বিকেলে ঘুম থেকে উঠলেই বিষণ্ণ লাগে কেন
· Prothom Alo

দুপুরে ভরপেট খাওয়ার পর চোখটা যখন একটু একটু করে জুড়িয়ে আসে, তখন মনে হয় ১০-১৫ মিনিট বিছানায় গা এলিয়ে দিলে ক্ষতি কী! কিন্তু আসল বিপত্তিটা বাধে ঘুম ভাঙার পর। মনে হয় মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছে, কোনো কিছুতে মন বসতে চায় না। মেজাজটা অকারণে খিটখিটে হয়ে থাকে, শরীর ম্যাজম্যাজ করে। কারো কারো হয়তো মনে হয়, আশেপাশের কাউকে ধরে দু-ঘা বসিয়ে দিই। কিন্তু এমন তো হওয়ার কথা ছিল না! একটুখানি ঘুম তো শরীর ও মস্তিষ্ককে একদম রিচার্জ করে ফুরফুরে করে দেওয়ার কথা। তাহলে মেজাজ এমন বিগড়ে গেল কেন?
Visit biznow.biz for more information.
এই অদ্ভুত কিন্তু অত্যন্ত পরিচিত সমস্যার পেছনের বিজ্ঞান চমৎকারভাবে খোলসা করেছেন স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির স্লিপ মেডিসিন বিভাগের ক্লিনিক্যাল প্রফেসর রাফায়েল পেলায়ো। মার্কিন পত্রিকা ওয়াশিংটন পোস্ট-এ প্রকাশিত তাঁর এক বিশ্লেষণ থেকে জানা যায়, দুপুরে ঘুম থেকে উঠে আপনার মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়ার পেছনে মূলত দুটি কারণ থাকতে পারে—হয় আপনার ঘুমটা বড্ড কম হয়েছে, নয়তো আপনি এত লম্বা ঘুম দিয়েছেন যে একেবারে গভীর ঘুমের অতল গহ্বর থেকে আপনাকে জোর করে টেনে তুলতে হয়েছে! চলুন, ড. পেলায়োর কাছ থেকেই জেনে নিই এর আসল রহস্য।ড. পেলায়ো বলছেন, যদি দিনে বা রাতে যেকোনো সময় ঘুম থেকে ওঠার পরই আপনার মেজাজ এমন খিটখিটে থাকে, তবে বুঝতে হবে আপনি আসলে মারাত্মক ঘুমহীনতায় ভুগছেন।
শিশুদের পর্যাপ্ত ঘুম কেন দরকারড. পেলায়ো বলছেন, যদি দিনে বা রাতে যেকোনো সময় ঘুম থেকে ওঠার পরই আপনার মেজাজ এমন খিটখিটে থাকে, তবে বুঝতে হবে আপনি আসলে মারাত্মক ঘুমহীনতায় ভুগছেন।
আমাদের রাতের ঘুম মূলত দুই ভাগে বিভক্ত—র্যাপিড আই মুভমেন্ট বা স্বপ্নের স্তর এবং নন-র্যাপিড আই মুভমেন্ট বা স্বপ্নহীন স্তর। এই স্বপ্নহীন স্তরটি আবার হালকা, মাঝারি ও গভীর ঘুমে বিভক্ত। সাধারণত আমরা যখন চোখ বুজি, তখন জেগে থাকা অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে হালকা ঘুম পেরিয়ে ননরেম (NREM) স্তরে প্রবেশ করি। এরপর প্রায় এক থেকে দুই ঘণ্টা পার হওয়ার পর আমাদের প্রথম রেম (REM) বা স্বপ্নের ঘুম শুরু হয়।
ড. পেলায়োর মতে, আপনি যদি দুপুরে দেড় ঘণ্টার বেশি ঘুমিয়ে পড়েন, তাহলে ঘুম ভাঙার পর আপনার মেজাজ খিটখিটে হতে বাধ্য। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে স্লিপ ইনারশিয়া। ব্যাপারটা হলো, আপনার শরীর তখন ননরেম স্তরের একেবারে গভীর ঘুমে তলিয়ে ছিল। সেখান থেকে হঠাৎ কেউ আপনাকে টেনে তুললে শরীর সেটা কিছুতেই মেনে নিতে চায় না। শরীর চায় আরও কিছুক্ষণ ওই আরামের ঘুমের রাজ্যে পড়ে থাকতে। এই অবস্থাকে অনেক সময় স্লিপ ড্রাঙ্কেননেস বা ঘুমের ঘোরে মাতাল হয়ে থাকাও বলা হয়। তখন শরীর ব্যথা করে, মাথা কাজ করে না এবং নিজেকে খুব বিভ্রান্ত মনে হয়।
এখন প্রশ্ন হলো, এই সমস্যা কি শুধু দুপুরে ঘুমালেই হয়, নাকি রাতে ঘুম থেকে ওঠার পরও আপনার একই রকম লাগে? ড. পেলায়ো বলছেন, যদি দিনে বা রাতে যেকোনো সময় ঘুম থেকে ওঠার পরই আপনার মেজাজ এমন খিটখিটে থাকে, তবে বুঝতে হবে আপনি আসলে মারাত্মক ঘুমহীনতায় ভুগছেন। এর আরেক নাম স্লিপ ডিপ্রাইভেশন।
৪৫ মিনিটের ঘুম মস্তিষ্কের শেখার ক্ষমতা বাড়ায়ড. পেলায়োর মতে, আপনি যদি দুপুরে দেড় ঘণ্টার বেশি ঘুমিয়ে পড়েন, তাহলে ঘুম ভাঙার পর আপনার মেজাজ খিটখিটে হতে বাধ্য। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে স্লিপ ইনারশিয়া।
ঘুম কম হলে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই খিটখিটে ও অমনোযোগী হয়ে পড়ে। এর সমাধান হলো আপনার ঘুমের পরিমাণ এবং ঘুমের মান বাড়ানো। আপনি নিশ্চয়ই জানেন, অতিরিক্ত চা-কফি পান, অ্যালকোহল, রাতে শুয়ে শুয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইল টেপা, খুব গরম বা অতিরিক্ত ঠান্ডা ঘর কিংবা অমসৃণ বিছানা—এসবই আপনার ঘুমের বারোটা বাজানোর জন্য যথেষ্ট।
কিন্তু একটা বিষয় আমরা প্রায়ই এড়িয়ে যাই—ঘুমাতে যাওয়ার সময় আপনার মানসিক অবস্থা কেমন থাকে? আপনি কি বিছানায় যাওয়ার কথা ভাবলেই বিরক্ত হন? নাকি সকালের সুন্দর কোনো পরিকল্পনার জন্য উত্তেজনা নিয়ে অপেক্ষা করেন? এই মানসিক চাপগুলো আপনার ঘুমের গুণগত মানের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। এরপরও যদি ঘুম থেকে ওঠার পর আপনার মাথা ভার হয়ে থাকে আর কাজে মন না বসে, তবে বুঝতে হবে স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো কোনো স্বাস্থ্যগত সমস্যা হয়তো উঁকি দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
রাতে টিভি দেখলে কি ঘুম কমে যায়দুপুরের ঘুমের জন্য সবচেয়ে আদর্শ সময় হলো দুপুরের খাবারের ঠিক পর পর। কারণ এ সময় আমাদের শরীরের জৈবিক ঘড়ির কারণে এমনিতেই একটু ঝিমুনি আসে।
পারফেক্ট ঘুমের সিক্রেট রেসিপি
দুপুরের এই ছোট ঘুমটাকে ড. পেলায়ো বিকালের হালকা নাশতার সঙ্গে তুলনা করেছেন। একেকজনের খিদে একেক রকম। নাশতা যদি খুব কম হয়, তবে আপনার পেট ভরবে না, খিদেই থেকে যাবে। আবার যদি একগাদা চপ-সিঙাড়া খেয়ে পেট ভরিয়ে ফেলেন, তবে রাতের আসল খাবারটার প্রতি আর কোনো আগ্রহই থাকবে না এবং অস্বস্তি লাগবে। দুপুরের ঘুমটাও ঠিক তেমনই—বেশিও নয়, কমও নয়, একদম মাপে মাপে!
ড. পেলায়োর মতে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য দুপুরের এই ঘুম হওয়া উচিত ২০ থেকে ৪০ মিনিটের। এটাই হলো মস্তিষ্ককে রিচার্জ করার জন্য একদম পারফেক্ট সময়। এর চেয়ে বেশি ঘুমালে তা রাতের ঘুমের দফারফা করে ছাড়বে। তাই নিশ্চিন্তে ঘুমাতে চাইলে অ্যালার্ম দিয়ে রাখাটাই সবচেয়ে নিরাপদ। দুপুরের ঘুমের জন্য সবচেয়ে আদর্শ সময় হলো দুপুরের খাবারের ঠিক পর পর। কারণ এ সময় আমাদের শরীরের জৈবিক ঘড়ির কারণে এমনিতেই একটু ঝিমুনি আসে।
অর্থকষ্টে কেন মানুষের ঘুম আসে না, বিজ্ঞান কী বলেড. পেলায়োর মতে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য দুপুরের এই ঘুম হওয়া উচিত ২০ থেকে ৪০ মিনিটের। এটাই হলো মস্তিষ্ককে রিচার্জ করার জন্য একদম পারফেক্ট সময়।
আবার অনেকেই আছেন যারা কফি ন্যাপ বা ন্যাপুচিনো নামে এক অদ্ভুত টোটকায় দারুণ বিশ্বাস করেন। এদের কাজ হলো, ঘুমাতে যাওয়ার ঠিক আগে এক মগ কফি পেটে চালান করে দেওয়া, যাতে কফির ক্যাফেইন কাজ শুরু করার আগেই ঘুমিয়ে পড়া যায় এবং ২০ মিনিট পর চোখ খুললেই একদম চাঙ্গা লাগে! তবে মুশকিল হলো, কফি খাওয়ার ঠিক পরের মিনিটেই যদি আপনার ঘুম না আসে, তবে এই ফর্মুলা একেবারে মাঠে মারা যাবে।
সবচেয়ে ভালো হয় যদি আপনি রাতে যে ঘরে ঘুমান, দুপুরের ঘুমটাও সেই একই ঘরে, অন্ধকার পরিবেশে বা আই-মাস্ক পরে ঘুমাতে পারেন। এতে শরীরের মধ্যে একটি ইতিবাচক সংকেত যায় যে, এটি আপনার চেনা জায়গা এবং এখন আপনাকে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে হবে। তাই একটু নিয়ম মেনে ঘুমিয়ে দেখুন, ঘুম ভাঙার পর আর মেজাজ খিটখিটে লাগবে না।
সূত্র: দ্য ওয়াশিংটন পোস্টঘুম নিয়ে আমাদের যত ভুল ধারণা