চাকরির আশায় কম্বোডিয়া গিয়ে ‘স্ক্যাম সেন্টারে’ বন্দী ছিলেন ১৭ দিন, জানালেন দুঃসহ অভিজ্ঞতা

· Prothom Alo

কম্পিউটারে ডেটা এন্ট্রির চাকরির আশায় দালালের মাধ্যমে কম্বোডিয়ায় গিয়েছিলেন মো. শফিকুল ইসলাম; কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর তাঁর পাসপোর্ট ও মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া হয়। অনলাইনে প্রতারণার কাজে রাজি না হওয়ায় তাঁকে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। পরে ৩ হাজার ২০০ ডলার দেওয়ার পর মুক্তি পান বলে দাবি করেছেন ৩০ বছর বয়সী এই যুবক।

Visit saltysenoritaaz.org for more information.

শফিকুলের ভাষ্য, কম্বোডিয়ায় ২২ দিনের দুঃসহ অভিজ্ঞতার পর তিনি দেশে ফিরেছেন। সে দেশে তাঁকে একটি ‘স্ক্যাম সেন্টারে’ (প্রতারণাকেন্দ্র) ১৭ দিন বন্দী রাখা হয়েছিল। সেখানে নিয়মিত মারধর ও বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার পাশাপাশি পর্যাপ্ত খাবার দেওয়া হতো না। তাঁকে বিক্রির চেষ্টাও করা হয়েছিল।

রাজধানীর মিরপুরে স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে শফিকুলের সংসার। প্রায় আট বছর ধরে তিনি অগ্নিনির্বাপণসামগ্রীর ব্যবসা করতেন। ফেসবুকে মো. মাসুদ মিয়া নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয়ের পর বিদেশে চাকরির প্রস্তাব পান। একপর্যায়ে কম্পিউটারে ডেটা এন্ট্রির কাজের কথা বলে তাঁকে কম্বোডিয়ায় পাঠানো হয়।

শফিকুলের পাসপোর্ট, ভ্রমণসংক্রান্ত নথি ও আর্থিক লেনদেনের কিছু তথ্য এই প্রতিবেদক দেখেছেন। তবে কম্বোডিয়ায় তাঁকে আটকে রাখা, নির্যাতন করা এবং বিক্রির চেষ্টার বর্ণনা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

ছোট হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের বড় শ্রমবাজার, নতুন বাজারের নামে প্রতারণা

সাড়ে ৪ লাখ টাকার চুক্তি

শফিকুল বলেন, কম্বোডিয়ায় যাওয়ার আগে তিনি কম্পিউটারের প্রাথমিক কাজ শেখেন। গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর ২০০ টাকার স্ট্যাম্পে মাসুদের সঙ্গে তাঁর সাড়ে চার লাখ টাকার চুক্তি হয়। ঢাকার প্রবাসীকল্যাণ ভবনে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তিন দিনের প্রশিক্ষণ নিয়ে ছাড়পত্র বা স্মার্টকার্ডও পান তিনি। প্রথমে গত ১৬ অক্টোবর তাঁর ফ্লাইট হওয়ার কথা থাকলেও পরে তা পরিবর্তন করে ২৬ অক্টোবর করা হয়।

ঢাকায় বিমানবন্দরে যাওয়ার পর ইমিগ্রেশন পুলিশ শফিকুলকে আটকে দেয়। প্রবাসী ডেস্ক থেকে স্মার্টকার্ড যাচাই করে আসতে বলা হয়। শফিকুল বলেন, ‘প্রবাসী ডেস্কের একজন কর্মী সবার কার্ড স্ক্যান করে যাচাই করছিলেন। আমার পাসপোর্ট দেওয়ার পর নাম দেখে যাচাই ছাড়াই ছেড়ে দেন। এরপর আবার ইমিগ্রেশনে গেলে অনুমতি দেয় পুলিশ।’

তবে কম্বোডিয়া পৌঁছার পর শফিকুলকে আটকে দেয় দেশটির ইমিগ্রেশন। পাসপোর্ট জব্দ করে রাখে পুলিশ। তখন তিনি নমপেন বিমানবন্দর থেকে কম্বোডিয়ায় অবস্থানরত মাসুদের সহযোগী মোস্তফা মুকুল নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেন। কিছুক্ষণ পর সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্য শফিকুলের ফোনের বার্তাগুলো দেখেন। পরে তাঁর এমপ্লয়মেন্ট ভিসা পরিবর্তন করে ভ্রমণ ভিসা দেওয়া হয় বলে শফিকুলের দাবি। এরপর তাঁকে বিমানবন্দর থেকে বের করে দেওয়া হয়।

শফিকুলের ভাষ্য, কম্বোডিয়ায় ২২ দিনের দুঃসহ অভিজ্ঞতার পর তিনি দেশে ফিরেছেন। সে দেশে তাঁকে একটি ‘স্ক্যাম সেন্টারে’ (প্রতারণাকেন্দ্র) ১৭ দিন বন্দী রাখা হয়েছিল। সেখানে নিয়মিত মারধর ও বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার পাশাপাশি পর্যাপ্ত খাবার দেওয়া হতো না। তাঁকে বিক্রির চেষ্টাও করা হয়েছিল।

‘কলিং’ ও ‘চ্যাটিং’ প্রতারণা

নমপেন বিমানবন্দরের বাইরে অপেক্ষা করছিলেন মুকুলের সহযোগী আরিফ। তাঁর সঙ্গে একটি অটোরিকশায় করে ৪০ মিনিট পর শফিকুল পৌঁছান একটি আবাসিক ভবনে। এর মধ্যেই ৮০০ মার্কিন ডলার নিয়ে নেন আরিফ। পৌঁছাতে রাত হয়ে যায়। কিছু খাবার খেতে দেয়। বলা হয়, একটু পর সাক্ষাৎকার (ইন্টারভিউ) হবে। হঠাৎ করে রাত একটার দিকে শফিকুলের সঙ্গে আরও একজনকে তোলা হয় গাড়িতে। ২৭ অক্টোবর সকাল আটটার দিকে থাইল্যান্ড সীমান্তের কাছে একটি কমপ্লেক্সে পৌঁছান তাঁরা। সীমানাপ্রাচীর দেওয়া চত্বরের ভেতরে ছয়তলা তিনটি ভবন। তাঁদের দুজনের জায়গা হয় একটি ভবনের তৃতীয় তলায়। কাজ করার জায়গা একই ভবনের পঞ্চম তলায়।

শফিকুলের ভাষায়, পুরো চত্বর ছিল অনেকটা কারাগারের মতো। বের হওয়ার উপায় নেই। চারপাশে নিরাপত্তা প্রহরী। মুঠোফোন ও পাসপোর্ট নিয়ে নেওয়া হয়। চীনা ভাষায় লেখা একটি কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে রাখে। এরপর হিন্দি ও ইংরেজি দুই ভাষায় দুটি স্ক্রিপ্ট দেয়। এগুলো মুখস্থ করতে বলা হয়। এভাবে এক দিন পার করেন তাঁরা। ২৮ অক্টোবর থেকে শুরু হয় কাজ। দায়িত্ব পড়ে ‘কলিং রুমে’।

শফিকুল বলেন, নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করেছেন; কিন্তু কোনো ক্ষতিপূরণ পাননি, কোনো বিচার পাননি। সরকারের সহায়তা চান শফিকুল।

শফিকুল বলেন, এটি মূলত ‘স্ক্যাম সেন্টার’। চীনা মালিক, চালান পাকিস্তানিরা। এখানে দুটি বিভাগ। একটি কলিং ও আরেকটি চ্যাটিং। কলিংয়ের ক্ষেত্রে চারটি ভাগ আছে। প্রথম লাইনের কাজ হলো দিনে তালিকা ধরে ৫০০ নম্বরে ফোন করে নাম, ঠিকানা যাচাই করা। এরা মূলত টার্গেট করে ভারতীয়দের। প্রাথমিক তথ্য নেওয়ার পর এটি চলে যায় দ্বিতীয় লাইনে। এরা ফোন করে আধার কার্ড (ভারতীয় নাগরিক কার্ড) যাচাই করে। এসব তথ্য পাওয়ার পর তৃতীয় লাইনে থাকে থানা। পুলিশ সেজে ভিডিও কল করে, পুরো কক্ষ থানার আদলে সাজানো হয়। এক বা দুজনকে হাতকড়া পরিয়ে আসামি বানিয়ে পেছনে রাখা হয়। চলে হুমকি। এরপর চতুর্থ ধাপে থাকে ব্যাংকের আদলে সাজানো কক্ষ। একই গ্রাহককে ফোন করে পুলিশের বরাত দিয়ে জরিমানা চাওয়া হয়। নেওয়া হয় আরও কিছু তথ্য, চাওয়া হয় পিন নম্বর। এর মধ্যেই ব্যাংক হিসাব হ্যাক করে হাতিয়ে নেওয়া হয় সব অর্থ। চার ধাপে এভাবেই চলে প্রতারণা।

চ্যাটিং রুমের কাজ আবার আলাদা। এরা মূলত বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে (ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ডেটিং অ্যাপ) মেয়েদের নামে বানানো প্রোফাইল চালায়। রাত ১১টা থেকে পরদিন বেলা ১১টা পর্যন্ত কাজ করে এই গ্রুপ। এরা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের টার্গেট করে প্রেমের ফাঁদে ফেলে। চ্যাট করতে করতে একপর্যায়ে অডিও কলে কথা বলে। ছেলেরা কথা বললেও সফটওয়্যারের মাধ্যমে অপর প্রান্তে যায় নারীর কণ্ঠ। এতে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হয়। এভাবে ধীরে ধীরে তথ্য নিতে থাকে, আর হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে ওই মার্কিন নাগরিকদের টাকা বাগিয়ে নেয়।

শফিকুল বলেন, এটি মূলত ‘স্ক্যাম সেন্টার’। চীনা মালিক, চালান পাকিস্তানিরা। এখানে দুটি বিভাগ। একটি কলিং ও আরেকটি চ্যাটিং। কলিংয়ের ক্ষেত্রে চারটি ভাগ আছে।

২২ দিন পর মুক্তি

শফিকুল জানান, ২৮ অক্টোবর কলিং রুমের দ্বিতীয় ধাপের কাজে তিনি ও ইশতিয়াক রাব্বী নামের আরেকজন যোগ দেন। সেন্টারে অধিকাংশ পাকিস্তানি কাজ করেন। কিছু বাংলাদেশি ও ভারতীয় আছেন। দুই দিন পর কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁদের দুজনকে হাতকড়া পরিয়ে বন্দী করা হয়। ওই দিন রাতেই ইন্টারভিউ হয়, বিক্রি হয়ে যান রাব্বী। আর তাঁর ওপর শুরু হয় নির্যাতন।

শফিকুল বলেন, বৈদ্যুতিক শক, মারধর চলে। বারবার বিক্রির চেষ্টা করেও পারেনি। হঠাৎ ১৬ নভেম্বর ছেড়ে দিয়ে একটি গাড়িতে তুলে দেয়। ওই গাড়ি সিয়েম রিয়েপ নিয়ে নির্জন এক জায়গায় নামিয়ে দেয়। পাসপোর্ট আর মুঠোফোন ফেরত দেয়। গাড়ির চালককে অনুরোধ করার পর তিনি একটি বাসস্ট্যান্ডে নিয়ে কম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেনের টিকিট করে দেন।

সেন্টারে অধিকাংশ পাকিস্তানি কাজ করেন। কিছু বাংলাদেশি ও ভারতীয় আছেন। দুই দিন পর কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁদের দুজনকে হাতকড়া পরিয়ে বন্দী করা হয়। ওই দিন রাতেই ইন্টারভিউ হয়, বিক্রি হয়ে যান রাব্বী। আর তাঁর ওপর শুরু হয় নির্যাতন।

ফোনে দেশে কথা হয় শফিকুলের। জানতে পারেন, কম্বোডিয়ার বাংলাদেশি কমিউনিটির কাছে সহায়তা চেয়েছেন তাঁর ছোট ভাই। তাঁরাই ৩ হাজার ২০০ ডলার পরিশোধ করে স্ক্যাম সেন্টার থেকে ছাড়ানোর ব্যবস্থা করেছেন। নমপেনে পৌঁছানোর পর কমিউনিটির এক প্রতিনিধির বাসায় ওঠেন। দুই দিন সেখানে থাকার পর দেশ থেকে টিকিট করা হলে ১৮ নভেম্বর দেশে ফেরেন শূন্য হাতে।

দেশে ফিরে দালাল মাসুদের সঙ্গে কথা হয় শফিকুলের। বিক্রির কথা জানতেন না বলে দাবি করেন মাসুদ। ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথাও বলেন। এর পর থেকে মাসুদের আর খোঁজ নেই। অফিসও বন্ধ। মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। শফিকুল বলেন, নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করেছেন; কিন্তু কোনো ক্ষতিপূরণ পাননি, কোনো বিচার পাননি। সরকারের সহায়তা চান শফিকুল।

Read full story at source