তিতাস একটি নদীর নাম, নাকি জীবনের
· Prothom Alo

নদীর এপাড় ভাঙে তো ওপাড় গড়ে। আবার এপাড় গড়লে ওপাড় ভাঙে। নদীর বুকে চর জাগে, মানুষ সেখানে বাস করে, আবার কোনো একদিন সেই মানুষই নদীর গহিনে হারিয়ে যায়। নদী বয়ে চলে। তার সঙ্গে বয়ে চলে মানুষের জীবনও।
তিতাস নদীর পাড়ে এক গ্রামে মালোদের বাস। এপাড়ার ছেলে থেকে বুড়ো, সবাই মাছ ধরার ওপরেই বেঁচে থাকে। নারীরা জাল বোনে, ছেলেরা উঠোনজুড়ে খেলে। একটু বয়স বাড়লেই নৌকায় গিয়ে মাছ ধরতে শেখে। কারও নিজের নৌকা আছে, কেউ অন্যের নৌকায় যায়। মাছ ধরা, মাছ বিক্রি করা, জাল বোনা আর নিজেদের কিছু উৎসব পালন, এভাবেই চলতে থাকে জীবন।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
উর্বর তিতাস এদের নিরাশ করেনি। হাসি-কান্না, জন্ম-মৃত্যু, আনন্দ-বিষাদ, সবকিছুরই সাক্ষী এই নদী। কতকাল ধরে এসব সে নীরবে দেখেছে। দেখেছে আর বয়ে চলেছে। কত মানুষের গল্প নিজের বুকের মধ্যে গিলে নিয়েছে।
এই মালোপাড়ারই বাসিন্দা কিশোর, সুবল ও বাসন্তী। ওরা এই সমাজের সদ্য কৈশোরে পা দেওয়া মানুষের প্রতিনিধি। বয়স বাড়লে দুই বন্ধু কিশোর ও সুবল তিতাস পাড়ি দিয়ে মাছ ধরতে যায় অন্য এক গ্রামে। বহু দিনের পথ। ঝড়-তুফান পেরিয়ে যে গ্রামে তারা যায়, সেখানে এক মেয়েকে দেখে কিশোরের মনে ধরে যায়। সেখানেই বিয়ে হয় তার।
কিন্তু সেই গ্রামের পাট চুকিয়ে ফেরার রাতেই ডাকাতের কবলে পড়ে কিশোরের নৌকা। ডাকাতেরা তার নববধূকে নিয়ে যায়। যাকে দুই দণ্ড ভালো করে দেখার সুযোগও সে পায়নি, তাকেই হারিয়ে ফেলে কিশোর।
এদিকে মালোদের উৎসবের এক প্রচলিত রীতি মেনে বাসন্তীর সঙ্গে সুবলের বিয়ে হয়। কিন্তু কিশোর তখন ধীরে ধীরে উন্মাদ হয়ে যায়। বিয়ের কয়েক দিনের মধ্যেই বিধবা হয় বাসন্তী, সুবলের বউ।
অভাবী সুবল, কিশোর, তাদের পরিবার, সবাই যেন একই অনিশ্চয়তার মধ্যে বেঁচে থাকে। যে বুড়ো বাবা-মায়ের এই বয়সে ছেলে আর ছেলের বউয়ের দেখাশোনা পাওয়ার কথা, সেই বুড়ো বাবাকেই শেষ পর্যন্ত পাগল ছেলের জন্য কপাল চাপড়ে কাঁদতে হয়।
মালোদের ছেলে মরল, কেউ পাগল হলো, কেউ–বা বেঁচে রইল। কিন্তু কার কী এসে যায়? এভাবেই তো মালোদের দিন চলে।
এই সুবল, কিশোর, বাসন্তী, উদয়তারা, বনমালী সবাই যেমন মালোপাড়ার প্রচ্ছন্ন প্রতিচ্ছবি, তেমনই হয়তো আমাদের সমাজেরই। ‘পদ্মানদীর মাঝি’র মতোই এরাও একটা জালে আটকা, একটা গোলকধাঁধায় আটকা! সে ফাঁদ কেটে কেউ বেরোতে পারে কি?
একদিন এক বিধবা ছোট্ট ছেলে অনন্তের হাত ধরে এসে হাজির হয় এই গ্রামে। সেই মা মালোদের ঘরে আশ্রয় পায়। কারণ, তার নিজের ঘর নেই। আগে-পরে কেউ নেই। ডাকাতের ভয়ে একসময় নদীর জলে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সে। এত দিন এক বুড়ো-বুড়ির আশ্রয়ে ছিল। এবার আশ্রয়ের খোঁজে এসে ওঠে তিতাসের পাড়ে।
সে যদি জানত, এই সেই গ্রাম, যেখানে আছে তার হারিয়ে যাওয়া মনের মানুষ! পাগল কিশোরকে দেখে প্রথমে চিনতে না পারলেও একসময় অনন্তর মা তাকে চিনে ফেলে। ধীরে ধীরে বাসন্তী, গ্রামের মানুষ এবং অন্যরাও জানতে পারে, এই পাগল কিশোরই তার হারিয়ে যাওয়া স্বামী। কিন্তু সবকিছু জানাজানি হওয়ার কিছুদিন পরেই কিশোর ও অনন্তের মা, যে নারীর নামও যেন সময়ের আড়ালে হারিয়ে গেছে, দুজনই মারা যায়।
বইয়ের পাতায় চেনা জীবন—কাফকার ‘দ্য ট্রায়াল’বিধবা মায়ের ছেলে, দরিদ্র ও অসহায় অনন্ত তখন বাসন্তীর ঘরেই আশ্রয় পায়। বাসন্তীর সঙ্গে তার সম্পর্ক হয় পাতানো মাসির। কিন্তু সংসারের অভাব আর বাসন্তীর মায়ের মুখঝামটার কারণে বাপ-মা হারা অনন্তকে একদিন সেই ঘর থেকেও তাড়িয়ে দেওয়া হয়।
বাসন্তীর মায়েরই–বা দোষ কী? ঘাড়ের ওপর বিধবা মেয়ে, সংসারে অভাব, স্বামীর আয় নেই। সবকিছু মিলিয়ে তারও তো এক অসহায় জীবন। ঘরহীন, আশ্রয়হীন অনন্তর জীবনে তখন অনন্ত পৃথিবী ছাড়া আর কিছুই নেই।
ভাসতে ভাসতে অনন্তের আশ্রয় হয় উদয়তারা ও তার ভাই বনমালীর কাছে, অন্য এক গ্রামে। সেখানে পরিচয় হয় অনন্তবালা নামের এক বালিকার সঙ্গে। যে মেয়ে শেষ দিন পর্যন্ত অনন্তের ফিরে আসার অপেক্ষা করে যায়।
একদিন অনন্ত অক্ষর চিনতে শেখে। তারপর ঘর ছাড়ে সে। এরপর তাকে আর এই পাড়ায় ফিরে পাওয়া যায় না। কিংবা হয়তো সে নিজেই পালাতে চায় নিজের অতীত থেকে।
এভাবেই সময় কাটে। তিতাসের এক পাড় ভাঙে, অন্য পাড় গড়ে। চর জাগে। সেই চর দখল করে জমিদারেরা। মালোরা কিছুই করতে পারে না। শূন্য হাতে ফিরে আসে তারা। না জল, না ডাঙা! কী আছে তাদের?
তিতাস তখন শুধু একটি নদী থাকে না। যেন জীবনেরই আরেক নাম হয়ে ওঠে।
অনন্ত কি ফিরবে সেই গ্রামে?
শত হলেও, নদীগর্ভে হারিয়ে গেলেও অনন্ত যে এই মালোপাড়ারই ছেলে। অনন্তের ফেরা কিংবা না ফেরার এই দোলাচলের মধ্য দিয়েই একসময় নদী শুকিয়ে যায়। ধ্বংস হয়ে যায় মালোপাড়া।
এই রকম হাজারো আনন্দ-বেদনা, দুঃখ-কষ্ট আর উৎসবের সাক্ষী এই তিতাস।
অদ্বৈত মল্লবর্মণের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ বাংলা সাহিত্যের অমূল্য এক সম্পদ। অথচ বইটি নিয়ে আলোচনা খুব বেশি চোখে পড়ে না। মনে হয়, ধীরে ধীরে যেন আমাদের পাঠের জগৎ থেকে বইটি হারিয়ে যাচ্ছে। হয়তো বাংলা সাহিত্য নিয়ে যাঁরা পড়াশোনা করেন, তাঁরা বইটি পড়েন। কিন্তু এত পাঠকের ভিড়ে বইটির আবেদন কোথায়, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
গণতন্ত্রের অপূর্ণতার উত্তর ‘নেতা জনতা ও রাজনীতি’ বইয়ে আছে কীবইটি পড়লে মালো কিংবা আজকের ভাষায় জেলেদের জীবনের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায়। এই চিত্রের কিছুটা আমরা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মানদীর মাঝি’ উপন্যাসেও পাই। চাইলে দুটি উপন্যাসকে পাশাপাশি রেখেও পড়া যায়।
আমরা জীবনকে যেভাবে দেখি, মালোদের জীবনও যেন তারই এক অখণ্ড রূপ। তিতাসের পাড়ের এই মানুষগুলোর জীবন কখনো আমাদের জীবনেরই প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। আবার কখনো মনে হয়, এ তো নিছকই মালোপাড়ার গল্প।
কে জানে? এই জীবন, তিতাসপাড়ের মানুষের জীবন, বোঝার বা এ নিয়ে আলোচনা করার মতো যোগ্যতা আমার মতো সামান্য পাঠকের আছে কি না, সেটাও ভাবি। তাই হয়তো ব্যাখ্যা করার চেয়ে বইটি পড়ার কথাই বলব।
হয়তো পড়তে পড়তে জীবনের অনেক আক্ষেপ তিতাসের জলে মিশে যাবে। হয়তো...
বইটি পড়ুন। বুঝুন। অনুভব করুন।