‘কে হতে চায় কোটিপতি’ থেকে চ্যাম্পিয়নস লিগে বার্সেলোনা-আর্সেনাল-ইউনাইটেডের প্রতিপক্ষ
· Prothom Alo

মানুষের জীবন নাকি থ্রিলার সিনেমার চেয়েও বেশি রোমাঞ্চকর। একমুহূর্তে নেওয়া সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারে পুরো জীবনের গতিপথ। আজারবাইজানের ক্লাব সাবাহ এফসির কোচ ভালদাস ডামব্রকাস যেন নিজের জীবনের গল্প লিখছেন থ্রিলার সিনেমার মতো করেই। কে হতে চায় কোটিপতির মঞ্চ থেকে তিনি নিজের দলকে নিয়ে পৌঁছে গেছেন চ্যাম্পিয়নস লিগে। অথচ এটি এমন এক দল, যার সূচনাই হয়েছে আজ থেকে মাত্র ৯ বছর আগে।
Visit tr-sport.bond for more information.
কে হতে চায় কোটিপতি থেকে ফুটবল কোচ
ক্লাবের গল্প বলার আগে কোচের গল্প দিয়েই শুরু করা যাক। লিথুয়ানিয়ার ভালদাস ডামব্রকাস ছিলেন শখের ফুটবলার। তৃতীয় আর চতুর্থ বিভাগে খেলেই কেটেছে তাঁর ক্যারিয়ার। ২৩ বছর বয়সে ফুটবল ক্যারিয়ারের ইতি টেনে শুরু করেন পড়াশোনা। এমন সময়ই সুযোগ পান ‘কে হতে চায় কোটিপতি’র লিথুয়ানিয়ান ভার্সনে। সেখানে জিতে পেয়েছিলেন চার হাজার লিতাস। বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৫৬ হাজার টাকা। সেই টাকা দিয়ে লিথুয়ানিয়া ছেড়ে পাড়ি দেন ইংল্যান্ডে, কোচিং লাইসেন্সের জন্য শুরু করেন ট্রেনিং। একদিকে চলছিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াশোনা, অন্যদিকে ফুটবল কোচ হিসেবে ফুলহাম, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মতো দলে ট্রায়াল।
কে হতে চায় কোটিপতির লিথুয়ানিয়া ভার্সনে কোচ ভালদাস ডামব্রকাসঅবশেষে ২০০৭ সালে ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি নিয়ে শুরু করেন ফুটবল কোচিং। এক দেশ থেকে অন্য দেশে পাড়ি দিয়েছেন, কোথাও থিতু হতে পারেননি। ছোটখাটো দলে কোচিং করিয়েই কেটেছে তাঁর ক্যারিয়ার। অবশেষে ২০২৫ সালে এসে তাঁর হাতে দলের দায়িত্ব তুলে দেয় আজারবাইজানের সাবাহ।
৯ বছর আগের ছোট্ট ক্লাব সাবাহ
এ রকম একজন কোচের অপেক্ষাতেই ছিল আজারবাইজানের ক্লাব সাবাহ। আজ থেকে ৯ বছর আগে, এই নামে কোনো দলের অস্তিত্বই ছিল না। ২০১৭ সালের এই সময়ে সাবাহ এফসি নামে কোনো দলই ছিল না। ২০১৭ সালের ৮ সেপ্টেম্বর তারা নেমেছিল নিজেদের প্রথম ম্যাচ খেলতে। মূলত আজারবাইজানের ব্যবসায়ী ইয়াগুব হুসেনোভ চেয়েছিলেন নিজের শহরের একটি ক্লাব তৈরি করতে। মাসাজির শহরের বিখ্যাত গোলাপি লেকের পাশে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন নিজের ক্লাব। সেই চিন্তা থেকেই সূচনা সাবাহ এফসির। অঢেল টাকা নিয়ে শুরু করা ক্লাবটাকে শুরু থেকেই আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। বরং প্রথম বছর থেকেই প্রথম বিভাগে খেলার সুযোগ মিলেছিল তাদের।
৯ বছর আগেও অস্তিত্ব ছিল না ক্লাবটিরটাকা থাকলেই তো আর সব হয় না, জেতার জন্য দরকার কঠোর পরিশ্রম আর পরিকল্পনা। সেটাই যেন ছিল না তাদের কাছে। কোচ ভালদাস ডামব্রকাস আসার পরেই যেন ধীরে ধীরে খুঁজে পেল নিজেদের। আগের মৌসুমেই আজারবাইজান কাপ জিতে শিরোপা জয়ের স্বাদ পেয়েছিল সাবাহ। শেষ ১২ মৌসুমের মধ্যে ১১ মৌসুমেই শিরোপা নিজেদের করে নিয়েছে কারাবাগ, তাদের মনোপলি ভাঙতেই উঠেপড়ে লেগেছিল সাবাহ এফসি। নতুন কোচ আর ভুল করেননি। ৩৩ ম্যাচের ২৪ জয়, ৬ ড্র নিয়ে ৭৮ পয়েন্ট নিয়ে লিগ শিরোপা নিজেদের করে নিয়েছেন তাঁরা। ৯ বছর আগে জন্ম নেওয়া ক্লাবটা লিগ শিরোপার পাশাপাশি জিতে নিয়েছে আজারবাইজান কাপও। বিশাল অর্জন তাদের নাম লিখিয়েছিল চ্যাম্পিয়নস লিগের বাছাইপর্বে।
নতুন ফরম্যাটে চ্যাম্পিয়নস লিগওয়েলসের নিউ সেন্টস, ফিনল্যান্ডের কুপিএস আর নরওয়ের এজিএফকে হারিয়ে উঠে এসেছিল বাছাইপর্বের ফাইনালে। ইসরায়েলের হাপোই শেভা ক্লাবের বিপক্ষে প্রথম লেগে পিছিয়ে পড়েছিল ২-১ গোলে। নিজেদের মাঠে দ্বিতীয় লেগের ম্যাচে দরকার ছিল দুই গোলের ব্যবধানে জয়; কিন্তু সেটা হয়নি। ৯০ মিনিট পর্যন্ত দুই দলের ২-২ গোলে সমতা, শেষ মিনিটের কর্নার কিক শেষ হলেই ম্যাচের সমাপ্তি। এমন সময় ত্রাতা হয়ে এলেন পোল্যান্ডের টিমোটোজ পুজাকস। তার কর্নার লক্ষ্য থেকে ছিল অনেক দূরে; কিন্তু তেলুর মুতালিমোভের ভলি জড়িয়ে গেল জালে। মুহূর্তের মধ্যে পুরো মাসাজিরবাসী ফেটে পড়ল উল্লাসে। ৩০ মিনিটের জন্য আবারও সুযোগ পেল সাবাহ।
চ্যাম্পিয়নস লিগের মূল মঞ্চে সাবাহ এফসিনিজেদের মাটিতে সেই ৩০ মিনিটকে পরিণত করল পূর্ণদৈর্ঘ্য এক সিনেমায়। ১০১ মিনিটে চতুর্থ আর ১১৫ মিনিটে পঞ্চম গোল দিয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগে নিজেদের পথ খুঁজে নিল সাবাহ। মাত্র ছয় হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার মাঠটি পৌঁছে গেল চ্যাম্পিয়নস লিগের মূল মঞ্চে।
চ্যাম্পিয়নস লিগে তাদের অভিষেক হয়েছে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে। ওল্ড ট্রাফোর্ডের মতো বিখ্যাত স্টেডিয়ামে ৪-০ গোলে হেরে সূচনা হয়েছে বৈকি। কিন্তু এখনও বাকি আছে বার্সেলোনা, আর্সেনালের বিপক্ষে ম্যাচ। বুরুশিয়া ডর্টমুন্ড, নাপোলি, ভিয়ারিয়াল — তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে নাম লিখিয়েছে ইউরোপের প্রতিটি হেভিওয়েট দল। এদের ভীড়ে হয়তো সাবাহকে খুঁজে পাওয়া কষ্টকর হবে, কিন্তু ইউরোপের পরিপূর্ণ স্বাদ পাওয়া থেকে সাবাহ এফসিকে রুখতে পারবে না কেউ। স্বাগতম সাবাহ, ইউরোপের বিশাল মঞ্চে।
টানা তৃতীয় চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতা হবে কি পিএসজির