আমি বললাম, আমাকে সরে যেতে দিন
· Prothom Alo

মো. তৌহিদ হোসেন বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের সম্পর্ক, সেখানে তাঁর অভিজ্ঞতা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে তিনি কথা বলেছেন প্রথম আলোর সঙ্গে। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন প্রথম আলোর কূটনৈতিক প্রতিবেদক রাহীদ এজাজ
২০২৪–এর গণ–অভ্যুত্থানের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হিসেবে আপনার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
Visit asg-reflektory.pl for more information.
তৌহিদ হোসেন: সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আমাকে কোনো ভূমিকা রাখতে হবে, এটা আমি কখনো ভাবিনি। কিন্তু যখন আমাকে প্রস্তাব দেওয়া হলো এবং আমি নিশ্চিত হলাম যে অধ্যাপক ইউনূস দায়িত্বে থাকবেন, তখন রাজি হয়েছি। দেড় বছরের সব অভিজ্ঞতা যে সুখকর বা মনমতো হয়েছে, তা নয়। তবে আলাদা রকম একটা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছি। আমার পক্ষে যেটুকু করা সম্ভব, তার চেষ্টা করেছি। সাফল্য–ব্যর্থতা নিয়ে খুব বেশি বিচলিত নই, কারণ আমি তো তদবির করে সেখানে যাইনি।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে ড. ইউনূসের কাছ থেকে আপনার প্রতি কোনো নির্দেশনা ছিল?
তৌহিদ হোসেন: তখন আমি বা আর কেউ কোনো ব্যাপার নয়, ড. ইউনূস সরকারের প্রাথমিক দায়িত্ব ছিল স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনা। প্রতিটি ক্ষেত্রে সেটা তখন জরুরি ছিল। প্রাথমিকভাবে দেশের ভেতরে ও বাইরে সেই লক্ষ্যে আমরা সবাই কাজ করেছি।
কাজের অগ্রাধিকার নিয়ে কোনো দিকনির্দেশনা তাহলে ছিল না?
তৌহিদ হোসেন: দিকনির্দেশনা বলতে যা বোঝায়, সুনির্দিষ্টভাবে সে রকম কিছু ছিল না। প্রথম দিকে বিশ্ববাসীর কাছে আমাদের অবস্থান স্পষ্ট করাই ছিল মূল কাজ। তবে আমি এটা বলতে পারি, ড. ইউনূসও মনে করতেন যে ভারতের সঙ্গে আমাদের একটা মোডাস অপারেন্ডি (কর্মপদ্ধতি) প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। কারণ, ভারত একটি বাস্তবতা। তাদের সঙ্গে আমাদের বহুমাত্রিক সম্পর্ক, তারা আমাদের তিন দিক ঘিরে আছে। ঘটনা হলো, শেখ হাসিনা চলে গেলেন, অধ্যাপক ইউনূস দায়িত্ব নিলেন; এরপর ভারতের কাছ থেকে উষ্ণ কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এমনকি অধ্যাপক ইউনূসকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানিয়ে বার্তাও চীন বা অন্যান্য দেশের মতো সঙ্গে সঙ্গে আসেনি, অনেক দেরিতে এসেছে। বিষয়টা খুব অপ্রত্যাশিতও ছিল না। আগের সরকারের সঙ্গে তাদের যে ঘনিষ্ঠতা ছিল, সেই পরিপ্রেক্ষিতে তারা বেশ হতবাক হয়ে গিয়েছিল হয়তো। তাদের কী করা উচিত, তা নিয়ে দ্বিধা ছিল কি না, সেটা তারাই বলতে পারবেন। আমাদের দিক থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ড. ইউনূসের প্রথম ফোনালাপের জন্য আমাদের উদ্যোগ নিতে হয়।
তাহলে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করা হয়?
তৌহিদ হোসেন: অধ্যাপক ইউনূস ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করেছিলেন। আমরা সময়ের জন্য অনুরোধ করেছিলাম। পরে সময় ঠিক হয়েছে। যমুনা থেকে অধ্যাপক ইউনূস কথা বলেন।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হিসেবে কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পেরেছেন?
তৌহিদ হোসেন: একদম প্রথম তিন–চার মাস অনেকটা স্বাধীনতাই উপভোগ করেছি। তবে অবশ্যই প্রতিটি ক্ষেত্রে অধ্যাপক ইউনূসের সম্মতি নিয়ে কাজ করেছি। তবে বলতে পারি, তখন অনেকটা এককভাবেই অনেক কিছু করতে পেরেছি।
মানে ২০২৪–এর ডিসেম্বর পর্যন্ত আপনি মোটামুটি স্বাধীনভাবে কাজ করেছেন?
তৌহিদ হোসেন: হ্যাঁ, কোথাও অন্তত বাধাগ্রস্ত হইনি। যেমন যেসব রাষ্ট্রদূতের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসছিল, আমরা কি চটজলদি তাঁদের ব্যাপারে পদক্ষেপ নেব নাকি ধাপে ধাপে করব, এ রকম কিছু বিষয়ে আমি অধ্যাপক ইউনূসের সঙ্গে কথা বলেছি। আমি চেয়েছিলাম, এটা ধাপে ধাপে হোক। তিনিও সম্মতি দিয়েছেন। প্রথম দিকে অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে বা রাষ্ট্রদূত নিয়োগের ব্যাপারে আমার প্রস্তাবে তিনি পুরোপুরি সম্মতি দিয়েছেন। তাঁর অভিমত ছিল, তিনি বিদেশে বেশি যাবেন না। সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে আমি তাঁর যাওয়ার পক্ষে যুক্তি দিলাম। কারণ, তিনি অত্যন্ত পরিচিত মুখ। তাঁর মুখ থেকেই বিশ্বনেতৃত্ব বাংলাদেশের অবস্থানটা জানতে পারবেন। জাতিসংঘে অন্য কেউ গেলে সে গুরুত্ব থাকবে না। তিনিই পরে জাতিসংঘে গিয়েছিলেন। কমনওয়েলথ শীর্ষ সম্মেলন ছিল। সেটার অত গুরুত্ব ছিল না। আমি বলেছিলাম, তিনি না গেলেও পারেন। তিনি সেখানে যাননি, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হিসেবে আমি গিয়েছিলাম। শুরুতে পরিস্থিতিটা ছিল এমন। পরে ধীরে ধীরে বিভিন্ন ধরনের টানাপোড়েনের সৃষ্টি হয়।
পরিস্থিতি পাল্টে গেল কেন?
তৌহিদ হোসেন: দু–একটি বিষয়ে তাঁর বক্তব্য নিয়ে যে দ্বিমত করিনি, তা–ও কিন্তু নয়। যেমন তাঁর সরকারের একটা অগ্রাধিকার ছিল ভারতের সঙ্গে সম্পর্কটা যাতে ভালো করা যায়। প্রথম দিকে আমরা বেশ চেষ্টা করেছি। পরে দেখা গেল, এটা একেবারেই ব্যর্থ প্রয়াস। তিনি আমাকে একবার বললেন, তুমি কোথাও যাওয়ার পথে একবার দিল্লি ঘুরে এসো না? আমি বললাম, স্যার, এটা ঠিক হবে না।
এটা কোন সময়ে?
তৌহিদ হোসেন: ২০২৪–এর নভেম্বর–ডিসেম্বরের দিকে। আমি বললাম, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমন্ত্রণ না জানালে তো আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে দিল্লি যেতে পারি না। এটা করলে যে সম্পর্কের জন্য খুব একটা ভালো পরিবেশ সৃষ্টি হবে, তারও নিশ্চয়তা নেই। কারণ শুধু ভারত সরকার নয়, ভারতের কিছু মানুষের মধ্যেও বাংলাদেশবিরোধী মনোভাব আছে। আওয়ামী লীগের প্রতি তাদের সমর্থন প্রবল। তাই অনর্থক ওখানে যাওয়ার কোনো মানে নেই। তিনি মেনে নিয়েছিলেন।
আপনি টানাপোড়েনের কথা বলছিলেন। কীভাবে সেটা শুরু হলো?
তৌহিদ হোসেন: আমি তো আমার মতো করে কাজ করে গেছি। হয়তো আমার সক্ষমতা নিয়ে অধ্যাপক ইউনূস খুশি ছিলেন না। হয়তো তাঁর যাঁরা ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তাঁদের আমাকে পছন্দ হয়নি। ধরুন, লুৎফে সিদ্দিকীকে আন্তর্জাতিক বিষয়–সংক্রান্ত বিশেষ দূত নিয়োগ করা হলো, অথচ উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হয়েও আমি তা জানলাম সরকারি নির্দেশ জারির পর, মন্ত্রিপরিষদ থেকে নিয়োগের চিঠি পাওয়ার পর। সরকার দায়িত্ব নিয়েছিল আগস্টে। সেপ্টেম্বরে যখন তাঁকে নিয়োগ করা হচ্ছে, আমি আশা করেছি প্রধান উপদেষ্টা আমাকে সেটা জানাবেন। পরে আমি তাঁকে ফোন করে বলেছিলাম, স্যার, লুৎফে সিদ্দিকীর যে সিভি দেখলাম, তাতে তাঁকে বিডায় দিলে আরও ভালো হতো। তিনি বললেন, ওখানে তো আরেকজনকে দিয়ে দিয়েছি। এটা ছিল একধরনের ছোটখাটো ধাক্কা। এমন নয় যে উনি এটা করতে পারেন না; অবশ্যই পারেন। কিন্তু পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হিসেবে আমি জানব না?
সম্প্রতি একটি টিভি চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আপনি তিন দফা পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন। কারণ কী ছিল?
তৌহিদ হোসেন: এ নিয়ে বিস্তারিত কিছুতে যাব না। আমি জানতাম না যে এরই মধ্যে একটা কিচেন ক্যাবিনেট হয়ে গেছে।
কিচেন ক্যাবিনেটের কথা কীভাবে জানলেন?
তৌহিদ হোসেন: একটা বিষয়ে আলোচনার জন্য আমাকে মধ্যাহ্নভোজে যোগ দিতে বলা হলো। মধ্যাহ্নভোজে গিয়ে আমি কিছুটা বিরূপ পরিস্থিতিতে পড়ে গেলাম। এ জন্য যে সেটা ক্যাবিনেট মিটিং ছিল না, ছিল একটা গ্রুপের মিটিং। সেখানে গিয়ে আমি যথেষ্ট প্রশ্নের মুখে পড়ে গেলাম। আমাকে সমালোচনা করার জন্যই ডাকা হয়েছিল।
আপনি আভাস পাননি, সেখানে কী ঘটবে?
তৌহিদ হোসেন: না। জেনেভার বিমানবন্দরে আসিফ নজরুলকে নিয়ে যে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি ঘটেছিল, সে বিষয়েই আমাকে ওই মধ্যাহ্নভোজে ডাকা হয়েছিল। জেনেভার পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করার পর যে ধরনের বিরূপ সমালোচনার মুখে পড়েছি, তাতে মনে হলো আমি অভিযুক্ত হিসেবে উপস্থিত হয়েছি। আমি বললাম, আমার কাজ হয়তো আপনাদের পছন্দ হচ্ছে না। আপনাদের হয়তো মনে হচ্ছে যে আমি ৩৩ বছর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ছিলাম, তাই এ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের অযৌক্তিকভাবে সমর্থন করছি। আপনারা যদি এটা মনেই করে থাকেন, প্লিজ, তাহলে অন্য কাউকে নিন। আমাকে সরে যেতে দিন।
এরপর আবার কবে সরে যেতে চাইলেন?
তৌহিদ হোসেন: ২০২৫–এর ২২ সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় নিউইয়র্কের জেএফকে বিমানবন্দরে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের কয়েকজনকে নিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। তখন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, এমনকি ওই গ্রুপের যে তিন–চারজন ছিলেন, তাঁদেরও বলেছি যে কাজ শেষ করে ঢাকায় ফিরে গিয়ে এখানে যা ঘটেছে তার দায়িত্ব নিয়ে আমি পদত্যাগ করি। তাহলে আপনাদের কারোর ওপর আর কোনো দায় আসবে না। মির্জা ফখরুলসহ সবাই এর বিরোধিতা করলেন। আমি খলিলুর রহমানের সঙ্গেও আলাদাভাবে বসে বলেছি, আপনারা তো সুফিউর রহমানকে প্রতিমন্ত্রী বানাতে চেয়েছিলেন। আমি রাজি হইনি। ঢাকায় ফিরে যাই। আপনারা তাঁকে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দিয়ে আমাকে ছেড়ে দিন।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে আপনি প্রার্থী ছিলেন। কিন্তু আপনারা নিউইয়র্কে থাকা অবস্থায় খবর এল যে বাংলাদেশ প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছে। কী ঘটেছিল?
তৌহিদ হোসেন: হঠাৎ আমার একজন সহকর্মী নিউইয়র্কে আমাকে একটা মেসেজ পাঠিয়ে ফোন করে বললেন, আপনি একটু দেখে দিন। মেসেজ পড়ে আমি বললাম, এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বা পরে আমাকে তো বলা হয়নি কিছু। সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাধারণ সৌজন্য তো এই—আমার সঙ্গে পরামর্শ করা হবে। কাজেই আমি এ ব্যাপারে কোনো মতামত দেব না। যিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনিই বলুন যে ফিলিস্তিনের পক্ষে বাংলাদেশ নিজেকে প্রত্যাহার করছে। কথা ছিল, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শেষ করে অধ্যাপক ইউনূস যেদিন বলে আসবেন, তার পরদিন আমরা ওখানে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের নির্বাচনী প্রার্থিতার আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু করব। সেটা আর হয়নি। আমি টিকিট পাল্টে অধ্যাপক ইউনূসের সঙ্গে ফেরত চলে আসছি। তাঁকে বলেছি, স্যার, জিনিসটা আপনি এভাবে না করলেও পারতেন।
কথাটা কি ঢাকায় ফিরে বলেছিলেন?
তৌহিদ হোসেন: হ্যাঁ। তিনি যদি আমাকে বলতেন যে আমরা প্রত্যাহার করতে চাই, সেটা বুঝে নিতাম। তিনি কিন্তু আর কিছু বলেননি। আমি তাঁকে বলছি, স্যার, আমি দায়িত্ব নিতে রাজি হয়েছি শুধু আপনি থাকবেন বলে। আপনি যদি মনে করেন, আমি সরে গেলে আপনার সুবিধা হবে, আমি সরে যাব। আপনাকে ব্যাখ্যাও করতে হবে না।
ওই কিচেন ক্যাবিনেটের কাজ কী ছিল?
তৌহিদ হোসেন: আমি তো তাঁদের কোনো বৈঠক করিনি। কাজেই বলতে পারব না। তাঁরা সক্রিয় ছিলেন এবং নিয়মিত বসতেন।
কখন বসতেন, ক্যাবিনেট মিটিংয়ের পরে?
তৌহিদ হোসেন: শুধু এইটুকু জেনেছি, সপ্তাহে এক দিন করে বসতেন।
কিচেন ক্যাবিনেটের সদস্য কতজন ছিলেন?
তৌহিদ হোসেন: পাঁচ–ছয়জন।
ভারত বলছিল, নির্বাচনের পর বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে। বিএনপি সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে অংশ নিতে ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা ঢাকায় এলেন। এপ্রিলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান দিল্লিতে গেলেন। এরপরেও যেভাবে মনে করা হয়েছিল, নির্বাচিত নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক সেভাবে এগোল না। সংকটটা কোথায়?
তৌহিদ হোসেন: এখন কেন এমন হচ্ছে, সেটা তো আমি বলতে পারব না। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়তো ভালো বলতে পারবেন।
ভারতকে বাদ দিলে অন্তর্বর্তী সরকার তার দেড় বছরে অন্যান্য দেশ ও জোটের ক্ষেত্রে কি ভারসাম্যমূলক সম্পর্ক রেখে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে পেরেছে?
তৌহিদ হোসেন: আমি মনে করি, সেটা মোটামুটি সম্ভব হয়েছে। তবে প্রথম ছয় মাসে সম্পর্ক এগিয়ে যাওয়ার যে আভাস ছিল, শেষ ছয় মাসে এসে তা স্থবির হয়ে পড়ে। এর একটা কারণ খুব স্পষ্ট। কারণ, যখন দেখা গেল নির্বাচন হতে যাচ্ছে, তখন আর কোনো অগ্রগতি হয়নি। যেমন ওই সময় চীন আমাদের সরকারের সঙ্গে বন্ধুভাবাপন্ন ছিল, তারাও গতি কমিয়ে দেয়। চীনের সঙ্গে কিছু কিছু বিষয়ে অগ্রগতি হচ্ছিল। আমরা আশা করেছিলাম যে কিছু কিছু ভালো বিষয় ঘটবে। সেটা হঠাৎ থেমে গেল।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
তৌহিদ হোসেন: যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পূরক বাণিজ্যচুক্তির বিষয়টি আমরা নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দিতে পারতাম। দায়িত্ব ছাড়ার তিন দিন আগে এটা না করাই যথাযথ হতো বলে মনে করি।
জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) কিন্তু নির্বাচনের কাছাকাছি সময়েই অন্তর্বর্তী সরকার স্বাক্ষর করেছে।
তৌহিদ হোসেন: দুটো কিন্তু ঠিক এক রকম না। নির্বাচনের ঠিক আগেভাগে সবকিছুতেই আমাদের একটু মন্থরভাবে যাওয়া উচিত ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি একেবারে শেষ মুহূর্তে তড়িঘড়ি করে করা হয়েছে। সহজেই আরও সপ্তাহখানেক দর–কষাকষি করা যেত। হতে পারে যে জাপানের ক্ষেত্রে অগ্রগতিটা বেশি ছিল। তবে আরও পরেও করা যেত। তবে এটা নিয়ে তো বিতর্ক তেমন হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা ছিল না? নাকি এটা সরকারের পদক্ষেপ ছিল?
তৌহিদ হোসেন: কোনো দোষারোপে না গিয়ে আমি এটুকু বলতে পারি, ২০২৫–এর সেপ্টেম্বর বা তার আগে থেকেই জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অনেক কিছুরই দায়িত্ব নিচ্ছিলেন। একদিক থেকে সেটা ভালোই হয়েছে। কারণ, তিনি তো এখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। আমি অবশ্য জানি না, তখনই এটা তাঁদের জানা ছিল কি না। একটা জিনিস খেয়াল রাখতে হবে যে প্রথমে তাঁকে নিয়োগের সিদ্ধান্ত ছিল রোহিঙ্গাবিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে। কিন্তু সিদ্ধান্তটা নেওয়ার সময় আরও কিছু বিষয় যুক্ত করা হয়। এর মানে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনেক কাজ তিনিই দেখবেন। সেই হিসেবে তিনি অনেক কিছু দেখছিলেন। অনেক ক্ষেত্রেই আমার সঙ্গে তাঁর বোঝাপড়া ছিল, কিছু কিছু ক্ষেত্রে ছিল না। এটা অস্বীকার করার কিছু নেই যে শেষ পর্যায়ে কিছু দেশের সঙ্গে সম্পর্কের অনেকটাই তাঁর এখতিয়ারে চলে গিয়েছিল।
আপনাকে ধন্যবাদ।
তৌহিদ হোসেন: আপনাকেও ধন্যবাদ।