হার্ভার্ড, কেমব্রিজ, অক্সফোর্ড—তিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই অফার এসেছিল
· Prothom Alo

লিখেছেন এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের স্নাতক মিফতাহুল জান্নাত
ছোটবেলা থেকেই মা-বাবা আমাকে বড় স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে। তাই বলে কখনো ভাবিনি, একই সঙ্গে হার্ভার্ড, কেমব্রিজ ও অক্সফোর্ড থেকে ডাক পাব!
Visit grenadier.co.za for more information.
পড়াশোনাকে গুরুত্ব দিতেই হবে, এই উৎসাহ বাসা থেকে সব সময় পেয়েছি। আমার কাছেও পড়াশোনা মানে কখনোই শুধু ‘ভালো রেজাল্ট’ করা ছিল না। বরং সব সময় মনে হয়েছে, এটা আদতে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার জন্য নিজেকে গড়ে তোলার একটা পথ।
যখন এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে (এইউডব্লিউ) ব্যাচেলর শুরু করি, তখন থেকেই শিক্ষকেরা উৎসাহ দিতেন, যেন দেশের বাইরে উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি নিই। ভালো রেজাল্টের পর আরও সাহস দিলেন, বললেন শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই আমি পছন্দের তালিকায় রাখতে পারি।
‘হয় তুমি জিনিয়াস, না হয় পাগল’এই যাত্রায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের কাজগুলো। অনেক বছর ধরেই বিভিন্ন বস্তি ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কিংবা নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে কাজ করছি। যখন দেখেছি আমার ছোট ছোট উদ্যোগ একজন মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে, তখনই আগ্রহটা আরও বেড়েছে। মনে হচ্ছিল, গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার মাধ্যমে যদি নিজেকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারি, তাহলে হয়তো আরও বড় পরিসরে কাজ করতে পারব। এই ভাবনাটাই প্রতিদিন অনুপ্রাণিত করেছে।
কেন হার্ভার্ড
আমার প্রথম অফার লেটার আসে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ১৬ জানুয়ারি রাতের সেই মুহূর্তটা আজও মনে আছে। অফার লেটারে নিজের নাম দেখে প্রথমে বিশ্বাস করতে পারিনি। বারবার যাচাই করেছি, সত্যিই কি এটা আমাকেই পাঠানো হয়েছে! পরে অক্সফোর্ড ও হার্ভার্ড থেকেও অফার আসে। প্রতিটি অফারই আমার কাছে সমান আনন্দের; কারণ, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ই ছিল আমার স্বপ্নের তালিকায়।
শেষ পর্যন্ত আমি হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিকে বেছে নিয়েছি; কারণ, হার্ভার্ড গ্র্যাজুয়েট স্কুল অব এডুকেশনের লার্নিং ডিজাইন, ইনোভেশন অ্যান্ড টেকনোলজি প্রোগ্রামটি আমার গবেষণার আগ্রহ, সামাজিক কাজ ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য—সবকিছুর সঙ্গে সবচেয়ে বেশি মানানসই। পাশাপাশি বারাকাত ফ্যামিলি ফেলোশিপ ও আগা খান ইন্টারন্যাশনাল স্কলারশিপের অর্থায়নও পেয়েছি, যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
মিফতাহুল জান্নাতকী শিখলাম
স্কলারশিপের ক্ষেত্রে যদি একটি বিষয় শিখে থাকি, তা হলো শুধু আবেদন করলেই হয় না, আগে অনেক গবেষণা করতে হয়। কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে কী ধরনের স্কলারশিপ বা ফেলোশিপ আছে, কোনটিতে আমি যোগ্য, কীভাবে আবেদন করতে হবে, এসবের পেছনে অনেক সময় দিতে হয়েছে। তারপরও বারাকাত ফ্যামিলি ফেলোশিপের তথ্য আমি প্রথমে পাইনি। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে এ সম্পর্কে জানতে পারি। তাই আমি মনে করি, নিজ উদ্যোগে তথ্য খুঁজে বের করার অভ্যাস খুব গুরুত্বপূর্ণ।
স্টেটমেন্ট অব পারপাস (এসওপি) লেখার ক্ষেত্রেও আমি প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আলাদা করে লিখেছি। কখনো একই এসওপি সব জায়গায় ব্যবহার করিনি। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় কী জানতে চায়, তাদের প্রোগ্রামের সঙ্গে আমার অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কোথায় মিল আছে, সেগুলো মাথায় রেখেই আবেদনপত্র তৈরি করেছি। আমার ব্যক্তিগত গল্প, পড়াশোনা, গবেষণা, সামাজিক কাজ ও ভবিষ্যৎ স্বপ্নকে একটি ধারাবাহিক গল্পের মতো তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।
আগে থেকেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কিছু অভিজ্ঞতা ছিল, সেগুলো আমাকে আত্মবিশ্বাস দিয়েছে। এইউডব্লিউতে ব্যাচেলর করার সময়ই আমি ফ্রান্সে একটা ‘এক্সচেঞ্জ সেমিস্টার’ করেছি। পরে ইন্টার্নশিপ করেছি হংকংয়ের একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে। এসব অভিজ্ঞতা আমাকে বৈশ্বিক পরিবেশে কাজের সুযোগ দিয়েছে।
এআই দিয়ে আয় করবেন কীভাবেপরামর্শ
আমার মনে হয়, নামী বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদনের সবচেয়ে বড় বাধা যোগ্যতা নয়; বরং আত্মবিশ্বাসের অভাব। আমিও একসময় ভাবতাম, হার্ভার্ড, অক্সফোর্ড বা কেমব্রিজে হয়তো শুধু অসাধারণ মেধাবীরাই পড়তে পারেন। পরে বুঝেছি, আপনি যদি একটি লক্ষ্য নির্ধারণ করে দীর্ঘদিন ধরে সেই লক্ষ্য অনুযায়ী নিজেকে প্রস্তুত করেন, তাহলে বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও আপনার কাজের মূল্যায়ন করবে।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য একটা বিষয় বিশেষভাবে বলব। আমাদের দেশে কাজ করার বহু ক্ষেত্র আছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাল্যবিবাহ, জলবায়ু পরিবর্তন, শরণার্থী সংকট কিংবা সামাজিক বৈষম্য—এসব নিয়ে আমরা বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারি। আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই বাস্তব অভিজ্ঞতাকে খুব গুরুত্ব দেয়। তাই আগ্রহের ক্ষেত্র খুঁজে নিয়ে সেটার পেছনে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
আমার আবেদনপত্রে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সুপারিশপত্র বা লেটার অব রিকমেন্ডেশন। ব্যাচেলর পর্যায়ে শিক্ষকদের সঙ্গে গবেষণায় কাজ করেছি। তাই তাঁরা আমার সম্পর্কে আন্তরিকভাবেই বিস্তারিত লিখতে পেরেছেন। আমি মনে করি, ভালো ফলাফলের পাশাপাশি শিক্ষকদের সঙ্গে অর্থবহ একাডেমিক সম্পর্ক গড়ে তোলাও আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
হার্ভার্ডে পড়াশোনা শেষে আমি আবারও বাংলাদেশে শিক্ষা নিয়ে কাজ করতে চাই। বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, রোহিঙ্গা শিশু, বাল্যবিবাহের ঝুঁকিতে থাকা কিশোরী এবং শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন মানুষদের জন্য আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক শিক্ষাক্রম তৈরিতে যুক্ত হতে চাই। আমার দীর্ঘমেয়াদি স্বপ্ন হলো এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে অবদান রাখা, যেখানে কোনো মানুষ শুধু তাঁর পরিচয়, লিঙ্গ বা সামাজিক অবস্থানের কারণে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে না।