জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাস, আদর্শিক সংকট ও সংস্কার: একটি গ্রন্থালোচনা
· Prothom Alo

বইয়ের নাম: Bangladesh Jamaat-e-Islami: Its History and Politics; লেখক: ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক; প্রকাশক: The University Press Limited (UPL); প্রকাশস্থান: ঢাকা; প্রকাশকাল: ২০২৬; পৃষ্ঠা: ২৪২; আইএসবিএন: 978-984-506-576-4; মূল্য: ৳১,১৬০
ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী: ইটস হিস্ট্রি অ্যান্ড পলিটিকস বইটি কার্যত দুটি ভাগে বিভক্ত বলে আমার মনে হয়েছে এবং আমি সেইভাবেই বইটি পাঠ করেছি। বইয়ের লেখক বা প্রকাশক বইটি দুভাগে বিভক্ত বলছেন না। প্রথম ভাগ হচ্ছে প্রথম চারটি অধ্যায়; এবং দ্বিতীয় ভাগ হচ্ছে বইয়ের পঞ্চম, ষষ্ঠ এবং সপ্তম অধ্যায়। স্বীকার করা করা দরকার যে আমি এই বইয়ের দ্বিতীয় ভাগ প্রথমে পড়েছি।
Visit newsbetsport.bond for more information.
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাস ও রাজনীতি বিষয়ে বইয়ের সংখ্যা অত্যন্ত কম। ভূঁইয়া মোহাম্মদ মনোয়ার কবিরের পলিটিকস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অব দ্য জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশ (কবির ২০০৬), মাইদুল ইসলামের লিমিটস অব ইসলামিজম: জামায়াতে ইসলামী ইন কনটেম্পোরারি ইন্ডিয়া অ্যান্ড বাংলাদেশ (ইসলাম ২০১৫) এবং সৈয়দ সিরাজুল ইসলাম ও মোহাম্মদ সাঈদুল ইসলাম সম্পাদিত গ্রন্থ দ্য জামায়াত কোয়েশ্চন ইন বাংলাদেশ: ইসলাম, পলিটিকস অ্যান্ড সোসাইটি ইন আ পোস্ট-ডেমোক্রেটিক নেশন (ইসলাম ও ইসলাম ২০২৩) জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য বই। এর বাইরে ২০০৯ সালে প্রকাশিত ইরফান আহমেদের ইসলামিজম অ্যান্ড ডেমোক্রেসি ইন ইন্ডিয়া: দ্য ট্রান্সফরমেশন অব জামায়াতে ইসলামী (আহমদ ২০০৯) বইয়ে বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামী বিষয়ে আলোচনা আছে। এর মানে এই নয় যে জামায়াতে ইসলামী বিষয়ে আলোচনার ঘাটতি আছে, বরং বাংলাদেশের রাজনীতি এবং ইসলামপন্থী রাজনীতিবিষয়ক আলোচনা, বই, প্রবন্ধ ও নিবন্ধে জামায়াতের সাংগঠনিক দিক, আদর্শিক অবস্থান ও রাজনীতির প্রসঙ্গ অনিবার্যভাবেই এসেছে। রাজনৈতিক আলোচনাগুলো—যাতে জামায়াতের তীব্র সমালোচনা আছে এবং আবার তার প্রতি দ্বিধাহীন সমর্থনও আছে—বাদ দিলেও জামায়াতের বিষয়ে আলোচনাগুলো বাইরে থেকে দেখা। অর্থাৎ জামায়াতে ইসলামীকে গবেষকেরা যেভাবে দেখেছেন, সেভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। বিদ্যায়তনিক আলোচনায় সেটাই স্বাভাবিক।
এযাবৎ জামায়াতের সঙ্গে যুক্ত যাঁরা, তাঁরা তাঁদের অবস্থান থেকে জামায়াতের ইতিহাস, তার সাফল্য-ত্রুটিবিচ্যুতি বলার চেষ্টা করেননি। আবদুর রাজ্জাক সেই চেষ্টা করেছেন। এই জায়গায় বইটি সবার চেয়ে আলাদা। এই বইয়ের প্রথম চারটি অধ্যায়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাস এবং এর সঙ্গে লেখকের সংযুক্তি, অংশগ্রহণ, বিতর্ক এবং পদত্যাগের বিষয় বর্ণনা করা হয়েছে। সেই বিবেচনায় ব্যারিস্টার রাজ্জাকের বইটাই প্রথম, যা এই দলকে আমাদের সামনে ভিন্নভাবে তুলে ধরেছে। আবদুর রাজ্জাকের বইয়ের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে এটা স্মরণ করিয়ে দেওয়া যে জামায়াতে ইসলামী একটি ক্রান্তিকালে দাঁড়িয়ে আছে। তাঁর ভাষায়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান অনস্বীকার্য, কিন্তু দলটির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সে যে অতীতকে এড়িয়ে আছে, তার মোকাবিলা করতে প্রস্তুত কি না তার ওপরে (রাজ্জাক ২০২৬: ১৮৫)।
আবদুর রাজ্জাক তাঁর বইয়ে ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে জামায়াতের কার্যক্রম এবং সিদ্ধান্তের আলোচনা করার আগে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন। যাকে তিনি বলেছেন নেতৃত্বের ঘাটতি এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষয় (তাঁর ভাষায় ‘লিডারশিপ ডেফিসিট অ্যান্ড ইন্টেলেকচুয়াল ডিকলাইন’)। ‘জামায়াত কেন গত ৮০ বছরে স্বপ্নদর্শী (ভিশনারি) নেতা তৈরি করতে পারেনি?’ এই ধরনের নেতার উদাহরণ হিসেবে তিনি রাশেদ ঘানুচি, রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ও আনোয়ার ইব্রাহিমের উল্লেখ করেছেন। তিনি মনে করেন যে জামায়াতের সাংগঠনিক কাঠামো এবং কর্মসূচি এই ধরনের নেতার বদলে কর্মী তৈরি করে। দ্বিতীয় প্রশ্ন হচ্ছে, জামায়াতের ভেতরে ক্রমাগতভাবে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার ক্ষয় হয়েছে। তিনি মনে করেন যে জামায়াতে ইসলামী রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার ফলেই এই ক্ষয় হয়েছে (রাজ্জাক ২০২৬: ১০)। প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ্য যে জামায়াতের কর্মসূচি চারটি—১. দাওয়াত ও তাবলিগ (চিন্তার পরিশুদ্ধি ও পুনর্গঠন), ২. সংগঠন ও প্রশিক্ষণ, ৩. সমাজসংস্কার ও সমাজসেবা, ৪. রাষ্ট্রীয় সংস্কার ও সংশোধন। শেষটি হচ্ছে রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী।
প্রথম চারটি অধ্যায়ের যে বিষয় প্রধান হয়ে উঠছে, তা হচ্ছে ১৯৭১ সাল প্রসঙ্গ। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় জামায়াতে ইসলামী স্বাধীনতার বিরোধিতা করে এবং এই প্রশ্নে সুস্পষ্টভাবে বিরোধী ভূমিকা নেয়। ব্যারিস্টার রাজ্জাক তাঁর বইয়ে জানাচ্ছেন যে ১৯৯৩ সাল থেকেই ১৯৭১ সালের ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্ন দলের ভেতরে আলোচনা ছিল। আবদুর রাজ্জাক যেমন জানান, প্রকৃতপক্ষে এই আলোচনার সূত্রপাত ১৯৭৬ সালে আইডিএল প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যই ছিল জামায়াতের সংস্কার। ১৯৭৬ সালের জুলাই মাসে রাজনৈতিক দলবিধির (পিপিআর) আওতায় আবেদন করেও জামায়াত অনুমোদন পায়নি, কিন্তু ১৯৭৮ সালে জামায়াত নেতা গোলাম আযম বাংলাদেশে আসার পরে তিন বছর আগে করা অঙ্গীকার ভঙ্গ করে ১৯৭৯ সালে জামায়াতের উত্থান ঘটানো হয়েছিল। এই আলোচনার সূত্র ধরেই ১৯৮২ সালে মাওলানা আবদুল জাব্বার এবং ছাত্রশিবির নেতা আহমদ আবদুল কাদের বাচ্চুর নেতৃত্বে দলের একাংশকে আলাদা করে ইসলামী যুব শিবির তৈরি করেছিলেন। ১৯৯৪ সালে আবদুর রাজ্জাক এবং অন্যরা এই ক্ষমাপ্রার্থনার বিষয় সামনে আনেন।
তারপর ২০০১ সালে যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত জামায়াত নেতারা সংস্কার নিয়ে সুস্পষ্টভাবে প্রস্তাব পাঠান বলে জানা যায়। ঢাকায় একই ধরনের উদ্যোগের অংশ হিসেবে একটি খসড়া তৈরির এবং তাঁর ভাষ্য আবদুর রাজ্জাকের বইয়ে আমরা দেখতে পাই। ২০১০ সালের মাঝামাঝি দলের একাংশ কামারুজ্জামান ও মীর কাসেম আলীর নেতৃত্বে সংস্কারের উদ্যোগ নেয়, এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে ছাত্রশিবিরের তৎকালীন সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল্লাহ আল মামুনসহ সংশ্লিষ্ট নেতারা পদত্যাগ করেন। কারাগার থেকে ২০১০ সালের নভেম্বরে কামারুজ্জামানের লেখা চিঠি এবং তার পরে দলের প্রতিক্রিয়া বিষয়ে এখন সবাই জ্ঞাত। কামারুজ্জামান তাঁর চিঠিতে সাংগঠনিকভাবে তিনটি সম্ভাব্য পদক্ষেপের কথা বলেছিলেন—এক. ‘যা হবার হবে। আমরা যেমন আছি, তেমনি থাকব।’ দুই. ‘পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জামায়াত সিদ্ধান্ত নিয়ে পেছন থেকে একটি নতুন সংগঠন গড়ে তুলবে। এই সংগঠন প্রজ্ঞা ও দৃঢ়তার সঙ্গে ধর্মহীন শক্তির মোকাবিলা করবে।’ তিন. ‘আমাদের যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের মিথ্যা অভিযোগ আনা হচ্ছে, তারা জামায়াতের নেতৃত্ব থেকে সরে দাঁড়াব এবং সম্পূর্ণ নতুন লোকদের হাতে জামায়াতকে ছেড়ে দেব। অর্থাৎ, একটা নিউ জেনারেশন জামায়াত হবে এটি।’
এ বিষয়ে জামায়াতের দলগত অবস্থান বোঝা গিয়েছিল তৎকালীন আমির মতিউর রহমান নিজামীর স্ত্রী ও জামায়াতের মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি শামসুন্নাহার নিজামীর লেখায়। ২০১১ সালের ১১ ও ২৫ মার্চ সাপ্তাহিক সোনার বাংলায় ‘বিবেচনায় আনতে হবে সবকিছু’ এই শিরোনামে দুই কিস্তিতে প্রকাশিত লেখায় তিনি কামারুজ্জামানের প্রস্তাবগুলোর জবাব দেন। শামসুন্নাহার নিজামী লেখেন, জামায়াত মনে করে, যেকোনো পরিস্থিতিতে বা পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে নতুন কোনো কর্মকৌশল নয়, বরং শাশ্বত কর্মকৌশলই অবলম্বন করতে হবে। পরিস্থিতি যতই নাজুক হোক, চ্যালেঞ্জ যত কঠিনই হোক; শর্টকাট কোনো পথ নেই। এই ঘটনাগুলো নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু আবদুর রাজ্জাক কামারুজ্জামানের চিঠির প্রসঙ্গ ছাড়া (রাজ্জাক ২০২৬: ১০২-১০৩) অন্য বিষয়গুলো উল্লেখ করেননি। সম্ভবত এই কারণে যে এই বই তাঁর আত্মজীবনীমূলক, তাঁর অভিজ্ঞতা এবং চেষ্টার বর্ণনা।
২০১১ সালে তিনি দলের মজলিসে শুরায় তাঁর বক্তব্য উপস্থাপন করেন এবং ২০১৬ সালে জামায়াতের নেতাদের কাছে তিনি বিস্তারিত চিঠি লেখেন। তাঁর চিঠির আগের এসব ঘটনা, যার সঙ্গে তিনি প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত না থাকলেও যার অভিঘাত দলে ছিল, সেগুলো ফুটনোট আকারে হলেও উল্লিখিত হলে পাঠকেরা বুঝতে পারতেন যে এই বিষয়ে দলের ভেতরে আলোচনা-বিতর্ক আছে। বিশেষ করে যখন তিনি কামারুজ্জামানের চিঠির প্রসঙ্গ সংক্ষেপে তুলে ধরেছেন। দলের সংস্কার এবং ১৯৭১ প্রশ্নে ভিন্নমতের জন্য ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জামায়াতের নির্বাহী পরিষদের সদস্য মুজিবুর রহমান মঞ্জুকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। আবদুর রাজ্জাক পদত্যাগ করেন। জামায়েতের ভেতরে এই বিষয়ে এর পরেও আলোচনা হয়েছে বলেই জানা যায়। ফলে এই প্রশ্নটি এখনো অমীমাংসিতই থেকে গেছে, আবদুর রাজ্জাক একে জামায়াতের ‘একিলিস হিল’ বলে বর্ণনা করেছেন।
বইয়ের দ্বিতীয় ভাগ বলে আমি যাকে বর্ণনা করেছি, তাতে তিনটি প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছে। প্রথমত, শরিয়াহ আইন বাস্তবায়ন ও দ্বীন প্রতিষ্ঠার যে দায়িত্ব, তা কি রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নেওয়াকে প্রয়োজনীয় করে তোলে? (সহজ ভাষায় বললে শরিয়াহ আইন বাস্তবায়ন ও দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য কি ক্ষমতায় যেতেই হবে?)। দ্বিতীয়ত, খিলাফত বা ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা কি মুসলিমদের জন্য ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা? তৃতীয়ত, ‘ইসলামি রাষ্ট্র’ কি একটি লক্ষ্য নাকি অন্য লক্ষ্যে পৌঁছানোর উপায়? এই প্রশ্নগুলো বিশ্বজুড়ে ইসলামি আন্দোলন এবং ইসলামি রাষ্ট্রচিন্তার বিষয়ে আলোচনায় বিভিন্নভাবেই কয়েক দশক ধরে আলোচিত হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশে বিভিন্ন কারণেই এই নিয়ে আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি হয়নি। আবদুর রাজ্জাক তাঁর বইয়ে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তিনি এ বিষয়ে ইসলামি রাজনৈতিক চিন্তাবিদ—আবুল আ’লা মওদুদী, হাসান আল বান্না, সাইয়িদ কুতুব এবং মোহাম্মদ আসাদ-এর ধ্যানধারণাগুলো আলোচনা করেন (রাজ্জাক ২০২৬: ১১৮-১৩০)। শেখ ইউসুফ আল কারাদাউই, হাসিম কামালি, আলী আবদ আল-রাজিক এবং আবদুল্লাহ আল-নাইম, রাশেদ ঘানুচির চিন্তাভাবনাগুলোর আলোকে তিনি এই উপসংহারে পৌঁছান যে মুসলিমদের জন্য খেলাফত বা ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কোনো ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা নেই। শুধু তা–ই নয়, তিনি বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকে ‘ইলুসারি’ (বা অলীক) বলে যে মত, তার দিকেই ঝোঁকেন।
এখানে দুটি বিষয় বলা দরকার যে প্রথমত, রাজ্জাক ইসলামি রাষ্ট্রচিন্তার অন্য চিন্তাবিদদের ধ্যানধারণাগুলোর আলোচনায় যাননি। ইবনে তাইমিয়া, মোহাম্মদ আবদু এবং রশিদ রিদার রাষ্ট্রচিন্তার মধ্যে যে ইসলামি রাষ্ট্র বা খিলাফতের ধারণা, তার প্রভাব এখনো ইসলামপন্থীদের মধ্যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিদ্যমান, তাঁদের বক্তব্যকে আলোচনায় নেওয়া জরুরি বলেই আমার ধারণা। দ্বিতীয়ত, রাজ্জাক যেভাবে বান্না বা কুতুবের ধারণাকে পাঠ করেন এবং তার মধ্যে যে যৎসামান্য নমনীয়তার জায়গা দেখেন, তা আমার পাঠের সঙ্গে ভিন্ন। মুসলিম ব্রাদারহুড সমাজের ইসলামীকরণের আন্দোলন হিসেবে সূচিত হলেও বান্না যে একদলীয় ব্যবস্থার কথা বলেন, তা গণতান্ত্রিক ধারণার পরিপন্থী (রাজ্জাক ২০২৬: ১২৫)। মওদুদীর ধারণার যে সংক্ষিপ্ত পরিচিতি এবং সমালোচনা এই বইয়ে আছে, তা যথার্থ। কেন ইসলামি রাষ্ট্র বা ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র, এমনকি আদর্শভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করলে সমস্যা হবে সমালোচকদের উদ্ধৃত করে রাজ্জাক দুটি কারণ বলেছেন—ইসলামি রাষ্ট্র স্থিতিশীলতা প্রদান করতে পারবে না এবং আদর্শভিত্তিক রাষ্ট্রের কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠার আশঙ্কা আছে। তিনি রাশেদ ঘানুচির ‘মিনিমাল স্টেট’-এর পক্ষেই অবস্থান নিয়েছেন।
রাজ্জাক এই আলোচনায় যে প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন, তা হচ্ছে সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন (রাজ্জাক ২০২৬: ১৪৪)। কিন্তু তিনি এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা থেকে বিরত থাকেন। জামায়াতে ইসলামীর সংস্কার বিষয়ে ২০১৯ সালে যখন আলোচনা ও বিতর্ক ওঠে, সেই সময়ে এই বিষয়ে সংক্ষেপে যা বলেছিলাম, তা উদ্ধৃত করার তাগিদ অনুভব করছি। আমি লিখেছিলাম যে,
‘কুতুব, বান্না ও মওদুদী এই অবস্থানের ওপরে তাঁদের রাজনৈতিক আদর্শ তৈরি করেন যে সার্বভৌমত্বে হচ্ছে ঐশ্বরিক (ডিভাইন সভেরনটি), ফলে তা ব্যক্তির নয়। সহজ ভাষায় বললে আইন প্রণয়নের অধিকার শুধু আল্লাহ–তা’আলার; মানুষ হচ্ছে তাঁর প্রতিনিধি (বা ভাইস-রিজেন্ট)। ফলে কোরআনে সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত বিধানের বাইরে আইন প্রণয়নের কোনো সুযোগ মানুষের নেই। এই বিষয়ে প্রচলিত ইসলামপন্থী তাত্ত্বিকদের ব্যাখ্যার সমর্থনে যেমন কথাবার্তা হয়েছে, তেমনি তার বিপরীতে কোরআন, সুন্নাহ এবং ইসলামের ইতিহাসের আলোকেও ভিন্ন ব্যাখ্যা হয়েছে। যাতে বলা হয়েছে যে ইজতিহাদের (যুক্তিসিদ্ধ আলোচনা) আলোকে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার ইসলাম মানুষের ওপরে অর্পণ করেছে। ফলে ডিভাইন সভেরনটির নামে রাষ্ট্র পরিচালনা ও আইনশাস্ত্রকে সীমিত করা এবং একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যাকে অনুসরণের ধারণা সঠিক নয়। ইসলামপন্থী তাত্ত্বিক হিসেবে রাশিদ ঘানুচি ইজতিহাদের আলোকে বলেন যে আসলে মুসলিম সমাজের বা উম্মাহর সার্বভৌমত্ব আছে, ঐশ্বরিক সার্বভৌমত্বের ব্যাখ্যাকে তিনি নাকচ করে দেন। যেখানে মওদুদী মনে করেন যে গণতন্ত্রকে হতে হবে ‘থিও-ডেমোক্রেসি’, সেখানে ঘানুচি বলেন অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের কথা। ঘানুচি সেক্যুলারিজমের পক্ষে অবস্থান নেন, শরিয়াহভিত্তিক ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থার বিপরীতে সিভিল রাষ্ট্রের কথা বলেন।’ (রীয়াজ ২০১৯)।
এই প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে ইসলামপন্থী রাজনীতির ভবিষ্যৎ বা ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাব্যতা বা বাস্তবতা বিচার সম্ভব নয়। একই সঙ্গে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে যাঁরা রাষ্ট্রবিষয়ক পঠন-পাঠনে যুক্ত, তাঁদেরও এই নিয়ে আরও বেশি আলোচনা করা দরকার। এই নিয়ে বৈশ্বিক পরিসরে প্রায় দুই দশক ধরেই একাডেমিকভাবে আলোচনা হচ্ছে।
আবদুর রাজ্জাক প্রচলিত অর্থে ইসলামি দল করার পক্ষে নন; কিন্তু ইসলামি দলকে তিনি সমাজের ইসলামীকরণের একটি উপায় বলে মনে করেন। তিনি মনে করেন, ‘ওপর থেকে’ রাষ্ট্রের মাধ্যমে ইসলামি আদর্শ–ন্যায়বিচার ও সমাজকল্যাণ – প্রতিষ্ঠা না করে সমাজের ভেতর থেকে ইসলামের মৌলিক আদর্শগুলো মানুষের ভেতরে ছড়িয়ে দেওয়া মুসলিমদের নৈতিক দায়িত্ব (রাজ্জাক ২০২৬: ১১৮)। মানুষের ভেতরে ‘ইসলামি জাগরণ’ (‘ইসলামিক অ্যাওয়েকেনিং’; রাজ্জাক ২০২৬: ১১৯) বিভিন্নভাবে প্রকাশিত হতে পারে। তিনি একেই ইসলামি রাজনীতি বলছেন, কেননা তিনি মনে করেন যে ইসলামের সঙ্গে রাজনীতির ভেদ তৈরি করা যায় না, যাকে ইনসেপারিবিলিটি বলে বর্ণনা করা হয়ে থাকে। তিনি ইসলামি সমাজ যাঁরা প্রতিষ্ঠা করতে চান, তাঁদের রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের বিকল্পকে ইসলামি আন্দোলনের নেতাদের বিবেচনার জন্য রেখেছেন (রাজ্জাক ২০২৬: ১৫৪)। কিন্তু তিনি সেটার পক্ষে বলেননি। তাঁর পরামর্শ হচ্ছে, দলের বাইরে স্বাধীনভাবে সামাজিক-সাংস্কৃতিক-বুদ্ধিবৃত্তিক-গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠার (রাজ্জাক ২০২৬: ১৫৪-১৫৭)। তিনি এই প্রশ্নে অধ্যাপক খুরশিদ আলমের উদ্ধৃতি দেন, ‘দাওয়া এবং রাজনীতি একই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। এগুলোকে আলাদা করা যায়’ (রাজ্জাক ২০২৬: ১৫৯)।
কীভাবে ইসলামি আন্দোলন পরিচালনা করা এবং রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করা যায়, রাজ্জাক তাঁর তিনটি মডেলের কথা বলেছেন—তিউনিসিয়ার আন-নাহদা (Ennahda Movement), তুরস্কের একেপি (Adalet ve Kalkınma Partisi) এবং মরক্কোর জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (পিজেডি)। এ বিষয়ে ২০১৯ সালে আমার অবস্থান ছিল যে ‘ইসলামপন্থী রাজনীতির ক্ষেত্রে তিউনিসিয়া, তুরস্ক ও মরক্কোর দলগুলোর অভিজ্ঞতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে যে তারা ইসলামপন্থী রাজনীতির প্রচলিত গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক নেতাদের দেওয়া পথ ও পদ্ধতি থেকে সরে এসে নিজেদের মতো করে আদর্শিক অবস্থান এবং পথ তৈরি করেছে। এ প্রসঙ্গে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে যে তিউনিসিয়ার আন-নাহদার নেতা রাশিদ ঘানুচি নতুন তত্ত্বের কথা বলেছেন।’ রাজ্জাক তাঁর বইয়ে দলগুলোর সাংগঠনিক পরিবর্তন বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন এবং এই আদর্শিক অবস্থানের পরিবর্তনের দিকে মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। কিন্তু যা দরকার তা হচ্ছে এ বিষয়ে আরও বেশি তত্ত্বগত আলোচনা।
আবদুর রাজ্জাকের এই বই এমন সময় প্রকাশিত হয়েছে, যখন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী প্রধান বিরোধী দল হিসেবে সংসদে রয়েছে। এটি কেবল বাংলাদেশের ইতিহাসে জামায়াতের সবচেয়ে ভালো নির্বাচনী ফল নয়, দক্ষিণ এশিয়ায় জামায়াতের কোনো শাখাই এখন পর্যন্ত এই অবস্থানে আসতে পারেনি। এই রকম পটভূমিকায় এই বই নিয়ে অনেক আলোচনা হবে বলেই আমি মনে করি। তবে ১৯৭১ সালের ক্ষমাপ্রার্থনার বিষয়ই আলোচনায় প্রাধান্য পাবে। জামায়াতের সমালোচকেরা একে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেবেন, অন্যদিকে জামায়াতের সমর্থকেরা একে খুব সহানুভূতির সঙ্গে নেবেন না। কিন্তু এটা অস্বীকারের উপায় নেই যে জামায়াতের পক্ষ থেকে ১৯৭১ সালের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা দল এবং দেশের জন্যই দরকার। তবে এই বইয়ের গুরুত্ব কেবল এখানেই নয়; এই বই জামায়াতের আদর্শিক অবস্থানের বিষয়ে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে যেসব প্রশ্ন তুলেছে, সেগুলো জামায়াতের নেতাদের বিবেচনায় নেওয়া দরকার। একই সঙ্গে রাষ্ট্র, নাগরিকদের ‘সার্বভৌমত্বের’ যেসব তত্ত্বগত প্রশ্ন আছে, সেগুলো আমাদের সবার বিবেচনা করা এবং আলোচনা করা দরকার। এই জন্যই এই বই অনেকে পাঠ করবেন, আলোচনা করবেন, সেটাই আশা করি। ইউপিএল বইটি প্রকাশ করে সেই সুযোগ তৈরি করেছে, সে জন্য ইউপিএল-কে ধন্যবাদ।
ইলিনয়, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
গ্রন্থপঞ্জি
আহমদ ২০০৯।। Irfan Ahmad, Islamism and Democracy in India: The Transformation of Jamaat-e-Islami, Princeton, NJ: Princeton University Press।
ইসলাম ২০১৫।। Maidul Islam, Limits of Islamism: Jamaat-e-Islami in Contemporary India and Bangladesh, Cambridge: Cambridge University Press।
ইসলাম ও ইসলাম ২০২৩।। Syed Serajul Islam and Md Saidul Islam সম্পাদিত, The Jamaat Question in Bangladesh: Islam, Politics and Society in a Post-Democratic Nation, London: Routledge।
কবির ২০০৬।। Bhuian Md. Monoar Kabir, Politics and Development of the Jamaat-e-Islami, Bangladesh, Dhaka: A. H. Development Publishing House।
রাজ্জাক ২০২৬।। Abdur Razzaq, Bangladesh Jamaat-e-Islami: Its History and Politics, Dhaka: The University Press Limited।
রীয়াজ ২০১৯।। আলী রীয়াজ, ‘জামায়াত: সাংগঠনিক না আদর্শিক সংস্কার?’, প্রথম আলো, ১৯শে ফেব্রুয়ারি।
লেখক পরিচিতি
অধ্যাপক আলী রীয়াজ বাংলাদেশি-মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, ও লেখক। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর। তাঁর গবেষণার প্রধান ক্ষেত্র গণতন্ত্রায়ণ, স্বৈরতন্ত্রীকরণ, রাজনৈতিক ইসলাম, সহিংস উগ্রবাদ, রাষ্ট্র–সমাজ সম্পর্ক, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা ও শিক্ষকতার পর তিনি ইস্ট-ওয়েস্ট সেন্টারের ফেলো হিসেবে ইউনিভার্সিটি অব হাওয়াই থেকে যোগাযোগ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব লিংকন ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্ল্যাফলিন ইউনিভার্সিটিতেও শিক্ষকতা করেছেন; লন্ডনে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে প্রযোজক ও জ্যেষ্ঠ সম্প্রচার সাংবাদিক হিসেবেও কাজ করেছেন। ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটিতে তিনি বিভাগীয় প্রধান, ইউনিভার্সিটি প্রফেসর এবং টমাস ই. আইমারম্যান প্রফেসরসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের সভাপতি এবং আটলান্টিক কাউন্সিলের অনাবাসিক জ্যেষ্ঠ ফেলো। ২০২৩ সালে সুইডেনের ভি-ডেম ইনস্টিটিউটে ভিজিটিং গবেষক ছিলেন। বাংলাদেশে তিনি সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলা ও ইংরেজিতে তাঁর বহু গ্রন্থ, গবেষণা-প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়েছে; বিশেষত বাংলাদেশের গণতন্ত্র, নির্বাচন, কর্তৃত্ববাদ, মাদ্রাসাশিক্ষা ও ইসলামপন্থী রাজনীতি বিষয়ে তাঁর গবেষণা দেশ-বিদেশে সুপরিচিত।