জীবনের ভেতরে আল্লাহকে যেভাবে অনুভব করা যায়
· Prothom Alo

ইসলাম আমাদের কাছে যে মুক্তির বার্তা নিয়ে এসেছে, তা হলো এমন এক শান্তি যা মানুষকে দুনিয়ার অসার গোলামি থেকে মুক্ত করে স্রষ্টার পরম আশ্রয়ে পৌঁছে দেয়। এটি সব সৃষ্টিজগতের মালিকের পক্ষ থেকে এক বিশ্বজনীন আহ্বান—নিজের জীবনকে তাঁর কাছে সমর্পণ করার আহ্বান।
Visit afrikasportnews.co.za for more information.
আল্লাহকে নিজের জীবনের ভেতরে অনুভব করতে হলে ৪টি কথা মনে রাখতে হবে।
১. পরম সত্তার ওপর আস্থা
‘ইসলাম’ শব্দের মূল নির্যাসই হলো পরম প্রতিপালকের কাছে নিজের অস্তিত্বকে সঁপে দেওয়া বা আত্মসমর্পণ করা। যখন একজন মানুষ আন্তরিকভাবে উচ্চারণ করে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ (আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই), তখন তা হয়ে ওঠে মানুষের নিজের সীমাবদ্ধতার স্বীকারোক্তি।
এর মাধ্যমে বান্দা মেনে নেয় যে একজন সৃষ্টি হিসেবে তার নিজস্ব জ্ঞান, ক্ষমতা ও সামর্থ্য সীমিত।
এই মহাবিশ্বের প্রতিটি অণু-পরমাণু আল্লাহর একক নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয় এবং তিনি যা চান, যে সময়ে চান, সেভাবেই তা বাস্তবায়িত হয়। এমনকি মাতৃগর্ভে আমাদের আকৃতি ও অস্তিত্ব কেমন হবে, তাও নির্ধারণ করেছেন তিনি। (সুরা আল-ইমরান, আয়াত: ৬)
সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৬তিনটি গুণ যার মধ্যে থাকবে, সে ইমানের প্রকৃত স্বাদ বা মাধুর্য আস্বাদন করতে পারবে। প্রথমটি হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে অন্য সবকিছুর চেয়ে বেশি ভালোবাসা।অপরাধীকে আল্লাহ যেভাবে শাস্তির আওতায় আনেন২. সৃষ্টির নিখুঁত সৌন্দর্য দেখা
মহান আল্লাহ অসীম ক্ষমতার অধিকারী হলেও তা প্রকাশিত হয় তাঁর সৃষ্টির নিখুঁত সৌন্দর্যের মাধ্যমে। আমরা যদি চোখ মেলে আমাদের চারপাশের প্রাকৃতিক জগত এবং সুবিশাল আসমানের দিকে তাকাই, তবে সেখানে কোনো ধরনের খুঁত, অসঙ্গতি বা বিশৃঙ্খলা দেখতে পাব না।
আল্লাহ–তাআলা অত্যন্ত সুসংহতভাবে আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং মানুষকে দিয়েছেন নিখুঁত ও সুন্দর আকৃতি। (সুরা তাগাবুন, আয়াত: ৩)
কোরআনে বারবার এই সামঞ্জস্যপূর্ণ সৃষ্টির দিকে চোখ ফেরাতে বলা হয়েছে, যাতে মানুষ তার প্রতিপালকের অসীম প্রজ্ঞা ও কুদরত উপলব্ধি করতে পারে। (সুরা মুলক, আয়াত: ৩-৪)
আল্লাহর এই দয়ার আরেকটি বিস্ময়কর দিক হলো, মানুষের প্রতিনিয়ত অবাধ্যতা সত্ত্বেও তাঁর রহমত সবসময় তাঁর ক্রোধের ওপর বিজয়ী থাকে।
মহানবী (সা.) বলেছেন, আল্লাহ–তাআলা সৃষ্টিজগৎ সৃষ্টির পর তাঁর কাছে আরশে সংরক্ষিত গ্রন্থে লিখে রেখেছেন, ‘নিশ্চয়ই আমার রহমত আমার ক্রোধের ওপর প্রাধান্য পাবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩১৯ ৪)
মানুষের পাপের তুলনায় আল্লাহর শাস্তি খুবই কম আসে, কারণ তিনি মানুষের অধিকাংশ অপরাধই ক্ষমা করে দেন। (সুরা শুরা, আয়াত: ৩০)
৩. রাসুলের সুন্নাহ অনুসরণ করা
মানুষের তৈরি সামাজিক সম্পর্কে অনেক সময় কৃত্রিমতা থাকে, কিন্তু স্রষ্টার সঙ্গে সম্পর্কের মূল ভিত্তি হতে হয় সম্পূর্ণ নিখাদ। ভালোবাসা ছাড়া আল্লাহর আনুগত্য কখনো আনন্দদায়ক হতে পারে না।
যখন অন্তরে আল্লাহর প্রতি সত্যিকারের ভালোলাগা জন্ম নেয়, তখন তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে চলা স্বাচ্ছন্দ্যময় হয়ে ওঠে। আর আল্লাহর প্রতি এই ভালোবাসার বাস্তব ও বিশ্বস্ত প্রমাণ হলো তাঁর প্রেরিত রাসুলের সুন্নাহ ও পথ অনুসরণ করা।
সুন্দর থাকুন, আল্লাহ সৌন্দর্য ভালোবাসেনহাদিসে কুদসি, সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৫০২আমার বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকে, একপর্যায়ে আমি তাকে ভালোবেসে ফেলি। আর আমি যখন তাকে ভালোবাসি, তখন আমি তার কান হয়ে যাই যা দিয়ে সে শোনে, তার চোখ হয়ে যাই যা দিয়ে সে দেখে, তার হাত হয়ে যাই যা দিয়ে সে ধরে এবং তার পা হয়ে যাই যা দিয়ে সে চলে।কোরআনে বলা হয়েছে, “বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবেসে থাকো, তবে আমাকে অনুসরণ করো; আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবেন।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৩১)
মহানবী (সা.) আরও বলেছেন যে তিনটি গুণ যার মধ্যে থাকবে, সে ইমানের প্রকৃত স্বাদ বা মাধুর্য আস্বাদন করতে পারবে—যার প্রথমটিই হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে অন্য সবকিছুর চেয়ে বেশি ভালোবাসা। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৬)
৪. দৈনন্দিন জীবনে ইমানের প্রকাশ
আল্লাহকে জীবনের ভেতরে অনুভব করা কোনো হঠাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনা নয়; এটি একটি ধারাবাহিক আত্মিক রূপান্তর। যখন বিশ্বাস ও ভালোবাসা মানুষের অন্তরে শক্ত ভিত গড়ে তোলে, তখন আল্লাহর হেদায়েতের আলো হৃদয়ের সব অন্ধকারকে ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করে দেয়।
তখন মানুষের দেখা, শোনা, বলা ও চিন্তার ভঙ্গিতে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন আসে।
হাদিসে কুদসিতে আছে, আল্লাহ–তাআলা বলেন, “...আমার বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকে, একপর্যায়ে আমি তাকে ভালোবেসে ফেলি। আর আমি যখন তাকে ভালোবাসি, তখন আমি তার কান হয়ে যাই যা দিয়ে সে শোনে, তার চোখ হয়ে যাই যা দিয়ে সে দেখে, তার হাত হয়ে যাই যা দিয়ে সে ধরে এবং তার পা হয়ে যাই যা দিয়ে সে চলে। সে যদি আমার কাছে কিছু চায়, আমি অবশ্যই তাকে তা দান করি; আর যদি আমার কাছে আশ্রয় চায়, আমি তাকে অবশ্যই আশ্রয় দিই।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৫০২)
এই হাদিসের অর্থ এটি নয় যে আল্লাহ তাআলা শারীরিকভাবে মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে পরিণত হন। বরং অর্থ হলো, আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দার কান, চোখ, হাত ও পাকে পাপাচার থেকে হেফাজত করেন।
ফলে বান্দা হারাম কিছু শোনে না, অন্যায় কিছু দেখে না এবং অন্যায়ের দিকে পা বাড়ায় না। বান্দা কেবল তা-ই শোনে, দেখে বা করে—যা আল্লাহ পছন্দ করেন।
এমন বান্দা আল্লাহর কাছে যা-ই চায়, আল্লাহ তা কবুল করেন। পার্থিব জীবনের নানা প্রতিকূলতা, ক্ষতি কিংবা অনিশ্চয়তার মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তখন বান্দা বিচলিত হয় না। সে স্থির বিশ্বাসে জানে, তার পেছনের চালিকাশক্তি হলেন এক পরম দয়াময় প্রতিপালক।
এই বিশ্বাসই হলো আসল ইমান, যা শুধু তাত্ত্বিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা মানুষের দৈনন্দিন চরিত্র, আচরণ ও সৎকর্মে রূপ নেয়।
যখন একজন মানুষের আচার-ব্যবহার, নৈতিকতা ও জীবনযাত্রায় ইমানের এই সৌন্দর্য ফুটে ওঠে, তখনই বোঝা যায় যে সে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহকে তার জীবনে গ্রহণ করতে পেরেছে।
মহান আল্লাহ কোথায় আছেন