নদী গণিতের যে নিয়ম মেনে চলে
· Prothom Alo

ঢাকা ছেড়ে বের হতে গেলে কোনো না কোনো নদী পার হতেই হয়। বেশ কিছু নদী ঢাকা শহরকে ঘিরে আছে। যেমন গাবতলী থেকে যেকোনো বাস উত্তরবঙ্গের দিকে যেতে প্রথমেই গাবতলী ব্রিজ পার হতে হবে। গাবতলী ব্রিজ তুরাগ নদের ওপর অবস্থিত। তুরাগ নদ ধরে কিছুটা বসিলার দিকে এগোলে সামনে পড়বে বুড়িগঙ্গা নদী। আমাদের চারপাশে এভাবেই ছড়িয়ে আছে নদী। আবার ঢাকা থেকে সড়কপথে চট্টগ্রাম যেতে হলে মেঘনা নদী পার হতে হবে। ঢাকা থেকে বরিশালে নদীপথে গেলে বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী, মেঘনা হয়ে তবেই যাওয়া যাবে। মানচিত্র দেখলে নদীগুলো সহজেই চোখে পড়ে। নদীর ধারাগুলো অনুসরণ করে সহজেই সামনে এগোনো যায়। খেয়াল করলে দেখা যাবে, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র, শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরী—সব কটি নদী মুন্সিগঞ্জে গিয়ে একসঙ্গে মিলেছে।
পৃথিবীর প্রায় সব নদীর নেটওয়ার্ক দেখতে একই রকম। ছোট ছোট নদী ও খাল একে অন্যের সঙ্গে মিশে বড় হয়। তারপর আরও বড় নদীতে গিয়ে মেশে। এভাবে নিচের দিকে, মানে সমুদ্রের দিকে নদীগুলো এগিয়ে যায়। আমাদের দেশের নদীগুলো এভাবেই বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিশেছে।
Visit bettingx.bond for more information.
নদীর এই নকশা দেখতে অনেকটা গাছের ডালপালার মতো। গাছের শিকড়ের সঙ্গেও এর মিল আছে। আবার পাতার শিরার সঙ্গে, আমাদের শরীরের রক্তনালি কিংবা শহরের রেলপথ ও মহাসড়কের নেটওয়ার্কের সঙ্গেও নদীর এই শাখা-প্রশাখার মিল পাওয়া যায়।
সমুদ্রের ঢেউয়ের গাণিতিক রহস্য ও ৩০০ বছরের পুরোনো ধাঁধাঢাকা থেকে বরিশালে নদীপথে গেলে বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী, মেঘনা হয়ে তবেই যাওয়া যাবে। মানচিত্র দেখলে নদীগুলো সহজেই চোখে পড়ে। নদীর ধারাগুলো অনুসরণ করে সহজেই সামনে এগোনো যায়।
নদীর এই নকশার মধ্যে কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম আছে। তবে কিছু বিশৃঙ্খলাও এর মধ্যে দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের নদীবিজ্ঞানী ক্রিস পাওলা বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, নদী, পাতার শিরা বা এ ধরনের শাখা-প্রশাখার নেটওয়ার্কের নকশা আমরা মোটামুটি বুঝতে পারি। কিন্তু এর মধ্যে আবার এমন এক বিশৃঙ্খলা আছে, যা পুরোপুরি বোঝা যায় না। এ ব্যাপারটিই নদীকে এত আকর্ষণীয় করে তোলে!
এ ধরনের শাখা-প্রশাখার নেটওয়ার্ককে বিজ্ঞানীরা বলেন পরিবহন নেটওয়ার্ক। এর কাজ হলো কোনো তরল পদার্থ, যেমন পানি বা রক্ত বা অন্য কোনো জিনিসকে অনেকগুলো জায়গা থেকে সংগ্রহ করে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে দেওয়া। নদী বৃষ্টির পানি বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করে শেষ পর্যন্ত সমুদ্র বা হ্রদে পৌঁছে দেয়। রক্তনালি শরীরের বিভিন্ন জায়গা থেকে রক্তকে হৃদ্যন্ত্রে নিয়ে যায়। আবার সড়ক মানুষকে শহরের বিভিন্ন জায়গা থেকে একটি কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
এসব উদাহরণের মধ্যে নদী এক বিশেষ জায়গা দখল করে আছে। কারণ, নদী কোনো জীবের বিবর্তনের ফল নয়। আবার কোনো শহরের পরিকল্পনাকারীও নদীর নকশা তৈরি করেননি। পৃথিবীর নানা প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নদীর সৃষ্টি হয়। বৃষ্টি, মহাকর্ষ এবং পানি, মাটি ও পাথরের ক্ষয়; সব মিলে তৈরি হয় নদীর পথ। তারপরও নদীগুলো কিছু সহজ ও প্রায় সর্বজনীন নিয়ম মেনে চলে।
বিশ্বের দীর্ঘতম ৭ নদীক্রিস পাওলার মতে, নদী, পাতার শিরা বা এ ধরনের শাখা-প্রশাখার নেটওয়ার্কের নকশা আমরা মোটামুটি বুঝতে পারি। কিন্তু এর মধ্যে আবার এমন এক বিশৃঙ্খলা আছে, যা পুরোপুরি বোঝা যায় না।
পৃথিবীর পানি নিষ্কাশনব্যবস্থাই হলো নদী
পৃথিবীর স্থলভাগের প্রায় প্রতিটি জায়গায় বৃষ্টির পানি পড়ে। সেই পানির অনেকটাই শেষ পর্যন্ত কোনো নদী, হ্রদ বা সমুদ্রে গিয়ে পড়ে। মানে, নদী হলো পৃথিবীর বিশাল এক পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা।
নদীর এই নেটওয়ার্ক নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি নিয়ম আবিষ্কার করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার বিজ্ঞানী জন হ্যাক। ১৯৫৭ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া ও মেরিল্যান্ডের নদী ও খাল নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি প্রতিটি নদী বা খালের দৈর্ঘ্য মাপেন। পাশাপাশি হিসাব করেন, নদীটির দিকে যে বিশাল এলাকার পানি ঢাল বেয়ে নেমে আসে, সেই এলাকার আয়তন কত। এই এলাকাকে বলা হয় পানিনিষ্কাশন এলাকা।
জন হ্যাক দেখলেন, ছোট্ট একটি ঝরনা থেকে শুরু করে বিশাল নদী; সব ক্ষেত্রেই নদীর দৈর্ঘ্য আর এর পানিনিষ্কাশন এলাকার মধ্যে একটি নির্দিষ্ট সম্পর্ক আছে। নদীর দৈর্ঘ্য মোটামুটি এর পানিনিষ্কাশন এলাকার আয়তনের ০.৬ ঘাত বা পাওয়ারের সমানুপাতিক।
গাণিতিকভাবে বিষয়টি লেখা যায়: L ~ A⁰·⁶। এখানে L হলো নদীর দৈর্ঘ্য, আর A হলো পানিনিষ্কাশন এলাকার আয়তন।
পৃথিবীর প্রকৃতি অবশ্য এতটাও নিখুঁত নয় যে প্রতিটি নদী এই নিয়ম হুবহু মেনে চলবে। কিছুটা পার্থক্য থাকবেই। কিন্তু পৃথিবীর নানা অঞ্চলের নদীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই সম্পর্কটি আশ্চর্য রকমভাবে মিলে যায়!
সাগরের পানি লবণাক্ত, কিন্তু নদীর পানি নয় কেননদীর নেটওয়ার্ক যদি পুরোপুরি একই ধরনের নকশা অনুসরণ করত, তাহলে ছোট ও বড় নদীর অববাহিকার আকৃতি একই রকম থাকার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে তা হয় না।
০.৬ কেন, ০.৫ কেন নয়
এখানেই নদীর গণিতের মজা। ধরা যাক, একটি বর্গাকার জমি আছে। সেই জমিতে বৃষ্টি পড়ছে এবং সব পানি একটি নির্দিষ্ট জায়গা দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। খুব সরলভাবে চিন্তা করলে মনে হতে পারে, জমির পানি একটি খাল দিয়ে বের হবে, যার দৈর্ঘ্য জমির এক পাশের দৈর্ঘ্যের সমান। জমির আয়তন যদি বাড়ে, তাহলে এর এক পাশের দৈর্ঘ্য বাড়বে আয়তনের বর্গমূলের হারে, অর্থাৎ ঘাত হবে ০.৫। মানে, এখানে নদীর দৈর্ঘ্য ও পানিনি ষ্কাশন এলাকার সম্পর্ক হিসাব করলে ঘাতটা প্রায় ০.৫ হওয়ার কথা।
কিন্তু বাস্তবে নদী তা করে না। হ্যাকের সূত্র বলছে, ঘাত প্রায় ০.৬। এর মানে হলো, পানিনিষ্কাশন এলাকা যত বড় হয়, নদীর দৈর্ঘ্যও তত বাড়ে এবং এটি প্রত্যাশার চেয়ে একটু দ্রুত হারেই বাড়ে।
আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন থেকে তোলা ইয়েমেনের শুকনো নদীর ছবিতে হ্যাকের সূত্রের প্রয়োগ দেখা যায়যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির ভূ-পদার্থবিদ ড্যানিয়েল রথম্যান বিষয়টি খুব সহজভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। ছোট নদীর অববাহিকা তুলনামূলকভাবে খাটো ও চওড়া হয়। বড় নদীর অববাহিকা হয় বেশি লম্বা ও সরু।
মানচিত্রে নদীর শাখা-প্রশাখার দিকে তাকালে আমরা বিষয়টি বুঝতে পারি। নদীর নেটওয়ার্ক যদি পুরোপুরি একই ধরনের নকশা অনুসরণ করত, তাহলে ছোট ও বড় নদীর অববাহিকার আকৃতি একই রকম থাকার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে তা হয় না। বড় নদীগুলোর অববাহিকা ধীরে ধীরে বেশি লম্বাটে হয়ে ওঠে। তাহলে প্রশ্ন হলো, নদী এমন আকৃতি নেয় কেন?
উনিশ শতকে গণিতের যত পুরস্কারবাস্তবে নদী তা করে না। হ্যাকের সূত্র বলছে, ঘাত প্রায় ০.৬। এর মানে হলো, পানিনিষ্কাশন এলাকা যত বড় হয়, নদীর দৈর্ঘ্যও তত বাড়ে এবং এটি প্রত্যাশার চেয়ে একটু দ্রুত হারেই বাড়ে।
নদী কি সবচেয়ে কম শক্তির পথ বেছে নেয়
এর একটি ব্যাখ্যা হতে পারে এমন—নদী এমন একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করে, যা পানি সরানোর জন্য তুলনামূলক কম শক্তি খরচ করে। আবার সেই বর্গাকার মাঠের কথাই ভাবা যাক। সেখানে সমানভাবে বৃষ্টি পড়ছে। আমাদের কাজ হলো মাঠের সব পানি একটি নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে দেওয়া।
আমরা চাইলে মাঠের প্রতিটি জায়গা থেকে সরাসরি সেই নির্দিষ্ট জায়গা পর্যন্ত আলাদা আলাদা খাল বানাতে পারব। কিন্তু এতে প্রচুর খাল তৈরি করতে হবে। খালগুলো খনন করতে বা পানির স্রোতে সেগুলো তৈরি হতে অনেক বেশি শক্তি লাগবে।
এর চেয়ে ভালো ব্যবস্থা হলো গাছের মতো একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করা। অনেক ছোট খাল প্রথমে একসঙ্গে মিশবে। তারপর সেগুলো বড় খালে গিয়ে পড়বে। বড় খালগুলো আবার একটি প্রধান নদীতে মিশবে। শেষ পর্যন্ত সেই প্রধান নদী সব পানি নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়ে যাবে।
গণিতের পরীক্ষক যখন কম্পিউটারবিজ্ঞানীরা দেখেন, যেসব নেটওয়ার্ক হ্যাকের সূত্রের কাছাকাছি থাকে, মানে যেখানে ঘাত প্রায় ০.৬, সেগুলো পানি সরানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে কম শক্তির অপচয় করে।
এতে কোনো কোনো পানির ফোঁটাকে হয়তো একটু বেশি পথ পাড়ি দিতে হবে, কিন্তু পুরো নেটওয়ার্কের জন্য শক্তি খরচ হবে কম। কারণ, অনেকগুলো ছোট নদী একটি বড় নদীর পথ ব্যবহার করতে পারে। বড় নদী যত বেশি লম্বা হয়, তত বেশি ছোট নদী এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। ফলে পুরো ব্যবস্থায় পানি সরানোর খরচ কমে যায়। আমাদের দেশের মেঘনা নদীর দিকে তাকালে বিষয়টি স্পষ্ট হয়।
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বিজ্ঞানীরা কম্পিউটারে নদীর বিভিন্ন নেটওয়ার্কের মডেল তৈরি করে বিষয়টি পরীক্ষা করেন। তাঁরা দেখেন, যেসব নেটওয়ার্ক হ্যাকের সূত্রের কাছাকাছি থাকে, মানে যেখানে ঘাত প্রায় ০.৬, সেগুলো পানি সরানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে কম শক্তির অপচয় করে।
একই সময়ে দুই রকম দূরত্ব পার হওয়ার অদ্ভুত প্যারাডক্সঅনেকগুলো ছোট নদী একটি বড় নদীর পথ ব্যবহার করতে পারে। বড় নদী যত বেশি লম্বা হয়, তত বেশি ছোট নদী এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। ফলে পুরো ব্যবস্থায় পানি সরানোর খরচ কমে যায়।
নদী কীভাবে নিজের পথ তৈরি করে
এখানে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়। নদী তো আর কোনো প্রকৌশলী নয় যে বসে বসে হিসাব করে সবচেয়ে কার্যকর নকশা বানাবে। তাহলে নদী এমন পথ তৈরি করে কীভাবে?
এর উত্তর খুঁজতে বিজ্ঞানীরা ভূদৃশ্য পরিবর্তনের কম্পিউটার মডেল তৈরি করেছেন। এই মডেলগুলোতে দেখা যায়, পানি প্রথমে মহাকর্ষের কারণে নিচের দিকে বয়ে যায়। চলার পথে পানি মাটি ও পাথর ক্ষয় করে। ভূমির কোথাও সামান্য উঁচু-নিচু বা ছোট কোনো অনিয়ম থাকলে কিছু জায়গায় অন্য জায়গার চেয়ে বেশি পানি জমে যায়।
নদী কোনো প্রকৌশলী নয় যে বসে বসে হিসাব করে সবচেয়ে কার্যকর নকশা বানাবে। তাহলে নদী এমন পথ তৈরি করে কীভাবে?যে খাতে বেশি পানি যায়, সেটি দ্রুত ক্ষয় হতে থাকে। ফলে খাতটি আরও গভীর হয়। আরও বেশি পানি তখন সেই খাতে প্রবেশ করে। এভাবে খাতটি আরও বড় হয় এবং পাশের কোনো খাতের পানি নিজের দিকে টেনে নিতে পারে। একসময় একটি খাত শক্তিশালী হয়ে ওঠে। পাশের খাতটি ছোট হয়ে যায় বা পুরোপুরি হারিয়ে যেতে পারে।
৯৯ বা ৯৯৯ দিয়ে গুণ করো চোখের পলকেচলার পথে পানি মাটি ও পাথর ক্ষয় করে। ভূমির কোথাও সামান্য উঁচু-নিচু বা ছোট কোনো অনিয়ম থাকলে কিছু জায়গায় অন্য জায়গার চেয়ে বেশি পানি জমে যায়।
এভাবে নদীর নেটওয়ার্ক ধীরে ধীরে বদলাতে থাকে। হাজার হাজার বছর ধরে চলতে থাকা এই ছোট ছোট পরিবর্তনের ফলেই নদী এমন পথ তৈরি করে, যেটি দিয়ে পানি তুলনামূলকভাবে সহজে নিচের দিকে যেতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় দুটি শক্তি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ—মহাকর্ষ ও ঘর্ষণ।
মহাকর্ষ পানিকে নিচের দিকে নামায়, আর পানির সঙ্গে মাটি ও পাথরের ঘর্ষণ ভূমিকে ক্ষয় করে। পানি যখন কোনো জায়গা দিয়ে বয়ে যায়, তখন এর স্রোত মাটি ও পাথর ক্ষয় করতে থাকে। কোনো একটি পথ যদি পানির জন্য ভালোভাবে পানি সরাতে না পারে, তাহলে সেখানে বেশি ক্ষয় হতে পারে। ধীরে ধীরে সেই পথের আকৃতি বদলে যায়। আবার যে পথ দিয়ে পানি সহজে ও কম বাধায় বয়ে যেতে পারে, সেটি বেশি স্থিতিশীল থাকে। ফলে সময়ের সঙ্গে নদী এমন পথই বেছে নেয়, যেটি দিয়ে পানি তুলনামূলক সহজে প্রবাহিত হতে পারে। তাই নদীর বর্তমান নকশা এক দিনে তৈরি হয়নি। অসংখ্য ছোট পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে নদী নিজের পথ তৈরি করেছে।
গণিত যেভাবে খাবারের মেনু ঠিক করে দেয়মহাকর্ষ পানিকে নিচের দিকে নামায়, আর পানির সঙ্গে মাটি ও পাথরের ঘর্ষণ ভূমিকে ক্ষয় করে। পানি যখন কোনো জায়গা দিয়ে বয়ে যায়, তখন এর স্রোত মাটি ও পাথর ক্ষয় করতে থাকে।
নদীর ব-দ্বীপেও একই গণিত!
নদীর গণিত নিয়ে গল্প এখানেই শেষ নয়। ২০২৬ সালের এপ্রিলে বিজ্ঞানীরা আরও একটি চমকপ্রদ তথ্য আবিষ্কার করেন। টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের (রিও গ্র্যান্ডে ভ্যালি) গবেষক তিয়ান ডং ও তাঁর সহকর্মীরা দেখান, হ্যাকের সূত্র শুধু নদীর শাখা-প্রশাখার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়; বরং নদীর ডেলটা বা ব-দ্বীপের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
ডেলটা কী, সেটা আমরা সবাই কমবেশি জানি। নদী যখন সমুদ্রে গিয়ে পড়ে, তখন এর গতি হঠাৎ কমে যায়। ফলে নদীর সঙ্গে বয়ে আসা মাটি ও পলি সেখানে জমতে শুরু করে। বছরের পর বছর, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পলি জমে নতুন ভূমি তৈরি হয়। এ সময় নদীর পানি এক জায়গায় না গিয়ে অনেকগুলো ছোট চ্যানেল বা শাখায় ভাগ হয়ে যায়। এগুলোকে বলা হয় ডিস্ট্রিবিউটারি চ্যানেল।
বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, ডেলটার একটি চ্যানেলের দৈর্ঘ্য এবং যে এলাকা থেকে সেটি পলি পায়, তাদের মধ্যেও প্রায় ০.৬ ঘাতের সম্পর্ক আছেপলি কখনো জমে, কখনো স্রোতে ধুয়ে যায়। ফলে এসব চ্যানেলের অবস্থানও বারবার বদলায়। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের ম্যাপের দিকে তাকালে মুহূর্তেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। বিশেষ করে সুন্দরবনের ভেতরে নদীর শাখাগুলো এর অনন্য উদাহরণ।
উজানের নদীর ক্ষেত্রে পানি বিভিন্ন জায়গা থেকে এসে একটি বড় নদীতে মিলিত হয়। কিন্তু ডেলটায় ঠিক উল্টো ঘটনা ঘটে। একটি বড় নদী অনেকগুলো ছোট চ্যানেলে ভাগ হয়ে যায়। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, ডেলটার একটি চ্যানেলের দৈর্ঘ্য এবং যে এলাকা থেকে সেটি পলি পায়, তাদের মধ্যেও প্রায় ০.৬ ঘাতের সম্পর্ক আছে। মানে নদীর উজান আর ডেলটা উভয়ই একেবারে বিপরীত ধরনের নেটওয়ার্ক হলেও এরা একই গাণিতিক নিয়ম মেনে চলে! কেন এমন হয়, বিজ্ঞানীরা এখনো তা পুরোপুরি জানেন না।
গণিতে আঠারো শতকের পুরস্কারের ইতিহাসএকটি বড় নদী অনেকগুলো ছোট চ্যানেলে ভাগ হয়ে যায়। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, ডেলটার একটি চ্যানেলের দৈর্ঘ্য এবং যে এলাকা থেকে সেটি পলি পায়, তাদের মধ্যেও প্রায় ০.৬ ঘাতের সম্পর্ক আছে।
বিশৃঙ্খলাতেও ছন্দ আছে!
নদীর প্রতি মানুষের ভালোবাসা তৈরি হওয়ার কারণ বুঝি এটাই। নদীকে দেখতে বিশৃঙ্খল মনে হয়। এর পথ বাঁক নেয়, শাখায় ভাগ হয়, আবার অন্য নদীর সঙ্গে মিশে যায়। কোথাও স্রোত দ্রুত হয়, কোথাও ধীরে। কোথাও নদী পথ বদলায়, কোথাও নতুন চ্যানেল তৈরি হয়। কিন্তু এই বিশৃঙ্খলার মধ্যেও একটি নির্দিষ্ট নিয়ম লুকিয়ে আছে।
লেখাটির শুরুতে সেই হ্যাকের নিয়মের কথা বলা হয়েছে। কোনো নদীর পানি নিষ্কাশন এলাকা যত বড় হবে, সেই নদীর দৈর্ঘ্যও তত বাড়বে। ছোট নদীর তুলনায় বড় নদীর অববাহিকা সাধারণত বেশি লম্বা ও সরু হবে। পৃথিবীর নানা প্রান্তের নদীর ক্ষেত্রেই এই একই ধরনের সম্পর্ক দেখা যায়। প্রকৃতি যেন কোনো অদৃশ্য গণিত মেনে নদীর পথ তৈরি করে! সেই গণিত পুরোপুরি নিখুঁত নয়। কারণ, প্রকৃতিতে সব সময়ই কিছু অনিশ্চয়তা ও এলোমেলো পরিবর্তন থাকে। তবু নদীর নেটওয়ার্কে আমরা এমন কিছু নিয়ম দেখি, যা পৃথিবীর নানা প্রান্তে বারবার দেখা যায়। নদীবিজ্ঞানী ক্রিস পাওলার মতে, প্রকৃতিতে আমরা বিশৃঙ্খলা আশা করি। কিন্তু নদীর মধ্যে সেই বিশৃঙ্খলার পাশাপাশি সুন্দর একটি শৃঙ্খলাও দেখা যায়। এটাই নদীর গাণিতিক সৌন্দর্য!
লেখক: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, কিশোর আলোসূত্র: কোয়ান্টা ম্যাগাজিন১১ সংখ্যার ম্যাজিক