বৃদ্ধ শাহজাহানের ঘরে খাবার নেই, দুই মাসের ঘরভাড়া বাকি

· Prothom Alo

রাজধানীর আদাবর থানার সামনের রিংরোড সড়ক। ২৬ আগস্ট বিকেল ৫টা। প্যাডেল রিকশা নিয়ে বসেছিলেন ৯০ বছর বয়সী শাহজাহান মিয়া। সারা দিন রিকশা চালিয়েছেন। তবে আয় হয়েছিল মাত্র ১৫০ টাকা। দুপুরের খাবারও খেতে পারেনি শাহজাহান।

কারণ, ১৫০ টাকা থেকে রিকশার মালিককে দিতে হবে ১০০ টাকা। হাতে থাকবে ৫০ টাকা। সেই টাকা দিয়ে বাড়ির জন্য কিছু খাবার কিনতে হবে। কিন্তু কী কিনবেন, সেটিও ঠিক করতে পারছিলেন না শাহজাহান।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

কথা বলতে বলতে নিজের সংসারের কথা জানান তিনি। বলেন, প্রায়ই এক বেলা খেলে আরেক বেলা না খেয়ে থাকতে হয়। কখনো ঘরে খাবার থাকে না। তখন প্রতিবেশীদের কাছে খাবার চেয়ে নিতে হয়। সেদিনও তাঁর চিন্তা ছিল একই—রাতে পরিবারের সবাই কী খাবেন।

পরে আদাবরের সুনিবিড় হাউজিংয়ে শাহজাহানের ঘরে গিয়ে দেখা যায়, এক কক্ষের আধাপাকা ঘর। একটি খাট। কয়েকটি পাতিল। কয়েকটি ব্যাগে কিছু কাপড়। সংসারের তাদের প্রয়োজনীয় জিনিস বলতে এটুকুই। ঘরে তখন রান্না করার মতো চাল-ডাল, আলু-তরকারি কিছুই ছিল না।

সংসার চালাতে বৃদ্ধ বয়সেও বাজারে মাছ কাটেন পাবনার নিয়ামত

তিন নাতির দায়িত্বও শাহজাহানের

শাহজাহানের সঙ্গে থাকেন তাঁর স্ত্রী রেনু বেগম। বয়স ৬৫ বছর। সঙ্গে থাকে তাঁদের মেয়ের তিন সন্তানও। শিশু তিনটির বয়স যথাক্রমে ১১, ৮ ও ৫ বছর। দুই বছর আগে অজানা অসুখে মারা গেছেন শাহজাহানের মেয়ে। গত বছর মারা যান সেই মেয়ের স্বামী। তিনি একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন।

মেয়ের মৃত্যুর পর তিন শিশুর দায়িত্ব এসে পড়ে শাহজাহানের ওপর। শিশুদের দাদা-দাদি তাদের দায়িত্ব নিতে চান না। তাই বয়স ও শারীরিক দুর্বলতা সত্ত্বেও নাতিদের ভরণপোষণের দায়িত্ব নিতে হয়েছে তাঁকে।

শাহজাহানের নিজের এক ছেলে আছেন। তিন বছর আগে ছেলেকে বিয়ে দিয়ে আলাদা করে দিয়েছিলেন। ছেলেটিও অসুস্থ। তাই মা–বাবার তেমন খোঁজ নিতে পারেন না। কখনো কখনো উল্টো বাবার ঘরে এসে খাবার খান। ফলে সংসারে উপার্জনের প্রধান ভরসা ৯০ বছরের শাহজাহান। বয়সের কারণে আগের মতো রিকশা চালাতে পারেন না। প্যাডেলে জোর পান না। ধীরে চালান। যাত্রীরাও তাঁর রিকশায় কম ওঠেন। শাহজাহান বলেন, ‘এই রিকশা চলে কম। মানু উঠতে চায় না। মিশিনেরডা চলে বেশি।’

খরচের চাপে সংসারের হিসাব মেলানো কঠিন

তারপরও প্রতিদিন রিকশা নিয়ে বের হতে হয় তাঁকে। কারণ, রিকশা না চালালে ঘরে খাবার আসে না। সেদিন শাহজাহানের কথায় ফুটে উঠেছিল অসহায়ত্ব। বলেছিলেন, ‘টেকা না থাকলে খাব কী, দেড় শ টেকা মারছি, মহাজনের কী দেব, বাড়িতে কী নেব।’

শুধু দৈনিক আয়ের টানাটানি নয়, তাঁর ওপর আছে ঋণের চাপও। দুই বছর আগে ছিনতাইকারীরা তাঁর রিকশা নিয়ে যায়। সেই রিকশার মূল্য পরিশোধ করতে ১৫ হাজার টাকা ঋণ করতে হয়েছিল। সুদসহ অল্প অল্প করে এখনো সেই টাকা শোধ করছেন তিনি।

স্ত্রীর আয় বন্ধ, ভাড়া বাকি

সংসারের অভাব কিছুটা কমাতে কাজ করতেন রেনু বেগম। সুনিবিড় হাউজিংয়ের একটি নির্মাণাধীন ভবনের শ্রমিকদের রান্না করে মাসে ৫ হাজার টাকা পেতেন। দুই মাস ধরে ভবনটির কাজ বন্ধ। তাই তাঁর আয়ও বন্ধ। এর মধ্যে দুই মাসের ঘরভাড়াও বাকি পড়েছে। এক কক্ষের যে ঘরটিতে তাঁরা থাকেন, সেটার মাসিক ভাড়া ৩ হাজার ৫০০ টাকা। দুই মাসে বকেয়া হয়েছে ৭ হাজার টাকা। এই টাকা কীভাবে দেবেন, জানেন না রেনু।

চার দিন ধরে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করেও কাজ পাননি রাশিদা

রেনু বলেন, ‘মালিক কইছে ভাড়া না দিলে তালা দেবু।’ একদিকে খাবারের অভাব। অন্যদিকে ঘর হারানোর ভয়। তিন নাতিকে নিয়ে এরপর কোথায় যাবেন, সেই চিন্তাও আছে তাঁর।

তবু নিজের খাবারের কথা ভুলে নাতিদের খাওয়ানোর চেষ্টা করেন রেনু। বলেন, ‘চেষ্টা করি বাবা, নিজে না খাইয়াও ছোট বাচ্চাগো খাওয়াতে।’ তিন শিশুর পর্যাপ্ত জামাকাপড়ও নেই। পড়াশোনার ব্যবস্থাও করতে পারেননি তাঁরা। শাহজাহানের নিজের পরনের কাপড়ও ছেঁড়া।

সাহায্য মিললেও অভাব কাটেনি

২৬ আগস্ট শাহজাহানের পরিবারের খোঁজ পাওয়ার পর সেদিন ও পরে মোট দুই দফায় তাঁদের জন্য চাল, ডাল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। এতে কয়েক দিনের খাবারের ব্যবস্থা হয়েছিল। কিন্তু তাতে অভাব কাটেনি। ঘরভাড়া এখনো বাকি। ঋণও আছে। এর মধ্যে এক সপ্তাহ ধরে অসুস্থ শাহজাহান। তাই রিকশা নিয়ে বের হতে পারছেন না। বন্ধ হয়ে গেছে তাঁর সামান্য আয়ও।

‘কোনোমতে তিন বেলা খাওন জুটে’

গত রোববার বিকেলে আবার কথা হয় রেনু বেগমের সঙ্গে। তিনি জানান, আজও তাঁদের পরিবার না খেয়ে আছে। অসুস্থ শাহজাহান রিকশা নিয়ে বের হতে পারছেন না এক সপ্তাহ। উপার্জন না থাকায় আজও ঘরে খাবার নেই।

খাবার জোগানোর চেষ্টায় আছেন শাহজাহানের স্ত্রী রেনু বেগম। দুপুরে আশপাশের মানুষদের কাছে খাবার চেয়েছিলেন, কিন্তু কাজ হয়নি। তাই দুপুরে পরিবারসহ ছিলেন না খেয়ে। তবে রাতে কী হবে, সেই চিন্তায়ও উদ্বিগ্ন তিনি। রেনু বেগম জানান, কেউ দিলে রান্না হবে। না দিলে আজও খালি পেটে থাকতে হবে।

রাতের খাবারের কথা জানতে চাইলে রেনু বেগম বলেন, ‘জুটলে খাবু, না জুটলে না খাবু।’

Read full story at source