‘ভাগ্য বদলাইতে ধারদেনা কইরা বিদেশ গেল, হেই আমাগো দুর্ভাগ্যের সাগরে ফালাইয়া গেল’

· Prothom Alo

‘দেশে কাম কইরা যে টাকা পাইত, তা দিয়া কোনোরকমে পাঁচজনের খাওন চলত। পোলাপাইনের পড়ালেখা আর সংসারের অন্য খরচ হইত না। সংসারডা ভালো কইরা চালাইতে, আমাগো ভাগ্য বদলাইতে ধারদেনা কইরা বিদেশ গেল। হেই মানুষটাই আমাগো দুর্ভাগ্যের সাগরে ফালাইয়া গেল।’

Visit newsbetting.club for more information.

আহাজারি করতে করতে কথাগুলো বলছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকায় অগ্নিকাণ্ডে মারা যাওয়া বাংলাদেশি প্রবাসী মো. রাজিকুল ইসলামের (৫৩) স্ত্রী পুষ্প আক্তার। গত সোমবার দিবাগত রাতে দেশটির ইস্টার্ন কেপ প্রদেশের কুইন্সটাউনের একটি সুপারশপে অগ্নিকাণ্ডে রাজিকুলসহ ছয় বাংলাদেশির মৃত্যু হয়। রাজিকুলের বাড়ি মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার মিরকাদিম পৌরসভার কালিন্দিপাড়া এলাকায়। বাকি পাঁচজনের বাড়ি নারায়ণগঞ্জে।

আজ বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রাজিকুলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ছোট্ট একটি পাকা ঘরে তিন মেয়েকে নিয়ে বসে আছেন তাঁর স্ত্রী পুষ্প আক্তার। স্বামীর মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকেই তাঁর কান্না থামছেই না। প্রতিবেশী ও স্বজনেরা তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু স্বামীর মৃত্যুর শোক আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে অথই সাগরে পড়েছেন তিনি।

জীবিকার তাগিদে গত ১৩ মে চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ও তিন মেয়েকে রেখে দক্ষিণ আফ্রিকায় যান রাজিকুল ইসলাম। বিদেশে যেতে স্বজনদের কাছ থেকে প্রায় ১০ লাখ টাকা ধার নিয়েছিলেন। পরিবারের স্বপ্ন ছিল, প্রবাসের আয় দিয়ে ধীরে ধীরে ঋণ শোধ করবেন, মেয়েদের লেখাপড়া চলবে এবং সংসারে স্বস্তি ফিরবে। কিন্তু মাত্র আড়াই মাসের মাথায় সেই স্বপ্ন আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।

রাজিকুলের বড় মেয়ে রামিসা আক্তার (১৬), মেজো মেয়ে রাজিয়া ইসলাম (১১) ও ছোট মেয়ে রাফিজা ইসলাম (২) বাবার মৃত্যুর খবরের পর থেকেই নির্বাক। স্ত্রী পুষ্প আক্তার বলেন, ‘মাথার ওপর ছোট্ট একটা ছাদ ছাড়া আমাগো আর কিছুই নাই। বিদেশ যাওনের আগে প্রায় ১০ লাখ টাকা ধার নিছিল। বেতন পাইয়া আস্তে আস্তে শোধ কইরা দিব কইছিল। এহন আমাগো সংসার চালামু কেমনে? পোলাপাইনের পড়ালেখা করামু কেমনে? আবার দেনা শোধ করমু কোত্থেকে? আমরা তো অথই সাগরে পইড়া গেলাম।’ একপর্যায়ে তিন মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

রাজিকুলের বড় ভাই কাউসার মিয়া বলেন, ‘আমার ভাইডা দেশে কঠিন পরিশ্রমের কাম করত। সংসারের অভাব ঘোচাতে ধারদেনা কইরা বিদেশ গেল। ভাবছিলাম, ভাইডার ভাগ্যটা বদলাইব। কিন্তু আগুনে সব শেষ হইয়া গেল।’

স্বজনদের ভাষ্য, দক্ষিণ আফ্রিকার কুইন্সটাউনের একটি সুপারশপে স্থানীয় সময় মঙ্গলবার ভোরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ওই সুপারশপে কাজ করতেন রাজিকুল এবং রাতে সেখানেই থাকতেন। আগুন লাগার পর রাজিকুলসহ ভেতরে থাকা বাংলাদেশিরা বের হতে না পারায় দগ্ধ হন। ঘটনাস্থলেই রাজিকুলসহ ছয় বাংলাদেশির মৃত্যু হয়।

দক্ষিণ আফ্রিকায় সুপারশপে আগুনে নিহত ৬, নারায়ণগঞ্জে ৫ জনের বাড়িতে মাতম

রাজিকুলের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন মুন্সিগঞ্জ-৩ (সদর-গজারিয়া) আসনের সংসদ সদস্য মো. কামরুজ্জামান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, রাজিকুলের মৃত্যু অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তাঁর মৃত্যুতে একটি পরিবার যেমন সব হারিয়েছে, তেমনি দেশও একজন রেমিট্যান্স–যোদ্ধাকে হারিয়েছে। রাজিকুলের পরিবারের বিষয়ে তাঁরা খোঁজ নিয়েছেন। স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে সরকারিভাবে পরিবারটির জন্য যা যা সহায়তা করা সম্ভব, তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবেও তিনি পরিবারটির পাশে দাঁড়াবেন।

‘কাজের অনুমতির কাগজ পেয়েছি’—ছেলেকে জানানোর কয়েক ঘণ্টা পর আসে প্রবাসীর মৃত্যুর খবর

Read full story at source