ব্রিকসের নেতৃত্বে ভারত, চারদিকে স্বার্থের সংঘাত

· Prothom Alo

বিশ্বরাজনীতির পুরোনো সমীকরণ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ক্রমবর্ধমান প্রতিদ্বন্দ্বিতা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত, বাণিজ্য ও প্রযুক্তি নিয়ে বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় নতুন মেরুকরণ—সব মিলিয়ে বহুপক্ষীয় বিশ্বব্যবস্থা এখন গভীর অনিশ্চয়তা ও টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

Visit mchezo.life for more information.

অর্থনীতি, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ও কূটনীতির পুরোনো জোট ও নির্ভরতার কাঠামোও বদলে যাচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ বাড়ছে, অন্যদিকে চীন, ভারত, রাশিয়া ও অন্যান্য উদীয়মান শক্তি নিজেদের প্রভাবের পরিসর বৃদ্ধি করার চেষ্টা করছে।

ঠিক এমন এক সময়ে ভারতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ব্রিকস সম্মেলন। আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে বসছে ব্রিকসের অষ্টাদশ শীর্ষ সম্মেলন। ২০২৬ সালে ব্রিকসের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছে ভারত। বছরের শুরুতেই, ১ জানুয়ারি দেশটি এ দায়িত্ব নেয়। এক বছর ধরে এই জোটের কার্যক্রমে নেতৃত্ব দেবে ভারত। এর আগে ২০২৫ সালে ব্রিকসের সভাপতির দায়িত্বে ছিল ব্রাজিল।

ব্রিকসের সভাপতিত্ব তাই ভারতের জন্য নিছক আনুষ্ঠানিক নেতৃত্বের দায়িত্ব নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে নয়াদিল্লি কীভাবে নিজের স্বার্থ, কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ও বৈশ্বিক প্রভাবের ভারসাম্য রাখে, তারও একটি পরীক্ষা।

জানুয়ারিতে ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের ইনস্টিটিউট অব সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের গবেষক অমিত রঞ্জন এক বিশ্লেষণে লিখেছিলেন, ভারত এমন এক ব্রিকসের নেতৃত্ব নিয়েছে, যার সদস্যদের মধ্যে বৈশ্বিক নানা ইস্যুতে গভীর মতপার্থক্য রয়েছে। ভারতের ঘোষিত মূলমন্ত্র—‘স্থিতিস্থাপকতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও টেকসই উন্নয়নের জন্য নির্মাণ’—এর মধ্য দিয়ে দিল্লি অন্তর্ভুক্তিমূলক, সহযোগিতামূলক ও মানবকেন্দ্রিক ব্রিকসের একটি ধারণা সামনে এনেছে।

কিন্তু মূলমন্ত্র ঘোষণা করা আর ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থের দেশগুলোকে অভিন্ন লক্ষ্য ও কর্মপথে নিয়ে আসা এক বিষয় নয়; বরং ভারতের সভাপতিত্বের কয়েক মাস না যেতেই সেই কঠিন বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সদস্যদেশগুলোর পারস্পরিক স্বার্থের সংঘাত, ভূরাজনৈতিক বিভাজন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের ভিন্ন ভিন্ন সম্পর্ক ব্রিকসের অভিন্ন অবস্থান তৈরির পথকে জটিল করে তুলছে।

শক্তি বাড়ছে, ঐক্য কমছে

ব্রিকসের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ঘটেছে এর সম্প্রসারণে। একসময় ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই জোট এখন অনেক বেশি বিস্তৃত ও বৈচিত্র্যময়। ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর, ইথিওপিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশ যুক্ত হওয়ায় এর অর্থনৈতিক ও জনমিতিক ওজনও অনেক বেড়েছে।

ইনস্টিটিউট অব সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের হিসাবে, সম্প্রসারিত ব্রিকস এখন বিশ্বের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৩৭ দশমিক ৩ শতাংশ এবং বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৪ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে।

কিন্তু এখানেই ব্রিকসের মৌলিক বৈপরীত্য। সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে জোটের অর্থনৈতিক ও জনমিতিক প্রভাব যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে সদস্যদের স্বার্থ ও ভূরাজনৈতিক অবস্থানের বৈচিত্র্য। ফলে একটি বৃহত্তর ও প্রভাবশালী জোট গড়ে উঠলেও অভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। ব্রিকসের সামনে এখন তাই শুধু সম্প্রসারণের সাফল্য ধরে রাখার নয়, এই বৈচিত্র্যকে সামলে কার্যকর ও ঐক্যবদ্ধ একটি শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করারও চ্যালেঞ্জ।

ব্রিকস এখন এমন একটি মঞ্চ, যেখানে চীন ও ভারত একই সংগঠনের সদস্য, আবার এশিয়ায় প্রভাব ও শক্তির ভারসাম্য নিয়ে তারা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী। রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে, আবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গেও দিল্লির সম্পর্ক ক্রমেই গভীর হয়েছে। ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো সদস্যদের মধ্যেও রয়েছে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও স্বার্থের সংঘাত।

অর্থাৎ ব্রিকসের শক্তি তার বৈচিত্র্যে, আবার সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও সেই বৈচিত্র্য। এই জোট যত বিস্তৃত হয়েছে, ততই বেড়েছে এর সম্ভাবনা। একই সঙ্গে বেড়েছে অভিন্ন অবস্থান তৈরি করার জটিলতাও।

ব্রাজিলে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে সংস্থাটির নেতারা। ৭ জুলাই ২০২৫, রিও ডি জেনিরো

ভারতের প্রথম বড় পরীক্ষা চীন

ভারতের জন্য ব্রিকসের সবচেয়ে জটিল সমীকরণ সম্ভবত চীনকে ঘিরে। দুই দেশই এশিয়ার বড় শক্তি এবং ব্রিকসের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। সীমান্ত বিরোধ, বাণিজ্য, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে তাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন রয়েছে। একই সময়ে সম্পর্ক স্থিতিশীল করার চেষ্টাও চলছে।

জানুয়ারিতে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের একটি প্রতিনিধিদল নয়াদিল্লি সফর করে ভারতীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করে। ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর এটি ছিল দুই দেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ দলীয় পর্যায়ের যোগাযোগ। প্রায় একই সময়ে শাকসগাম উপত্যকায় চীনের অবকাঠামো নির্মাণ নিয়ে দিল্লি ও বেইজিংকে নতুন করে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিতে দেখা গেছে।

এ বাস্তবতায় ভারত এমন একটি সংগঠনের নেতৃত্ব দিচ্ছে, যার অন্যতম প্রধান সদস্যই তার গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী। ফলে ব্রিকসের সভাপতিত্ব ভারতের জন্য একই সঙ্গে সহযোগিতা এবং প্রতিযোগিতার এক কঠিন ভারসাম্য রক্ষার পরীক্ষা।

দিল্লির সামনে তাই একটি কঠিন ভারসাম্যের প্রশ্ন রয়েছে। ব্রিকসকে চীনবিরোধী কোনো মঞ্চে পরিণত করার চেষ্টা করলে সংগঠনটির অভ্যন্তরীণ ঐক্য আরও দুর্বল হতে পারে। আবার চীনের সঙ্গে অতিরিক্ত সমঝোতার চেষ্টা করলে ভারতের নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থ ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্ন উঠতে পারে।

এ বাস্তবতায় ভারতের সম্ভাব্য কৌশল হতে পারে, চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু সে প্রতিযোগিতাকে ব্রিকসের পুরো কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ করতে দেওয়া হবে না। যেখানে স্বার্থের মিল রয়েছে, সেখানে সহযোগিতা এবং যেখানে স্বার্থের সংঘাত রয়েছে, সেখানে প্রতিযোগিতা—এই দুই পথ পাশাপাশি রাখাই দিল্লির জন্য বাস্তবসম্মত হতে পারে।

ইরান ও আরব আমিরাত দেখিয়ে দিয়েছে সমস্যাটা কোথায়

মে মাসের ঘটনাটি ভারতের জন্য আরও বড় সতর্কবার্তা। ১৪ ও ১৫ মে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত, বিশেষ করে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের অবস্থানগত পার্থক্যের কারণে সদস্যদেশগুলো একটি অভিন্ন যৌথ বিবৃতিতে একমত হতে পারেনি।

শেষ পর্যন্ত ভারতকে সভাপতির দায়িত্ব থেকে পৃথক ‘সভাপতির বিবৃতি’ ও ফলাফল নথি প্রকাশ করতে হয়। ওই নথিতেও পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে সদস্যদের মধ্যে মতপার্থক্যের কথা স্বীকার করা হয়েছে।

ঘটনাটি শুধু একটি বৈঠকে যৌথ বিবৃতি প্রকাশ না হওয়ার বিষয় নয়। এর মধ্য দিয়ে ব্রিকসের অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতাটিই প্রকাশ্যে এসেছে। একই সংগঠনে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত রয়েছে, কিন্তু পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত নিয়ে তাদের অবস্থান এক নয়। বৈঠকেও সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ তোলে।

ফলে ভারতকে একদিকে ইরানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ও নিজস্ব স্বার্থ বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে, অন্যদিকে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে তার গভীর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কও সামলাতে হচ্ছে। এর সঙ্গে রয়েছে জ্বালানি–নিরাপত্তার প্রশ্ন। হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে জ্বালানি ও বাণিজ্য পণ্যের আন্তর্জাতিক চলাচল ব্যাহত হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে ভারতের অর্থনীতি ও জ্বালানি–নিরাপত্তায়।

অর্থাৎ ব্রিকসকে ঐক্যবদ্ধ রাখার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ভারতকে শুধু বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতাই নয়, সদস্যদেশগুলোর পারস্পরিক আঞ্চলিক বিরোধও সামলাতে হচ্ছে। সভাপতিত্বের কয়েক মাসের মধ্যেই এ বাস্তবতা দিল্লির সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

এখানে ব্রিকসের সামনে প্রশ্নটি শুধু ‘পশ্চিমা আধিপত্যের বিকল্প’ হয়ে ওঠার নয়; বরং নিজেদের ভেতরের মতপার্থক্য সামলে সংগঠনটিকে কতটা কার্যকর ও প্রভাবশালী রাখা যায়, সেটিও। কারণ, একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সংকটেই যদি সদস্যদেশগুলো অভিন্ন অবস্থান বা অভিন্ন ভাষা খুঁজে পেতে হিমশিম খায়, তাহলে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার সংস্কার, আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামোর পরিবর্তন কিংবা একটি নতুন বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার মতো বৃহত্তর লক্ষ্য কতটা বাস্তবসম্মত—সেই প্রশ্নও সামনে আসে।

তবে এসব সংকটের সবটাই ভারতের তৈরি নয় কিংবা ভারতের সভাপতিত্বের কারণে তৈরি হয়নি। ব্রিকসের সম্প্রসারণের সঙ্গে যে স্বার্থগত বৈচিত্র্য তৈরি হয়েছে, এগুলো মূলত তারই বহিঃপ্রকাশ। ভারতের সভাপতিত্বের পরীক্ষা হলো এ বাস্তবতাকে কতটা সামলে সংগঠনটিকে কার্যকর রাখা যায়।

ব্রিকস কি পশ্চিমবিরোধী জোট

ব্রিকস নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনায় সবচেয়ে বেশি ভুল–বোঝাবুঝির জায়গা সম্ভবত এখানেই। জোটটির অনেক সদস্য আন্তর্জাতিক আর্থিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পশ্চিমা দেশগুলোর প্রভাব কমাতে আগ্রহী। বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি করা, আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার সংস্কার এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের স্বার্থকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়ে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে। তবে এই মিলকে একটি অভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। পশ্চিমা বিশ্ব সম্পর্কে সদস্যদেশগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি যেমন এক নয়, তেমনি বিশ্বব্যবস্থা কীভাবে বদলানো উচিত—সে প্রশ্নেও তাদের অগ্রাধিকার ও স্বার্থের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে।

কিন্তু সেখান থেকে ব্রিকসকে সরাসরি ‘পশ্চিমবিরোধী জোট’ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সম্পর্ক যেমন গভীর, তেমনি রাশিয়ার সঙ্গেও তার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। চীনের ক্ষেত্রেও সহযোগিতা ও প্রতিযোগিতা পাশাপাশি চলছে। ফলে ব্রিকসের অনেক সদস্য পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থার কিছু দিক নিয়ে অসন্তুষ্ট হলেও তারা সবাই পশ্চিমের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে চায়—এমন কোনো বাস্তবতা নেই।

বরং ব্রিকসের ভবিষ্যৎ সম্ভবত পশ্চিমের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের চেয়ে বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থায় নিজেদের স্বার্থ ও প্রভাবের জায়গা আরও শক্তিশালী করার জন্য দর-কষাকষির একটি কার্যকর মঞ্চ হিসেবে গড়ে ওঠার ওপর বেশি নির্ভর করবে। ভারতের ‘সংস্কার করা বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা’র ধারণাটিও এ বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ—পুরোনো ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ভেঙে ফেলার বদলে বিদ্যমান আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে উন্নয়নশীল ও উদীয়মান দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব ও প্রভাব বাড়ানো।

ভারতে গত ১৪ ও ১৫ মে ব্রিকসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ১৪ মে ২০২৬, নয়াদিল্লি

ভারতের লক্ষ্য কি শুধু ব্রিকস

এখানে ভারতের বৃহত্তর কৌশলটিও বিবেচনায় নিতে হবে। দিল্লি একদিকে ব্রিকসের নেতৃত্ব দিচ্ছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে তার কৌশলগত সম্পর্কও বাড়াচ্ছে। অর্থাৎ ভারত নিজেকে কোনো একটি শক্তিশিবিরে পুরোপুরি আবদ্ধ না রেখে একাধিক শক্তিকেন্দ্রের সঙ্গে কাজ করার নীতি অনুসরণ করছে। ব্রিকস ভারতের সেই বৃহত্তর কৌশলেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

অর্থাৎ ভারত ব্রিকসকে এমন কোনো সংগঠন হিসেবে দেখতে চাইবে না, যা তাকে পশ্চিমা বিশ্বের বিপরীতে দাঁড় করিয়ে দেয়; বরং দিল্লি চাইবে, ব্রিকসের মাধ্যমে বৈশ্বিক দক্ষিণে নিজের প্রভাব ও নেতৃত্বের দাবি জোরালো করতে, চীনের সঙ্গে একই মঞ্চে থেকে নিজের স্বার্থ ও প্রভাবের জায়গা শক্তিশালী করতে এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখতে।

এই ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা ভারতের সাম্প্রতিক পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে। আর ব্রিকসের সভাপতিত্ব সেই ভারসাম্য রক্ষার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাগুলোর একটি।

আসল সাফল্যের মাপকাঠি কোথায়

ভারতের ব্রিকস সভাপতিত্বের সাফল্য শুধু নয়াদিল্লিতে একটি জমকালো শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং অন্তত চারটি প্রশ্নের উত্তরের মধ্যেই এর প্রকৃত সাফল্য খুঁজতে হবে।

প্রথমত, ভারত কি চীন, রাশিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ ভিন্ন স্বার্থের দেশগুলোর মধ্যে ন্যূনতম কার্যকর সমঝোতা তৈরি করতে পারবে?

দ্বিতীয়ত, ব্রিকস কি এমন একটি কার্যকর অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারবে, যা সদস্যদেশগুলোর জন্য বাস্তব সুফল বয়ে আনবে?

তৃতীয়ত, বৈশ্বিক দক্ষিণের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো এবং বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের দাবিকে ব্রিকস কি বাস্তব কূটনৈতিক উদ্যোগে রূপ দিতে পারবে?

চতুর্থত, সম্প্রসারিত ব্রিকসকে কি এমন একটি কার্যকর কাঠামো দেওয়া সম্ভব হবে, যেখানে সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা কমে যাবে না?

এর কোনোটিই সহজ নয়; বরং মে মাসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক দেখিয়েছে, ব্রিকসের ভেতরের রাজনৈতিক বিভাজন এখন আর কেবল তাত্ত্বিক সমস্যা নয়, এটি ভারতের নেতৃত্বের সামনেই বাস্তব কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে ভারতের সভাপতিত্বের আসল পরীক্ষা হবে শীর্ষ সম্মেলনের জৌলুশে নয়; বরং মতপার্থক্যে ভরা এই জোটকে কতটা কার্যকর ও প্রভাবশালী করে তোলা যায়, তার ওপর।

দিল্লির জন্য যে ভারসাম্য জরুরি

ভারতের সামনে তাই দ্বৈত দায়িত্ব। একদিকে তাকে ব্রিকসের প্রভাব ও পরিধি বাড়াতে হবে, অন্যদিকে এমন কোনো অবস্থান নেওয়া যাবে না, যাতে সদস্যদের বড় অংশ সংগঠনটিকে নিজেদের স্বার্থবিরোধী মনে করে।

এখানে ভারতের কূটনৈতিক দক্ষতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়তো ঐকমত্য তৈরি করা নয়; বরং মতপার্থক্যকে নিয়ন্ত্রণযোগ্য পর্যায়ে রাখা। ব্রিকসের সব সদস্য কখনোই সব বিষয়ে একমত হবে না। সেটি প্রত্যাশা করাও বাস্তবসম্মত নয়; বরং ভারতের সাফল্য হবে মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোকে সচল রাখা।

অর্থনীতি, প্রযুক্তি, জলবায়ু, উন্নয়ন, জ্বালানি ও বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার সংস্কারের মতো ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলে রাজনৈতিক বিভাজন ব্রিকসকে অকার্যকর করে দিতে পারবে না। মতপার্থক্যকে কীভাবে এমন পর্যায়ে রাখা যায়, যাতে তা সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোকে অকার্যকর না করে, ব্রিকসের কার্যকারিতা অনেকটাই তার ওপর নির্ভর করবে।

সেপ্টেম্বরের নয়াদিল্লি শীর্ষ সম্মেলন তাই শুধু ব্রিকসের আরেকটি বার্ষিক বৈঠক নয়। এটি পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় ভারতের কূটনৈতিক সক্ষমতারও বড় পরীক্ষা।

ভারত কি ব্রিকসকে নিজের প্রভাব বিস্তারের একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবে, নাকি ভিন্ন স্বার্থের শক্তিগুলোকে একই টেবিলে রেখে কার্যকর বহুপক্ষীয় মঞ্চ হিসেবে গড়ে তুলতে পারবে—নয়াদিল্লির সামনে মূল প্রশ্ন সেটিই।

আর এই প্রশ্নের উত্তর শুধু ভারতের ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতির জন্য নয়, আগামী দিনের বিশ্বব্যবস্থা আদৌ কতটা বহুমেরুকেন্দ্রিক, কার্যকর ও প্রতিনিধিত্বশীল হবে, তা বোঝার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

কাজী আলিম-উজ-জামান: উপবার্তা সম্পাদক, প্রথম আলো

[email protected]

Read full story at source