ইমরানের দুই ছেলের সাক্ষাৎকার ও ভীতসন্ত্রস্ত পাকিস্তানের ‘লাঞ্চ ব্রেক ভীতি’
· Prothom Alo

স্কাই স্পোর্টসে লর্ডস টেস্টের প্রথম দিনের লাঞ্চ ব্রেকে ইমরান খানের দুই ছেলের সাক্ষাৎকার প্রচার এবং এতে পাকিস্তানের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া নিয়ে লন্ডনভিত্তিক মিডল ইস্ট মনিটর-এ একটি কলাম লিখেছেন অধ্যাপক জুনায়েদ এস আহমেদ। প্রথম আলোর পাঠকদের জন্য সেটির বাংলা ভাষান্তর। জুনায়েদ এস আহমেদ আইন, ধর্ম ও বৈশ্বিক রাজনীতি বিষয়ে অধ্যাপনা করেন এবং পাকিস্তানের ইসলামাবাদে অবস্থিত ‘সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব ইসলাম অ্যান্ড ডিকলোনাইজেশনের’ (সিএসআইডি) পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি ‘ইন্টারন্যাশনাল মুভমেন্ট ফর আ জাস্ট ওয়ার্ল্ড’, ‘মুভমেন্ট ফর লিবারেশন ফ্রম নাকবা’ এবং ‘সেভিং হিউম্যানিটি অ্যান্ড প্লানেট আর্থ’-এর সদস্য।
কিছু সরকার নির্বাচনকে ভয় পায়। কেউ ভয় পায় বিক্ষোভকে। কেউ বিচারক, সাংবাদিক বা শিক্ষার্থীদের। পাকিস্তানের শাসকেরা অবশ্য রাজনৈতিক নিরাপত্তাহীনতার এমন এক চরম ও অদ্ভুত পর্যায়ে পৌঁছেছেন যে এখন ক্রিকেট ম্যাচের মধ্যাহ্নবিরতি দেখেও তাঁদের হাত-পা কাঁপতে শুরু করে। লর্ডসের মাঠে যে অদ্ভুত কাণ্ডটি ঘটল, তা এই তামাশার প্রায় নিখুঁত উদাহরণ!
Visit biznow.biz for more information.
দুই ছেলে তাঁদের ৭৩ বছর বয়সী বাবার শারীরিক অবস্থা নিয়ে কথা বলেছেন, আর সে কারণে আস্ত একটা টেস্ট ম্যাচ বয়কটের হুমকি দেওয়া হচ্ছে! একটি ‘শক্তিশালী ও স্থিতিশীল রাষ্ট্রের’ এর চেয়ে বড় বিজ্ঞাপন আর কী হতে পারে!
ইমরান খানের মুক্তির দাবি করে মিয়াঁদাদ কেঁদে বললেন, ইমরান সৎ মানুষরাষ্ট্রের ওই প্রতিক্রিয়াই সাক্ষাৎকারের চেয়ে বেশি কিছু বলে দিচ্ছে। পাকিস্তান সরকার নিজের কাজকর্ম নিয়ে আত্মবিশ্বাসী হলে জবাব দিত প্রমাণ দিয়ে—স্বাধীন চিকিৎসকদের মতামত, পরিবারের সঙ্গে বাধাহীন যোগাযোগ, আদালতের নির্দেশ মানার প্রমাণ ও স্বচ্ছ চিকিৎসা নথি দিয়ে।
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পিটিআইয়ের প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানকিন্তু তাদের ক্ষোভের লক্ষ্য হলো সম্প্রচারমাধ্যম। যে সম্প্রচারমাধ্যমে সাক্ষাৎকারটি দেওয়া হয়েছে, রাষ্ট্রযন্ত্রের পুরো ক্ষোভ গিয়ে পড়েছে সেই চ্যানেলের ওপর। তারা বোধ হয় ভুলে গেছে, যখন ক্ষমতা অভিযোগের চেয়ে মাইক্রোফোনকেই বেশি ভয় পায়, তখন সমস্যা মাইক্রোফোনে নয়।
রাজনীতিবিদেরা পতাকা নাড়িয়ে, মন্ত্রীদের বহর নিয়ে স্টেডিয়ামে ঢুকলে সেটা নাকি ‘জাতীয় ঐক্য’। আর ভুল প্রশ্ন তুলে ফেললেই সেটা হঠাৎ ‘অগ্রহণযোগ্য রাজনীতি’! আর খেলাধুলায় রাজনীতির এই ‘দূষণ’ নিয়ে যে পিসিবি প্রতিবাদ করছে, তার চেয়ারম্যানই আবার পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। রসিকতার দক্ষতা দেখলে বিস্ময় জাগে।
ইমরানের পাশে মঈনও, পাকিস্তানের ক্রিকেটারদের বললেন মুখ খুলতেআসল সমস্যাটা হলো, ক্রিকেট এমন এক মঞ্চ, যেখান থেকে ইমরান খানকে মুছে ফেলা অত সহজ নয়। সরকার হয়তো ভাষণ সম্প্রচার বন্ধ করতে পারে, গণমাধ্যমকে চাপ দিতে পারে, তাঁর নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া আটকাতে পারে, সামাজিক যোগাযোগমাশ্যমের গলা টিপে ধরতে পারে, মামলা দিয়ে রাজনীতিকে কবর দিতে পারে। কিন্তু রাজনীতিতে আসার বহু আগেই ইমরান খান পাকিস্তানের মানুষের মনে গেঁথে গেছেন। সরকার হয়তো প্রতিষ্ঠানগুলো কবজা করে বসে আছে, কিন্তু তারা মানুষের স্মৃতি কবজা করবে কী করে?
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে কারাবন্দী পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালের দিকে যাওয়ার সড়ক পাহারা দিচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা। তাঁদের পাশ দিয়ে একটি কারাগারের ভ্যান যাচ্ছে। ইসলামাবাদ, পাকিস্তান, ২০ আগস্ট ২০২৬১৯৯২ সালের বিশ্বকাপ তো সেন্সর করা যাবে না। ওই পুরোনো ভিডিও ফুটেজগুলোকে তো আর জেলে পোরা সম্ভব নয়। জেলখানার চার দেয়াল রাজনীতিবিদ ইমরান খানকে হয়তো আটকে রাখতে পারবে, কিন্তু ক্রিকেটার ইমরান খানকে নয়। ঠিক এ কারণেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বিশিষ্ট তারকাদের উদ্বেগ এতটা গুরুত্ব পাচ্ছে। তাঁরা ইমরানের রাজনৈতিক দলের হয়ে প্রচার করছেন না; তাঁরা শুধু জানতে চাইছেন, এই খেয়াল-খুশির দুনিয়ায় খেলার ইতিহাসের অন্যতম সেরা একজন মানুষ কি ন্যূনতম মানবিক আচরণ পাচ্ছেন?
ইমরান খানকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে মুখ খুললেন ওয়াসিম–ওয়াকার–শোয়েবঅথচ পাকিস্তানের ভেতরের দৃশ্যটা দেখুন—কী অদ্ভুত নীরবতা! বাইরের দেশের প্রতিদ্বন্দ্বীরা যখন মুখ খুলছেন, তখন ইমরানের একসময়ের সতীর্থরা হঠাৎ ভীষণ আত্মসচেতন হয়ে উঠেছেন। একসময় যাঁরা ভীষণ দ্রুতগতির বোলিংয়ের সামনে সাহস দেখাতেন, তাঁরা এখন তাঁদের সাবেক অধিনায়ক উপযুক্ত চিকিৎসা পাচ্ছেন কি না, এই প্রশ্ন তুলতে দ্বিধায় ভোগেন! তাঁদের হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে, কোনো গতিদানবের প্রাণঘাতী স্পেল সামলানো বোধ হয় রাষ্ট্রযন্ত্রের অসন্তোষের মুখোমুখি হওয়ার চেয়ে অনেক সহজ ছিল।
পাকিস্তানের কারাবন্দী সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দুই ছেলে সুলাইমান খান ও কাসিম খান। লন্ডন, যুক্তরাজ্য। ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬হয়তো পেশাগত ক্ষতির ভয় কাজ করছে অনেকের মনে। কেউ হয়তো আরামদায়ক অবসর, ধারাভাষ্যের চুক্তি বা বোর্ডের পদই বেছে নিচ্ছেন। কারণ যা–ই হোক, এই বৈপরীত্য বড়ই নির্মম ও কুৎসিত। বাইরের প্রতিদ্বন্দ্বীরা যখন সত্য বলছেন, পুরোনো সহযোদ্ধারা তখন নীরবে হিসাব মেলাচ্ছেন। অথচ মানবিক আচরণের দাবি তোলা কোনো বিদ্রোহ নয়; এটি স্রেফ ন্যূনতম সৌজন্যের পরীক্ষা।
পাকিস্তান সরকার অবশ্য গুরুতর অভিযোগগুলো উড়িয়ে দিয়ে এসেছে বারবার। দাবি করছে যে ইমরান খান যথাযথ চিকিৎসা, আইনি সুবিধা ও পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পাচ্ছেন। বেশ তো, তবে সেটা প্রমাণ করে দিন। অভিযোগ যদি মিথ্যাই হয়, তবে স্বাধীন তদন্ত ও নজরদারি তো উল্টো সরকারের জন্যই ভালো। জেলখানার পরিবেশ যদি এতই চমৎকার হয়, তবে স্বাধীন চিকিৎসকদের দিয়ে তা নিশ্চিত করা হোক। আদালতের নির্দেশ মানা হলে তার প্রমাণ প্রকাশ করুন।
সাক্ষাৎকারটি যদি নিভৃতে শেষ হতে দেওয়া হতো, তবে বৃষ্টির বিরতির মধ্যে আর দশটা ক্লিপের মতোই হয়তো এটি হারিয়ে যেত। কিন্তু পিসিবি অভিযোগ তুলতেই এবং পাকিস্তানের মাঠে না ফেরার সম্ভাবনার খবর বেরোতেই গল্পটি সাক্ষাৎকারের চেয়েও বড় হয়ে গেল। তখন প্রশ্নটা আর কাসিম আর সুলাইমান কী বললেন, তাতে আটকে রইল না। দুনিয়ার মানুষ প্রশ্ন তুলতে শুরু করল, কী এমন সত্য, যা সাধারণ মানুষের কানে পৌঁছাবে বলে রাষ্ট্র এত ভয় পাচ্ছে?
সংবাদ সম্মেলনে কথা বলছেন কারাবন্দী সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের ব্যক্তিগত চিকিৎসক ফয়সাল সুলতান ও ইমরান খানের বোনেরা। ইসলামাবাদ, পাকিস্তান। ২১ আগস্ট ২০২৬এটা আসলে কৌশলগত বোকামি। কয়েক দশক ধরে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী ক্রিকেটকে ব্যবহার করেছে নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার হাতিয়ার হিসেবে। এখন সেই ক্রিকেটই তাদের ভেতরের কঙ্কালটা উন্মোচিত করে দিচ্ছে। ঘরের মাঠে রাষ্ট্র ইমরান খানকে যত চেপে ধরতে চাইছে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তিনি তত উজ্জ্বল হয়ে ফিরে আসছেন—কখনো তাঁর ছেলেদের মুখে, কখনো পুরোনো মাঠের প্রতিদ্বন্দ্বীদের কণ্ঠে, কখনো পুরোনো দিনের ভিডিওতে, আবার কখনো সাধারণ মানুষের স্মৃতিতে।
ক্ষমতা দিয়ে মন্ত্রণালয়, পুলিশ, জেলখানা, সেন্সর বোর্ড আর ক্রিকেট বোর্ড চালানো যায়। কিন্তু মানুষের মনের ভেতরের কথাগুলো তো আটকে রাখা যায় না।
পাকিস্তান যেন ইমরানকে মুছে ফেলতে না পারে, সে জন্যই ওই চিঠি—মাইকেল আথারটনলর্ডস ঠিক এই সত্যটাই সবার চোখের সামনে তুলে ধরেছে। মধ্যাহ্নভোজের বিরতিতে দুজন ছেলে কথা বললেন। একটি টিভি চ্যানেল সেটি সম্প্রচার করল। আর আস্ত এক রাষ্ট্রের পুরো ক্ষমতার চাবি যাঁদের হাতে, তাঁরা নাকি সেই এক সাক্ষাৎকারে এতই ভীত হয়ে পড়লেন যে একটা টেস্ট ম্যাচকে রাজনৈতিক সংকটে পরিণত করতে উদ্যত হলেন!
এটা আসলে কোনো শক্তির প্রদর্শন নয়। এটি কর্তৃত্বের মুখোশ পরা এক চরম ভঙ্গুরতার উদাহরণ।
তিন বছর ধরে কারাগারে বন্দী পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানপাকিস্তানের শাসকেরা একটা আলোচনা বন্ধ করতে চেয়েছিলেন। আর সেটা করতে গিয়ে তাঁরা নিজেদের বুকের ভেতর চেপে রাখা ভয়ের বিজ্ঞাপন বানিয়ে বসলেন! যে ব্যবস্থা দাবি করে তারা সবকিছুর নিয়ন্তা, সেই পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র দুজন সন্তান, একজন সাংবাদিক আর একটি মাইক্রোফোনের সামনে এমন কেঁপে উঠল!
ফলে তারা কী আড়াল করতে চাচ্ছে, সেটা এখন আর আসল কেলেঙ্কারি নয়। আসল কেলেঙ্কারি হলো, নিজেদের সেই ভীতি আড়াল করার এতটুকু শক্তিও আজ আর তাদের হাতে অবশিষ্ট নেই।
ইমরানের জন্য আবারও সরব সাবেক অধিনায়করা, প্রধানমন্ত্রীর কাছে এবার ২১ জনের চিঠি