নগরের পর দুই উপজেলায় ‘এশিয়ান টাইগার মশা’, কোন ধরনের রোগ ছড়ায়
· Prothom Alo

চট্টগ্রামে গত দেড় মাসে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বেড়েছে। চলতি সেপ্টেম্বর মাসে প্রতিদিন গড়ে ৭০ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হচ্ছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম নগর এবং নগরসংলগ্ন সীতাকুণ্ড ও কর্ণফুলী উপজেলার রোগী বেশি। আর এই তিন স্থানে পৃথক দুটি জরিপ চালিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। জরিপে এই তিন এলাকায় দুই ধরনের মশার লার্ভার উপস্থিতির প্রমাণ পেয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
জেলা ও বিভাগীয় স্বাস্থ্য বিভাগ জানায়, গত জুন মাসে চট্টগ্রাম নগরে জরিপ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এরপর গত জুলাই-আগস্ট মাসে দুই উপজেলায় আক্রান্ত বাড়লে সেখানেও জরিপ চালানো হয়। দুই জরিপে প্রাপ্ত লার্ভার মধ্যে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই ডেঙ্গুর প্রধান বাহক ‘এডিস ইজিপ্টাই’ বা পীত জ্বরের মশা এবং ২০ থেকে ৩০ শতাংশ ‘এডিস অ্যালবোপিকটাস’ বা ‘এশিয়ান টাইগার’ মশা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।
Visit afnews.co.za for more information.
যেভাবে চিনবেন টাইগার মশা
এশিয়ান টাইগার মশা বা এডিস অ্যালবোপিকটাস ও এডিস ইজিপ্টি দেখতে অনেকটা একই হলেও কিছু পার্থক্য রয়েছে। অ্যালবোপিকটাসের কালো বক্ষের মাঝখানে একটি সাদা সরল দাগ থাকে, আর এডিস ইজিপ্টির বক্ষে বীণার মতো সাদা নকশা দেখা যায়। এডিস ইজিপ্টি মানুষের ঘরবাড়ির আশপাশে বেশি থাকে এবং মানুষের রক্তে বেশি আকৃষ্ট হয়। অ্যালবোপিকটাস সাধারণত ঘরের বাইরের বাগান-ঝোপঝাড়ে বেশি দেখা যায়।
কীটতত্ত্ববিদেরা জানান, দেশে ডেঙ্গুর প্রধান বাহক এডিস ইজিপ্টাই। অন্যদিকে এডিস অ্যালবোপিকটাস ডেঙ্গুর পাশাপাশি চিকুনগুনিয়ার বাহক। অর্থাৎ দুটির কামড়েই ডেঙ্গু আক্রান্তের ঝুঁকি রয়েছে। কোনো এলাকায় এডিস ইজিপ্টাইয়ের লার্ভা বেশি পাওয়া গেলে সেখানে ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি। অন্যদিকে এডিস অ্যালবোপিকটাসের লার্ভা বেশি পাওয়া গেলে সেখানে ডেঙ্গুর পাশাপাশি চিকুনগুনিয়ারও ঝুঁকি থাকে।
২০১৫ সালে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় দেখা যায়, এডিস অ্যালবোপিকটাসের প্রায় ৯৯ শতাংশ লার্ভা বাড়ির বাইরে পাওয়া গেছে। গবেষণার সঙ্গে যুক্ত জাপানের সুকুবা বিশ্ববিদ্যালয় ও কানাডার ম্যাকমাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা এডিস ইজিপ্টাই ও এডিস অ্যালবোপিকটাসের প্রজননস্থলের এই পার্থক্যকে মশা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন।
জরিপে নগর ও দুই উপজেলায় বিভিন্ন ধরনের জমে থাকা পানি, পরিত্যক্ত পাত্র, নির্মাণাধীন ভবন, বাসাবাড়ির আশপাশের পাত্রসহ বিভিন্ন স্থানে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। গত জুন মাসের জরিপে নগরের প্রতি চার বাড়ির একটিতে ডেঙ্গুর লার্ভা পাওয়া যায়। তবে দুই উপজেলায় চালানো জরিপের আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়।
চট্টগ্রামের ডেপুটি সিভিল সার্জন সৌনম বড়ুয়া বলেন, কর্ণফুলীতে বিভিন্ন বাড়ির উঠান এবং সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন দোকানের সামনে ফেলে রাখা যন্ত্রাংশ, কৌটা ও টায়ারে জমে থাকা পানিতে মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে এডিস এজিপ্টাইয়ের সংখ্যা বেশি। পাশাপাশি এডিস অ্যালবোপিকটাসের লার্ভাও পাওয়া গেছে। এসব স্থান পরিষ্কার করার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বলা হয়েছে। প্রশাসনকেও জানানো হয়েছে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু ওয়ার্ডে ভিড় বাড়ছেকোথায় থাকে এই মশা, কখন কামড়ায়
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও যুক্তরাষ্ট্রের রোগনিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি)-এর তথ্য অনুযায়ী, এডিস মশা মূলত দিনের বেলা সক্রিয় থাকে। ভোরের পর এবং সন্ধ্যার আগে এদের কামড়ানোর প্রবণতা বেশি। এডিস ইজিপ্টাই সাধারণত মানুষের বসতির আশপাশে এবং ঘরের ভেতর ও বাইরে থাকে। অন্যদিকে এডিস অ্যালবোপিকটাস সাধারণত ঘরের বাইরে, বিশেষ করে ঝোপঝাড় ও গাছপালার আশপাশে বেশি দেখা যায়।
ঢাকায় পরিচালিত এক গবেষণায় বাড়িঘরের আশপাশের পানির পাত্র, পরিত্যক্ত টায়ার, নির্মাণসামগ্রী ও যানবাহনের পরিত্যক্ত অংশকে এডিস মশার গুরুত্বপূর্ণ প্রজননস্থল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আইসিডিডিআরবি, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের গবেষকেরা ২০১১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত জরিপ চালিয়ে ১২ হাজার ৬৮০টি লার্ভা ও পিউপা সংগ্রহ করেন। এর প্রায় ৮২ শতাংশ ছিল এডিস ইজিপ্টাই।
২০১৫ সালে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় দেখা যায়, এডিস অ্যালবোপিকটাসের প্রায় ৯৯ শতাংশ লার্ভা বাড়ির বাইরে পাওয়া গেছে। গবেষণার সঙ্গে যুক্ত জাপানের সুকুবা বিশ্ববিদ্যালয় ও কানাডার ম্যাকমাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা এডিস ইজিপ্টাই ও এডিস অ্যালবোপিকটাসের প্রজননস্থলের এই পার্থক্যকে মশা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন।
জেলা কীটতত্ত্ববিদ (ভারপ্রাপ্ত) সৈয়দ মো. মঈন উদ্দীন বলেন, এডিস সাধারণত পরিষ্কার পানিতে ডিম পাড়ে। সীতাকুণ্ড উপজেলায় জাহাজের বিভিন্ন সামগ্রী বিক্রির দোকানের সামনে ফেলে রাখা ফ্রিজ, বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ও কৌটায় বৃষ্টির পানি জমে ছিল। এসব জমে থাকা পানিতে মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। কর্ণফুলী উপজেলায় বিভিন্ন বাড়ির উঠান ও সামনের অংশে রাখা পাত্র, পুরোনো টায়ার ও ফুলের টবে জমে থাকা পানিতেও এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে।
এশিয়ান টাইগার মশা বা এডিস অ্যালবোপিকটাস ও এডিস ইজিপ্টি দেখতে অনেকটা একই হলেও কিছু পার্থক্য রয়েছে। অ্যালবোপিকটাসের কালো বক্ষের মাঝখানে একটি সাদা সরল দাগ থাকে, আর এডিস ইজিপ্টির বক্ষে বীণার মতো সাদা নকশা দেখা যায়। এডিস ইজিপ্টি মানুষের ঘরবাড়ির আশপাশে বেশি থাকে এবং মানুষের রক্তে বেশি আকৃষ্ট হয়। অ্যালবোপিকটাস সাধারণত ঘরের বাইরের বাগান-ঝোপঝাড়ে বেশি দেখা যায়।
‘সকালেও মশারি টানাতে হবে’
কীটতত্ত্ববিদদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এডিস মশা ঠিক কোন সময়ে সবচেয়ে বেশি কামড়ায় বা কোন এলাকায় এর কামড়ের ঝুঁকি বেশি—তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন। তবে বিভিন্ন জরিপ ও গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, শুধু সন্ধ্যা বা রাতের কথা মাথায় রেখে মশারি ব্যবহার করলেই হবে না। দিনের বেলাতেও বিশ্রাম নেওয়ার সময় মশারি টানিয়ে শোয়া উচিত। পাশাপাশি সম্ভব হলে ফুলহাতা জামাকাপড় পড়তে হবে।
কীটতত্ত্ববিদেরা জানিয়েছেন, এডিস মশা সাধারণত দিনের আলো ফোটার পর এবং সূর্য ডোবার কয়েক ঘণ্টা আগে বেশি সক্রিয় থাকে। তবে রাতে ঘরের আলোতেও সক্রিয় হয়ে কামড়াতে পারে। এডিস ইজিপ্টাই সাধারণত মানুষের বসতির কাছাকাছি থাকতে বেশি পছন্দ করে। এডিস অ্যালবোপিকটাস গাছপালা ও ঘরের বাইরের পরিবেশে বেশি থাকে। এই প্রজাতি মানুষ ছাড়াও অন্যান্য প্রাণীকে কামড়াতে পারে।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য বলছে, চলতি বছর চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে সেপ্টেম্বর মাসে। মোট আক্রান্ত ৩ হাজার ২৭০ জনের মধ্যে ১ হাজার ২৩৪ জন আক্রান্ত হয়েছে চলতি সেপ্টেম্বর মাসে। ইতিমধ্যেই আক্রান্তের সংখ্যা গত বছরের তুলনায় বেড়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বলেন, দিনের বেলাতেও ঘুমানো বা বিশ্রাম নেওয়ার সময় মশারি টানাতে হবে। প্রয়োজন হলে এবং সম্ভব হলে ফুলহাতা জামাকাপড় পরতে হবে। একই সঙ্গে ঘরের আশপাশ সব সময় পরিষ্কার রাখতে হবে, যাতে এডিস মশার কোনো প্রজননস্থল তৈরি না হয়। যেহেতু ভাইরাসের বাহক চিহ্নিত করা গেছে, এখন সচেতনতা মুখ্য।