চীনে চড়ুই নিধন, গুদাম ভরা সার ও কৃষকের হাতে হাতকড়া
· Prothom Alo

সময়টা ১৯৫৮ সাল। চীনে মাও সে–তুংয়ের নেতৃত্বে বিপ্লবের ১১ বছর পেরিয়েছে। কৃষিনির্ভর চীন একটা স্থিতিশীলতার মধ্যে এসেছে। চীনের কমিউনিস্ট পার্টি শুরু করল গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড কর্মসূচি। এর মূল লক্ষ্য ছিল কৃষির উৎপাদন ব্যাপকভাবে বাড়ানো এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে শিল্পায়নের বিকাশ।
কৃষির উৎপাদন বাড়ানোর উপায় হিসেবে ফসলের শত্রু হিসেবে ইঁদুর, মশা, মাছির সঙ্গে চড়ুই পাখিকেও চিহ্নিত করা হলো। সরকারি প্রচারণায় দেশপ্রেমের কাজ হিসেবে উপস্থাপন করে কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র সবাইকে উৎসাহিত করা হলো চড়ুই নিধনে। কিছুদিনের মধ্যে চীন প্রায় চড়ুইশূন্য হয়ে গেল। কিন্তু হায়, মৌসুম শেষে দেখা গেল, ফসলের উৎপাদন বাড়া তো দূরে থাক; বরং আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেল। পরের মৌসুমে ফসলের উৎপাদন আরও কমল। পরিণামে চীনে দেখা দিল ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ।
Visit newsbetting.cv for more information.
চড়ুই ফসল খেয়ে ফেলে ঠিকই, কিন্তু পোকামাকড় খেয়ে ফসল বাঁচায় তার চেয়ে অনেক গুণ বেশি। প্রকৃতি চড়ুইশূন্য হয়ে যাওয়ায় বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য নষ্ট হয়েছিল। পোকামাকড়ের বিস্তারে ফসলহানি হয়েছিল। সেটাই দুর্ভিক্ষ ডেকে এনেছিল। চীনের কমিউনিস্ট সরকার তাদের ভুল বুঝতে পেরে চড়ুইকে ক্ষতিকর প্রাণীর তালিকা থেকে বাদ দিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে চড়ুই এনে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করতে হয়েছিল। রাষ্ট্রের ভুল সিদ্ধান্ত কত বড় বিপর্যয় ঘটাতে পারে, চীনের চড়ুই নিধন প্রকল্প তার বড় দৃষ্টান্ত।
সার, সেচ ও ফসল সংরক্ষণ নিয়ে সংকট কেনচীনের এই গল্পটি মনে পড়ছিল ১২ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোয় প্রকাশিত কুড়িগ্রামের একটা খবর পড়তে গিয়ে। খবরের শিরোনাম হলো, ‘সার চাওয়া কি আমাগরে অপরাধ? এহন প্রতি রাতে গ্রামে পুলিশ আহে’। এ প্রশ্ন পুলিশের কাছে গ্রেপ্তার ও হয়রানির ভয়ে পালিয়ে বেড়ানো কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীর বঙ্গসোনাহাট ইউনিয়নের কৃষকদের। আমনের ভরা মৌসুমে সার না পেয়ে তাঁরা সড়কে নেমে বিক্ষোভ করেছিলেন। সেখানে গিয়ে একজন কৃষি কর্মকর্তা অবরুদ্ধ হন। ব্যস, কৃষকদের বিরুদ্ধে কৃষি কর্মকর্তার ওপর হামলার অভিযোগে মামলা ঠুকে দেওয়া হয়।
সংকটের সময় বেশি দামে সার কিনে আনতে হচ্ছে, অন্যদিকে ব্যবস্থাপনার ভুলের কারণে সেই সার কৃষকের কাছে পৌঁছাচ্ছে না, সার চেয়ে প্রতিবাদ করায় হাতকড়া পড়ছে কৃষকের হাতে। এখানে অপরাধটা আসলে কার?
দেশে দেড় মাসের বেশি সময় ধরে দেশে সার নিয়ে ‘সংকট’ চলছে। বাস্তবতা হলো, সরকারের গুদামে সার থাকলেও আমন চাষের জন্য চাহিদামতো সার পাননি কৃষকেরা। ডিলারদের কাছে গেলে বলা হয়েছে সার নেই। দীর্ঘ লাইনে কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করে থেকেও প্রয়োজনীয় সার পাননি তাঁরা। অথচ সরকারি সার বেশি দামে খোলাবাজারে ঠিকই বিক্রি হচ্ছে।
প্রায় সারা দেশেই কমবেশি একই চিত্র। সার না পেয়ে কৃষকদের মধ্যে অসন্তোষ দানা বেঁধেছে। তবে কোথাও কোথাও সেটা বিক্ষোভে রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া ও দারিদ্র্যের দিক থেকে এগিয়ে থাকা উত্তরবঙ্গের কৃষকেরা মানববন্ধন, উপজেলা প্রশাসনের কার্যালয় ঘেরাও ও সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ করেছেন।
সারের দাবিতে কৃষকদের বিক্ষোভসার না পেয়ে ডিলারের গুদামের দরজা ও বেড়া ভেঙে সার নিয়ে যাওয়ার দুটি ঘটনা ঘটেছে। একটি ভূরুঙ্গামারীতে, আরেকটি রৌমারীতে। এ দুটি ঘটনা ঘটেছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি গরিব জেলা কুড়িগ্রামে।
প্রশ্ন হচ্ছে, কুড়িগ্রামের মানুষ বেশি গরিব কেন? এর বড় কারণ হলো কৃষির বাইরে সেখানে আর বড় কোনো কর্মসংস্থান নেই। বছরের বেশির ভাগ সময় আলুর ডাল আর ভাত খেয়ে কাটানো জনগোষ্ঠীর জন্য ধান কিংবা রবি ফসল যে কতটা বাঁচামরার প্রশ্ন, সেটা জনবিচ্ছিন্ন আমলাতন্ত্র আর পুলিশের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়।
গণমাধ্যমের খবর বলছে, ডিলারদের গুদাম থেকে সার নিয়ে যাওয়ার পর বেশির ভাগ সারই কৃষকেরা আবার নিজেদের কাঁধে বয়ে ফেরত দিয়ে যান। ভূরুঙ্গামারীর যে কৃষকদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, তাঁদের দুজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। ভুক্তভোগী কৃষকেরা বলছেন, ‘এহন প্রতি রাতে গ্রামে পুলিশ আহে। সারা দিন রোদে কাজ করি। অজ্ঞাতনামা আসামি করেও ধরে নিয়ে যেতে পারে। রাতে বাসায় ঘুমামু, সেই উপায় নাই।’
এ মামলায় শুধু কৃষকদের আসামি করা হয়নি, শিক্ষার্থীর নামেও মামলা দেওয়া হয়েছে। কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের এক শিক্ষার্থী এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। তাঁর অপরাধ হলো, ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে তিনি ভিডিও করছিলেন। ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে তাঁর দ্বিতীয় বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা। তিনি জানেন না এবার পরীক্ষা দিতে পারবেন কি না।
এই যে কৃষক সারা রাত পুলিশের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন আর দিনের বেলা রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে ফসল ফলাচ্ছেন, এর পেছনে শুধু জীবিকার টান নয়, কৃষির প্রতি অপরিসীম দরদও কাজ করে। প্রশ্ন হচ্ছে, কৃষকের সার চাওয়াটা কি অপরাধ? কৃষকের এই চাওয়াকে যদি অপরাধ বলে বিবেচনা করা হয়, তাহলে সরকারি গুদামে সার মজুত থাকার পরও যাঁরা দেশের খাদ্যনিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছেন, তাঁদের বেলায় কী হবে?
এবারের মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের যে অনিশ্চয়তার ধরন, তাতে ধান, সবজিসহ কৃষি উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি। ডিজেলের সংকট এবং হাওরের বন্যার কারণে এমনিতেই বোরোর উৎপাদন কিছুটা কম হয়েছে। এ কারণে আমনের উৎপাদন ঠিকঠাক রাখা জরুরি।
মৌসুমের শুরুতেই অতিবৃষ্টির কারণে চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলের আমনের চাষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেই ক্ষতি কিছুটা কাটিয়ে ওঠা গেলেও ঠিকমতো সার না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত আমনের উৎপাদন ঠিকঠাক থাকবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে যে সারের সংকটে যদি বাংলাদেশে চালের দাম ১০ শতাংশ বাড়ে, তাহলে নতুন করে দরিদ্র হবে ১৪ লাখ মানুষ।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, বর্তমানে ১২ লাখ টনের বেশি সার মজুত রয়েছে। এর অর্থ, সংকটটা পুরোপুরি ব্যবস্থাপনাগত। চালসহ খাদ্যপণ্যের দাম যাতে নাগালের বাইরে না চলে যায়, সে জন্য সরকার সারে ভর্তুকি দেয়। কিন্তু সার বিতরণব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ থাকে ডিলারদের হাতে।
রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় তাঁরা সিন্ডিকেট তৈরি, কালোবাজারে সার বিক্রির মতো অপরাধ করেও পার পেয়ে যান। কৃষি মন্ত্রণালয়ের এখানে বড় দায় আছে। মাঠপর্যায়ে কৃষকের সংখ্যা, চাহিদার সঠিক হিসাব তাঁরা করছেন না। এ ছাড়া সরকার পরিবর্তনের পর সারের ডিলারশিপ পেতে ক্ষমতাসীন নেতাদের দৌড়ঝাঁপের কারণেও বিতরণ ব্যাহত হচ্ছে।
সংকটের সময় বেশি দামে সার কিনে আনতে হচ্ছে, অন্যদিকে ব্যবস্থাপনার ভুলের কারণে সেই সার কৃষকের কাছে পৌঁছাচ্ছে না, সার চেয়ে প্রতিবাদ করায় হাতকড়া পড়ছে কৃষকের হাতে। এখানে অপরাধটা আসলে কার? সার চেয়ে বিক্ষোভ করা কৃষকের, নাকি সংকটকালে দেশের খাদ্যনিরাপত্তাকেই যাঁরা হুমকিতে ফেলছেন, তাঁদের? দয়া করে কৃষকদের রাতে ঘুমাতে দিন। সংকটে অন্নদাতা কৃষকই আমাদের ভরসা। করোনা মহামারি আমাদের সেটা শিখিয়েছে।
মনোজ দে প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী
* মতামত লেখকের নিজস্ব