মানসকন্যা

· Prothom Alo

শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত নির্জন কক্ষে দেয়ালঘড়ির টিক টিক শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। নিমীলিত চোখে লাবনের মনে হলো, তার হৃৎস্পন্দন যেন ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে। অথচ কয়েক দিন আগে কার্ডিওলজিস্ট রিপোর্টগুলো হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে ছিলেন। কাগজের পাতাগুলো বারবার উল্টে দেখছিলেন, যেন কোথাও কোনো অদৃশ্য উত্তর খুঁজছেন। তারপর ভ্রু কুঁচকে শুধু বলেছিলেন, হার্টে তেমন সমস্যা নেই, অন্য কিছু পরীক্ষা করাতে হবে।
দিন দিন শরীরে নতুন উপসর্গ টের পেয়ে লাবনের মনোবল প্রায় ভেঙে পড়েছে। শরীরের কোথাও সামান্য নিশপিশ করলেই দুশ্চিন্তা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। চুন খাওয়া বিড়াল যেমন দইয়ের পেয়ালা দেখলে ভয় পায়, লাবনের ক্ষেত্রে তেমনই হয়েছে।

Visit mchezo.co.za for more information.

নির্জন কেবিনে নিজের হৃৎস্পন্দনের মৃদু ধাক্কায় শরীরের সামান্য নড়াচড়াও স্পষ্ট টের পাচ্ছে সে। কাচুমাচু ভঙ্গিতে উঠে মাথার পাশে রাখা ছোট্ট তাক থেকে ঢকঢক করে এক গ্লাস পানি খেল। পা মুড়িয়ে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসতে চাইল, কিন্তু অস্থিরতায় ধপাস করে শুয়ে পড়ল।
পাশ ফিরে কুঁজো হয়ে ভাবুকতার রেখা টেনে মনে মনে বলল, প্রাইভেট হাসপাতালের এই এক সুবিধা; যা-ই হোক, অন্তত কোলাহলমুক্ত সেবাটা পাওয়া যায়। এলোমেলো ভাবনায় নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করে সে।
টেবিলের ড্রয়ারে ভাঁজ করে রাখা রিপোর্টটির দিকে লাবন তাকাতে চায় না; যেন কাগজের পাতাগুলো খুললেই জীবনের কোনো কঠিন সত্য বেরিয়ে আসবে। হাঁসফাঁস করতে করতে আচমকাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল সে; কিন্তু চোখের কোণ দিয়ে শূন্যর দিকে ভেসে আসা অজানা ভীতি এখনো দূর হয়নি।

হাসপাতালের বাঁধা নিয়ম অনুযায়ী কেবিনে রোগীর তদারকিতে একজনের বেশি থাকা যায় না। দুয়েকজন থাকতে পারলে অন্তত লাবনের মনের ভার কিছুটা কমত। কিন্তু তার পাশে কেউ থাকা না–থাকা সমান। চুপটি মেরে শুয়ে থাকা ছাড়া মুখের কুলুপ খুলতে চায় না। এমনিতেই অতিরিক্ত কথা বলতে গেলে পেটে-পিঠে টান খায় তার।

লাবন শৈশব থেকেই নরম প্রকৃতির মানুষ। এবার অসুখে পড়ার পর থেকে একেবারে গলে গিয়ে ডালের মতো নরম হয়ে আছে। বিছানায় শুলে চাদরের মতো লেপটে থাকে সারাক্ষণ। দিন দিন শক্তি আর ওজন কমে যাচ্ছে তার। মুখের রুচিহীনতা যেন গলায় কষের মতো জমে থাকে। পানি ছাড়া অন্য কোনো খাবার গলা দিয়ে নামতে চায় না।
ডাক্তারের দামি ওষুধেও কাজ হচ্ছে না। দুশ্চিন্তায় শরীর ভেঙে পড়েছে; পেটে একঢোঁক পানি গেলেও ব্যথায় কাতর হয়ে গুনগুনিয়ে ওঠে।
এত দিন লাবনের মনে হতো, অল্প প্রাণ নিয়ে জন্মানোর ফলেই হয়তো তার মৃত্যু হবে। বাস্তবে রেলের বগির মতো মানুষ সে, সামান্য হেরফের হলেই লাইনচ্যুত হয়ে যায়। অতর্কিতে ভালো-মন্দ কিছু শুনলে চোখেমুখে ঘোর লাগে, হৃদয় ধড়ফড়িয়ে ওঠে।
কিন্তু এখন ঘটেছে তার উল্টো; শরীর তার ধীরে ধীরে দূষিত কোষের দখলে চলে যাচ্ছে। সুঠাম দেহের নিয়ন্ত্রণ যে একদিন অদৃশ্য প্রাণখেকোর হাতে চলে যাবে, তা সে ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি।
হাসপাতালের বারান্দায় একটু নড়াচড়া করলেই লাবনের মনে হয়, তাকে কেউ দেখতে আসছে। নার্সদের হাঁটাচলাও নিশ্চুপে ঠাহর করার চেষ্টা করে সে। কিন্তু ঘুমজড়ানো চোখে উঁকি দিয়ে দেখতে ইচ্ছা করে না।

এভাবে হাঁসফাঁস করতে করতে আচমকাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে লাবন।
ঘুমের গভীর রাজ্যে হঠাৎ যেন সুখীর মুখ ভেসে ওঠে। চোখ জোড়ায় নরম আলো নিয়ে সে এসে দাঁড়ায় মাথার পাশে।
সুখীকে দেখেও ভাবলেশহীনের মতো হয়ে থাকে লাবন। যেচে কোনো কথা বলে না। সুখী মাথার পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে কপালে হাত রেখে বলে উঠল, ‘লাবু, শরীর কেমন আছে এখন?’
—এই তো, ভালো। কখন এসেছ তুমি?
—একটু আগে এলাম।
—তবে ভালোই হয়েছে। বোসো না! তুমি দাঁড়িয়ে আছ যে?
—সমস্যা হবে না। তুমি চোখ বুজে আছ তো বেশ। আমি ধীরেসুস্থে বসব।
—তা হয় নাকি? প্রতিদিন তুমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমার জন্য খেটে মরবে?
—তোমার জন্য কই খাটছি? একটু সময় নিয়ে দেখতে আসা, খোঁজখবর রাখা, এগুলোকে খাটনি বলে?
লাবন কিছুক্ষণ সুখীর কোমল মুখের দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তারপর নিচুস্বরে বলল,
‘সুখী, তুমি সময়ে-অসময়ে আসো, দিনরাত এক করে আমার পাশে থাকো। এসব করতে গিয়ে তোমার নিশ্চয়ই কষ্ট হচ্ছে। বাড়িতে কেউ কিছু বলবে না তো?’
—সে বিষয়ে আপাতত কিছু বলতে চাচ্ছি না। তুমি এত অদ্ভুত প্রশ্ন কোথা থেকে পাও, বল তো!
—না, এমনি জানতে চাচ্ছি। আজকাল তোমাকেও কেমন যেন ক্লান্ত দেখায়।
লাবন একটু থেমে আবার বলল, ‘অসুখ হয়েছে আমার, অথচ পরিবর্তনটা যেন তোমার শরীরেই বেশি ফুটে উঠছে। এটা কি বিস্ময়কর নয়?’

দুজনই একবার মোলায়েম হাসি হাসল। শুয়ে শুয়ে কথা বলা তেমন সুবিধাজনক নয় বলে লাবন শিয়রে বালিশ ঠেকিয়ে আধশোয়া হয়ে বসল। তারপর কোমল অনুরোধে বলল, ‘তুমি একটু বোসো না, সুখী। হাসপাতালের মাসিকে ডেকে ছোট কেবিনটা পাশাপাশি করে দিতে বলি। আমার পাশে একটু বিশ্রাম নাও। এ কয়েক দিনে তোমার চোখ জোড়া কেমন যেন মলিন হয়ে গেছে। কী মায়া মায়া চোখ ছিল তোমার! এখন চেহারার দিকে তাকালে সবার আগে চোখ দুটোই ধরা পড়ে। আজকাল আমাকে নিয়ে একটু বেশিই ভাবছ, তা–ই না?’
কিছু একটা বলতে গিয়ে ঢোঁক গিলে ফেলল সুখী। একটু থেমে ধীরে বলল, ‘তোমাকে নিয়ে এত ভাবার কিছুই তো নেই। তুমি কটা দিন পর সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরবে। ডাক্তার তো বললেন, তেমন কিছু হয়নি। শরীরে জটিল কোনো সমস্যা নেই।’
লাবন অনিচ্ছাকৃত হাসল। বলল, ‘ক্যানসার বুঝি কোনো রোগ না? নাকি এতেও কারও খায়েশ মিটছে না?’
এত তির্যক কথা বলার পরও সুখীর গায়ে লাগল না। অন্য সময় হলে সে-ও ছাড় দিত না। মনে মনে ভাবল, অসুখে পড়লে মানুষের আচরণ ছেলেমানুষি হয়ে যায়।

সুখীর স্বভাবেও ইদানীং একধরনের রাশভারী গাম্ভীর্য এসেছে। সময়ের আঘাতে তার সব আহ্লাদি ভাব কোথায় যেন উবে গেছে। লাবনের সামনে নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করলেও ভেতরটা তার পুড়ে ছাই হয়ে আছে।
চেহারা আর শরীরের পরিবর্তনেই তা স্পষ্ট বোঝা যায়। চোখের গভীরে জমে থাকা ক্লান্তি সব বলে দেয়। তবু সে লাবনকে অভয় দিয়ে যাচ্ছে সর্বক্ষণ।
লাবন ইশারায় একজন মাসিকে ডাকে। মাসি ছোট কেবিনটা পাশাপাশি করে দেয়। লাবন বলল,
‘মাসি, একটু ফাঁকা রেখেই সেটআপ করে দিন। এ যে লজ্জাবতী লতা, আমার ছোঁয়া লাগলে মিইয়ে যাবে মাটির সঙ্গে।’
লাবণের কথাটা উপহাস নাকি দুষ্টুমি, তালাশ করে দেখার প্রয়োজন মনে করে না সুখী। সে পাশের কেবিনে উঠে পা মুড়িয়ে বসেছে, লাবনের মাথার সোজাসুজি হয়ে। দুজনের মধ্যে কথা চলে প্রাসঙ্গিক-অপ্রাসঙ্গিক। বান ডাকা কথা বলতে বলতে লাবন হাঁপিয়ে ওঠে।
—অনেকক্ষণ তো বসে আছ, সুখী। এবার নাহয় একটু শোও। ঘুম হলো সবচেয়ে বড় বিশ্রাম, বুঝলে সুখী? না ঘুমিয়ে তো আমি নানান রোগ বাধিয়েছি শরীরে।
লাবনের ছেলেমিতে নিশ্চুপ সম্মতি দিয়ে যাচ্ছে সুখী।
লাবন মিহি সুরে আবার বলে উঠল, ‘মাঝখানে একটু দূরত্ব রেখে হলেও শোও। আমার ডান হাতটায় ক্যানুলা নেই; একটু শক্ত করে ধরে রাখলে আমি কিছুটা অভয় পেতাম।’
—শুধু আজ কেন? হাত তো চিরদিনের জন্য ধরব। আজ নাহয় শুভদিনের খেলাপ না করি?
—সুখী, তুমি কি পারবে এত বড় সিদ্ধান্ত নিতে?
—এটা কেমন বড় সিদ্ধান্ত আবার? সমুদ্রে পেতেছি শয্যা, শিশিরে কী ভয়? সুস্থ থাকতে খুব তো বলেছিলে, নিজ হাতে বাবুই পাখির মতো একটা ছোট্ট সংসার গড়বে, আর সেখানে থাকব আমরা। নির্জন দ্বীপের ঠিক মাঝখানে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা তালগাছটার মতো হয়ে। আমাদের ছোট্ট সংসারে শত ঝঞ্ঝা, বৈরী পরিবেশে টিকে থাকব আমরা। কালবৈশাখী ঝড়ের কবলে পড়লেও গাছের মতো দুলব শুধু; ভেঙে পড়ব না।
—এসব রূপকথা, নাকি তোমার মনের অমিত বাসনা? যদি সত্য হয়ে থাকে, আমার পাশে বসো তো একটিবার।

আসমানীদের ঘর

সুখী বিড়বিড়িয়ে, অভিমানী সুরে কিছু বলতে চাইল। তারপর মায়াবী চাহনি বিলিয়ে ধীরে বলল,
‘লাবন, প্রতিদিনই তো তোমার পাশে বসি। বসি না?’
সুখীর বুঝতে আর বাকি রইল না, লাবনের মাথা ধরেছে। চোখে–মুখে শিশিরবিন্দুর মতো ঘাম জমতে শুরু করেছে।
অনুনয়ের সুরে সুখী বলল, ‘অনেক হয়েছে। এবার একটু চুপ করো তো। ওহ্ হ্যাঁ! তোমার খালিপেটের ওষুধগুলো খাবে না? বেলা যে গড়িয়ে যাচ্ছে। ওষুধের বাক্সটা কই? আমাকে দেখিয়ে দাও তো…’
লাবন ধীরস্বরে বলল, ‘তাকের মাঝখানের ড্রয়ারে রাখা আছে সব ওষুধ।’
সুখী ড্রয়ার খুলে ওষুধগুলো বের করল। তারপর গ্লাসভর্তি পানি এনে লাবনের হাতে দিল।
লাবন কয়েক ঢোঁক পানি খেল। একটু চুপ থেকে, ভাবুক ছেলের মতো বলল, ‘তোমাকে একটা কথা বলব?’
আকুল আগ্রহে সুখী বলে উঠল, ‘বলো।’
লাবন দুষ্টুমিভরা চোখে তাকিয়ে বলল, ‘তোমার হাতগুলোর চেয়ে গতকালের নার্সের হাতগুলো বেশি সুন্দর।’
সুখী মুখ টিপে ওড়নার আড়ালে একগাল হাসল। হাসলে মেয়েটিকে বড় সুন্দর দেখায়। লাবন চেয়ে থাকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে। সুখী মৃদু ঠাট্টার সুরে বলল, ‘হাসপাতালে থাকতে থাকতে ওদের সঙ্গে ভাব জমে ক্ষীর হয়ে আছে বুঝি? আচ্ছা, সমস্যা নেই বাবা, সুস্থ হয়ে একটাকে জীবনসঙ্গী বানিয়ে বাড়িতে নিয়ে যেয়ো। লাবন, এবার আমি উঠি? চারদিকে মিশমিশে অন্ধকার নেমে এসেছে। আমি বাড়িতে ফাঁকি দিয়ে এসেছি, বিশেষ করে একটা সুখবর দিতে।
লাবন কথার মাঝেই বলে উঠল, ‘সুখবর বলতে?’
—আমাদের বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।
লাবনের চোখে হালকা কৌতুকের ঝিলিক ফুটল। সে বলল, ‘আমাদের বলতে… মাহিনের সঙ্গে তোমার?’
সুখী মুচকি হেসে মাথা নাড়ল।
—তুমি অসুস্থ অবস্থায়ও দুষ্টুমি ছাড়তে পারছ না দেখে ভালোই লাগছে। আমাদের বলতে লাবন আর সুখীর বিয়ে ঠিক হয়েছে।
লাবনের ভেতরটা হঠাৎ উল্লাসে ভরে উঠল, অথচ চোখে ফুটে উঠল একধরনের কাতরতা। সে ধীরে বলল, ‘ওহ্, তাই? আমি ভাবছিলাম, মেয়ের বাবা কেমন মানুষ! মৃত্যুপথযাত্রীর হাতে তার রাজকন্যাকে নিরাসক্তের মতো তুলে দিচ্ছে।’
সুখী মুখটা একটু বাঁকিয়ে বলল, ‘কে বলেছে তুমি রোগী? শিগগিরই সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরবে।’
লাবন নিচুস্বরে বলল, ‘কোন বাড়ি… সেটা একটু স্পষ্ট করে বলো।’
সুখী হালকা বিরক্ত হয়ে বলল, ‘তুমি সব সময় এমন আশাহত মানুষের মতো কথা বলো কেন? তোমার আশপাশের মানুষের মনও ভেঙে দাও। চাইলেই কি আমরা ভালো কিছু ভাবতে পারি না? মানুষের সবকিছু তো মনকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। মনে মনে বলো তো, তুমি ষোলো আনা একজন মানুষ।’
লাবন মৃদু হাসল, ‘আমি ষোলো আনা, না অচল আধুলি, তা তো আমাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে।’
—বেশি বকছ কিন্তু! শুধু শুধু মুরব্বিপনা করছ। এত পাকা কথা সব সময় মানায় না।

অপরূপা সুখী তার কোমল হাতটা লাবনের মুখে বুলিয়ে দিয়ে বিদায় নিতে উদ্যত হলো। ঠিক তখনই লাবন যেন হঠাৎ ব্যস্ত হয়ে বলে উঠল, ‘আমাকে বিয়ে তো করবে, তাই না?’
একটু থেমে আবার বলল, ‘যদি সত্যিই তা হয়, তাহলে শোনো, ডাক্তার যেমন আমার রোগের ওপর প্রেসক্রিপশন লিখতে লিখতে কাগজ ভরিয়ে ফেলেছে, তোমরাও যেন দেনাপাওনার হিসাব লিখতে লিখতে বিয়েটাকে সমাজ-রোগের প্রেসক্রিপশন বানিয়ে না ফেলো। সবকিছু সহজ রেখো। জীবন যেমন সহজ, জন্ম-মৃত্যু যেমন অবধারিত, তেমনি জীবনের অনুষঙ্গগুলোও সাবলীল হওয়া উচিত।’
সুখী শান্ত স্বরে বলল, ‘তোমার এসব নিয়ে ভাবার দরকার নেই। আমি একাই সব গুছিয়ে নিয়েছি। বিয়ের পিঁড়িতে বসে তুমি শুধু কবুল বলতে পারবে না?’
লাবন মনে মনে ভাবল, এমন লক্ষ্মীর মতো মেয়ে আর দ্বিতীয়টা হয় না। নিজের তির্যক কথার ওজন বুঝতে পেরে মুখে কিছুটা দরদ ঢেলে বলতে চেষ্টা করল, ‘সুখী, আমার কটু কথায় মনের কোথাও মেঘ জমতে দিয়ো না। প্রিয়জন কত প্রিয়-অপ্রিয় বকবে, তাতে কান দিলে চলবে না।’
একটু থেমে আবার বলল, ‘আমার মনে হয়, কদিন পর মরণকোষ আমার গলা চিবিয়ে খাবে। তাই বেশি বলে যাচ্ছি। দিন শেষে মানুষের কী থাকে জানো? স্মৃতি, শুধুই স্মৃতি।
‘অল্প স্মৃতির মুহূর্তের দৈর্ঘ্য হয় পুরো জীবনের সমান। যে সুজন গলায় তোমাকে নমনীয় নামে ডাকছি, তা যদি তুমি শুনতে না পাও, তবে তোমার কী যে হবে, আমি ভেবে কূলকিনারা পাচ্ছি না।’
সুখী নিশ্চুপ শান্ত লক্ষ্মীটির মতো দাঁড়িয়ে রইল। চোখ জোড়ায় তাকালে লক্ষ করা যায়, অশ্রুবিন্দু জমে আছে, ঝরে পড়ার অপেক্ষায়।
লাবন একটু থেমে, কলের পুতুলের মতো সুড়সুড় করে বলে চলল, ‘তবে তোমার বেশি সমস্যা হওয়ার কথাও নয়। কারণ, তোমার নামের সঙ্গে যে সুখ লেগে আছে জন্মদাগের মতো। সুখ কিন্তু তোমার পিছু ছাড়বে না। কখনো হৃদাকাশে মেঘ জমলে, দুঃখ এলে, সুখের শব্দে অনুবাদ করে নিয়ো।’
সুখী নিবৃত কণ্ঠে বলে উঠল, ‘লাবন, তোমার কোনো কথা আমি আর শোনার আগ্রহ প্রকাশ করছি না। যেখানে আমার জীবন শুরু হয়েছে ভাঙন দিয়ে, সেখানে আলতো প্রলেপে কাজ হবে না। ভাঙা-গড়াতেই মানুষ; ভাঙনই জীবনের অংশ। আমাকে নিয়ে ভেবো না তুমি, বরং তোমাকে নিয়েই প্রতিনিয়ত ভাবছি আমি।’
—আমাকে নিয়েও ভাবার কিছু নেই। আমি আঁধার খুঁজে নিয়েছি; আলোতে আমার ভয় হয়। অন্ধকারই সঙ্গী, বেদনার মতো রং তার।
নাক সিঁটিয়ে সুখী বলল, ‘তোমার মুখের অশুভ কথায় ছাই পড়ুক!’
এ কথা বলে বাঁ হাতে নাড়া দিয়ে পা বাড়াল সুখী।

দুশ্চিন্তার কারণে লাবনের ঘুম হয় না, আবার কসরত করে চোখে ঘুম ডেকে আনলে আর ছাড়ে না।
গভীর ঘুম ভেঙে হঠাৎ লাবন চোখ খুললে দেখতে পেল দুজন নার্সকে, হাতে নাড়া দিয়ে ডাকছে।
দুঃস্বপ্ন ভেঙে গেলে ঢুলু ঢুলু চোখে নার্সদের মুখের ওপর তাকাল একবার, মুহূর্তে তার মানসপুত্রী কোথায় যেন মিলিয়ে গেল স্মৃতি থেকে।
একজন নার্স মৃদু, মিহি সুরে বলল, ‘আপনার বাঁ হাত সোজা করুন, প্লিজ।’
লাবন পাতলা কম্বলের আড়াল থেকে হাত বের করে সোজা করে রাখল।
হাতের ক্যানুলায় নিয়মমাফিক ইনজেকশন দিতে এসেছে তারা।
প্রথম দিকের মুমূর্ষু অবস্থা কেটে গেলেও, ওষুধে লাবনের মাথা ধরে, ঘুমের ঘোরে আজেবাজে বকে, নানা রকম স্বপ্নের জালে আটকা পড়ে পথহারা বুনো প্রাণীর মতো।

শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

Read full story at source