ছোট উদ্যোক্তাদের ১ শতাংশ ন্যূনতম করের বোঝা, টিকে থাকার লড়াই কঠিন হবে

· Prothom Alo

যেকোনো দেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা হলেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা। কর্মসংস্থান সৃষ্টি থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায়ে চাহিদার জোগান দেওয়া—সবখানেই তাঁদের বিচরণ।

Visit extonnews.click for more information.

কিন্তু সম্প্রতি পাস হওয়া অর্থ আইন, ২০২৬ দেশের এই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য এক বড় ধরনের দুঃসংবাদ বয়ে এনেছে। আয়কর আইন, ২০২৩–এর ১৬৩(৬) ধারায় আনা একটি পরিবর্তনের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও ব্যক্তিগত পর্যায়ের উদ্যোক্তাদের জন্য আগে বহাল থাকা চার কোটি টাকার বার্ষিক টার্নওভার পর্যন্ত কর অব্যাহতির সুবিধাটি পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। এর পরিবর্তে এখন থেকে তাঁদের মোট বিক্রয় বা টার্নওভারের ওপর বাধ্যতামূলকভাবে ১ শতাংশ হারে ন্যূনতম কর আরোপ করা হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে রাজস্ব বাড়ানোর একটি সাধারণ পদক্ষেপ মনে হলেও এর নেতিবাচক প্রভাব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের টিকে থাকার লড়াইকে আরও কঠিন করে তুলবে।

আগের কর ব্যবস্থায় নিয়ম ছিল, কোনো উদ্যোক্তার বার্ষিক টার্নওভার যদি চার কোটি টাকার নিচে হয়, তবে তিনি তাঁর প্রকৃত নিট মুনাফার ওপর ভিত্তি করে এবং ব্যক্তিগত করদাতার নির্ধারিত ধাপ (স্তর অনুসারে) অনুযায়ী আয়কর দেবেন। এতে সুবিধা ছিল, কোনো কারণে ব্যবসায়ে লোকসান হলে বা মুনাফা কম হলে করের বোঝাও কম হতো। কিন্তু নতুন বিধানে লাভের চেয়ে বিক্রির অঙ্ককেই বড় করে দেখা হয়েছে। এখন ব্যবসা লাভে চলুক বা লোকসানে, মোট বিক্রির ১ শতাংশ সরকারকে কর হিসেবে দিয়ে দিতে হবে। সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এই নিয়ম সহায়ক হতে পারে, কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় এটি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সক্ষমতাকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দেবে।

কর বাড়বে কত

এই নতুন আইনের প্রভাবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের করের ভার কতটা বেড়েছে, তা সাম্প্রতিক উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে পিলে চমকে ওঠার মতো। উদাহরণস্বরূপ, একজন ব্যবসায়ীর বার্ষিক বিক্রি ৫০ লাখ টাকা এবং সব খরচ বাদে করযোগ্য আয় আড়াই লাখ টাকা (নিট মুনাফা ৫ শতাংশ অনুমান করে), আগের নিয়মে তাঁকে কোনো আয়করই দিতে হতো না। কারণ, আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত আয় ছিল করমুক্ত সীমার ভেতরে। কিন্তু এখন তাঁকে বাধ্যতামূলকভাবে ৫০ হাজার টাকা ন্যূনতম কর দিতে হবে। অর্থাৎ যে ব্যবসায়ী আগে শূন্য কর দিতেন, তাঁকে এখন শুরুতেই বড় অঙ্কের (৫০ হাজার) টাকা গুনতে হবে।

একইভাবে এক কোটি টাকা টার্নওভার ও পাঁচ লাখ টাকা আয়ের ক্ষেত্রে আগে করের পরিমাণ ছিল মাত্র ১০ হাজার টাকা। কিন্তু নতুন নিয়মে তাঁকে দিতে হবে এক লাখ টাকা। এখানে করের বোঝা একলাফে ৯০০ শতাংশ বৃদ্ধি পে য়েছে। দুই কোটি টাকা বিক্রয় ও ১০ লাখ টাকা আয়ের ক্ষেত্রে আগে কর দিতে হতো ৬৭ হাজার ৫০০ টাকা, যা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে দুই লাখ টাকায়। অর্থাৎ কর বেড়েছে প্রায় ১৯৬ শতাংশ।

তিন কোটি টাকার ব্যবসায়ে আগে যেখানে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা কর ছিল, তা এখন দ্বিগুণ হয়ে তিন লাখ টাকা হয়েছে। এমনকি চার কোটির সামান্য নিচে অর্থাৎ ৩ কোটি ৯৯ লাখ টাকা টার্নওভারের ক্ষেত্রেও করের পরিমাণ প্রায় ৫৫ শতাংশ বেড়ে চার লাখ টাকা হয়েছে। এই অঙ্কগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ব্যবসার আকার যত ছোট, করের বোঝা বৃদ্ধির হার সেখানে তত বেশি।

ঝুঁকি কী

নীতিগতভাবে এই পরিবর্তন দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের জন্য বেশ কিছু বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। প্রথমত, এটি ব্যবসায়ীদের মূলধন ক্ষয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। বিশেষ করে যাঁরা ট্রেডিং বা কম মুনাফার ব্যবসা করেন, যেখানে লাভের হার মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ, সেখানে ১ শতাংশ টার্নওভার কর দেওয়া মানে হলো, তাঁদের মোট মুনাফার অর্ধেক বা তার বেশি সরকারের কোষাগারে জমা দেওয়া।

কোনো বছর ব্যবসা লোকসানে থাকলে করের টাকা দিতে হবে পকেট থেকে বা ব্যবসা থেকে মূলধন তুলে। এর ফলে সাধারণ উদ্যোক্তারা আয়কর রিটার্ন জমা দিতে চরম অনাগ্রহ প্রকাশ করতে পারেন। তাঁরা মনে করতে পারেন, কর ব্যবস্থার ভেতরে আসার চেয়ে বাইরে থাকাই নিরাপদ।

দ্বিতীয়ত, এই কর ব্যবস্থা ব্যবসায়ীদের মধ্যে অস্বচ্ছতা ও কর ফাঁকির প্রবণতা বাড়িয়ে দিতে পারে। করের অতিরিক্ত চাপ এড়াতে অনেক ব্যবসায়ী তাঁদের প্রকৃত বিক্রির হিসাব লুকানোর চেষ্টা করবেন। এতে বাজারে আন্ডার ইনভয়েসিং বা প্রকৃত দামের চেয়ে কম দাম দেখানোর প্রবণতা বাড়বে। স্বচ্ছ ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেন করার পরিবর্তে ব্যবসায়ীরা নগদ বা ক্যাশ লেনদেন করতে বেশি আগ্রহী হবেন। এর ফলে অর্থনীতিতে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের পরিধি বাড়বে, যা দীর্ঘ মেয়াদে সরকারের ডিজিটালাইজেশন ও কর ফাঁকি রোধের লক্ষ্যকেই ব্যাহত করবে।

সবশেষে বলা যায়, সরকার অর্থ আইন, ২০২৬–এর মাধ্যমে ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নত করতে অনেকগুলো ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে পাঁচ ধরনের ব্যবসায় ও স্টার্টআপ কোম্পানির বিক্রয়ের ওপর ন্যূনতম কর প্রত্যাহার করেছে, যা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।

কিন্তু চার কোটি টাকার নিচে টার্নওভার থাকা প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের ওপর এই ১ শতাংশ ন্যূনতম করের বোঝা সরাসরি তাঁদের টিকে থাকার ওপর আঘাত। লোকসানে থাকা অবস্থায়ও কর পরিশোধের বিধানটি মুনাফাকেন্দ্রিক ন্যায়সংগত করনীতির মূল দর্শনের পরিপন্থী। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা যাতে কর ব্যবস্থার মূলধারায় থেকে সততার সঙ্গে ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারেন, সে জন্য এ বিধানটি জরুরি ভিত্তিতে পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। তা না হলে করের এই বোঝা ক্ষুদ্র শিল্প বিকাশের পথকে রুদ্ধ করে দেবে, যা সামগ্রিকভাবে জাতীয় অর্থনীতির জন্যই ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়াবে।

স্নেহাশীষ বড়ুয়া, পরিচালক, এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস

Read full story at source