জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে আমরা ঢেলে সাজাচ্ছি: উপাচার্য
· Prothom Alo

২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব নিয়েছেন ড. এ এস এম আমানুল্লাহ। এর আগে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব নিউ সাউথ ওয়েলস থেকে শুরু করে ঢাকার নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতেও শিক্ষকতা করেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মো. সাইফুল্লাহ
প্রায় ৪০ লাখ শিক্ষার্থীর আপনি উপাচার্য, অনেক বড় দায়িত্ব। গত ২ বছর এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী ছিল?
Visit mwafrika.life for more information.
ড. এ এস এম আমানুল্লাহ: দেখুন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে শুধু একটা ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ বললে কম বলা হয়। এটা একটা উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার কেন্দ্র বা হাব। দেশে যত ছেলেমেয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছে, তার ৭০ শতাংশই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। এই বিপুল তরুণ জনশক্তিকে বাদ দিয়ে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন যেমন সম্ভব নয়, তেমনি এদের বিশ্ববাজার উপযোগী করে গড়ে তোলাও অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। অনেক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও আমরা সেই কাজে হাত দিয়েছি। আশা করছি, খুব শিগগির দৃশ্যমান উন্নয়ন চোখে পড়বে। ২০২৪ সালের আগস্টের পর অন্যতম মূল চ্যালেঞ্জ ছিল শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ক্লাসমুখী করা, পড়ার টেবিলে ফিরিয়ে আনা। কারণ, গণ-অভ্যুত্থানের পর নানা কারণে সবাই ট্রমাটাইজ ছিল। সেই চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে এখন আমরা স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছি।
প্রতিবছর প্রায় ৫ লাখ শিক্ষার্থী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে বের হন। তাঁদের কত শতাংশ চাকরি পান বা পান না, সে রকম কোনো উপাত্ত কি আপনাদের কাছে আছে?
ড. এ এস এম আমানুল্লাহ: সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। বর্তমানে উচ্চশিক্ষার সার্বিক পরিস্থিতি মূল্যায়নের জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে ইউনিসেফের সহযোগিতায় জাতীয় পর্যায়ে একটি গবেষণা কার্যক্রম চলছে। সেটি শেষ হলে হয়তো বলা যাবে। তবে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার হিসেবে দেখা যায়, প্রায় ৭০ শতাংশ চাকরি পায়।
এআই–যুগে টিকে থাকতে কী করবেন, পড়ুন কম্পিউটারবিজ্ঞানীর পরামর্শস্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের পাঠক্রম আধুনিকীকরণ, শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন, শিক্ষকদের যোগ্যতা বাড়ানো—এমন বেশ কিছু লক্ষ্য নিয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আপনার কি মনে হয়, লক্ষ্য কি অর্জিত হয়েছে?
ড. এ এস এম আমানুল্লাহ: হয়নি। কারণ, আমাদের সিলেবাস এখনো মান্ধাতা আমলের। আমরা বলি ৪০ লাখ শিক্ষার্থী। আসলে শিক্ষার্থী নয়, পরীক্ষার্থী। পরীক্ষা দিচ্ছে, ডিগ্রি নিচ্ছে। বিশ্ব যখন চতুর্থ ও পঞ্চম শিল্পবিপ্লব কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রবেশ করেছে, তখনো আমাদের সেই পুরোনো আমলের কারিকুলামে আটকে থাকতে হয়েছে। উচ্চশিক্ষাকে প্রকৃত অর্থে কর্মমুখী, দক্ষতাভিত্তিক ও জীবনঘনিষ্ঠ করা হয়নি। অনেক কলেজ ও প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন অনার্স ও প্রফেশনাল কোর্স চালু করা হয়েছে, কিন্তু পর্যাপ্ত ল্যাবরেটরি বা প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নেই। তাই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে আমরা ঢেলে সাজাচ্ছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরাসহ দেশের খ্যাতনামা পণ্ডিতদের সম্পৃক্ত করে সিলেবাস ও কারিকুলাম উন্নয়নের কাজ চলছে। কলেজগুলোর ল্যাবের আধুনিকীকরণে আমরা হাত দিয়েছি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে আবার ভর্তি পরীক্ষা চালু করেছি। বলা যায় বিরাট কর্মযজ্ঞ চলছে।
একনজরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষার্থীদের বিশ্ববাজার উপযোগী করে গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জের কথা বলছিলেন। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কী কী উদ্যোগ নিয়েছেন?
ড. এ এস এম আমানুল্লাহ: আমূল সংস্কারের পরিকল্পনা আমাদের আছে। প্রথমত, আউটকাম-বেজড এডুকেশনের ওপর জোর দিচ্ছি। অর্থাৎ কোর্সগুলো যেন শুধু তাত্ত্বিক না হয়ে নির্দিষ্ট দক্ষতাভিত্তিক হয়। মৌলিক ডিজিটাল দক্ষতা, যেমন ডেটা অ্যানালাইসিস, কোডিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, বেসিক ও অ্যাডভান্সড এআই কোর্স বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছে। একাডেমি-ইন্ডাস্ট্রির সংযোগের জন্য আমরা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি, যেন শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীদের জন্য ইন্টার্নশিপ বা অন দ্য জব ট্রেনিংয়ের সুযোগ তৈরি হয়। সব মিলিয়ে কারিকুলাম ঢেলে সাজানো হচ্ছে। ইতিমধ্যে ইংরেজি ও আইসিটি আমরা বাধ্যতামূলক করেছি। কেউ যদি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি চায়, তাকে এই দুটি কোর্স পাস করতেই হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার সিকিউরিটি, প্রোগ্রামিং, সেমিকন্ডাক্টর, ডিজিটাল কমিউনিকেশন, লিডারশিপ, কগনিটিভ এমপাওয়ারমেন্ট, ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসি—এসব আধুনিক বিষয়ও পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করছি। ধাপে ধাপে ৪০ লাখ শিক্ষার্থী এসব কোর্স করবে, বছরে অন্তত ২ লাখ দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে অবদান রাখবে। এ ছাড়া চালু হতে যাচ্ছে বিভিন্ন মাইক্রো-ক্রেডেনশিয়াল প্রোগ্রাম। দক্ষ শিক্ষক তৈরির মাস্টারপ্ল্যানও চলমান আছে।
শিক্ষকদের কীভাবে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন?
ড. এ এস এম আমানুল্লাহ: সারা দেশে ১২ হাজার শিক্ষকের প্রশিক্ষণ চলমান আছে। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, এটুআই, আইসিটি ডিভিশন ও ইউনিসেফ বাংলাদেশ আমাদের কারিগরি সহযোগিতা দিচ্ছে। আইসিটির জন্য ৪৯ জন কোর ট্রেইনার, ৮৪০ জন মাস্টার ট্রেইনারসহ মোট ৯৩০ জনকে তৈরি করা হয়েছে। দেশব্যাপী ১২ হাজার শিক্ষককে পর্যায়ক্রমে আইসিটি প্রশিক্ষণ দেবেন তাঁরা।
ড. এ এস এম আমানুল্লাহতৃতীয় ভাষাশিক্ষার ব্যাপারেও তো নানা উদ্যোগ নিয়েছেন আপনারা।
ড. এ এস এম আমানুল্লাহ: বর্তমান সরকার, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তৃতীয় ভাষাশিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। দেশের শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশ তৃতীয় ভাষা না জানায় বৈশ্বিক কর্মবাজারের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। তৃতীয় কোনো ভাষা যদি আমরা শেখাতে পারি, প্রবাসী আয় দ্বিগুণ হতে পারে। সে জন্যই মাল্টি ল্যাঙ্গুয়েজ লার্নিং ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এই ইনস্টিটিউটের তত্ত্বাবধানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে আমরা ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাব প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করেছি। ঢাকার বেশ কয়েকটা কলেজে চালুও হয়ে গেছে। পর্যায়ক্রমে সারা দেশে হবে। প্রাথমিকভাবে আমরা দেখেছি, চায়নিজ, জাপানিজ, আরবি ও ফরাসি ভাষা শিখতে শিক্ষার্থীরা আগ্রহী। এ কারণেই আমরা ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমির সংযোগের উদ্যোগ নিচ্ছি। আইডিপি বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা ভাষাদক্ষতা উন্নয়ন করতে পারবে। এ ছাড়া আমরা সাইবার সিকিউরিটি ক্লাব, ক্যারিয়ার ক্লাব গঠন করছি।
ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমির যোগাযোগের কথা বলছিলেন। এই ক্ষেত্রে কী কী করেছেন বা করছেন?
ড. এ এস এম আমানুল্লাহ: অনেকে বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে ছেলেমেয়েরা চাকরি পাচ্ছে না। প্রথমে জানতে হবে, বেকারত্বের মূল কারণটা কী। এককথায় বলতে গেলে কারণ হলো ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সংযোগের অভাব। কেন এই সংযোগ হচ্ছে না? ওই যে বললাম, মান্ধাতা আমলের কারিকুলাম। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই জরাজীর্ণ কারিকুলামকেই ঢেলে সাজিয়ে ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমির যোগাযোগ গড়ে তোলার উদ্যোগ হাতে নিয়েছে। শিল্পোদ্যোক্তা ও গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে মেলবন্ধনের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। বেশ কয়েকটা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমরা সমঝোতা স্মারক সই করেছি। যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিনস ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাজ্যের স্যালফোর্ড ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব নিউ হ্যাভেন, চীনের হোপ এডুকেশন, অক্সফোর্ড একিউএ, ইউনিসেফ বাংলাদেশ, এটুআই, এসিসিএ, এনএসডিএ, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডের সিনাওয়াত্রা ইউনিভার্সিটি, ইএটিএল ইনোভেশন হাবসহ প্রায় ১৫০টিরও বেশি দেশি-বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা সংস্থা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমরা এমওইউ স্বাক্ষর করেছি। এর মাধ্যমে ইন্টার্নশিপ, কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ সম্প্রসারণ হচ্ছে। ঢাকা শেরাটন ও হোটেল ওয়েস্টিনের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। আমাদের গ্র্যাজুয়েটরা এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে ইন্টার্নশিপের সুযোগ পাবে। এ ছাড়া ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। এর মাধ্যমে আমাদের শিক্ষার্থীরা গবেষণা ও দক্ষতা বিনিময় করবে। খুব শিগগির বিদেশি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতায় আমরা মাস্টার্স অব পাবলিক হেলথ (এমপিএইচ) প্রোগ্রাম চালু করতে যাচ্ছি।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যেই নানা কারণে হতাশা আছে। ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁরা উদ্বিগ্ন। মানসিকভাবে ছেলেমেয়েদের চাঙা করার ব্যাপারে কিছু কি ভাবছেন?
ড. এ এস এম আমানুল্লাহ: আমাদের শিক্ষার্থী আছে সারা দেশে। এই শক্তি কাজে লাগিয়ে আমরা একটা সাংস্কৃতিক বিপ্লব ঘটাতে চাই। দেশ স্বাধীনের পর ৭১ সালে এই সুযোগ এসেছিল। সেটা আমরা কাজে লাগাতে পারিনি। ৯০-এ একবার এসেছিল। সেবারও পারিনি। ২০২৪ সালের পর এবার সুযোগটি আমরা কাজে লাগাতে চাই। আমরা রেনেসাঁ (পুনর্জাগরণ) তৈরি করতে চাই। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বছরে ৪০ লাখের বেশি শিক্ষার্থীকে নৈতিক ও মানসিক শিক্ষা প্রদানের কার্যক্রম শুরু করেছে। এ ছাড়া সরকারের লার্নিং উইথ হ্যাপিনেসের আলোকে দেশব্যাপী খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। প্রান্তিক ও প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আধুনিকায়নের জন্য একটি মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করা হচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য, দেশের আটটি বিভাগের প্রতিটিতে প্রতিবন্ধীদের জন্য অন্তত একটি করে বিশেষায়িত কলেজ প্রতিষ্ঠা করা। সংগীত কলেজের সংখ্যা দুই-তিনটি থেকে বাড়িয়ে ৬৪টি জেলার সব কটিতে পারফরমিং আর্টস কলেজ করা। এই প্রচেষ্টাগুলো সবই ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ কাঠামোর অংশ। এর আওতায় ইতিমধ্যে প্রায় ২৫ থেকে ৩৫ লাখ শিক্ষার্থীকে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচিতে যুক্ত করা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা যেন ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ট্রমা কাটিয়ে উঠতে পারে, সে জন্য আমরা বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নের নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি।
নানা পরীক্ষার জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজগুলোর ক্লাস প্রায়ই বন্ধ থাকে। এই সমস্যা সমাধানের কোনো উদ্যোগ আছে?
ড. এ এস এম আমানুল্লাহ: জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজগুলোতে সারা বছর ধরে এসএসসি, এইচএসসি, বিসিএসসহ নানা ধরনের পরীক্ষা হয়। ফলে নিয়মিত ক্লাস ও পড়াশোনা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়। এই সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে প্রাথমিকভাবে ৩০০টি ও পর্যায়ক্রমে দেশের ৫০০টি উপজেলায় স্বতন্ত্র ‘ন্যাশনাল এক্সাম সেন্টার’ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই সেন্টারগুলোতে শুধু পাবলিক পরীক্ষা হবে। পরীক্ষা পরিচালনার জন্য ডেডিকেটেড ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনবল থাকবে। হলগুলোতে সিসিটিভি থাকবে। ফলে নকল কমবে। পড়ালেখার মানও বাড়বে।
ড. এ এস এম আমানুল্লাহ, উপাচার্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়আমি স্পষ্টই বুঝতে পারছি, পুরোনো কারিকুলাম এবং এই কারিকুলামের গ্র্যাজুয়েট দিয়ে দেশের কোনো উপকার হবে না। অতএব এটা পরিবর্তন করতেই হবে। আরেকটা বিষয় হলো পরীক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তন। ৬০ শতাংশ প্রায় করে ফেলেছি। বাকি ৪০ শতাংশও করেই যাব।উচ্চশিক্ষা নিয়ে বারবার বিভিন্ন পরীক্ষামূলক উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। স্থির একটা জায়গায় আমরা পৌঁছাতে পারছি না কেন?
ড. এ এস এম আমানুল্লাহ: ৫৪ বছর পেরিয়ে গেছে, দেশ স্বাধীন হয়েছে। এখনো আমরা সুনির্দিষ্টভাবে আমাদের শিক্ষার পলিসি ঠিক করতে পারিনি। এ পর্যন্ত ৬টির বেশি শিক্ষা কমিশন হয়েছে; ড. মুহাম্মদ কুদরাত-এ–খুদা শিক্ষা কমিশন, মজিদ খান কমিশন, মফিজউদ্দীন কমিশন, শামসুল হক কমিশন, এম এ বারী কমিশন, মনিরুজ্জামান মিয়া কমিশন, কবীর চৌধুরী কমিশন। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলেও বেশ কিছু শিক্ষা কমিশন হয়েছিল, যার মধ্যে ব্রিটিশ আমলে হান্টার কমিশন, স্যাডলার কমিশন এবং পাকিস্তান আমলে শরীফ কমিশন ও আতাউর রহমান খান শিক্ষা কমিশন। এতগুলো কমিশন হওয়ার পরও বাংলাদেশের শিক্ষানীতি ও সংস্কারের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি, যাতে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার মতো একটি আধুনিক উচ্চশিক্ষাব্যবস্থা আমরা পাই।
এ জন্য কারা দায়ী?
ড. এ এস এম আমানুল্লাহ: দায়ী আমাদের নীতিনির্ধারকেরা। আমাদের শিক্ষার্থীরা খুবই সচেতন। তারা শিখতে চায়। দক্ষতা অর্জন করতে চায়। কিন্তু আমরা তাদের উপযুক্ত কারিকুলাম দিতে পারিনি। বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলা করতে পারে, এমন পলিসি আমরা নিতে পারিনি। এ জন্যই আমরা পিছিয়ে আছি।
গবেষণার ক্ষেত্রেও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অনেক পিছিয়ে। এ ব্যাপারে কি কিছু করছেন?
ড. এ এস এম আমানুল্লাহ: জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গঠনকাঠামো অন্য সাধারণ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে আলাদা; কারণ, আমাদের দুই হাজারেরও বেশি অধিভুক্ত কলেজ আছে। তাই গবেষণা কৌশলটি দুটি ধারায় বিভক্ত। প্রথমত, কলেজশিক্ষকদের গবেষণায় উৎসাহিত করতে আমরা বিশেষ গবেষণা অনুদান বাড়িয়েছি। গবেষণাপত্র প্রকাশের ওপর ভিত্তি করে পদোন্নতি ও সম্মাননার ব্যবস্থা করছি। দ্বিতীয়ত, আমাদের শিক্ষার্থীরা যেন স্থানীয় কৃষি, জলবায়ু পরিবর্তন, ক্ষুদ্র শিল্প ও আঞ্চলিক অর্থনীতি নিয়ে গবেষণা করতে পারে, সেই পথ সুগম করা হচ্ছে। এ জন্য এরই মধ্যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাসে ইনোভেশন অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। এই ল্যাব স্থাপনের উদ্দেশ্য হলো শিক্ষা ও উন্নয়নে নতুন ক্ষেত্র তৈরি, গবেষণার মান বাড়ানো, টেকসই উন্নয়নকে উৎসাহিত করা।
একসময় সেশনজট ছিল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় সমস্যা। এখন পরিস্থিতি কেমন?
ড. এ এস এম আমানুল্লাহ: সেশনজট আমরা কমিয়ে আনার চেষ্টা করছি। আশা করি ২০২৭ সালের মধ্যে সেশনজট পুরোপুরি শেষ হবে। আমরা এখন একটি সুনির্দিষ্ট একাডেমিক ক্যালেন্ডার মেনে চলছি। কিছুদিন আগে ডিগ্রি পাস ও সার্টিফিকেট কোর্স দ্বিতীয় বর্ষ পরীক্ষার ফলাফল ৪২ কর্মদিবসে প্রকাশ করেছি, যেটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটা রেকর্ড। মাত্র ৫০ কর্মদিবসে মাস্টার্স শেষ বর্ষের ফল প্রকাশ করা হয়েছে। এ ছাড়া যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড একিউএ, এডেক্সেলের সঙ্গে কাজ শুরু করছি। এটা করতে পারলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে পরীক্ষার ফলাফল দেওয়া সম্ভব হবে।
আমূল পরিবর্তনের যে প্রয়োজনীয়তা আপনি অনুভব করছেন, আপনার কি মনে হয়, সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা কলেজগুলোর শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও এই তাগিদটা উপলব্ধি করছেন? সবাই যদি সহযোগিতা না করেন, এত পরিকল্পনা কি আলোর মুখ দেখবে?
ড. এ এস এম আমানুল্লাহ: জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আমাদের শিক্ষকের সংখ্যা এক লাখের বেশি। কর্মকর্তা–কর্মচারী সব মিলিয়ে প্রায় পৌনে দুই লাখ হবে। আমি মোটামুটি নিশ্চিত যে অধিভুক্ত প্রতিটি কলেজের প্রতিটি বিভাগের শিক্ষকেরা উদ্যোগগুলো মনেপ্রাণে গ্রহণ করেছেন। তাঁরা বিষয়গুলো জানেন। প্রতিনিয়ত তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছে। প্রতিটি কলেজ আমাদের সঙ্গে ইন্টারনেটের মাধ্যমে সর্বক্ষণ কানেক্টেড। এই যে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিচ্ছে, ১৫ মিনিটের মধ্যে আমাদের কাছে তথ্য চলে আসছে, কতজন উপস্থিত, কতজন অনুপস্থিত। কেউ একটু আগ বাড়িয়ে কাজ বেশি করছেন, কেউ একটু কম করছেন, কিন্তু জানেন সবাই। সবাই জেনে গেছে যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই আগের দিন আর নাই যে একজন শিক্ষক পরীক্ষার হলে বসে থাকবেন আর শিক্ষার্থীরা নকল করবে। সবাই এখন দেখছে যে প্রশ্নপত্র বদলে গেছে। সবাই দেখছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা কলেজে হাজির হচ্ছেন, ল্যাবে গিয়ে হাজির হচ্ছেন, যেটা আগে দেখা যায়নি। তবে হ্যাঁ, শুধু আমার শিক্ষকদের দোষ দিলে হবে না। অনেক রিসোর্সের অভাব আছে। আমরা এসব অভাব মেটানোর চেষ্টা করছি। ইউনিসেফ যেমন জাতীয় পর্যায়ের একটা গবেষণা করছে, পুরো টাকাটাই ওরা দিচ্ছে। ট্রেইনিংগুলোয় সহায়তা করছে। এটুআই সহযোগিতা করছে। পার্টনারদের ইনভলভ করে আমরা সমস্যাগুলোর সমাধান করার চেষ্টা করছি।
ধরা যাক, এই যে এত পরিবর্তনের কথা বলছেন, শেষ পর্যন্ত সব কটি করা সম্ভব হলো না। কিন্তু যেকোনো একটা সংস্কার যদি যেকোনো মূল্যে করতে চান, তাহলে কোনটা করবেন?
ড. এ এস এম আমানুল্লাহ: কারিকুলাম ও সিলেবাসের সংস্কারটা আমি করেই যাব। এটা আমার নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই আছে। আমি স্পষ্টই বুঝতে পারছি, পুরোনো কারিকুলাম এবং এই কারিকুলামের গ্র্যাজুয়েট দিয়ে দেশের কোনো উপকার হবে না। অতএব এটা পরিবর্তন করতেই হবে। আরেকটা বিষয় হলো পরীক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তন। ৬০ শতাংশ প্রায় করে ফেলেছি। বাকি ৪০ শতাংশও করেই যাব। কিছু সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা আছে। সব যদি করতে না-ও পারি, মাস্টারপ্ল্যানটা পরবর্তী প্রশাসনের জন্য রেখে যাব।
আপনাকে ধন্যবাদ।
ড. এ এস এম আমানুল্লাহ: আপনাকেও ধন্যবাদ।