যেখানেই যান, গাছের চারা রোপণ করেন জোবায়ের
· Prothom Alo
ছুটির দিন হাতে গাছের চারা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন জোবায়ের আহমেদ খান। কখনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আঙিনা, কখনো রাস্তার ধারে, আবার কখনো পার্ক কিংবা কোনো আত্মীয়ের বাড়ির আশপাশে—সুযোগ পেলেই চারা রোপণ করেন তিনি। কর্মস্থল ঢাকায় হলেও ছুটির দিনগুলোতে টাঙ্গাইল, দিনাজপুর, সিলেট ও সুনামগঞ্জে গাছ লাগাতে ছুটে যান।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার চারা ও তালবীজ রোপণ করেছেন জোবায়ের। তাঁর লাগানো গাছ এখন বড় হয়ে কোথাও ছায়া দিচ্ছে, কোথাও ফল-ফুল দিচ্ছে। কিছু গাছ আবার শিক্ষার্থীদের দুর্লভ প্রজাতির বৃক্ষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।
জোবায়ের আহমেদ খান আইন মন্ত্রণালয়ে কর্মরত। তাঁর বাড়ি টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলা সদরে। মৃত মোকলেসুর রহমান ও জুয়েনা বেগম দম্পতির বড় সন্তান তিনি।
শুরুটা ২০০৮ সালে
ছোটবেলায় নানাকে গাছ লাগাতে দেখেছেন জোবায়ের। নানার সেই কাজই তাঁকে গাছ লাগানোর প্রতি আগ্রহী করে তোলে। তবে নিয়মিত গাছ লাগানো শুরু করেন ২০০৮ সালে। তখন তিনি টাঙ্গাইলের করটিয়া সা’দত কলেজের স্নাতক (সম্মান) শ্রেণির শিক্ষার্থী।
কলেজে স্বেচ্ছায় রক্তদানকারী একটি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন জোবায়ের। সংগঠনটির রক্তদাতাদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের একটি করে গাছের চারা উপহার দিয়েছিলেন তিনি। এরপর নিজেই চারা রোপণ শুরু করেন।
টাঙ্গাইলের সন্তোষে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে কয়েকটি ফলদ গাছের চারা রোপণের মধ্য দিয়ে তাঁর এই উদ্যোগের শুরু। এরপর গাছ লাগানো আর থামেনি।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও বর্তমানে একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত লিয়াকত আলী বলেন, ‘জোবায়ের ২০০৮ সালে আমাদের সঙ্গে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কিছু গাছের চারা লাগিয়েছিলেন। সেই গাছগুলো এখন বড় হয়েছে।’
জোবায়েরের কাজ পরিবেশ রক্ষায় ভূমিকা রাখছে উল্লেখ করে টাঙ্গাইলের সরকারি মওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শামসুল হুদা বলেন, তিনি নিজে ঘুরে ঘুরে গাছ লাগান। এটি খুবই ভালো উদ্যোগ।
২০০৮ সালে জোবায়েরের রোপণ করা জামরুলগাছটি বড় হয়েছে। সেই গাছের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। সম্প্রতি টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চারা রোপণ
জোবায়েরের লাগানো গাছ রয়েছে টাঙ্গাইলের সরকারি সা’দত কলেজ, ঘাটাইলের জিবিজি কলেজ, গালা বীরসিংহ উচ্চবিদ্যালয়, হরিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ব্রাহ্মণশাসন সরকারি উচ্চবিদ্যালয়, ব্রাহ্মণশাসন মহিলা কলেজ, ঘাটাইল মাদ্রাসা ও উইজডম ভ্যালী স্কুলসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।
উইজডম ভ্যালী স্কুলের অধ্যক্ষ মো. কামাল হোসেন বলেন, ‘জোবায়ের আমাদের প্রতিষ্ঠানে নাগলিঙ্গম, কনকচাঁপা, উদাল, পলাশসহ বিভিন্ন দুর্লভ প্রজাতির গাছ লাগিয়েছেন। গাছগুলো এখন বড় হয়েছে। শিক্ষার্থীরা এসব গাছের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।’
ঘাটাইলের হেলেনাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এনামুল হক তালুকদার জানান, তাঁদের স্কুল, গ্রামের মসজিদ ও কবরস্থানের পাশে জোবায়ের বিভিন্ন জাতের প্রায় ৩০টি আমগাছের চারা লাগিয়েছেন। গাছগুলো এখন ফল দিচ্ছে।
চারা নিয়ে ছুটেছেন শহর থেকে শহরে
শিক্ষাজীবন শেষে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিয়ে ঢাকায় চলে যান জোবায়ের। সেখানেও গাছ লাগানো অব্যাহত রাখেন। ঢাকার ৩০০ ফিট সড়কের পাশে শিমুল, জারুল, নিম, হরীতকী, জাম, ছাতিম, অর্জুনসহ বিভিন্ন জাতের ১ হাজার ৫০০টির বেশি গাছের চারা লাগিয়েছেন তিনি।
২০১৬ সালে জোবায়ের দিনাজপুরে বিয়ে করেন। এরপর শ্বশুরবাড়িতে যাওয়া-আসার সময়ও সঙ্গে করে নিয়ে যেতে থাকেন চারা। আবার সেখান থেকেও চারা সংগ্রহ করে বিভিন্ন জায়গায় লাগিয়েছেন।
দিনাজপুর-রংপুর মহাসড়কের রামডুবি এলাকায় সড়কের দুই পাশে দুই শতাধিক পলাশ, কাঞ্চন, শিমুল ও ছাতিমের চারা লাগিয়েছেন তিনি। রামডুবি-বীরগাঁও আঞ্চলিক সড়কের দুই পাশে লাগিয়েছেন দুই শতাধিক আমগাছ। চিরিরবন্দর উপজেলার বিভিন্ন সড়কের পাশে রোপণ করেছেন আরও তিন শতাধিক ফল ও ফুলের গাছ।
কদমগাছের চারা রোপণ করেন জোবায়ের। বৃহস্পতিবার ঢাকার ৩০০ ফিট সড়কের পাশেজোবায়েরের মামার বাড়ি সুনামগঞ্জে। ছোটবেলা থেকেই সিলেট ও সুনামগঞ্জ অঞ্চলে তাঁর যাতায়াত। সিলেটেও বিভিন্ন জায়গায় গাছ লাগিয়েছেন তিনি। কয়েক বছরে সিলেটের শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতাল, আদালত চত্বর, আলিয়া মাদ্রাসা ও দলদল চা-বাগান এলাকায় পাঁচ শতাধিক গাছের চারা লাগিয়েছেন তিনি। ছাতক উপশহর এলাকায় লাগিয়েছেন দুই শতাধিক শিমুলের চারা।
তবে গাছ লাগানোর পাশাপাশি বীজ রোপণেও আগ্রহ রয়েছে জোবায়েরের। জয়দেবপুর-টাঙ্গাইল রেলপথের পাশে গত তিন বছরে প্রায় ছয় হাজার তালের বীজ রোপণ করেছেন। সেসব বীজ থেকে রেলপথের বিভিন্ন জায়গায় এখন তালগাছের চারা উঁকি দিচ্ছে।
‘যত দিন বেঁচে আছি, গাছ লাগিয়ে যাব’
গত ১৫ আগস্ট টাঙ্গাইলে এসেছিলেন জোবায়ের। সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন গাছের চারা। জেলা সদর এলাকায় রোপণ করেছেন নিমের চারা।
গাছের চারা কেনার জন্য নিজের আয়ের একটি অংশ খরচ করেন জোবায়ের। নিজেও চারা উৎপাদন করেন। পরিবারের সদস্যরাও তাঁকে উৎসাহ দেন। তাঁর ছোট ভাই ফোজায়েল আহমেদ খান একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। তিনিও নিয়মিতভাবে জোবায়েরকে গাছ লাগানোর কাজে আর্থিক সহায়তা করেন।
জোবায়ের বলেন, ‘যখন হাতে টাকা আসে, কিছু চারা কিনে রাখি। নিজেও চারা উৎপাদন করি। পরিবারের সবাই আমাকে এ কাজে উৎসাহ দেন। আমি যত দিন বেঁচে আছি, গাছ লাগিয়ে যাব। কারণ, গাছ মানুষের বড় বন্ধু।’