সবুজের গ্রিন কার্ড
· Prothom Alo

ইদানীং বাংলাদেশে নানা রকম কার্ড প্রচলিত হওয়ার আগে পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় কার্ড ছিল যুক্তরাষ্ট্রে। নাম গ্রিন কার্ড। প্রত্যেক বাংলাদেশির মনের মণিকোঠায় লুকানো ছিল দুটি স্বপ্ন। প্রথমটা যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পাওয়া, দ্বিতীয়টা যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে একটা গ্রিন কার্ড পাওয়া। আগে গ্রিন কার্ড পাওয়ার নানা রকম উপায় থাকলেও সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিন কার্ডের জন্য এক লাখ ডলার ফি নেওয়ার প্ল্যান করছেন। এ খবরে অনেকের গ্রিন কার্ডের স্বপ্নই রেড কার্ডে পরিণত হয়ে যাচ্ছে। আমার খালাতো ভাই সবুজের বহু দিনের স্বপ্ন ছিল যুক্তরাষ্ট্রে সেটেল হবে। সে চিন্তিত মুখে বলতেছে, ‘ভাই, আমি তো বিশাল এক দ্বিমুখী সমস্যার মধ্যে পড়ে গেলাম।’
Visit somethingsdifferent.biz for more information.
জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী সমস্যা?’
বলল, ‘এত দিন যুক্তরাষ্ট্রে যেতে চাইতাম, গিয়ে ডলার কামায়ে দেশে আনব সে জন্য। এখন শুনি যাওয়ার আগেই এক লাখ ডলার লাগবে। এক লাখ ডলার যদি আমার থাকেই, তাইলে আমি যুক্তরাষ্ট্র যাব কোন দুঃখে? এ কেমন প্যারাডক্স!’
চিন্তা করে দেখলাম কথা সত্য।
সবুজ তার আব্বার কাছে গিয়ে বলেছিল, ‘আমি যুক্তরাষ্ট্রে যাব, কিছু টাকা দিতে হবে গ্রিন কার্ডের জন্য। ট্রাম্প নিয়ম করেছে।’
‘কত টাকা?’
‘বেশি না। এক লাখ ডলার।’
খালু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছে, ‘তুই বরং তার চেয়ে চাঁদে যা। কম খরচ পড়বে।’
খালার বাসায় দুপুরে খাবার খেতে খেতে কথা হচ্ছিল এগুলো নিয়ে। খালু মুরগির রানে কামড় দিয়ে বলল, ‘ওই সব গ্রিন কার্ডের চিন্তা বাদ দে। এর চেয়ে আমাদের ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ফুয়েল কার্ডই ভালো। টাকা দিতে হয় না, উল্টা টাকা পাওয়া যায়।’
‘আপনি টাকা পাইছেন?’
‘আগে কার্ড পাই। তারপর না টাকা।’
বারোমাস বর্ষারসখালা খাবার বেড়ে দিতে দিতে কথার শেষ অংশ শুনে পুরোটা না বুঝেই বলল, ‘আমার সিম কার্ডে তো টাকা ভরলে টাকাই থাকে না। দুই–চার মিনিট কথা বললেই টাকা শেষ।’
সবুজ বলার চেষ্টা করল, ‘দুই–চার মিনিট কথা? আম্মা, তুমি ছোট খালার সঙ্গে গতকাল তিন ঘণ্টা একচল্লিশ মিনিট কথা বলছ।’
খালা রাগী গলায় বলল, ‘কী বলিস পাগলের মতো! কথাই তো বলতে পারলাম না ভালোমতো। ওর ছোট ছেলের ক্লাসের এক মেয়ের মা অসুস্থ ছিল, সেটার খোঁজ নিতে পারিনি, তার আগেই টাকা শেষ হয়ে গেল। আমার জন্য একটা ৩০০ টাকার রিচার্জ কার্ড নিয়ে আসিস।’
হঠাৎ খালু বলল, ‘আচ্ছা কার্ডের কথায় মনে পড়ল, আজকে না চিংড়ি মাছ কিনে এনেছিলাম। দেখছি না যে! রান্না করোনি?’
আমার অবাক লাগল। বললাম, ‘কার্ডের কথায় আপনার চিংড়ি মাছের কথা মনে পড়বে কেন?’
‘আরে চিংড়ি মাছের বিল তো দিলাম এটিএম কার্ড থেকে টাকা তুলে। আচ্ছা আমার কার্ডটা খুঁজে পাচ্ছি না। কই রাখছি দেখছ নাকি?’
এমন সময় বাইরে থেকে রুমে ঢুকল সবুজের ছোট ভাই রিমন। তাকে ধরল খালু, ‘কার্ড কই বল।’
রিমন হঠাৎ কিছু না বুঝে থতমত খেয়ে বলল, ‘আমি আজই প্রথম কার্ড খেলছি। আর জীবনে খেলব না। এবারের মতো মাফ করে দাও। আমি খেলতে চাইনি, রাকিব জোর করে খেলাইছে। টুয়েন্টি নাইন।’
বেচারা কিছু না বুঝেই ধরাটা খেল। সব দোষ ট্রাম্প আর গ্রিন কার্ডের।
সবুজদের গ্রামের বাড়ি সাতক্ষীরা শ্যামনগরের ছোট্ট এক গ্রামে। ওই গ্রাম থেকে নাকি কেউ কখনো যুক্তরাষ্ট্রে যায়নি এর আগে। সবুজ গ্রামে গেলেই সবাই নাকি ওকে নিয়ে গর্ব করত। বলত, ‘ভাতিজা তুমিই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে আমাগো গ্রামের নাম উজ্বল করবা।’ চায়ের দোকানে চা খাওয়ার পর ওর কাছ থেকে নাকি টাকাও নিত না। বলত, ‘এহন টাকা নিমু না, তুমি যখন যুক্তরাষ্ট্র থেইকা আসবা তখন ডলার নিমু।’
সবুজ মন খারাপ করে বলতেছে, ‘ভাই, এখন আমি ওই গ্রামের লোকদের কীভাবে বলি যে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে হলে আমাকে পুরো গ্রাম ধরেই বিক্রি করে দেওয়া লাগবে।’
তবে সবুজ যুক্তরাষ্ট্রে যেতে নাছোড়বান্দা। সে বলছে, ‘টাকার অভাবে গ্রিন কার্ড না পেলে দরকার হয় শাহরুখ খানের মতো অবৈধ পথে নৌকায় যুক্তরাষ্ট্রে যাব জীবনের ঝুঁকি নিয়ে।’
খালু আফসোসের গলায় বলল, ‘আহারে। শাহরুখ খান এত বড় নায়ক হয়েও এভাবে যুক্তরাষ্ট্রে গেল কেন? অনেক আগে শুনছিলাম, মুসলমান হওয়ার কারণে তাকে নাকি যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে দেয়নি। তাই বলে অবৈধ পথে যাবে?’
আমরা খালুকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম যে এটা সত্যি ঘটনা না। শাহরুখ খান ‘ডানকি’ নামের একটা সিনেমায় অভিনয় হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে গেছে অবৈধ পথে।
খালু কী বুঝল কে জানে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘আমাদের সময় শাহরুখ খান সুইজারল্যান্ডে যেত। পাহাড় আর বরফের মধ্যে নায়িকার সঙ্গে নেচে নেচে গান গাইত। আর এখন অবৈধ পথে যুক্তরাষ্ট্রে যায়। ছি ছি ছি।’
তবে আমার মনে হয়, এই সময়ে গ্রিন কার্ডের জন্য হোম লোন, কার লোনের মতো ব্যাংক গ্রিন কার্ড লোনও দিতে পারে। এই কথা সবুজের সঙ্গে শেয়ার করতেই বলল, ‘এই চেষ্টা কি আমি করিনি ভাবছ? কিন্তু এইখানে আরেক প্যারাডক্স।’
‘কেন?’
‘আরে ব্যাংক এক লাখ ডলার লোন দেওয়ার আগে গ্যারান্টি হিসেবে অন্তত তিন লাখ ডলারের সম্পদ বা ব্যবসা দেখাতে বলে। আরে ভাই, আমার তিন লাখ ডলার থাকলে আমি এক লাখ ডলার লোন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যাব কেন। আর ভাল্লাগে না।’
বিশ্বকাপ একটি সংখ্যাতত্ত্বমাত্রশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত সবুজ চল্লিশ হাজার ডলার পর্যন্ত জোগাড় করতে সক্ষম হয়েছিল। তারপর একজনের বুদ্ধিতে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার স্বপ্ন বাদ দিয়ে এই টাকায় একটা ফ্ল্যাট কিনে ভাড়া দিয়েছে। সবুজের ইনকাম নাকি অনেক ভালো। যুক্তরাষ্ট্রের প্রবাসীদের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি টাকা ইনকাম করছে একটা ফ্ল্যাট ভাড়া দিয়েই। আমি ঘুরতে গিয়ে দেখি, ফ্লাটের ছাদে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা টাঙানো। ফ্ল্যাটের নাম রাখছে নিউইয়র্ক ভবন।
আমি ঢুকতে গেলাম, সবুজ বাধা দিয়ে বলল, ‘তুমি ঢুকতে পারবা না।’
জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন?’
সবুজ মুচকি হেসে বলল, ‘এই ফ্ল্যাটে ঢোকার জন্য সবুজ কার্ড অর্থাৎ গ্রিন কার্ড লাগবে। গ্রিন কার্ড পেতে হলে এক শ টাকা লাগবে। টাকা দাও।’
আমি এক শ টাকা দিলাম। সবুজ পকেট থেকে একটা কার্ড বের করে দিল। সবুজ রঙের এই কার্ডের ওপর সাদা কালিতে লেখা, সবুজ ভাই। নিচে যোগাযোগের জন্য নম্বর।
একটা মাত্র ফ্ল্যাট থেকে সবুজ এত টাকা কীভাবে আয় করে, এখন বুঝলাম।