কাবিনে দেনমোহর বাড়িয়ে লেখা: ইসলামের বিধান কী
· Prothom Alo

কনেপক্ষ নিজেদের বংশমর্যাদা ও আভিজাত্য প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে লাখ লাখ বা কোটি টাকার দেনমোহর দাবি করে। অনেক সময় বরপক্ষও ভাবে, ‘দেনমোহর তো শুধু কাগজে লেখার বিষয়, কে আর নগদ দেয়!’—এমন ঠুনকো যুক্তিতে দলিলে স্বাক্ষর করে বসে।
কাবিনে লেখা দেনমোহর কি শুধু সামাজিক প্রদর্শনী? নাকি এটি একটি অলঙ্ঘনীয় আর্থিক দায়? মহান আল্লাহর পবিত্র বিধানের সঙ্গে দ্বিমুখী আচরণের পরিণতিই বা কী?
Visit saltysenoritaaz.org for more information.
উপহার নাকি অধিকার
দেনমোহর হলো নারীর একান্ত ব্যক্তিগত অধিকার, যা আল্লাহ পুরুষের ওপর বাধ্যতামূলক ফরজ করে দিয়েছেন, “তাদেরকে তাদের নির্ধারিত মোহর ফরজ দায়িত্ব হিসেবে প্রদান করো।” (সুরা নিসা, আয়াত: ২৪)
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দেনমোহরের অর্থ সম্পূর্ণভাবে স্ত্রীর সম্পত্তি। কনের পিতা-মাতা, অভিভাবক বা আত্মীয়দের এই সম্পদে বিন্দুমাত্র অধিকার নেই। স্ত্রী যদি নিজের পূর্ণ স্বাধীনতায় কোনো চাপ ছাড়া দেনমোহরের কিছু অংশ ক্ষমা করেন, তবেই শুধু স্বামী তা থেকে অব্যাহতি পেতে পারে; অন্যথায় পিতা বা অভিভাবকের ক্ষমা করার কোনো বৈধ অধিকার নেই।
মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১৮৯৩৩যে ব্যক্তি কোনো নারীকে কম বা বেশি দেনমোহর দেওয়ার অঙ্গীকার করে বিবাহ করল, অথচ মনে মনে তার সেই দেনমোহর পরিশোধ করার নিয়ত ছিল না এবং সে তাকে ধোঁকা দিল—অতঃপর সে তার দেনমোহর পরিশোধ না করেই মারা গেল, তবে কেয়ামতের দিন সে আল্লাহর দরবারে ব্যভিচারী হিসেবে উপস্থিত হবে।বিয়ে করার জন্য স্ত্রীকে মোহর প্রদান করা ফরজস্বাক্ষর করলে কি আর ‘লোকদেখানো’ থাকে
অনেকের ধারণা, কাগজে শুধু সম্মানের খাতিরে বড় অঙ্ক লেখা হয়েছিল। কিন্তু ইসলামি ফিকহ ও রাষ্ট্রীয় আদালত কোনোটিই এই অজুহাত গ্রহণ করে না।
নবীজি (সা.) ঘোষণা করেছেন, “মুসলিমরা তাদের পারস্পরিক চুক্তির শর্তাবলিতে দায়বদ্ধ থাকে।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৩৫২)
যখন একজন প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন পুরুষ কাবিননামা বা বিবাহচুক্তিতে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কে স্বাক্ষর করে, তখন ইসলামের পরিভাষায় সেটি নির্ধারিত দেনমোহর হয়ে যায় এবং তা বরের ওপর অপরিশোধ্য ঋণে পরিণত হয়।
ইবনে আবিদিন (রহ.) উল্লেখ করেছেন, যদি গোপন বৈঠকে একটি নির্দিষ্ট মোহর নির্ধারিত হয়, কিন্তু জনসমক্ষে অহমিকা ও বংশমর্যাদা প্রদর্শনের জন্য কাবিনে কয়েকগুণ বেশি অঙ্ক লিখে তাতে সম্মতি দেওয়া হয়, তবে কাজি বা বিচারক লিখিত চুক্তির ভিত্তিতেই প্রকাশ্য দেনমোহর কার্যকর করবেন।
বর যদি লিখিত দলিলের বিপরীতে দাবি করে যে এটি নিছক প্রদর্শনীর জন্য লেখা হয়েছিল, তবে অকাট্য সাক্ষ্যপ্রমাণ ছাড়া তার সেই দাবি ইসলামি আদালতে গ্রহণযোগ্য হবে না। (ইবনে আবিদিন, রদ্দুল মুহতার আলাদ দুররিল মুখতার, ৩/১০৩–১০৬, দারুল ফিকর, বৈরুত)
পরিশোধ না করার নিয়ত
পরিশোধের ইচ্ছা না রেখে শুধু বিয়ে সম্পন্ন করার উদ্দেশ্যে দেনমোহরের বড় অঙ্কে সম্মতি দেওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে চরম প্রতারণা এবং মহাপাপ।
দেনমোহর কি সামাজিক ‘স্ট্যাটাস’: ইসলাম কী বলেনবীজি (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোনো নারীকে কম বা বেশি দেনমোহর দেওয়ার অঙ্গীকার করে বিবাহ করল, অথচ মনে মনে তার সেই দেনমোহর পরিশোধ করার বিন্দুমাত্র নিয়ত ছিল না এবং সে তাকে ধোঁকা দিল—অতঃপর সে তার দেনমোহর পরিশোধ না করেই মারা গেল, তবে কেয়ামতের দিন সে আল্লাহর দরবারে ব্যভিচারী হিসেবে উপস্থিত হবে।” (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১৮৯৩৩)
দেনমোহরকে সহজ ও সহনশীল রাখার নবীজি বারবার তাগিদ দিয়েছেন। তিনি নিজের কন্যাদের বিবাহে কিংবা নিজের স্ত্রীদের দেনমোহরে কখনো অতি উচ্চ অঙ্ক নির্ধারণ করেননি।
বাকি দেনমোহর
দেনমোহরের একটি অংশ নগদে এবং বাকি অংশ বাকিতে পরিশোধের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু ‘বাকি’ থাকার অর্থ এই নয় যে তা মাফ হয়ে গেছে। স্ত্রী যেকোনো সময় তাঁর এই বিলম্বিত দেনমোহর দাবি করার পূর্ণ অধিকার রাখেন।
এমনকি স্বামী যদি স্ত্রীকে নিয়ে আজীবন সংসারও করে যান, তবুও দেনমোহর স্বামীর জিম্মায় এক অকাট্য ঋণ হিসেবে বহাল থাকে।
ইমাম ইবনে কুদামাহ উল্লেখ করেছেন, স্বামী যদি স্ত্রীর দেনমোহর পরিশোধ না করে মৃত্যুবরণ করে, তবে স্বামীর রেখে যাওয়া সম্পত্তি থেকে ওয়ারিশদের মাঝে মিরাস বণ্টন করার পূর্বেই স্ত্রীর দেনমোহরের সমস্ত পাওনা পরিশোধ করা ইসলামে ওয়াজিব। (ইবনে কুদামাহ, আল-মুগনি, ৯/১৮০, দারু আলমিল কুতুব, রিয়াদ)
তবে দেনমোহরকে সহজ ও সহনশীল রাখার নবীজি বারবার তাগিদ দিয়েছেন। তিনি নিজের কন্যাদের বিবাহে কিংবা নিজের স্ত্রীদের দেনমোহরে কখনো অতি উচ্চ অঙ্ক নির্ধারণ করেননি।
বলেছেন, “সবচেয়ে বরকতময় বিবাহ হলো সেটি, যার খরচ ও দেনমোহর সবচেয়ে সহজ এবং নাগালের মধ্যে থাকে।” (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২৪৫২৯)
কোরআন মুখস্থ সাহাবির বিয়ের মোহরানা