আদালতে চুক্তিপত্র দেখিয়ে জামিন, পরে বেরিয়ে এল জালিয়াতির তথ্য
· Prothom Alo

এক কোটি টাকা মুক্তিপণ চেয়ে ব্যবসায়ী আজিবর রহমানকে অপহরণের মামলায় কারাগারে ছিলেন চার আসামি। জামিন পেতে আদালতে দাখিল করা হলো একটি ‘যৌথ অংশীদারি বিনিয়োগ চুক্তিপত্র’। নথিতে দেখানো হলো, আজিবরের সঙ্গে তাঁদের ব্যবসায়িক লেনদেন ছিল। সেই নথি দেখেই মিলল জামিন। কিন্তু পরে ভুক্তভোগী জানালেন, এমন কোনো চুক্তির কথাই তিনি জানেন না। পুলিশের তদন্তে নথিটিকে ‘জাল’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
Visit freshyourfeel.org for more information.
চুক্তিপত্রের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর আদালত উত্তরা পশ্চিম থানার একজন উপপরিদর্শককে তদন্তের নির্দেশ দেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ ও নথিপত্র যাচাই করে তদন্ত কর্মকর্তা জানান, আজিবরের সঙ্গে আসামিদের কোনো ব্যবসায়িক চুক্তি বা লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এরপর আদালত চার আসামির জামিন বাতিল করে তাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। একই ঘটনায় জাল নথি তৈরি ও ব্যবহার, আদালতে মিথ্যা তথ্য দেওয়া এবং প্রতারণার অভিযোগে আলাদা মামলাও হয়েছে।
মামলার নথি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
এক কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবি
মামলার নথি অনুযায়ী, গত ৯ জুন উত্তরা পশ্চিম থানার ৩ নম্বর সেক্টর এলাকায় পরিচিত একজনের সঙ্গে একটি রেস্তোরাঁয় গিয়েছিলেন ৫০ বছর বয়সী ব্যবসায়ী আজিবর রহমান। সেখান থেকে ফেরার পথে রাজলক্ষ্মী মার্কেটের সামনে একটি সাদা গাড়িতে কয়েকজন ব্যক্তি তাঁকে জোর করে তুলে নিয়ে যান।
স্বজনেরা আর টাকা দিতে পারবেন না জানালে তাঁদের চেক দিতে বলা হয়। পরে জানানো হয়, আজিবরকে হালান অটোস্ট্যান্ড এলাকায় নিয়ে আসা হবে। পরে ওই এলাকায় অভিযান চালিয়ে পুলিশ আসামিদের গ্রেপ্তার এবং আজিবরকে উদ্ধার করে।
এজাহারে বলা হয়েছে, অপহরণকারীরা আজিবরের মাথায় আঘাত করেন। পরে তাঁর চোখ ও মুখ বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে গিয়ে মারধর করা হয়। এরপর স্বজনদের কাছে এক কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়।
আজিবর বাড়িতে না ফেরায় ১১ জুন উত্তরা পশ্চিম থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন তাঁর স্বজনেরা। সেই রাতেই আজিবরের মেসেঞ্জার থেকে তাঁর স্ত্রীর কাছে ভিডিও কল আসে। সেখানে দেখা যায়, কয়েকজন ব্যক্তি তাঁকে আটকে রেখে মারধর করছে। এরপর আবারও এক কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়।
২৫ লাখ টাকা দিয়েও মেলেনি মুক্তি
মামলার নথি সূত্রে আরও জানা গেছে, আজিবরকে উদ্ধারের আশায় স্বজনেরা টাকা জোগাড় করতে শুরু করেন। একপর্যায়ে ২৫ লাখ টাকা সংগ্রহ করা হয়।
১৪ জুন অপহরণকারীদের নির্দেশ অনুযায়ী দক্ষিণখান এলাকার ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের একটি হিসাবে ২০ লাখ টাকা জমা দেওয়া হয়। একই হিসাবে আজিবরের ভাগনে জহুরুল ইসলামের চাচাতো ভাই সোহেল রানা নিজের হিসাব থেকে আরও ৫ লাখ টাকা পাঠান বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়।
—মেহেদী হাসান, তদন্ত কর্মকর্তা ও উপপরিদর্শক, উত্তরা পশ্চিম থানাআজিবরকে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার, সোনারগাঁসহ বিভিন্ন স্থানে আটকে রাখা হয়েছিল। সেখানে তাঁকে মারধর করা হয়। আসামিপক্ষ আদালতে যে চুক্তিপত্র দাখিল করেছে, সেটির পক্ষে কোনো প্রমাণও তাঁরা দেখাতে পারেননি।টাকা পাওয়ার পর অপহরণকারীরা আজিবরের মেসেঞ্জার থেকে তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করে। জানায়, টাকা পাওয়া গেছে। কিন্তু আজিবরকে ছেড়ে দেওয়ার বদলে আরও টাকা দাবি করা হয়।
স্বজনেরা আর টাকা দিতে পারবেন না জানালে তাঁদের চেক দিতে বলা হয়। পরে জানানো হয়, আজিবরকে হালান অটোস্ট্যান্ড এলাকায় নিয়ে আসা হবে। পরে ওই এলাকায় অভিযান চালিয়ে পুলিশ আসামিদের গ্রেপ্তার এবং আজিবরকে উদ্ধার করে।
উদ্ধারের পর আজিবরকে উত্তরা কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় ১৫ জুন উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা করেন আজিবরের ভাগনে জহুরুল ইসলাম। মামলায় ছয়জনকে আসামি করা হয়। গ্রেপ্তার হন মো. সজীব মিয়া (২৯), আবদুল আলীম বাবু (৩০), মো. ময়নুদ্দিন (৪০) ও মহিউদ্দিন (৩৬)।
জামিনের জন্য আদালতে ‘চুক্তিপত্র’ দাখিল
কারাগারে থাকা চার আসামির পক্ষে ১৮ জুন আদালতে জামিনের আবেদন করেন আইনজীবী শাহ মোহাম্মদ শাহীন হাসান।
২২ জুন জামিন শুনানির সময় আদালতে দাখিল করা হয় ‘যৌথ অংশীদারি বিনিয়োগ চুক্তিপত্র’ নামে একটি দলিল। এতে আজিবর রহমানের সঙ্গে আসামিদের ব্যবসায়িক সম্পর্ক ও লেনদেনের কথা উল্লেখ ছিল। নথিটি বিবেচনায় নিয়ে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত আসামিদের জামিন মঞ্জুর করেন।
গত ২২ জুন জামিন শুনানির সময় আদালতে দাখিল করা হয় ‘যৌথ অংশীদারি বিনিয়োগ চুক্তিপত্র’ নামে একটি দলিল। এতে আজিবর রহমানের সঙ্গে আসামিদের ব্যবসায়িক সম্পর্ক ও লেনদেনের কথা উল্লেখ ছিল। নথিটি বিবেচনায় নিয়ে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত আসামিদের জামিন মঞ্জুর করেন।
কিন্তু পরে এই চুক্তিপত্রের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ২৬ জুলাই মামলার ধার্য তারিখে বাদী ও ভুক্তভোগী পক্ষ আদালতকে জানান, আসামিদের সঙ্গে তাঁদের কোনো আপসনামা বা ব্যবসায়িক চুক্তি হয়নি। আদালতে দাখিল করা চুক্তিপত্র সম্পর্কেও তাঁরা কিছু জানেন না।
এরপর চুক্তিপত্রটি সত্য কি না, তা তদন্ত করে ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে উত্তরা পশ্চিম থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মেহেদী হাসানকে নির্দেশ দেন আদালত।
সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিকও জানেন না
তদন্তে পুলিশ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান আল-ফারাবি ট্রেডার্স লিমিটেডের মালিক শরিফুল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। আদালতে দাখিল করা চুক্তিপত্রটির সঙ্গে তাঁর প্রতিষ্ঠানের কোনো সম্পর্ক আছে কি না, জানতে চাওয়া হয়।
তদন্ত কর্মকর্তার কাছে শরিফুল ইসলাম জানান, এ ধরনের কোনো চুক্তি তাঁর প্রতিষ্ঠানে হয়নি।
বাদী জহুরুল ইসলাম ও ভুক্তভোগী আজিবর রহমানও এমন কোনো চুক্তির বিষয়ে কিছু জানেন না বলে তদন্তে জানান।
৮ আগস্ট আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মেহেদী হাসান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, আজিবর রহমানের সঙ্গে আসামিদের কোনো ব্যবসায়িক লেনদেন বা চুক্তির সত্যতা পাওয়া যায়নি। তদন্তে জানা গেছে, মুক্তিপণ আদায়ের জন্যই আজিবরকে অপহরণ করা হয়েছিল।
—শাহ মোহাম্মদ শাহীন হাসান, আসামিপক্ষের আইনজীবীআসামিরা জানিয়েছেন, আদালতে দাখিল করা নথিটি আসল। আজিবর রহমানের সঙ্গে আসামিদের ব্যবসায়িক লেনদেন ছিল। পাওনা টাকা আদায়ের জন্য তাঁকে তুলে নিয়ে মারধর করা হয়েছিল, মুক্তিপণের জন্য নয়।তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, আজিবরকে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার, সোনারগাঁসহ বিভিন্ন স্থানে আটকে রাখা হয়েছিল। সেখানে তাঁকে মারধর করা হয়। আসামিপক্ষ আদালতে যে চুক্তিপত্র দাখিল করেছেন, সেটির পক্ষে কোনো প্রমাণও তাঁরা দেখাতে পারেননি।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, এজাহারভুক্ত আসামি আবদুল আলীম বাবুকে চুক্তিপত্রের বিষয়ে প্রত্যক্ষ বা দালিলিক প্রমাণ দিতে বলা হলেও তিনি তা পারেননি। আসামি সজীব ও আলীমের বিরুদ্ধে ডাকাতিসহ একাধিক মামলা আছে। এ ছাড়া সজীবের বিরুদ্ধে হত্যা মামলাও আছে।
হাজির না হওয়ায় জামিন বাতিল
জামিনের পর এই মামলায় আসামিদের আদালতে হাজির হওয়ার তারিখ ছিল ৯ আগস্ট। কিন্তু সেদিন তাঁরা আদালতে হাজির হননি।
এরপর আদালত তাঁদের জামিন বাতিল করে চার আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। একই সঙ্গে আদালতে দাখিল করা কথিত চুক্তিপত্রের বিষয়ে জাল নথি ও প্রতারণার অভিযোগে আলাদা মামলা করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৩ আগস্ট উত্তরা পশ্চিম থানায় নতুন মামলা করেন ডিএমপির প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই মো. হেলাল উদ্দিন।
নতুন মামলায় দণ্ডবিধির ১৮১, ১৮২, ৪৬৫, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১, ৩৪ ও ১০৯ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। পুলিশের অভিযোগ, আসামিরা জাল দলিল তৈরি ও ব্যবহার করেছেন, আদালতে মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন এবং পরস্পরের যোগসাজশে এসব করেছেন।
এসআই হেলাল উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, আসামিরা আদালতকে ভুল বুঝিয়ে জামিন নিয়েছেন। জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি করা চুক্তিপত্র আদালতে দাখিল করা হয়েছিল।
হেলাল উদ্দিন আরও বলেন, আদালত এক হাজার টাকার বন্ডে পুলিশ প্রতিবেদন দাখিল পর্যন্ত আসামিদের জামিন দিয়েছিলেন। পরে ভুক্তভোগী পক্ষ চুক্তিপত্রের বিষয়ে আপত্তি জানালে আদালত তদন্তের নির্দেশ দেন। তদন্তে নথিটি জাল বলে উঠে আসে। এরপর আদালতের নির্দেশে সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা করা হয়।
মান যাচাই করে হেলমেট কিনছেন তো, আমদানির সাড়ে ২৪ শতাংশ নিরাপত্তা পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণআসামিপক্ষের দাবি, চুক্তিপত্রটি আসল
তবে আসামিপক্ষের আইনজীবী শাহ মোহাম্মদ শাহীন হাসান পুলিশের বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন।
এই আইনজীবী প্রথম আলোকে বলেন, আসামিরা তাঁকে জানিয়েছেন, আদালতে দাখিল করা নথিটি আসল। তাঁর দাবি, আজিবর রহমানের সঙ্গে আসামিদের ব্যবসায়িক লেনদেন ছিল। পাওনা টাকা আদায়ের জন্য তাঁকে তুলে নিয়ে মারধর করা হয়েছিল, মুক্তিপণের জন্য নয়।
আসামিপক্ষের আইনজীবী আরও বলেন, তিনি আবদুল আলীম বাবুকে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে বলেছেন। তবে তিনি এখনো আত্মসমর্পণ করেননি।
নথিটি কীভাবে জাল প্রমাণিত হলো, সে প্রশ্নও তোলেন আইনজীবী। তাঁর দাবি, পুলিশ এ বিষয়ে আসামিদের যথাযথভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করেনি।
তবে তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চুক্তিপত্রের পক্ষে প্রত্যক্ষ বা দালিলিক প্রমাণ দিতে বলা হলেও আবদুল আলীম বাবু তা পারেননি।
গাড়ি ব্যবহারে অনিয়মে জড়িত এই আমলারা, জানতে চাইলে জবাব, ‘আমি একা করি নাকি’‘আমি তাঁদের আগে কখনো দেখিনি’
ভুক্তভোগী আজিবর রহমান অবশ্য আসামিদের সঙ্গে কোনো ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকার কথা পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন।
তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওরা আমাকে তুলে নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় আটকে রাখে। টাকার জন্য বেধড়ক মারধর করে। আমি আসামিদের আগে কখনো দেখিনি, চিনিও না। তাঁদের সঙ্গে আমার কোনো ব্যবসায়িক লেনদেনও নেই।’
আজিবর বলেন, তিনি এখনো অসুস্থ। আসামিরা যে নথি দেখিয়ে জামিন নিয়েছিলেন, সেটিও ভুয়া। তাঁদের সঙ্গে তাঁর কোনো ধরনের চুক্তি বা লেনদেনের সম্পর্ক ছিল না।
নিজের মুঠোফোনের ফাঁস হওয়া তথ্য দেখে মন্ত্রী বললেন, এটা কীভাবে সম্ভবনতুন মামলায় গ্রেপ্তার দুজন
জাল নথি দাখিল ও প্রতারণার অভিযোগে করা নতুন মামলাটি এখন তদন্ত করছে কোতোয়ালি থানার এসআই জাহাঙ্গীর আলম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এ মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি চারজন। তাঁদের মধ্যে এজাহারভুক্ত মহিউদ্দিন ও তদন্তে পাওয়া আসামি ওসমানকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। অন্য আসামিরা পলাতক।
তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, জাল নথি কীভাবে তৈরি হলো, কারা এটি তৈরি ও আদালতে দাখিলের সঙ্গে জড়িত এবং এর সঙ্গে আর কেউ জড়িত কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মামলার নথি অনুযায়ী, জাল নথি দাখিলের অভিযোগে করা নতুন মামলার পরবর্তী ধার্য তারিখ ২১ সেপ্টেম্বর।