরি এটি জ্ঞান, শৃঙ্খলা, বিনয় ও কৃতজ্ঞতা চর্চার এক অনন্য উপলক্ষও বটে।
দীপান্বিতা দে: প্রাবন্ধিক ও শিশুতোষ গ্রন্থপ্রণেতা
বাঙালির রঙের উৎসব দোল পূর্ণিমা