অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসন নীতিতে ব্যাপক কড়াকড়ি, উৎকণ্ঠায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা

· Prothom Alo

অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসন নীতিতে বড় ধরনের কড়াকড়ি আরোপ করেছে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার। নতুন নীতিমালায় বিদেশি শিক্ষার্থীদের এক ভিসা থেকে অন্য ভিসায় যাওয়ার সুযোগ বন্ধ করা, পরিবারের সদস্য আনার সুযোগ সীমিত করা এবং ভ্রমণ ভিসার অপব্যবহার রোধে বিধিনিষেধের কথা জানানো হয়েছে।

বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানী ক্যানবেরার ন্যাশনাল প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্র ও অভিবাসনবিষয়ক মন্ত্রী টনি বার্ক নতুন ভিসা বিধিনিষেধের রূপরেখা তুলে ধরেন। আগের দিন বুধবারই অভিবাসন নীতিতে বড় রদবদলের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল। এ নীতি নিয়ে উৎকণ্ঠায় রয়েছেন বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ থেকে অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়া শিক্ষার্থীরা।

Visit extonnews.click for more information.

মূলত অস্ট্রেলিয়ায় তীব্র আবাসনসংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির জেরে রাজনৈতিক চাপের মুখে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজের নেতৃত্বাধীন লেবার সরকার এ কঠোর অবস্থান নিল। তবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সতর্ক করে বলেছে, এমন সিদ্ধান্তের ফলে আন্তর্জাতিক শিক্ষা খাত মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

ক্যানবেরায় ওই অনুষ্ঠানে ‘অভিবাসন কর্মসূচি পরিচালনা: কারা আসবেন, কারা থাকবেন, কারা চলে যাবেন’ শীর্ষক বক্তৃতায় টনি বার্ক জানান, অস্ট্রেলিয়ায় বার্ষিক নিট অভিবাসীর সংখ্যা ২০২৬-২৭ অর্থবছরে কমিয়ে ২ লাখ ৪৫ হাজারে নামিয়ে আনা হবে। পরের বছরগুলোয় তা আরও কমিয়ে বছরে ২ লাখ ২৫ হাজারে সীমিত রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত আগের এক বছরে দেশটিতে নিট অভিবাসন কমে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৯২ হাজার ১০০। এই সংখ্যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কম এবং ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ের পর সর্বনিম্ন।

নতুন নীতিমালায় যেসব পরিবর্তন

অভিবাসনবিষয়ক নীতিমালায় ‘ভিসা হপিং’ বন্ধে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ভিসা হপিং হলো বিদেশি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা শেষ করে নিম্নমানের কোর্সে ভর্তি হওয়া কিংবা বারবার ভিসা পরিবর্তন। একই সঙ্গে বিদেশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে যাওয়ার সুযোগও সীমিত করা হচ্ছে।

নতুন নিয়মের বিষয়ে টনি বার্ক বলেন, বিদেশি শিক্ষার্থীদের অস্ট্রেলিয়ায় পরিবার নিয়ে আসার সুযোগ আর বাড়ানো হবে না। তবে ইতিমধ্যে যাঁরা অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা করছেন, তাঁরা ছাড় পাবেন। প্রশান্ত মহাসাগরীয় ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর আবেদনকারীদেরও ছাড় দেওয়া হবে। এ ছাড়া পিএইচডির শিক্ষার্থীরা সঙ্গে পরিবার আনতে পারবেন।

ভ্রমণ ভিসায় অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে অবস্থান দীর্ঘায়িত করার পথ বন্ধ করতে সব ধরনের পর্যটন ভিসায় ‘অতিরিক্ত অবস্থানের সুযোগ নেই’ (নো ফারদার স্টে)—এমন শর্ত যুক্ত করা হচ্ছে নতুন নীতিমালায়। ফলে পর্যটক হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে সেখানে অন্য ভিসায় আবেদন করার সুযোগ কার্যত বন্ধ হয়ে যাবে।

নীতিমালা অনুযায়ী, যাঁদের ভিসার বৈধ মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, তাঁদের দ্রুত দেশত্যাগে বাধ্য করতে নজরদারি ও আইনি ব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে। এ ছাড়া কৃষি ও সেবা খাতের ‘ওয়ার্কিং হলিডে’ ভিসার দ্বিতীয় ও তৃতীয় বছরের অনুমোদনের ক্ষেত্রে লটারি ব্যবস্থা চালু করা হবে। তবে নির্মাণ, স্বাস্থ্যসেবা ও কৃষি খাতের মতো শ্রমঘাটতিতে থাকা ক্ষেত্রগুলোয় দক্ষ অভিবাসনে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

শিশুদের ওপর সহিংসতা, পারিবারিক নির্যাতন এবং বিদ্বেষমূলক অপরাধে জড়িত অভিবাসীদের ভিসা দ্রুত বাতিল ও তাঁদের বহিষ্কারে অভিবাসন কর্মকর্তাদের বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে নতুন নীতিমালায়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক বলেন, যাঁরা নিষ্ঠার সঙ্গে অর্থনীতি ও সমাজে অবদান রাখতে অস্ট্রেলিয়ায় আসেন, তাঁদের স্বাগত জানানো হবে। তবে অভিবাসনব্যবস্থার ফাঁকফোকর ব্যবহার করে কোনো ধরনের অনিয়ম বা অন্যায্য সুযোগ নেওয়া বরদাশত করা হবে না।

‘আমাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে’

অভিবাসন সংকোচনের প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার অস্ট্রেলিয়ায় রাজপথে নামেন সাধারণ বিদেশি শিক্ষার্থীরা। সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চবিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষার্থী ক্লাস বর্জন করে বিক্ষোভ মিছিল করেন। সিডনির বিখ্যাত হাইড পার্কসহ মেলবোর্ন ও ব্রিসবেনের মতো প্রধান শহরগুলোয় এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যেও উৎকণ্ঠা কাজ করছে। সিডনির ড্যানহ্যাম কোর্ট এলাকার বাসিন্দা এক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমরা বিশাল অঙ্কের টিউশন ফি দিয়ে বৈধভাবে পড়াশোনা করতে এসেছি। কিন্তু যেভাবে ঘন ঘন নিয়ম বদলানো হচ্ছে এবং এক কোর্স বা ভিসা থেকে অন্যটিতে যাওয়ার সুযোগ বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে, এতে আমাদের ভবিষ্যৎ এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়ল।’

একই ধরনের শঙ্কার কথা জানান লাকেম্বা শহরের বাসিন্দা এক শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, অস্থায়ী ভিসায় যাঁরা দিনরাত পরিশ্রম করে এখানে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়তে চাইছেন, নতুন এই সিদ্ধান্ত তাঁদের জন্য বড় ধরনের ধাক্কা। সরকারের এই নীতিগত পরিবর্তনের ফলে যেকোনো সময় দেশে ফিরে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

Read full story at source