‘আম্মাজান’–এর পর এমন কোনো চরিত্র পাইনি, যা আমাকে মুগ্ধ করেছে

· Prothom Alo

ষাটের দশকে তাঁর অভিনয়ের শুরু। টানা কাজ করেছেন নব্বই দশকের শেষ পর্যন্ত। কয়েক দশকজুড়ে একচেটিয়া দর্শকদের মনের নায়িকা হয়ে রাজত্ব করেছেন শবনম। একচ্ছত্র এমন ধারাবাহিক সফলতা চলচ্চিত্রজগতে বিরল। অথচ ছোটবেলায় তিনি কখনো নায়িকা হতে চাননি। ছিলেন টমবয়। ক্রিকেট, ঘুড়ি ওড়ানো, মার্বেলসহ সব ধরনের খেলাধুলা ছিল তাঁর প্রিয়। স্কুলজীবন শেষ হতে না হতেই তিনি হয়ে উঠলেন পুরোদস্তুর নায়িকা। শুধু বাংলাদেশ নয়, পাকিস্তানের সবচেয়ে প্রভাবশালী নায়িকার তালিকায় উঠে আসে তাঁর নাম। ১৯৬১ সালে ‘হারানো দিন’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে জনপ্রিয়তা পান শবনম। তখন তাঁর বয়স মাত্র ১৫। পরের বছর উর্দু চলচ্চিত্র ‘চান্দা’তে অভিনয় করে তৎকালীন সমগ্র পাকিস্তানে তারকাখ্যাতি পান। দুটি ছবি মুক্তি পায় ঢাকা থেকে, এরপর সমগ্র পাকিস্তানে মুক্তি পায় ‘তালাশ’, হয় ব্যবসাসফল। ষাটের দশকের মাঝামাঝিতে পাকিস্তানের সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় অভিনেত্রী হিসেবে পরিচিতি পান শবনম। দুই দেশ মিলিয়ে ১৮০টির বেশি ছবিতে অভিনয় করেছেন। মা–বাবার ঝর্ণা বসাক একদিন দুই দেশের মানুষের কাছে হয়ে উঠলেন শবনম। আজও তিনি শবনম হয়েই আছেন। বাংলাদেশি চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য ২০২৩ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে তাঁকে আজীবন সম্মাননা প্রদানের সিদ্ধান্ত হয়েছে। আজ তাঁর ৮০ বছর পূর্ণ হবে। জন্মদিন ও আজীবন সম্মাননাসহ জীবনের নানা দিক নিয়ে সম্প্রতি বরেণ্য অভিনয়শিল্পী শবনম তাঁর ঢাকার বারিধারার ডিপ্লোম্যাট এলাকার বাসায় দীর্ঘ আলাপচারিতায় মেতে ওঠেন প্রথম আলোর সঙ্গে। বাংলাদেশে ও পাকিস্তানের জীবন নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন। জানিয়েছেন, বাংলাদেশ স্বাধীনের পর কেন ফিরে আসেননি সেই প্রসঙ্গেও। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মনজুর কাদের। সাক্ষাৎকারের দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব

পাকিস্তানের লাহোরে যখন অভিনয় নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন, তখন বাংলাদেশ থেকে আপনার সঙ্গে গাজী মাজহারুল আনোয়ারের ‘সন্ধি’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য যোগাযোগ করা হয়। ১৯৮৭ সালের ওই সময়ে পাকিস্তানে এত ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের সিনেমায় অভিনয়ের ক্ষেত্রে আপনার মনের মধ্যে কোন ভাবনা কাজ করেছিল?

Visit turconews.click for more information.

শবনম: বাংলা ছবি, নিজের ভাষায় কাজ করব, এটার আনন্দ তো অন্য রকম। খোকা ভাই (সাংবাদিক আহমেদ জামান চৌধুরী) আমাকে ছবিটিতে অভিনয়ের জন্য বুঝিয়েছিল, গল্পটা নিয়েও কথা বলেছিল। আমার দেবর অশোক ঘোষও ছবিটি করতে বলেছিল। খোকা ভাইয়ের কথায় আমি প্রথমে রাজি হলাম। আমাকে যখন ‘সন্ধি’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য প্রথম প্রস্তাব দেওয়া হয়, তখন আমি লন্ডনে, ছেলে রনির সঙ্গে সময় কাটাতে গেছি। খোকা ভাই ফোন করে বললেন, ঝর্ণা, গাজী ভাই খুব ভালো ডিরেক্টর। তুমি ছবিটা করো। ভালো লাগবে কাজটা করে। আমি জানতাম গাজী ভাই গান লেখেন। যা–ই হোক, এরপর আমাদের কথা হয়, শুটিংয়ের দিন–তারিখ জিজ্ঞেস করলাম। গাজী (গাজী মাজহারুল আনোয়ার) ভাই আমাকে বললেন, টানা এক মাস লাগবে।

তখন মনটা একটু খারাপ হলো। এই বুঝি নিজের দেশের ছবিটা ছেড়ে দিতে হবে। আমি তখন গাজী ভাইকে বললাম, আমাকে একটু সময় দেন, লন্ডন থেকে পাকিস্তানে যাই। ডায়েরি দেখে আপনাকে জানাই। শুটিংয়ে কার কী ডেট, না দেখে তো বলতে পারছি না। লাহোরে গিয়ে দেখে জানাই। গাজী ভাই আমাকে বললেন, এটা আপনাকে করতেই হবে। যেভাবে পারেন ম্যানেজ করেন। টেলিফোনে সব কথা হচ্ছে। বললাম, গাজী ভাই, আই অ্যাম রেডি টু ডু। শুধু ডেটটা অ্যাডজাস্ট করতে হবে। বললেন, আমার হিরো রাজ্জাক সাহেব, তিনি এখন টপে। তার ডেট যদি মিস করি তাহলে মুশকিল হয়ে যাবে।

 নায়ক রাজ্জাকের সঙ্গে তো আপনার এর আগেও শুটিং হয়েছিল?

 শবনম : হয়েছিল, ‘নাচের পুতুল’। তারপর আর কোনো ছবি হয়নি। লাহোরে এসে ডায়েরিতে দেখি যা–তা অবস্থা। কীভাবে যে সময় বের করি। তারপর সেখানকার প্রযোজক–পরিচালক সবার সঙ্গে কথা বলে কোনোভাবে সময় বের করি। লাহোরের কাউকে বলিনি যে ঢাকায় যাব। সবাইকে অ্যাডজাস্ট করে ঢাকায় এলাম। কারোরই কোনো ক্ষতি করিনি। তারপর এখানকার শুটিং শেষ করলাম।

ঢাকার বারিধারা ডিওএইচএস বাসায় প্রথম আলোর ক্যামেরায় শবনম

  এই যে লাহোরে এত এত ছবির শিডিউল সমন্বয় করে ঢাকায় এলেন গাজী মাজহারুল আনোয়ারের ‘সন্ধি’ করতে। কেমন ছিল ঢাকায় শুটিংয়ের প্রথম দিন?

 শবনম: আমি খুবই এক্সাইটেড ছিলাম। অনেক বছর পর নিজের দেশে শুটিং। এফডিসিতে শুটিং। রাজ্জাক সাহেব, জাফর ইকবালও শুটিংয়ে ছিলেন, তাঁরা দুজনেই হিরো। এত দিন পর এসে শুটিং, অন্য রকম লাগছিল। আমি তো তখন পাকিস্তানে টপ হিরোইন, কিন্তু এখানে কী? কিছুই না। রেডি হয়ে গেলাম সেটে। গাজী ভাই সেটে এসে বুঝিয়ে দিলেন। দুই–তিনবার স্ক্রিপ্ট পড়লাম, মুখস্থ করলাম। শুটিংয়ে যখন দাঁড়িয়েছি, দেখি, প্রম্পট করা হচ্ছে! প্রম্পট করে আমি তখন মহড়া একটা করলাম। এরপর বললাম, গাজী ভাই, এই ছবি আমি করব না! কেন? প্রম্পট করার অভ্যাস আমার নেই। আমি প্রম্পট করার পর আমার হিরোর প্রম্পট হচ্ছে, এরপর আবার আমার। এতে করে আসলে আমার ইমোশন থাকছে না। সরি, আমি কাজটা করতে পারব না। এভাবে কাজ করতে আমি অভ্যস্ত নই। যদি করতে হয়, স্ক্রিপ্ট মুখস্থ করে করতে হবে। বাংলা ছবি পেয়েছি বলেই যে সেটা করব, তা কিন্তু না। সেদিনের শুটিং ক্যানসেল হলো। তারপর রাজ্জাক সাহেব জাফরসহ সবাই মিটিং করে সিদ্ধান্ত নিল, স্ক্রিপ্ট মুখস্থ করে করা হবে। রাজ্জাক সাহেব বললেন, আমি মুখস্থ করব। জাফর বলল, আমিও মুখস্থ করব। এটা আমাদের ভাষা, আমরা স্ক্রিপ্ট মুখস্থ করে করব না কেন। ম্যাডাম (শবনম) ওখানে মুখস্থ করে কাজ করেন, প্রম্পট করে আসলে আবেগটা পাওয়া যায় না। তারপর সবাই মুখস্থ করেছিল। এরপর আমরা ‘সন্ধি’ ছবিটার কাজ করি। ‘সন্ধি’ মুক্তি পায় ১৯৮৭ সালে। পরের বছর অশোক ঘোষের ‘জুলি’ করলাম। একই বছরে মইনুল হোসেনের ‘যোগাযোগ’ ছবির কাজ করি। ১৯৮৯ সালের একই ঈদে আমার দুটি ছবি মুক্তি পায়, একটি সুভাষ দত্তের ‘সহধর্মিণী’ অন্যটি গাজী মাজহারুল আনোয়ারের ‘শর্ত’। এরপর একে একে কাজ করি হোসেইন আনোয়ারের ‘সন্দেহ’, অশোক ঘোষের ‘সমস্যা’, মমতাজ আলীর ‘কারণ’, এফ এ বেনুর (ফজল আহমেদ বেনজীর) ‘মহামিলন’, ফজলে হকের ‘সম্পর্ক’। রাজলক্ষ্মী প্রোডাকশনের ‘প্রেম শক্তি’ ছবিটি আমার ভালো লাগার একটি গল্প। এই ছবি পরিচালনার পাশাপাশি অভিনয়ও করেন রাজ্জাক। এভাবে ওই সময়টায় পাকিস্তান–বাংলাদেশ নিয়মিত কাজ করতে থাকি।

নায়িকাদের একধরনের নখরামি থাকে, প্রাউডনেস থাকে, এটা আমি এখনো শিখিনি

 তার মানে আপনি যত সিনেমায় অভিনয় করেছেন, সব ছবির স্ক্রিপ্ট মুখস্থ করেছেন?

শবনম: সব সময় করেছি। আমার কাছে মনে হয়েছে, মুখস্থ থাকলে যে দৃশ্যে যে আবেগ দরকার, তা ঠিকঠাক দিতে পারব। কিন্তু প্রম্পটে এই আবেগ আসে বলে মনে হয় না। এতে বরং অভিনয়ের ডিস্টার্ব হয়। এরপরও বাংলাদেশে যত ছবি করেছি, সব মুখস্থ করে। কাজী হায়াতের ‘আম্মাজান’ করেছি, মুখস্থ করেছি, এই ছবিতে মান্না ছিল আমার সঙ্গে।

ঢাকার বারিধারা ডিওএইচএস বাসায় প্রথম আলোর ক্যামেরায় শবনম

বাংলাদেশ–পাকিস্তান দুই দেশে কাজ করেছেন। দুই দেশে কাজের পরিবেশ ও ধরন আপনার দৃষ্টিতে কেমন ছিল?

শবনম: পাকিস্তানে আমি যখন গেলাম তখন বাংলাদেশের চেয়ে ভালো অবস্থান ছিল পাকিস্তানের। টেকনিক্যাল সাইডগুলোতে পাকিস্তান ভালো ছিল, যেমন লেটেস্ট ক্যামেরা। তবে ওভারঅল ছবির বিষয় যদি বলতে হয়, তাহলে আমি বলব, বাংলাদেশের সিনেমার মান পাকিস্তানের চেয়ে ভালো ছিল। পাকিস্তানি সিনেমায় বাণিজ্যিক দিকটাকে বেশি প্রাধান্য দিত।  গর্জিয়েস সেট বানাত। মিউজিকও বেশ ভালো হতো। পর্দায় দৃশ্য দেখলে চোখের একটা আরাম ছিল। সিনেমার ডাবিংও বেশ ভালোভাবেই হতো। বাংলাদেশের সিনেমার সেটসহ অন্যান্য বিষয়গুলো একটু গরিব গরিব মনে হতো। তবে গল্পে বাংলাদেশিরা দারুণ এগিয়ে ছিল পাকিস্তানের চেয়ে, এই গল্পগুলো মানুষের মনে গেঁথে থাকত।

কবে সিদ্ধান্ত নিলেন বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে ফিরে আসবেন?

শবনম: ‘রানি বেটি রাজ কারেগি’ ছবিটি শেষ হলেও তার চার–পাঁচ বছর আগেই সিদ্ধান্ত নিই বাংলাদেশে চলে আসব। পাকিস্তানে আর নতুন কোনো ছবিতে সাইন করব না। ‘আয়না’ ছবিটি পাকিস্তানের ব্যাম্বিনো প্রেক্ষাগৃহে একটানা ছয় বছর চলেছে, এর পরিচালক বাংলাদেশি নজরুল ইসলাম, মিউজিকে ছিল রবীন ঘোষ। ওই ছবিতে না ছিল কমেডি, না ছিল ফাইট—ওটা শুধুই সামাজিক প্রেক্ষাপটের একটা গল্প, তাতেই বিশাল হিট।

যত দূর জানি, আপনি যখন বাংলাদেশে কাজ শুরু করলেন নতুন করে, তখন শাবানা বাংলাদেশে একচেটিয়া কাজ করছেন। কেউ কেউ বলেন, আপনার সঙ্গে শাবানার একটা স্নায়ুযুদ্ধ ছিল।

শবনম: বাংলাদেশে প্রতিদ্বন্দ্বিতা শাবানার সঙ্গে ছিল মনে হয় না, ছিল শাবানার স্বামী ওয়াহিদ সাদিকের সঙ্গে। সবই জানতাম; কিন্তু না জানার ভান করেছি। তবে শাবানার সঙ্গে আমার সম্পর্ক খুব ভালো ছিল। ও তো আমার জুনিয়র ছিল। ‘তালাশ’–এ সে এক্সট্রাতে কাজ করল, গানে। শাবানা এখনো দেখলে খুব ভালো ব্যবহার করে। আমিও করি। শাবানার সঙ্গে তো আমার কিছু না, যা কিছু করেছে তার স্বামী করেছে। আমার একটা ছবির শুটিংও বন্ধ করে দিয়েছিল। জসীম হিরো ছিল, ফজলে হক পরিচালিত ছবিটির নাম ‘সম্পর্ক’।

ঢাকার বারিধারার বাসায় প্রথম আলোর ক্যামেরায় শবনম

তার মানে আপনার আগমনে শাবানার প্রযোজক স্বামী ঘাবড়ে গেলেন?

শবনম: শাবানার স্বামীর কাজকর্মে বিষয়টা তাই মনে হয়েছিল। ওয়াহিদ সাদিক হয়তো ভাবছিল, সব ছবি বুঝি এখন শবনম করবে। কিন্তু আমি তো মাত্র গেলাম। আমি তো প্রথম যেদিন এফডিসির স্টুডিওতে যাই, গিয়েছিলাম গাড়ি চালিয়ে। এখনো গাড়ি চালাই। গাড়ি চালিয়ে ঢোকার পরপর এফডিসিতে হইচই পড়ে গেল—সবাই বলাবলি করছিল, হিরোইন নিজেই গাড়ি চালিয়ে এসেছে। আমার দেবর (অশোক ঘোষ, পরিচালক) বলল, কী সর্বনাশ করলেন, এফডিসিতে গাড়ি চালিয়ে গেলেন। আমি বললাম, আমার তো ড্রাইভার নেই। সকাল সকাল পৌঁছাতে হবে। গাড়ি বাসায়, গাড়ি চালিয়ে যাব না, তো কি? গাড়ি চালিয়ে যেতে আমার তো কোনো অসুবিধা হয়নি।

ওয়াহিদ সাদিক যখন এসব করছিলেন, তখন মনে মনে আপনি কী ভাবছিলেন?

শবনম : আমি আসলে এসবে মাথাই ঘামাইনি। ১৯৮৯ সালের দিকে একবার আমাকে এফডিসি থেকে বলা হলো, এনওসি ছাড়া বাংলাদেশে কাজ করতে পারব না। জানতে চাইলাম, এটা কি নতুন নিয়ম? বলল, হ্যাঁ। আমিও বললাম ওকে, আমি দেখছি। আমি সোজা চলে গেলাম এরশাদ (হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, সাবেক রাষ্ট্রপতি) সাহেবের কাছে। তাঁর সঙ্গে আমার আগে থেকেই যোগাযোগ ছিল। এরশাদ সাহেব আমাকে দেখে বললেন, কী রে ঝর্ণা, কী ব্যাপার? তুই এখানে? আমিও তাঁকে কোনো ফোন করে যাইনি। তখন অবশ্য এত রেস্ট্রিকশনও ছিল না। আমি বললাম, এরশাদ ভাই এখানে সিনেমায় কাজ করার কী সিস্টেম, আমি কাজ করতে আসছি, আমার নাকি এনওসি লাগবে। আমি তো এই দেশেরই মেয়ে। আমার তো বাড়তি এসব নিয়ম মেনে কাজ করার কিছু নেই। জিজ্ঞেস করলেন, কে বলছে? বললাম, এফডিসি থেকে। ওরা আমার ছবির শুটিং বন্ধ করে দিয়েছে। এরপর সঙ্গে সঙ্গে কাকে যেন ফোন করলেন এরশাদ ভাই। এফডিসিতে চিঠি পাঠালেন। পরে জেনে গেল সবাই, শাবানার স্বামী আমার শুটিং বন্ধ করেছে! এরশাদ ভাই আমাকে বলেছিলেন, এরপরে যদি কেউ তোর কাজ বন্ধ করে, সঙ্গে সঙ্গে আমাকে জানাবি। এটা আমার ব্যক্তিগত ফোন নাম্বার, তুই রাখ। সঙ্গে সঙ্গে এনওসিও দিয়ে দিল। এত দিন মুখ খুলিনি। দরকারও পড়েনি। আমার আসলে নিজের ওপর আত্মবিশ্বাসও ছিল। সত্যি বলতে বাংলাদেশে কেউ আমাকে এভাবে জিজ্ঞেসও করেনি, তাই এত দিন এসব কথা বলা হয়নি।

আপনার কি মনে হয়, ওয়াহিদ সাদিক এসব কখনো উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন?

শবনম: শাবানার স্বামীর সঙ্গে আমার অতটা সম্পর্ক ছিল না, শুধু সালাম দেওয়া পর্যন্ত। শাবানার সঙ্গে ভাত খাচ্ছি, চা খাচ্ছি, গল্প করছি—নিশ্চয়ই সে–ও বুঝতে পেরেছে। হয়তো সে আমাকে দেখে লুকিয়ে যেত। তারও তো লজ্জা বা অপরাধবোধ কাজ করেছে। আমাকে গাজী ভাই বলতেন, আপনি এসে ইন্ডাস্ট্রিতে শাবানারে সব শেখাইলেন। আমি বলেছি, আমি কই কী শিখাইলাম। আমাকে বললেন, আপনি গাড়ি চালানো শেখালেন। আপনাকে দেখে মাথায় ফুল দেওয়া শিখল। এটা–সেটা কত কী শিখল। আমি বললাম, কেউ যদি আমারে দেখে শেখে, তা তো ভালো কথা। এটা আমার জন্য আনন্দের।

ঢাকার বারিধারা ডিওএইচএস বাসায় প্রথম আলোর ক্যামেরায় শবনম

বাংলাদেশের নায়িকাদের মধ্যে কাদের সঙ্গে আপনার আন্তরিক সম্পর্ক ছিল? আর কোন নায়কেরা আপনার জন্য খুবই স্বাচ্ছন্দ্যের ছিল?

শবনম: সেভাবে কারও সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক ছিল না। নাসিমা খানের সঙ্গে সুন্দর সম্পর্ক ছিল। কবরী তখন ছোট। শাবানাও ছোট। ববিতার সঙ্গেও কাজ হয়েছে। ওরা দেখলে আপা আপা করত। নায়কদের মধ্যে রহমান ও এরপর রাজ্জাকের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। সহশিল্পীর সম্পর্ক ছিল। মজার ব্যাপার হচ্ছে, রহমানের সঙ্গে যখন কাজ করতাম, সবাই বলত রহমানের সঙ্গে আমার প্রেম! অথচ রহমানও আমাকে আপা বলে ডাকত। একবার সিলেটে শুটিংয়ের সময় রহমান ভাইকে আমি বলেছিলাম, আমার তো কোনো ভাই নেই। তখন রহমান ভাই বললেন, আজ থেকে আপনি আমার বোন। এর বাইরে খলিল, আজিম, আলমগীর, জসীমের সঙ্গেও কাজ করেছি।

তাহলে রহমানের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক কেন আলোচনায় ছিল বলে মনে করেন?

শবনম: এটা পুরোপুরি জুটির জনপ্রিয়তার কারণে হয়েছে বলে আমার বিশ্বাস। তখন একটু হেসে কথা বললেই বলত যে প্রেম হয়ে গেছে। প্রেম তো আসলে সেভাবে হয় না। কাজ করতাম, একটা বন্ধুত্ব তো হবেই। কাজ করতে গিয়ে তো আর মুখ ভার করে থাকা যায় না। কাজ করতাম, হাসতাম—এসব দেখেই বলে দিত, প্রেম হয়ে গেছে।

রুপালি পর্দায় আমরা আপনাকে বেশির ভাগ সময় গ্ল্যামারাস চরিত্রে দেখেছি। কিন্তু ক্যামেরার বাইরের জীবন কেমন ছিল?

শবনম: আমার জীবনে সবচেয়ে কষ্টের অভিজ্ঞতা যদি বলি, আমার বাচ্চা। তিন–চার বছর বয়সী ছেলে রনিকে দেশে রেখে পাকিস্তানে থাকতাম। আমার ছেলে তখন খুব কান্নাকাটি করত। পরে যখন ওখানে বাড়িঘর করলাম, তখন মা–বাবাকে নিয়ে গেলাম। ছেলেকেও নিয়ে গেলাম। কাজকর্ম শেষে ভাবতাম, বাসায় গিয়ে ছেলেকে তো দেখতে পাব। আমার জীবনে যদি কোনো কিছু মিস করে থাকি, তাহলে সেটা আমার ছেলেকে সময় দিতে না পারা। এর বাইরে আল্লাহর রহমতে আমার কোনো কষ্ট নেই। নাদিমের সঙ্গেই তো ৫০টি সিনেমা! এত ছবি করেছি যে পরে একসঙ্গে সিনেমায় সাইন করলে মজা করে নাদিম বলত, প্রতিদিন সকালে আপনার চেহারা দেখতে হয়, আমি তো বিরক্ত। আমিও বলতাম, আপনার চেহারা প্রতিদিন দেখে আমিও বিরক্ত। এ রকম খুনসুটি তো চলত আমাদের মাঝে।

ঢাকার বারিধারা ডিওএইচএস বাসায় প্রথম আলোর ক্যামেরায় শবনম

৮০ বছরের জীবন। জীবনের এই সময়টায় এসে বিশেষ স্মৃতি আছে, যা আজও মনে হলে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন?

শবনম: মা–বাবার কথা মনে হলে আমার মনটা খারাপ হয়ে যায়। ১৯৯০ সালে আমার মা মারা যান। আমি তখন অনেক ব্যস্ত ছিলাম। মা–বাবা দুজনের কারও মৃত্যুর সময়টায় পাশে থাকতে পারিনি। লাহোরের হিলস্টেশনে ছবির শুটিংয়ে ছিলাম। এমন জায়গায় ছিলাম যে সঙ্গে সঙ্গে যে আসব, এই সুযোগও ছিল না। লাহোর থেকে দেখা গেল সকালে রওনা দিলে রাতে পৌঁছাতে হতো, দূরত্বটা ঠিক এ রকম। মায়ের মৃত্যু সকালে হলেও খবরটা রাতে শুনি। বাবারটা পরের দিন। আমার বড় বোন ইচ্ছা করে শোনায়নি আমাকে। বলেছে, মা তো খুব অসুস্থ ছিল। হঠাৎ করে চলে গেল, তোরে খবর দিতে পারিনি। কোথায় আছিস, কী অবস্থায় আছিস, তা তো জানি না।

অভিনয়ের জন্য পাকিস্তানে ১৬ বার নিগার অ্যাওয়ার্ড জিতেছেন। বছরখানেক আগে দেশটি আপনাকে দিয়েছে সিতারা-ই-ইমতিয়াজ। এত এত সম্মাননা পাওয়ার পরও কি মনে হয় এখনো কিছু বাকি রয়ে গেছে?

শবনম: আমি মনে করি, কোনো শিল্পী মনে করে না সে সব শিখে ফেলেছে। প্রত্যেক শিল্পী একেক দিন একেক কিছু শেখে। একজন শিল্পী ভিন্ন রকম কোনো চরিত্র পেলে সব সময় কাজ করতে চায়। আমিও এখন সে রকম কোনো চরিত্র পেলে কাজ করব। যদিও বয়স হয়ে গেছে, পারব কি পারব না, এটা ভেবে যেমনটা লাগে, মনে হয়, ক্যামেরার সামনে গিয়ে দাঁড়ালে সাহসটা এসে পড়বে।

তাহলে অভিনয় করছেন না কেন?

শবনম: তেমন কোনো চরিত্র তো পাই না। ‘আম্মাজান’–এর পর এমন কোনো চরিত্র পাইনি, যা আমাকে মুগ্ধ করেছে। কয়েক দিন আগেও হায়াৎ ভাইয়ের (কাজী হায়াৎ) সঙ্গে কথা হচ্ছিল। আমি আসলে সব বেছে করেছি বলেই ৪০–৪৫ বছর ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করতে পেরেছি।

ঢাকার বারিধারা ডিওএইচএস বাসায় প্রথম আলোর ক্যামেরায় শবনম

‘আম্মাজান’ ছবির পর নিশ্চয় ছবিতে অভিনয়ের প্রস্তাব পেয়েছিলেন?

শবনম: পেয়েছিলাম, কিন্তু চরিত্র নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলাম না। তাই করিনি। ‘আম্মাজান’ চরিত্রকে ছাড়িয়ে যাবে, সে রকম কোনো চরিত্র পাইনি।

এখন বারিধারায় আপনার সময় কীভাবে কাটে?

শবনম: ছেলের সঙ্গে থাকি, তাই বেশ উপভোগ করি। মা-ছেলে দুজনে বাইরে বেড়াতে যাই। ঢাকার রাস্তায় ঘুরি। মন চাইলে কোনো রেস্টুরেন্টে ঢুকে পড়ি। পছন্দের খাবার খেয়ে ঘরে ফিরি। এই যে ঘোরাঘুরি, এটা মজা লাগে—যেটা অনেক বছর করা হয়নি। ছেলে আমার ছোটবেলা থেকে লন্ডনে পড়াশোনা করেছে। ছবির শুটিংয়ে ব্যস্ত আমি ছেলেকে সময় দিতে পারতাম না। মাঝেমধ্যে যখন লন্ডন যেতাম, ১৫ দিন কিংবা ১ মাস থেকে আসতাম। আবার ছেলের যখন ছুটি হতো, সে–ও আসত। এই যা। তাই ২৬ বছর ধরে দেশে মা–ছেলের দারুণ সময় কাটছে। বয়স তো হয়েছে। চাইলেও যখন–তখন দূরে কোথাও যাওয়া সম্ভব নয়। ঢাকার বিভিন্ন জায়গা এবং আশপাশে ঘোরাঘুরি করি। রবিনের গান শুনি। পুরোনো ছবিও দেখি। রবিনকে তো ভীষণ মিস করি। রবিনের গান শুনে মনে হয়, এখানে যেমন তাঁর গানের শুরুতে, পাকিস্তানের যত ছবিতে কাজ করেছে—একটা ছবির একটা গান হলেও সুপারহিট হতো। ও রকম মিউজিক এখন আর হয় না, যা আমাকে টানে। অথবা আমার কান পর্যন্ত আসে। রবিনের মিউজিকে একটা মাধুর্য ছিল, মাদকতা ছিল। এরপর আমাকে কেউ আকৃষ্ট করতে পারেনি।

সর্বশেষ শুটিং করেছেন ‘আম্মাজান’, এরপর সিনেমার পর কোনো শুটিং ফ্লোরে যাননি?

শবনম: ‘আম্মাজান’ সিনেমার শুটিংয়ের পর কোনো স্টুডিওতে যাইনি, হাতে গোনা কয়েকটি অনুষ্ঠানে গিয়েছি। অনেক ব্যাপার আছে, প্রাণ খুলে সেসব বলতে পারছি না। পারব না। আর বলে লাভও হবে না। আমার মুখ পুরোপুরি বন্ধ। মাঝে অনেক দিন দেশের বাইরে ছিলাম। দেশে আসার পর যা কিছু পেয়েছি, যা দেখেছি, তা নিয়ে মুখ খুলতে চাই না। এর মধ্যে কোনো একদিন শুনবেন, আমি মরে গেছি। তখন এফডিসির লোকজন অস্থির হয়ে উঠবে, সেখানে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আমি তো আমার ছেলেকে স্পষ্ট বলে দিয়েছি, আমার মরদেহ যেন কোনোভাবেই এফডিসিতে না যায়। রবিন (রবিন ঘোষ, প্রখ্যাত সুরকার ও সংগীত পরিচালক, শবনমের স্বামী) সাহেবও বলে গিয়েছিলেন, তাঁর মরদেহও সেখানে নেওয়া হয়নি।

যে এফডিসিতে দীর্ঘ সময় কাজ করেছেন, দিনের অনেকটা সময় থেকেছেন, সেই জায়গা নিয়ে এত অভিমান?

শবনম: অবশ্যই কারণ আছে। আমি তো বলেছি, বলব না। এফডিসি থেকে কত সম্মান পাচ্ছি, তা তো বলে শেষ করতে পারব না! হ্যাঁ, এটা ঠিক, মরে গেলে ফুলের মালা দেব, হয়ে গেল, তাই না। এই সুযোগ আমি কাউকে দিতে চাই না। এফডিসিতে কাউকে আমার মরদেহ নিয়ে মায়াকান্না কাঁদার সুযোগ দেব না। আমি যেভাবে নিজের বাসায় চুপচাপ আছি, সেভাবেই ভালো আছি। শান্তিতে আছি। আমি শিল্পী। আমি আমার মতো আছি। খুব ভালো আছি।

ঢাকার বারিধারা ডিওএইচএস বাসায় প্রথম আলোর ক্যামেরায় শবনম

পুরোনো ছবির গান বা দৃশ্য দেখলে কি আপনাকে আবেগময় করে তোলে?

শবনম: মাঝেমধ্যে দেখলে হাসি পায়। ভাবতে থাকি, এত ভুলত্রুটি ছিল, তারপরও মানুষ আমাকে পছন্দ করেছে। এখন কাজ করলে হয়তো আরেকটু ভালো করতে পারতাম। আত্মবিশ্বাস এখন আগের চেয়ে বেশি। এখন করলে হয়তো আরও ভালো করতে পারতাম। তখন তো নতুন বিয়ে হয়েছে, তাই অনেক হিসাব করে অভিনয় করতে হতো। রোমান্টিক ব্যাপারস্যাপারও অতটা বুঝতাম না।

রোমান্স ব্যাপারটা কখন বুঝলেন?

শবনম: রোমান্স ব্যাপারটা আমি পাকিস্তানে যাওয়ার পর বুঝলাম। দেখলাম বাংলা আর উর্দুর মধ্যে রোমান্স অনেক ভিন্ন। ওখানে রোমান্সটা অনেক বেশি লাউড, আমাদের এখানে ঠিক তার বিপরীত। আমি যখন কাজ করতে গিয়েছিলাম তখন একটা চ্যালেঞ্জও ছিল, তবে কেউ কখনো বলতে পারবে না, শবনম ভালগার কিছু করেছে। গানে এমন কোনো পোশাক পরেছি, যা দৃষ্টিকটু লেগেছে—তখনকার কোনো পত্রপত্রিকায়ও এমন কোনো খবর পাওয়া যাবে না। আমি বাঙালি মেয়ে, এই ব্যাপারটা আমার মাথায় সব সময় থাকত।

দুই দেশ মিলিয়ে আপনার সবচেয়ে কাছের বন্ধু কে?

শবনম: সবচেয়ে কাছের বন্ধু জেবা, সে–ও হিরোইন (পাকিস্তান) ছিল। আমরা সমসাময়িক। এখনো প্রায়ই যোগাযোগ হয়। আমি গেলে ওর বাসায় যাই। লাহোরে যখন প্রথম দিকে শুটিং করতাম, তখনো তার বাসায় নিয়ে যেত।

আপনি সিনেমায় সফল, রবিন ঘোষ সফল। কিন্তু আপনাদের একমাত্র সন্তান রনি ঘোষকে সিনেমা এবং গান কোনো মাধ্যমে পাওয়া গেল না, এর পেছনে কারণ কী?

শবনম: ওর নিজের কোনো শখ ছিল না। রনিকে ভারত থেকে প্রস্তাব দিয়েছিল, সুভাষ ঘাই। আমিও গেলাম, ডিনার দিল, বলল যে তুমি কাজ করো। তখন রনি বলল, আমি পড়ালেখা শেষ না করে কাজ করব না। যদি আমার একটা ছবি ফ্লপ হয়, তাহলে আমি যাব কোথায়। তখন সম্ভবত ম্যাট্রিক দিয়েছিল। আমরাও বলেছিলাম, তোমার সিদ্ধান্তই আমাদের সিদ্ধান্ত। ও চায়নি, হয়নি। সে লন্ডন থেকে বিজনেস নিয়ে পড়াশোনা করেছে। এখন ব্যবসা করছে।

ঢাকার বারিধারা ডিওএইচএস বাসায় প্রথম আলোর ক্যামেরায় শবনম

অভিনয়ে একটা দীর্ঘ জীবন যাপন করে এসেছেন, এখন যখন পেছন ফিরে তাকান, কী মনে হয়। কী পেলেন, কী হারালেন? জীবন নিয়ে কোনো অনুশোচনা বা অনুতাপ আছে কি?

শবনম: আমি আমার ছেলেকে সময় দিতে পারিনি। এটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় মিসিং। যখন ওর জীবনে আমরা বেশি দরকার ছিলাম, তখন আমরা ওকে সময়টা দিতে পারিনি। সঙ্গে থাকতে পারিনি। বুঝতেও পারিনি। এখন সেটা বুঝতে পারি। তবে আমি কোনো দিন সময়ও অপচয় করিনি।

পরিবারে সময় দিতে গেলে কি নায়িকা হিসেবে এতটা সফল হতে পারতেন?

শবনম: ঠিক আছে, নায়িকা…। আমি সব সময় এটাকে ভিন্নভাবে দেখি। একটা কাজের জন্য প্রযোজককে হ্যাঁ করেছি, টাকাপয়সা নিয়েছি—ওটাও আমার দায়িত্ব হয়ে উঠেছিল যে ঠিকঠাকভাবে কাজটা শেষ করা। কমিটমেন্টে আটকে পড়েছিলাম। এসব নিয়ে এখন তাই আফসোস হয়।

ঢাকার বারিধারা ডিওএইচএস বাসায় প্রথম আলোর ক্যামেরায় শবনম

একটা বিষয় আপনার কাছে জানতে চাই, যত দূর জানি এটা নিয়ে আপনি কথা বলেননি। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হয়, তার পরের কয়েক বছরের মধ্যে অনেক শিল্পী–কলাকুশলী পাকিস্তান থেকে নিজেদের দেশে চলে আসেন। কাজ করেন। কিন্তু আপনি আসেননি, এ নিয়ে অনেক ধরনের কথাও প্রচলিত। আপনার কাছে জানতে চাই, ঠিক কী ভাবনাচিন্তা থেকে আপনার আসাটা হয়নি?

শবনম: খুবই চমৎকার প্রশ্ন। এটা নিয়ে আমার আসলে কখনো কিছু বলাও হয়নি। আমি কিন্তু তোমাকে আগেই বলেছি, একই সময়ে চার–চারটি ছবির শুটিংও করেছি। এর মধ্যে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। ওখানেও তখন অনেক বাংলাদেশি আর্টিস্ট ছিল, ওরা বোধ হয় টের পেয়েছিল, এ রকম, তাই করাচি থেকে চলে আসে। আমি তখন লাহোরে দিনরাত শুটিংয়ে ব্যস্ত। ওই সময়ে আমি সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না। ভাবলাম, শুটিং সব শেষ করে যাব। কিন্তু সেই শেষটা যে আমার পাকিস্তানে ৩০ বছর লেগে যাবে, সেটা জানতাম না। যা–ই হোক, এক সময় মনে খুব টেনেছে, মা–বাবা সবাইকে দেখার জন্য। বাংলাদেশ স্বাধীনের পর তখন সঙ্গে সঙ্গে ঘোষণা দেওয়া হলো যে পাকিস্তান থেকে কোনো আর্টিস্ট বের হলে, তার এনওসি লাগবে। ১৯৭৪ সালের কোনো একদিন রবিন বলল, তিন বছর হয়ে গেছে, আমরা এখনো এনওসি পাচ্ছি না। তিন বছর ধরে এনওসি চেয়েও পাচ্ছি না। আমি আমার মা–বাবার সঙ্গে দেখা করতে পারছি না। স্বাধীন দেশে যেতে পারছি না। মিনিস্টার তখন বললেন, আমাকে তো এ ব্যাপারে কেউ কিছু বলেনি! এরপর পিএসকে ডেকে ফাইল খুঁজে আনতে বললেন। পিএস ফাইল খুঁজে পাচ্ছে না জানানোর পর তাকে খুব বকাঝকা করলেন। এরপর ফাইল পাওয়া গেল। খুলেই বললেন, এই দেখেন। এই চিঠির কারণে আপনার এনওসি দেওয়া হচ্ছিল না। পরে দেখলাম, প্রোডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের চিঠি— তারা লিখেছে, শবনমকে এনওসি দেবেন না। তার ওপরে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ। দেখলাম, চিঠিটা দেখে অবাক হলাম। এসব ১৯৭৪ সালের ঘটনা। আমরা এনওসি চেয়েছিলাম, ১৯৭১ সালে। তখন বললাম, আমি চিঠি দেখলাম, কিন্তু আপনি আমাকে এনওসি দেবেন কি দেবেন না সেটা বলেন? বললেন, অবশ্যই দেব। কেন দেব না। তাহলে দেন, আমি মা–বাবার সঙ্গে দেখা করি। দেশে যাই। তারপর এলাম। প্রথমবার এনওসি নিয়ে এক মাস থেকে ফিরে যাই। আমি ফিরে যাওয়ার পর পাকিস্তানের সবাই অবাক হয়েছিল। আমার কাছে আসলে কমিটমেন্ট সব সময় বড় বিষয় ছিল।

অনেক সময় দিলেন। ধন্যবাদ আপনাকে।

শবনম: তোমাকেও অনেক ধন্যবাদ। অনেক কথা হলো। এত কথা কখনো বলা হয়নি।

Read full story at source