ভূমিধস কী, কেন, কীভাবে

· Prothom Alo

সম্প্রতি নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে কয়েক শ মানুষ নিহত হয়েছেন। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন অনেক মানুষ। আশঙ্কা করা হচ্ছে, মৃত ব্যক্তির সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

নেপালের লেন্দে খোলা নদীতে হঠাৎ যে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছিল, তার পেছনে ছিল পাহাড়ধসের ঘটনা। পাহাড় থেকে নেমে আসা বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর, মাটি ও ধ্বংসাবশেষ নদীর গতিপথ আটকে দেয়। এতে নদীর পানি আটকে গিয়ে দ্রুত বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে পানির প্রবল চাপে সেই বাধা ভেঙে যায়। তখন বরফ, পাথর, মাটি ও পানির বিশাল স্রোত একসঙ্গে ছুটে যায় নিচের দিকে। ভাসিয়ে নিয়ে যায় পথের গ্রামের পর গ্রাম, ঘরবাড়ি ও নানা স্থাপনা।

Visit xsportfeed.quest for more information.

এমন দুর্ঘটনার পেছনে দায়ী ভূমিধস আসলে কী? কেনই–বা পাহাড়ের মাটি, পাথর ও বরফ হঠাৎ নিচের দিকে নেমে আসে?

নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু, তবু ক্লাসরুমে ফিরতে ভয় পাচ্ছে ফিলিস্তিনি শিশুরা

ভূমিধস কী?

পাহাড় বা ঢালের মাটি, পাথর, শিলা, কাদা কিংবা অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ যখন অভিকর্ষের টানে ঢাল বেয়ে নিচের দিকে নেমে আসে, তখন একে সাধারণভাবে ভূমিধস বা ল্যান্ডস্লাইড বলা হয়। ভূমিধসের গতি খুব ধীর হতে পারে, আবার কখনো তা মুহূর্তের মধ্যে ভয়াবহ গতিতে নিচে নেমে আসতে পারে।

পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধস বেশি দেখা যায়। কারণ, সেখানে মাটি ও পাথর সাধারণত ঢালের ওপর অবস্থান করে। কোনো কারণে সেই ঢাল দুর্বল হয়ে গেলে কিংবা মাটি বা পাথরের ওজন ধরে রাখার ক্ষমতা কমে গেলে সেগুলো নিচের দিকে সরে যেতে পারে।

ভূমিধস কেন হয়?

ভূমিধসের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অভিকর্ষ বল। পাহাড়ের ঢালে থাকা মাটি ও পাথরকে সাধারণত বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তি আটকে রাখে। কিন্তু কোনো কারণে সেই ভারসাম্য নষ্ট হলে অভিকর্ষের টানে সেগুলো নিচের দিকে নামতে শুরু করে।

ভারসাম্য নষ্টের একটি বড় কারণ অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত। প্রচুর বৃষ্টি হলে পানি মাটির ভেতরে ঢুকে পড়ে। এতে মাটি ভারী ও দুর্বল হয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে মাটির কণার মধ্যে থাকা ঘর্ষণ কমে যায়। ফলে ঢাল আগের মতো মাটি ও পাথরকে ধরে রাখতে পারে না। তখন ভূমিধসের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

ভূমিকম্পও ভূমিধসের বড় কারণ। শক্তিশালী ভূমিকম্পের সময় পাহাড় ও ঢালের মাটি-পাথর কেঁপে ওঠে। এতে আগে থেকেই দুর্বল থাকা ঢাল ভেঙে নিচে নেমে যেতে পারে।

এ ছাড়া হিমবাহ গলে যাওয়া, পাহাড়ের ভেতরে ফাটল তৈরি হওয়া, নদী বা বৃষ্টির পানিতে মাটি ক্ষয় হওয়ার কারণেও ভূমিধস হতে পারে।

ক্লাউডবার্স্ট কী, এই বিরল আবহাওয়ার ঘটনাটি কতটা বিপজ্জনক

ভূমিধসের প্রধান কারণ

অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত

ভূমিকম্প

হিমবাহ গলে যাওয়া

পাহাড়ের মাটি ও পাথরে ফাটল তৈরি হওয়া

ভূমিক্ষয়

আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত

পাহাড় কেটে রাস্তা বা বসতি তৈরি

গাছপালা নির্বিচার কেটে ফেলা

খনন ও বিস্ফোরণের মতো মানবিক কর্মকাণ্ড

মানুষের কাজে বাড়ছে ভূমিধস

ভূমিধসের সব কারণ প্রাকৃতিক নয়। মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডও এর ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

পাহাড়ের ঢালে থাকা গাছের শিকড় মাটিকে শক্ত করে ধরে রাখে। ফলে বৃষ্টির পানিতে মাটি সহজে সরে যেতে পারে না। কিন্তু নির্বিচার গাছ কেটে ফেললে মাটি ধরে রাখার এই প্রাকৃতিক ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে যায়। ফলে ভারী বৃষ্টি হলে ভূমিধসের আশঙ্কা বেড়ে যায়।

বসতি, রাস্তা বা অন্যান্য স্থাপনা তৈরির জন্য পাহাড় কেটে ফেললেও একই সমস্যা তৈরি হতে পারে। পাহাড়ের স্বাভাবিক ঢাল পরিবর্তিত হলে সেটি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। খনির কাজের সময় বিস্ফোরণ ও অতিরিক্ত মাটি কাটাও ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও কিছু পাহাড়ি অঞ্চলে ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। তাপমাত্রা বাড়ার ফলে হিমবাহ গলে বেশি পানি তৈরি হতে পারে। সেই পানি পাহাড়ি ঢালকে দুর্বল করে ভূমিধসের আশঙ্কা বাড়াতে পারে।

লোকালয়ে ভালুকের উপদ্রব ঠেকানোর জাপানি উপায়

ভূমিধসের ধরন

সব ভূমিধস একইভাবে ঘটে না। কীভাবে মাটি, পাথর বা অন্যান্য উপাদান নিচে নামছে, তার ওপর ভিত্তি করে ভূমিধসের বিভিন্ন ধরন রয়েছে।

রোটেশনাল স্লাইড

এ ধরনের ভূমিধসে মাটি বা শিলার একটি অংশ বাঁকা বা বক্রপথে নিচে নামে। ভূমির ওপর অনেকটা চামচের মতো অবতল আকৃতির গর্ত তৈরি হতে পারে। এ কারণে একে রোটেশনাল বা ঘূর্ণনশীল ভূমিধস বলা হয়।

ট্রান্সলেশনাল স্লাইড

এ ক্ষেত্রে মাটি বা পাথরের একটি বড় অংশ তুলনামূলক সমতল কোনো দুর্বল স্তর বা ফাটলের ওপর দিয়ে নিচের দিকে সরে যায়। বড় আকারের ধ্বংসযজ্ঞ ঘটাতে পারে এ ধরনের ভূমিধস।

ব্লক স্লাইড

এ ধরনের ভূমিধসে বড় বড় শিলা বা মাটির খণ্ড আলাদা হয়ে প্রায় অক্ষত অবস্থায় ঢাল বেয়ে নিচে নেমে আসে।

টপল

পাহাড় বা খাড়া ঢালের কোনো শিলা বা অংশ সামনের দিকে হেলে গিয়ে নিচে পড়ে গেলে তাকে টপল বলা হয়।

আর্থ ফ্লো

পানিতে ভিজে মাটি যখন নরম হয়ে অনেকটা তরলের মতো নিচের দিকে প্রবাহিত হয়, তাকে আর্থ ফ্লো বলা হয়। এটি দেখতে অনেকটা বালুঘড়ি থেকে বালু পড়ে যাওয়ার মতো হতে পারে।

ল্যাটারাল স্প্রেড

মাটির নিচের দুর্বল স্তর ভেঙে গেলে ওপরের মাটি ও শিলা পাশের দিকে ছড়িয়ে যেতে পারে। ভূমিকম্পের সময় এ ধরনের ভূমি সঞ্চালন দেখা যায়।

ডেব্রিস অ্যাভালাঞ্চ

পাথর, মাটি, কাদা ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ খুব দ্রুত পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে নেমে এলে তাকে ডেব্রিস অ্যাভালাঞ্চ বলা হয়। এর গতি ও ধ্বংসক্ষমতা বেশি হতে পারে।

ক্রিপ

ভূমির ওপরের মাটি খুব ধীরে ধীরে ঢাল বরাবর নিচে সরে গেলে তাকে বলে ক্রিপ। এটি এত ধীরগতির হতে পারে যে কয়েক বছর না গেলে এর পরিবর্তন চোখেই পড়ে না।

সাপের ভ্রূণ কেন সব সময় ডান দিকে কুণ্ডলী পাকায়

পানির নিচেও হয় ভূমিধস

ভূমিধস মানেই শুধু পাহাড় থেকে মাটি-পাথর পড়ে যাওয়া নয়। নদী, হ্রদ কিংবা সমুদ্রের তলদেশেও ভূমিধস হতে পারে।

সমুদ্রের তলদেশে বড় ধরনের ভূমিধস হলে বিপুল পরিমাণ পানি হঠাৎ সরে যেতে পারে। এর ফলে সুনামি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

১৯৫৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কার লিটুয়া বে এলাকায় এমন একটি ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছিল। পাহাড়ের বিশাল অংশ উপসাগরের পানিতে গিয়ে পড়ার পর সেখানে একটি অস্বাভাবিক বড় ঢেউ তৈরি হয়। ঢেউটি পাহাড়ের ঢাল বেয়ে প্রায় ৫২৪ মিটার বা ১ হাজার ৭২০ ফুট পর্যন্ত উঠে গিয়েছিল। এটিকে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নথিভুক্ত ‘মেগা-সুনামি’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ভূমিধস কত দ্রুত হতে পারে?

ভূমিধসের গতি সব সময় এক রকম নয়। কিছু ভূমিধস এত ধীরে ঘটে যে বছরে মাত্র কয়েক সেন্টিমিটার বা কয়েক মিটার করে মাটি সরে যায়। আবার কিছু ভূমিধস খুব দ্রুত নেমে আসে। বিশেষ ধরনের শিলা, মাটি ও ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে ছুটতে পারে।

তাই পাহাড়ে ভূমিধস শুরু হলে মানুষকে নিরাপদ জায়গায় সরে যাওয়ার জন্য খুব বেশি সময় না–ও পাওয়া যেতে পারে।

লাহার কি ভূমিধস?

‘লাহার’ শব্দটি অনেক সময় ভূমিধসের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়। আসলে লাহার হলো আগ্নেয়গিরির ছাই, মাটি, পাথর ও পানির তৈরি একধরনের দ্রুতগতির কাদামাটির স্রোত। আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের সময় কিংবা আগ্নেয়গিরির বরফ ও তুষার গলে গেলে এমন স্রোত তৈরি হতে পারে।

লাহার দেখতে অনেকটা নদীর মতো হলেও এর মধ্যে প্রচুর কাদা, ছাই ও পাথর থাকে। তাই এটি পথে থাকা ঘরবাড়ি ও স্থাপনার জন্য ভয়াবহ ক্ষতি করতে পারে।

জানো কি

ভূমিধস নিয়ে গবেষণা করা হয় ভূ-আকৃতিবিজ্ঞান বা জিওমর্ফোলজিতে। পৃথিবীর পাহাড়ি অঞ্চলগুলোর মধ্যে হিমালয়ও ভূমিধসপ্রবণ একটি এলাকা। এখানে খাড়া পাহাড়, ভারী বৃষ্টিপাত, ভূমিকম্প এবং তুষার ও হিমবাহের নানা পরিবর্তনের কারণে ভূমিধসের ঝুঁকি রয়েছে।

বরফ ও তুষারের বিশাল অংশ পাহাড়ের ঢাল বেয়ে দ্রুত নিচে নেমে এলে তাকে সাধারণত অ্যাভালাঞ্চ বা তুষারধস বলা হয়। এটি সাধারণ ভূমিধসের চেয়ে কিছুটা আলাদা ঘটনা।

১৯৮০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মাউন্ট সেন্ট হেলেন্স আগ্নেয়গিরিতে অগ্ন্যুৎপাতের সময় পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। প্রায় ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ঘনমিটার শিলা ও ধ্বংসাবশেষ পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে নেমে গিয়েছিল।

তবে ভূমিধসের কারণে প্রাণহানির সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাগুলোর অনেকগুলোই ভূমিকম্পের সঙ্গে সম্পর্কিত। ১৯২০ সালে চীনের হাইইউয়ান অঞ্চলে শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর ব্যাপক ভূমিধস হয়। এতে বিপুলসংখ্যক মানুষ মারা যায়। এ দুর্যোগে মৃত ব্যক্তির সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় ভিন্ন ভিন্ন হিসাব পাওয়া যায়।

ভূমিধস ঠেকাতে কী করা যায়?

প্রাকৃতিকভাবে তৈরি সব ভূমিধস ঠেকানো সম্ভব নয়। তবে ঝুঁকি কমানো যায়। পাহাড়ের গাছপালা রক্ষা করা তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। গাছের শিকড় মাটিকে ধরে রাখে এবং অতিরিক্ত মাটি ক্ষয় কমাতে সাহায্য করে।

পাহাড় না কাটা, ঝুঁকিপূর্ণ ঢালে বসতি না গড়া, পানিনিষ্কাশনের ব্যবস্থা ঠিক রাখা এবং অতিবৃষ্টির সময় পাহাড়ি এলাকায় সতর্ক থাকা, এসবও ভূমিধসের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। পাহাড়ের ঢাল কখন দুর্বল হয়ে পড়ছে, কোথায় বৃষ্টি বেশি হচ্ছে কিংবা কোথায় ভূমিধসের ঝুঁকি বেশি, এসব বিষয়ে আগে থেকে জানা গেলে অনেক প্রাণ বাঁচানো সম্ভব।

সিগালের খাবার চুরি, ব্রিটেনে বছরে ক্ষতি ১৭১ মিলিয়ন পাউন্ড

Read full story at source