ফুলবাড়ীর ‘কয়লা বিক্রি’ থামায়নি এশিয়া এনার্জি

· Prothom Alo

দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে কয়লা উত্তোলনের প্রক্রিয়া থেমে গেছে ২০০৬ সালে। তবে থামেনি এশিয়া এনার্জি; নাম বদলে জিসিএম রিসোর্সেস নামে তৎপরতা চালাচ্ছে। নিয়মিত ব্যবধানে কয়লা উত্তোলনের বিষয়ে অগ্রগতির দাবি করছে তারা। আর লন্ডন শেয়ারবাজারে চাঙা হচ্ছে তাদের শেয়ারের দাম। এভাবেই মাটির নিচে পড়ে থাকা ফুলবাড়ীর কয়লা ‘বিক্রি’ করে যাচ্ছে এশিয়া এনার্জি।

Visit h-doctor.club for more information.

জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, যুক্তরাজ্যভিত্তিক কোম্পানি জিসিএম রিসোর্সের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের এখন কোনো সম্পর্ক নেই। খনি উন্নয়নের কর্মপরিকল্পনা তারা জমা দিয়েছিল ২০০৫ সালে। এটি যাচাই করতে ২০০৬, ২০০৭ ও ২০১২ সালে আলাদা তিনটি কমিটি করেছিল তিন সরকার। তিনটি কমিটির প্রতিবেদনেই ফুলবাড়ী প্রকল্পের বিপক্ষে মতামত দেওয়া হয়।

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কয়লা কোম্পানি অস্ট্রেলিয়ার বিএইচপির সঙ্গে বাংলাদেশ সরকার দিনাজপুরে কয়লাসম্পদ অনুসন্ধানের লাইসেন্স-সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষর করে ১৯৯৪ সালের ২০ আগস্ট। ফুলবাড়ীতে সমৃদ্ধ কয়লাখনির অস্তিত্ব খুঁজে পায় তারা। কিন্তু ১৯৯৭ সালে এশিয়া এনার্জি নামে একটি কোম্পানির হাতে লাইসেন্স হস্তান্তর করে বাংলাদেশ ছেড়ে যায় বিএইচপি।

আনু মুহাম্মদ, অর্থনীতিবিদবিএনপি সরকারই আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কয়লা উত্তোলন না করার চুক্তি করেছিল। এখন কয়লা তোলার কথা বলে বিএনপি দায়িত্বহীনতা ও বিশ্বাস ভঙ্গের কাজ করেছে। এতে জ্বালানিসংকটের সমাধান হবে না।

জ্বালানি বিভাগের সূত্র বলছে, ফুলবাড়ী কয়লাখনি নিয়ে একটি সমীক্ষা ও কর্মপরিকল্পনার (কয়লা উত্তোলন) জন্য ২০০৪ সালের ২৮ জানুয়ারি জ্বালানি বিভাগের প্রতিষ্ঠান খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরোর (বিএমডি) কাছ থেকে দুই বছরের অনুমোদন (লাইসেন্স) পেয়েছিল এশিয়া এনার্জি। ওই অনুমোদনের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০০৬ সালের ২৭ জানুয়ারি। তবে এশিয়া এনার্জির ঢাকা কার্যালয়ের দুজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে দাবি করেন, তাঁরা প্রতিবছর লাইসেন্স ফি ও কার্যক্রমের প্রতিবেদন জমা দিচ্ছেন বিএমডির কাছে।

২০০৪ সালে অনুমোদন পাওয়ার পর উন্মুক্ত খনন পদ্ধতিতে ফুলবাড়ীতে কয়লা উত্তোলনের চেষ্টা করে এশিয়া এনার্জি। উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের ও কয়লা রপ্তানির বিরোধিতা করে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি আন্দোলন শুরু করে। ২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট ফুলবাড়ীতে খনি এলাকায় সমাবেশ ডাকা হয়। সমাবেশে তৎকালীন বিডিআরের (বর্তমানে বিজিবি) গুলিতে স্থানীয় তিন ব্যক্তি নিহত হন। আহত হন দুই শতাধিক।

এরপর পরিস্থিতি সামাল দিতে তেল-গ্যাস কমিটির সঙ্গে চুক্তি করে তৎকালীন সরকার। এ চুক্তির অন্যতম শর্ত ছিল এশিয়া এনার্জিকে দেশ থেকে বহিষ্কার ও তাদের বিচার, উন্মুক্ত খনন পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন না করা।

প্রতিবছর ২৬ আগস্ট ফুলবাড়ী দিবস পালিত হয়।

ফুলবাড়ীর সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্কের বিষয়ে জিসিএম রিসোর্সের বক্তব্য জানতে চাইলে এশিয়া এনার্জির ঢাকা কার্যালয় থেকে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, জিসিএম রিসোর্সেসের কোম্পানি এশিয়া এনার্জি ‘উত্তরাঞ্চলে কয়লা অনুসন্ধান ও উত্তোলন চুক্তি’র (১১ /সি-৯৪) আওতায় কাজ করছে। ২০০৪ সালে সরকারের দেওয়া মাইনিং লিজের শর্ত হিসেবে ২৪ মাসের মধ্যে সমীক্ষা করার মেয়াদ থাকলেও কোম্পানি ১৮ মাসে তা সম্পন্ন করে। সমীক্ষা সম্পন্নের এ মেয়াদকে চুক্তি বা লিজের মেয়াদের সঙ্গে সম্পর্কিত করায় বিভ্রান্তির অবকাশ থাকে।

ফুলবাড়ী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত নেতারা বলছেন, ফুলবাড়ী কয়লাখনি দেখিয়ে এশিয়া এনার্জি লন্ডনে শেয়ার ব্যবসা করছে প্রায় ২০ বছর ধরে। কোনো সরকারই এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি।

কয়লা তোলার নামে শেয়ারের দাম চাঙা

লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের তথ্য বলছে, লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের সহযোগী হিসেবে কাজ করা অলটারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট মার্কেটে (এআইএম) ২০০৪ সালে তালিকাভুক্ত হয় এশিয়া এনার্জি। ২০০৭ সালে নাম পরিবর্তন করে জিসিএম রিসোর্স করা হয়। লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে কোম্পানিটি তার সম্পদের মধ্যে ফুলবাড়ী কয়লাখনির তথ্য তুলে ধরছে। এ কোম্পানির সহযোগী হিসেবে এশিয়া এনার্জি বাংলাদেশ নামে ঢাকায় কাজ করে।

কয়েক বছর ধরে লন্ডনের শেয়ারবাজারে এশিয়া এনার্জির শেয়ারের মূল্য নিম্নমুখী ছিল। এরপর কৌশলগত অংশীদার হিসেবে পাওয়ার চায়নাকে যুক্ত করে তারা। ফুলবাড়ী কয়লাখনির মুখে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কথা বলে চীনের প্রতিষ্ঠান পাওয়ার চায়নার সঙ্গে ২০২০ সালে চুক্তি সই করেছে এশিয়া এনার্জি।

গত এক বছরে জিসিএমের শেয়ারের দর ২ দশমিক ৮৬ পেন্স থেকে ১৭ পেন্স উঠেছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে দাম ছিল দেড় পেন্স। অন্তর্বর্তী সরকার কয়লা উত্তোলন নিয়ে আলোচনা শুরুর পর এটি ধীরে ধীরে বেড়ে গত ফেব্রুয়ারিতে সোয়া ৮ পেন্স হয়।

তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সাবেক সদস্যসচিব অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ প্রথম আলোকে বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে ইতিবাচক ইঙ্গিত পেলেই তাদের (এশিয়া এনার্জি) শেয়ারের দর চাঙা হয়। এর সঙ্গে সরকারের লোক যুক্ত থাকতে পারে। বিএনপি সরকারই আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কয়লা উত্তোলন না করার চুক্তি করেছিল। এখন কয়লা তোলার কথা বলে বিএনপি দায়িত্বহীনতা ও বিশ্বাস ভঙ্গের কাজ করেছে। এতে জ্বালানিসংকটের সমাধান হবে না। বরং বৈশ্বিক প্রতারক কোম্পানি এশিয়া এনার্জির ব্যবসায় সহায়তা করা হবে। জনগণ এটা আবার প্রতিরোধ করবে।

Read full story at source