প্রশ্নে ভুল, বিতরণেও গরমিল; এখন পরিবর্তন আসছে প্রশ্নপত্র প্রণয়নে

· Prothom Alo

এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র নিয়ে নানা ধরনের ভুল ও অসংগতির অভিযোগ উঠেছে। পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের দুটি প্রশ্নে ভুলের বিষয়টি সরকার স্বীকারও করেছে। ওই দুটি প্রশ্নের জন্য সব পরীক্ষার্থীকে পূর্ণ নম্বর দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ছাড়া রসায়ন ও জীববিজ্ঞান বিষয়েও প্রশ্নপত্রে কিছু অসংগতির অভিযোগ করেছেন পরীক্ষার্থীরা।

শুধু প্রশ্ন প্রণয়ন বা পরিশোধনেই (মডারেশন) ভুল নয়, এবার প্রশ্নপত্র বিতরণেও ঘটেছে গরমিল। কোথাও নিয়মিত পরীক্ষার্থীদের হাতে দেওয়া হয়েছে অনিয়মিত পরীক্ষার্থীদের জন্য তৈরি প্রশ্নপত্র, কোথাও আবার প্রথম পত্রের পরীক্ষার জায়গায় নেওয়া হয় দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা।

Visit betsport.cv for more information.

এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ, দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি ও তদন্তের মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

এসএসসি ও এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষা একজন শিক্ষার্থীর জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব পরীক্ষার ফলাফলের ওপরই উচ্চশিক্ষায় ভর্তি ও কর্মজীবনের অনেক কিছু নির্ভর করে। ফলে প্রশ্নপত্রের সামান্য ভুলও একজন শিক্ষার্থীর মধ্যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। আর প্রশ্নপত্র বিতরণে ভুল হলে পরীক্ষার হলে শিক্ষার্থীকে বিভ্রান্তিতে পড়তে হয়, যা তার পরীক্ষা দেওয়ার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

প্রশ্নপত্রে ভুল, অসংগতির অভিযোগ

এবার বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা নেওয়ায় পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ক্ষোভের পাশাপাশি প্রশ্নপত্র নিয়েও অসন্তোষ তৈরি হয়। কোনো কোনো বিষয়ের প্রশ্ন তুলনামূলক কঠিন হওয়ার অভিযোগের মধ্যেই কিছু বিষয়ের প্রশ্নপত্রে ভুল ও অসংগতির অভিযোগ সামনে এসেছে।

ঢাকার উত্তরার একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ইংরেজি ভার্সনের এক পরীক্ষার্থী প্রথম আলোকে বলেন, উচ্চতর গণিতের একটি প্রশ্নের বিষয় তাঁর জানা ছিল; কিন্তু প্রশ্নটিতে অসংগতি থাকায় তিনি সেটির উত্তর দেননি। পাবলিক পরীক্ষা হওয়ায় ঝুঁকি না নিয়ে কম আয়ত্তে থাকা আরেকটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছে তাঁকে। তাঁর ভাষায়, জানা প্রশ্নটিতে অসংগতি না থাকলে তাঁকে এ সমস্যায় পড়তে হতো না।

পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের ৬ ও ৭ নম্বর প্রশ্নে ভুল থাকার বিষয়টি সরকার স্বীকার করেছে। শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জাতীয় সংসদেই বলেছেন, ওই দুটি প্রশ্নের জন্য পরীক্ষার্থীদের পূর্ণ নম্বর দেওয়া হবে। ভুল হওয়া পদার্থবিজ্ঞান (তত্ত্বীয়) প্রথম পত্রের প্রশ্নপত্র পরিশোধনের দায়িত্বে থাকা চার শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

জীববিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্রের ইংরেজি ভার্সনের নৈর্ব্যক্তিক অংশের তিনটি প্রশ্নে অসংগতি থাকার অভিযোগ করেছেন পরীক্ষার্থীরা। তাঁদের অভিযোগ, ওই তিনটি প্রশ্নে বাংলা ও ইংরেজি সংস্করণের মধ্যে অসামঞ্জস্য ছিল। রসায়নেও ইংরেজি সংস্করণের প্রশ্নে অসংগতির অভিযোগ ওঠে।

এইচএসসিতে পদার্থ বিজ্ঞান প্রথম পত্রের পরীক্ষায় প্রশ্নপত্রে ভুল থাকার পর বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। এক পর্যায়ে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সামনে গিয়ে বিক্ষোভ করেন তাঁরা

ঢাকার উত্তরার একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ইংরেজি ভার্সনের এক পরীক্ষার্থী প্রথম আলোকে বলেন, উচ্চতর গণিতের একটি প্রশ্নের বিষয় তাঁর জানা ছিল। কিন্তু প্রশ্নটিতে অসংগতি থাকায় তিনি সেটির উত্তর দেননি। পাবলিক পরীক্ষা হওয়ায় ঝুঁকি না নিয়ে কম আয়ত্তে থাকা আরেকটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছে তাঁকে। তাঁর ভাষায়, জানা প্রশ্নটিতে অসংগতি না থাকলে তাঁকে এ সমস্যায় পড়তে হতো না।

ইংরেজি ভার্সনের প্রশ্নপত্রে ভুল ও অসংগতির ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। অতীতেও বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় এমন অভিযোগ উঠেছে।

প্রতিটি শিক্ষা বোর্ডে প্রধান প্রশিক্ষকদের (মাস্টার ট্রেইনার) তালিকা থাকে। সেই তালিকা থেকে পরীক্ষা শুরুর আগে প্রতিটি বিষয়ের জন্য চারজন প্রশ্ন প্রণয়নকারী শিক্ষক নির্বাচন করা হয়। তাঁরা পৃথকভাবে চার সেট প্রশ্নপত্র তৈরি করে সিলগালা খামে বোর্ডে জমা দেন। এরপর চারজন পরিশোধনকারী বা মডারেটর গোপনীয়তার সঙ্গে প্রশ্নপত্রগুলো যাচাই করেন। প্রয়োজন হলে তাঁরা প্রশ্ন সংশোধন, সংযোজন কিংবা নতুন প্রশ্ন তৈরি করতে পারেন।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক জেসমিন তাসলিমা বানু প্রথম আলোকে বলেন, ভুলের অভিযোগ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়, যাতে পরীক্ষার্থীরা নম্বর পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো অসুবিধায় না পড়েন।

তাঁর দাবি, পদার্থবিজ্ঞান ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে বড় ধরনের কোনো ভুল ছিল না। তবে বানান ভুল বা এ ধরনের কিছু ত্রুটি থাকতে পারে।

পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভিযোগ, করোনা মহামারির পর থেকেই শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়েছে। এরপর ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পরও বিভিন্ন কারণে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম অনেকাংশে ব্যাহত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কোনো কোনো বিষয়ের প্রশ্ন তুলনামূলক ‘কঠিন’ হওয়ার কারণেও শিক্ষার্থীরা বিপাকে পড়েন।

প্রশ্নপত্র বিতরণেও ভুল

এবার বিভিন্ন কেন্দ্রে প্রশ্নপত্র বিতরণেও একাধিক ঘটনা ঘটেছে। ২৭ জুলাই দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলায় এইচএসসি পরীক্ষার একটি কেন্দ্রে ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা প্রথম পত্রের পরিবর্তে দ্বিতীয় পত্রের প্রশ্নপত্র বিতরণ করা হয়। পরীক্ষার্থীরা বিষয়টি কক্ষ পরিদর্শককে জানালে ভুল প্রশ্নপত্র তাৎক্ষণিকভাবে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। পরে পাশের কেন্দ্র থেকে প্রথম পত্রের প্রশ্নপত্র এনে পরীক্ষা নেওয়া হয়।

এ ঘটনায় দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগে কেন্দ্রের দায়িত্ব থেকে তিনজনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। পাশাপাশি তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

—জেসমিন তাসলিমা বানু, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, ঢাকা শিক্ষা বোর্ডআগামী পরীক্ষায় দ্বিতীয়বার মডারেশনের ব্যবস্থা রাখা হবে। এ ছাড়া প্রশ্নপত্র পরিশোধনের সময় ইংরেজি ভার্সনের শিক্ষকের পাশাপাশি একজন ইংরেজি ভাষার শিক্ষক রাখা হবে। এ বছরের শেষ দিকে অনুষ্ঠেয় অষ্টম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়নের কাজ থেকে তা শুরু করা হচ্ছে।

এর আগে ১৫ জুলাই বগুড়ার শিবগঞ্জ সরকারি মোজাফ্ফর হোসেন কলেজ (এম এইচ কলেজ) কেন্দ্রে গত বছরের সিলেবাস অনুযায়ী অনিয়মিত পরীক্ষার্থীদের জন্য তৈরি প্রশ্নপত্রে এ বছরের নিয়মিত ৪২ জন পরীক্ষার্থীর যুক্তিবিদ্যা দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা নেওয়া হয়।

পরীক্ষা শেষে শিক্ষার্থীরা বিষয়টি কেন্দ্র কর্তৃপক্ষকে জানান। পরে কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ ভুল স্বীকার করে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে লিখিত প্রতিবেদন পাঠায়। এ ঘটনায় রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড কলেজ পরিদর্শক মাহবুব আলমকে প্রধান করে দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে।

জামালপুরেও একই ধরনের ঘটনা ঘটে। ৪ জুলাই সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ কেন্দ্রে অনিয়মিত শিক্ষার্থীদের জন্য গত বছরের সিলেবাস অনুযায়ী তৈরি প্রশ্নপত্রে শতাধিক নিয়মিত শিক্ষার্থীর এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া হয়। ওই কেন্দ্রের একটি কক্ষে ভুলবশত নিয়মিত পরীক্ষার্থীদের মধ্যে গত বছরের সিলেবাস অনুযায়ী তৈরি প্রশ্নপত্র বিতরণ করা হয়। পরীক্ষার পর বিষয়টি জানতে পেরে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা তখন জানিয়েছিলেন, বিষয়টি নিয়ে শিক্ষা বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। বোর্ড থেকে ১০০ পরীক্ষার্থীর উত্তরপত্র আলাদাভাবে পাঠাতে বলা হয়। তাঁদের উত্তরপত্র ২০২৫ সালের প্রশ্নপত্র অনুযায়ী বিবেচনা করার কথা জানানো হয়।

এ ঘটনায় জামালপুরের সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের অধ্যক্ষ মীর শওকত আলমকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ড। একই সঙ্গে কলেজের পরীক্ষা পরিচালনা কমিটি বাতিল করা হয়।

চলতি মাসে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরেও ২০২৬ সালের পরিবর্তে ২০২৫ সালের প্রশ্নপত্রে ১৪ পরীক্ষার্থীকে এইচএসসি পরীক্ষা দিতে হয়েছে। ২ আগস্ট এ ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে ইব্রাহীম খাঁ সরকারি কলেজের কেন্দ্র সচিব মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন খানসহ তিন শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে প্রশাসন।

এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র কীভাবে তৈরি হয়, এত যাচাইয়ের পরও ভুল কেন

যেভাবে তৈরি ও চূড়ান্ত হয় প্রশ্নপত্র

বন্যার কারণে স্থগিত করা চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড বাদে অন্যান্য শিক্ষা বোর্ডের লিখিত পরীক্ষা শনিবার শেষ হয়েছে। এখন শুরু হচ্ছে ব্যবহারিক পরীক্ষা।

এবার নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া হয়। প্রতিটি বিষয়ের এমসিকিউ ও সৃজনশীল অংশের জন্য প্রশ্নপত্র তৈরির নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে। পরীক্ষা শুরুর কয়েক মাস আগে থেকেই প্রশ্নপত্র প্রণয়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়।

প্রতিটি শিক্ষা বোর্ডে প্রধান প্রশিক্ষকদের (মাস্টার ট্রেইনার) তালিকা থাকে। সেই তালিকা থেকে পরীক্ষা শুরুর আগে প্রতিটি বিষয়ের জন্য চারজন প্রশ্ন প্রণয়নকারী শিক্ষক নির্বাচন করা হয়। তাঁরা পৃথকভাবে চার সেট প্রশ্নপত্র তৈরি করে সিলগালা খামে বোর্ডে জমা দেন। এরপর চারজন পরিশোধনকারী বা মডারেটর গোপনীয়তার সঙ্গে প্রশ্নপত্রগুলো যাচাই করেন। প্রয়োজন হলে তাঁরা প্রশ্ন সংশোধন, সংযোজন কিংবা নতুন প্রশ্ন তৈরি করতে পারেন।

যাচাই-বাছাই শেষে চার সেট প্রশ্নপত্র পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কাছে জমা দেওয়া হয়। সেগুলো বোর্ডে গোপনীয়তার সঙ্গে সংরক্ষণ করা হয়।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, এবার অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা হলেও নয়টি সাধারণ বোর্ডের জন্য মোট ৩৬ সেট প্রশ্নপত্র প্রস্তুত করা হয়েছিল। পরে বোর্ডের চেয়ারম্যানরা লটারির মাধ্যমে চার সেট নির্বাচন করেন। এর মধ্যে দুই সেট সরাসরি বিজি প্রেসে ছাপার জন্য পাঠানো হয়। বাকি দুই সেট সংরক্ষণ করা হয়, যাতে প্রয়োজন হলে ব্যবহার করা যায়।

ছাপার পর প্রশ্নপত্র স্থানীয় প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পাঠানো হয়। জেলা সদরে সাধারণ ট্রেজারিতে এবং উপজেলায় সাধারণত থানায় প্রশ্নপত্র সংরক্ষণ করা হয়। উপজেলা পর্যায়ে প্রশ্নপত্র সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, দেখা যাচ্ছে প্রতিবছরই পাবলিক পরীক্ষায় কমবেশি এ ধরনের ঘটনা ঘটে। কিন্তু পাবলিক পরীক্ষা যেহেতু শিক্ষার্থীদের জীবনপথ নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ, তাই প্রশ্নপত্রে ভুল বা অসংগতি এবং প্রশ্নপত্র বিতরণে গরমিল কোনোভাবেই কাম্য নয়। অসতর্কতা এ ধরনের ভুলের একটি বড় কারণ হতে পারে। কাজের চাপ, তাড়াহুড়ো বা অন্য কোনো কারণে এমনটি হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের ওই কর্মকর্তা বলেন, প্রতিটি পরীক্ষার দিন সকাল ৯টা ১০ মিনিটে আন্তশিক্ষা বোর্ডের সভাপতি লটারির মাধ্যমে কোন সেটে পরীক্ষা হবে, তা নির্ধারণ করে সব বোর্ডের চেয়ারম্যানকে জানান। এরপর জেলা প্রশাসনকে জানানো হয়। তারপর নির্ধারিত প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া হয়।

এই ব্যবস্থায় প্রশ্নপত্রের গোপনীয়তা নিশ্চিত হয়; কিন্তু পরীক্ষার আগে প্রশ্নের মান যাচাইয়ের সুযোগও কার্যত থাকে না। ফলে মডারেশন পর্যায়ে কোনো ভুল থেকে গেলে তা পরীক্ষা শুরুর আগে শনাক্ত করার আর সুযোগ থাকে না।

এবার পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ের যে প্রশ্নপত্রে ভুল পাওয়া গেছে, সেটি সিলেট শিক্ষা বোর্ডে প্রস্তুত করা হয়েছিল। এ জন্য সেখানকার দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।

কোথায় ঘাটতি, প্রশ্ন প্রণয়ন নাকি মডারেশনে

পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে ভুল নতুন কোনো ঘটনা নয়। এর আগেও বিভিন্ন পরীক্ষায় ভুল ও প্রশ্নপত্র বিতরণে ভুলের ঘটনা ঘটেছে। তবে এবারের ঘটনাগুলোতে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, পরিশোধন ও বিতরণ—তিনটি ধাপই আলোচনায় এসেছে।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, দেখা যাচ্ছে প্রতিবছরই পাবলিক পরীক্ষায় কমবেশি এ ধরনের ঘটনা ঘটে। কিন্তু পাবলিক পরীক্ষা যেহেতু শিক্ষার্থীদের জীবনপথ নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ, তাই প্রশ্নপত্রে ভুল বা অসংগতি এবং প্রশ্নপত্র বিতরণে গরমিল কোনোভাবেই কাম্য নয়। অসতর্কতা এ ধরনের ভুলের একটি বড় কারণ হতে পারে। কাজের চাপ, তাড়াহুড়ো বা অন্য কোনো কারণে এমনটি হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার। তবে যে কারণেই হোক, প্রশ্নপত্রে ভুল-অসংগতি বা বিতরণে গরমিলের ঘটনা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে হবে। এ জন্য শিক্ষা বোর্ডগুলোর উচিত প্রশ্ন প্রণয়নকারী ও মডারেশনের দায়িত্বে থাকা শিক্ষকদের দক্ষতাও পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া।

প্রশ্নপত্র প্রণয়নে পরিবর্তন আসছে

প্রশ্নপত্রে ভুলের ঘটনা সামনে আসার পর পরবর্তী পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও পরিশোধন প্রক্রিয়ায় কিছু পরিবর্তনের কথা বলছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড।

এ বিষয়ে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক জেসমিন তাসলিমা বানু বলেন, আগামী পরীক্ষায় দ্বিতীয়বার মডারেশনের ব্যবস্থা রাখা হবে। এ ছাড়া প্রশ্নপত্র পরিশোধনের সময় ইংরেজি ভার্সনের শিক্ষকের পাশাপাশি একজন ইংরেজি ভাষার শিক্ষক রাখা হবে। এ বছরের শেষ দিকে অনুষ্ঠেয় অষ্টম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়নের কাজ থেকে তা শুরু করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, প্রশ্নপত্রে ভুলের ক্ষেত্রে পরীক্ষার্থীদের নম্বর পাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া তাৎক্ষণিক ক্ষতি কিছুটা সামাল দিতে পারে; কিন্তু পাবলিক পরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থায় বারবার এমন ভুলের ঘটনা কেবল নম্বর সমন্বয় করে সামাল দেওয়ার বিষয় নয়। প্রশ্ন প্রণয়ন থেকে শুরু করে পরিশোধন, ছাপা, সংরক্ষণ ও পরীক্ষাকেন্দ্রে বিতরণ—প্রতিটি ধাপে জবাবদিহি ও মাননিয়ন্ত্রণ কতটা কার্যকর, তা নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

বিশেষ করে একই ধরনের ভুলের পুনরাবৃত্তি হলে শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া বা দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়াই যথেষ্ট কি না, সেই প্রশ্নও সামনে আসে। ভুলের কারণ চিহ্নিত করে ব্যবস্থাগত পরিবর্তন না হলে ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা ঘটার ঝুঁকি থেকে যাবে। কারণ, একটি পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্রের ভুল শুধু একটি প্রশ্নের ভুল নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একজন শিক্ষার্থীর প্রস্তুতি, ফলাফল এবং পরবর্তী শিক্ষাজীবনের সম্ভাবনা।

Read full story at source