গলির ভেতর শতবর্ষী হোটেল, প্রধান আকর্ষণ নদীর টাটকা মাছ

· Prothom Alo

খুপরির মতো ছোট একটি ঘর। ভেতরে বেজায় ভিড়। কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ চেয়ারে বসে খাবারের অপেক্ষায়। আবার কেউ খাওয়া শেষে তৃপ্তি নিয়ে বিল পরিশোধের পর বেরিয়ে যাচ্ছেন। প্রায় প্রতিদিনই এমন দৃশ্যের দেখা মেলে শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলা সদরের মাছবাজার গলির একটি খাবার হোটেলে। ক্রেতাদের ভালোবাসা ও আস্থায় হোটেলটি টিকে আছে ১০০ বছরের বেশি।

হোটেলটির আনুষ্ঠানিক কোনো নাম নেই। তবে স্থানীয় মানুষের কাছে এটি ‘সালাম হোটেল’ নামে পরিচিত। পদ্মা ও কীর্তিনাশা নদীর টাটকা মাছের স্বাদ নিতে দূরদূরান্ত থেকে লোকজন এখানে আসেন। প্রায় ৫৭ বছর ধরে হোটেলটি চালাচ্ছেন ৮৪ বছর বয়সী আব্দুস সালাম খান। এর আগে তাঁর বাবা সুরত আলী খান প্রায় ৪৯ বছর হোটেলটি পরিচালনা করেছেন।

Visit extonnews.click for more information.

ব্রিটিশ শাসনামলে ১৯২০ সালের দিকে সুরত আলী খান নড়িয়া বাজারে খাবারের হোটেল ব্যবসা শুরু করেন। পদ্মা ও কীর্তিনাশা নদীর তীরে হওয়ায় তখন বাজারে নদীর মাছের চাহিদা ছিল। কীর্তিনাশা নদীর ঘাটে প্রথম হোটেল চালু হয়। পরে বাজারের ভেতরে ও উপজেলা পরিষদের সামনে হোটেল পরিচালনা করা হয়। ১৯৯০ সাল থেকে মাছবাজার গলিতে চলছে হোটেলটি।

১৯৬৯ সালে বাবার কাছ থেকে হোটেল পরিচালনার দায়িত্ব নেন আব্দুস সালাম। ১৯৯০ সালে তাঁর বাবার মৃত্যুর পর হোটেলটি উপজেলা পরিষদের সামনে থেকে মাছবাজার গলিতে সরিয়ে নেওয়া হয়।

ক্রেতাদের খাবার পরিবেশন করছেন হোটেলটির মালিক আব্দুস সালাম খান

প্রতিদিন বেলা একটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত হোটেলে খাবার বিক্রি হয়। সরকারি ছুটির দিনে বন্ধ থাকে। পদ্মার ইলিশ, পাঙাশ, আইড়, বোয়াল ও চিংড়ির পাশাপাশি কীর্তিনাশার বিভিন্ন ধরনের ছোট মাছ রান্না করা হয়। থাকে দেশি মুরগি ও খাসির মাংসও। বাজারে নদীর মাছ না পাওয়া গেলে সেদিন হোটেল বন্ধ রাখা হয়।

বর্তমানে এক টুকরা ইলিশ ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা, পাঙাশ, আইড় ও বোয়াল ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা এবং ছোট মাছের এক প্লেট ১৫০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হয়। খাসি ও মুরগির মাংসের এক পিসের দাম ২০০ টাকা।

৪২ বছর ধরে রান্নার দায়িত্বে হাসিনা


হোটেলটিতে ৪২ বছর ধরে রান্নার কাজ করছেন হাসিনা বেগম। কিশোরী বয়সে মসলা বাটার কাজ দিয়ে এখানে তাঁর শুরু। এখন তিনিই হোটেলটির প্রধান বাবুর্চি।

হাসিনা বেগম প্রথম আলোকে জানান, কাঠের লাকড়ি দিয়ে তিনটি চুলায় রান্না করা হয়। সকালে বাজার থেকে মাছ কিনে আনার পর তা কেটে পরিষ্কার করে রান্নার কাজ শুরু হয়। বেলা একটার মধ্যে তৈরি হয় সব খাবার।

হাসিনার দাবি, দিনের মসলা ও রান্নার উপকরণ দিনেই ব্যবহার করেন। বাসি কোনো জিনিস এখানে ব্যবহার করা হয় না। এ কারণে খাবারের স্বাদ ও মান ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে।

হোটেলটিতে প্রায় ৪২ বছর ধরে রান্নার কাজ করছেন হাসিনা বেগম

‘একেবারে বাড়ির মতো রান্না’

শরীয়তপুর সদর উপজেলার বিনোদপুর এলাকার বাসিন্দা আব্দুল কাদের একটি বেসরকারি সংস্থায় কাজ করেন। দাপ্তরিক কাজে প্রায়ই তাঁকে নড়িয়া উপজেলা সদরে থাকতে হয়। আর দুপুরের খাবার খান সালাম হোটেলেই।

আব্দুল কাদের প্রথম আলোকে বলেন, ‘একেবারে বাড়ির মতো রান্না। সবচেয়ে বড় বিষয়, নদীর টাটকা মাছ দিয়ে দুপুরের খাবার খেতে পারি। খরচ একটু বেশি। তবে নদীর টাটকা মাছ হওয়ায় সেটা নিয়ে সমস্যা হয় না।’

হোটেলটির মালিক আব্দুস সালামের বয়স এখন ৮৪ বছর। পাঁচ মেয়ের সবাইকে বিয়ে দিয়েছেন। শরীরে বয়সের ভার এলেও মানুষের কাছে খাবার পৌঁছে দেওয়ার তাগিদে হোটেলটি চালিয়ে যাচ্ছেন বলে দাবি তাঁর।

বিভিন্ন পদের মাছ দিয়ে খাবার খাচ্ছেন ক্রেতারা

আব্দুস সালাম জানান, প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০ জন ক্রেতা হোটেলে খাবার খান। দৈনিক বিক্রি হয় প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। হোটেলে কাজ করেন সাতজন। তাঁদের মধ্যে তিনজন রান্না, চারজন খাবার পরিবেশন ও বিক্রির দায়িত্বে থাকেন।

আব্দুস সালাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘নদীর মাছ বিক্রি করি বলেই দূরদূরান্ত থেকে অনেক ক্রেতা এখানে আসেন। টাটকা মাছ না পেলে সেদিন হোটেলই বন্ধ থাকে। মানুষের ভালোবাসা আছে বলেই এত বছর ধরে হোটেলটি টিকে আছে।’

নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল কাইয়ূম খান প্রথম আলোকে বলেন, নদীর টাটকা মাছ বিক্রি করে নড়িয়ার এই হোটেল সুনাম অর্জন করেছে। দীর্ঘদিনের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে রাখতে হোটেলটির আধুনিকায়নে কোনো সহায়তা চাওয়া হলে উপজেলা প্রশাসন পাশে থাকবে। পদ্মা নদীর তীরে মাছকেন্দ্রিক পর্যটন চালুর পরিকল্পনা করছে উপজেলা প্রশাসন। এ ধরনের পুরোনো খাবারের হোটেলগুলো সেই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।

Read full story at source