ভারতে ভোটার তালিকা ঠিক করার নামে আসলে যা হচ্ছে

· Prothom Alo

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ভারতের নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার লিখিত আপত্তি জানিয়েছেন দুই নির্বাচন কমিশনার।

নতুন ভোটার নিবন্ধন ফরমে একতরফাভাবে ও ‘অননুমোদিতভাবে’ পরিবর্তন আনা এবং চলমান বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন বা এসআইআর কার্যক্রমে বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার বিষয়েও তাঁরা আপত্তি জানিয়েছিলেন।

Visit somethingsdifferent.biz for more information.

ফলে ভোটার তালিকা পরিষ্কারের একটি নিয়মিত প্রশাসনিক উদ্যোগ এখন এমন এক বিশাল প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে, যা ভোটাধিকার, নাগরিকত্ব এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার সীমা নিয়ে মৌলিক প্রশ্ন তুলছে।

দিল্লির ভোটার তালিকার পরিস্থিতি এর ভয়াবহতা স্পষ্ট করে। রাজধানীর বিদ্যমান ভোটারদের ৫৪ দশমিক ৬ শতাংশ হয় ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন, নয়তো তাঁদের প্রকৃত ভোটার হিসেবে প্রমাণ করার জন্য নির্বাচন কমিশন নোটিশ দিয়েছে। দিল্লির এক কোটি ৪৫ লাখ নিবন্ধিত ভোটারের মধ্যে ৮০ লাখের বেশি এখন কমিশনের যাচাইয়ের আওতায়।

এর মধ্যে প্রায় ৪৭ লাখ ৫০ হাজার ভোটারকে অনুপস্থিত, অন্যত্র চলে যাওয়া, মৃত অথবা দ্বৈত ভোটার হিসেবে চিহ্নিত করে বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। আরও ৩৩ লাখ ১৩ হাজার ভোটারের ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রশাসনিক ও কারিগরি সমস্যা চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৯ লাখ ৩৩ হাজারের ক্ষেত্রে ‘যৌক্তিক অসামঞ্জস্য’ এবং ১৩ লাখ ৮০ হাজারের ক্ষেত্রে ২০০২ সালের ভোটার তালিকার সঙ্গে তথ্য না মেলার কথা বলা হয়েছে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত ৩১ লাখ ৬০ হাজারের বেশি নোটিশ তৈরি হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গে শুভেন্দু চ্যাপ্টার: বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কে কেমন প্রভাব ফেলবে

এটি শুধু দিল্লির ঘটনা নয়। এসআইআরের তৃতীয় ধাপে থাকা ১৯টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মধ্যে ১৭টিতেই ভোটার তালিকা ১৫ শতাংশের বেশি সংকুচিত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। জাতীয় পর্যায়ে ভোটার বাদ পড়ার সংখ্যা ১২ থেকে ১৩ কোটি হতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে। মহারাষ্ট্রে একাই সর্বোচ্চ দুই কোটি ভোটার বাদ পড়তে পারেন। দিল্লিতে ভোটার কমার হার হতে পারে ৩৫ দশমিক ৮৯ শতাংশ এবং চণ্ডীগড়ে ৩১ দশমিক ৮৪ শতাংশ। ফলে প্রশ্ন উঠছে, ভারতে ভোটাররা সরকার নির্বাচন করবেন, নাকি সরকার নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে ভোটার নির্বাচন করবে।

এসআইআর শুরুর আগেই দিল্লিতে ভোটার তালিকা থেকে অস্বাভাবিকভাবে ১১ লাখ ভোটারের নাম বাদ পড়েছিল। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে এই ঘটনা ঘটে। অথচ ২০২০ সালের বিধানসভা নির্বাচন থেকে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন পর্যন্ত দিল্লিতে প্রায় চার লাখ ভোটার যুক্ত হয়েছিলেন।

২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন থেকে ২০২৫ সালের বিধানসভা নির্বাচন পর্যন্তও প্রায় একই সংখ্যক ভোটার যুক্ত হন। ভারতের প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যা ২০২৪ সালের ৯৯ কোটি থেকে বর্তমানে আনুমানিক ১০৩ কোটিতে দাঁড়িয়েছে। স্বাভাবিকভাবে ভোটার সংখ্যাও বাড়ার কথা। কিন্তু বিশ্লেষক যোগেন্দ্র যাদবের হিসাব অনুযায়ী, জাতীয় ভোটার সংখ্যা ৮৮ কোটিতে নেমে যেতে পারে। এর অর্থ, প্রায় ১৫ কোটি নাগরিক কার্যত ভোটাধিকার হারাতে পারেন।

এই প্রক্রিয়ার অস্বাভাবিকতা বোঝা যায় নোটিশ পাওয়া ব্যক্তিদের তালিকা দেখলেও। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা এবং তাঁর পূর্বসূরিও তালিকায় রয়েছেন। অর্থাৎ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হওয়াও এর বাইরে থাকার নিশ্চয়তা দিচ্ছে না। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর জাতিসংঘে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করছেন, অথচ তাঁর ভোটার-যোগ্যতা নিয়েও নির্বাচন কমিশনের তৈরি করা প্রশ্ন রয়েছে। একজন নির্বাচন কমিশনার, সিবিআই পরিচালকসহ সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাও তালিকায় আছেন। সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট, সাবেক প্রধান বিচারপতি, সাবেক সেনাপ্রধান এবং সাবেক সেবি চেয়ারম্যানের নামও রয়েছে। নির্বাচন কমিশন অবশ্য বলছে, এতে প্রমাণ হয় যে প্রক্রিয়াটি বৈষম্যহীন।

ভোটাধিকারই ভারতীয় গণতন্ত্রের ভিত্তি। জনসংখ্যা বাড়ার সময় ভোটার তালিকা সংকুচিত হওয়া, প্রযুক্তিগত কারণে বাদ দেওয়া ১০ জনের মধ্যে ৯ জনের ভুল প্রমাণিত হওয়া এবং কোনো নাগরিকের নিজের দোষ না থাকা সত্ত্বেও লাখ লাখ মানুষের ভোটাধিকার ঝুঁকির মুখে পড়া—এসব ঘটনা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য গুরুতর উদ্বেগের কারণ।

কিন্তু এই যুক্তিই সমস্যার আরেকটি দিক সামনে আনে। মন্ত্রী, বিচারপতি বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ ও সংশোধনের জন্য প্রশাসনিক সুযোগ-সুবিধা আছে। সাধারণ নাগরিকের সেই সুযোগ নেই। তার ওপর অনেক অসামঞ্জস্য নাগরিকের ভুলের কারণে নয়, নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব তথ্যভান্ডারের ভুলের কারণে তৈরি হয়েছে। কোথাও বাবার বয়স ৪৫ বছর থাকার জায়গায় শূন্য হয়ে গেছে। কোথাও কেরানি নামের বানান ভুল করেছেন। এসব ভুলই পরে ‘যৌক্তিক অসামঞ্জস্য’ হিসেবে দেখানো হয়েছে।

গোয়াতেও এমন সমস্যার নজির পাওয়া গেছে। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর ২৩ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আট দিনে আটটি ই-মেইল করার পরও বৈধ ভোটারদের অনেকে তালিকায় ফিরতে পারেননি। এর ফলে ভোটার হিসেবে নিবন্ধনের সঙ্গে যুক্ত ডায়ালাইসিস থেকে অঙ্গ প্রতিস্থাপন পর্যন্ত বিভিন্ন জরুরি সুবিধা থেকেও মানুষ বঞ্চিত হয়েছেন।

দিল্লিতে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। ৭০টি বিধানসভা আসনের মধ্যে ২৪টিতে এখন নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা ২০২৫ সালের নির্বাচনে বাস্তবে ভোট দেওয়া মানুষের সংখ্যার চেয়েও কম। চাঁদনি চক আসনের একটি ভোটকেন্দ্রে ৯০৯ ভোটারের মধ্যে ৯০৮ জনকেই বাদ দেওয়ার জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে।

ভারতের নির্বাচন কমিশনের এসআইআর কার্যক্রমের আওতায় প্রকাশিত ২০২৬ সালের খসড়া ভোটার তালিকায় নাম রয়েছে কি না, তা যাচাইয়ে ভোটারদের সহায়তা করছেন বুথ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা।

পশ্চিমবঙ্গের অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে ২৭ লাখ ভোটারকে ‘যৌক্তিক অসামঞ্জস্যের’ অভিযোগে ট্রাইব্যুনালে যাচাইয়ের জন্য পাঠানো হয়েছিল। তথ্য অধিকার আইনে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিষ্পত্তি হওয়া ৮২ হাজার মামলার ৯১ শতাংশ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, ভোটারদের ভুলভাবে বাদ দেওয়া হয়েছিল। পরে তাঁদের নাম পুনর্বহাল করতে হয়েছে। অর্থাৎ ১০ জনের মধ্যে প্রায় ৯ জনকে ভুলভাবে বাদ দেওয়া হয়ে থাকলে নির্বাচন কমিশনের ব্যবহৃত তথ্য ও অ্যালগরিদমের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

সুপ্রিম কোর্ট এসআইআর কার্যক্রমের বৈধতা বহাল রেখেছেন। তবে সাবেক নির্বাচন কমিশনার অশোক লাভাসা এবং সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এস ওয়াই কোরেশি এর ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কোরেশি বিশেষ করে ২০০২ সালের ভোটার তালিকাকে ভোটারদের তথ্য যাচাইয়ের প্রায় চূড়ান্ত ভিত্তি হিসেবে ব্যবহারের সমালোচনা করেছেন। তাঁর নিজের বাবার নামও ২০০২ সালের তালিকায় ভুল বানানে লেখা ছিল।

আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো, নাগরিকত্ব যাচাইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বুথ লেভেল কর্মকর্তাদের কতটা ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে। তাঁদের বড় অংশই সরকারি স্কুলের শিক্ষক। দীর্ঘদিন ভোটারদের নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার যাচাইয়ের দায়িত্ব তাঁদের ওপর দেওয়া হয়েছে। ত্রুটিপূর্ণ সফটওয়্যারের তথ্যের সঙ্গে এই প্রশাসনিক ক্ষমতা যুক্ত হলে নিয়মিত নথি যাচাই সহজেই নির্বিচারে ভোটার বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় পরিণত হতে পারে।

এসআইআরের সময় নিয়েও প্রশ্ন আছে। বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা ও তামিলনাড়ুতে বড় নির্বাচনের ঠিক আগে এই কার্যক্রম দ্রুত শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। লাখ লাখ ভোটারকে নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগে কঠোর প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্যে ফেলা হয়েছে। ভুল হলে তা সংশোধন ও আপিলের জন্যও পর্যাপ্ত সময় থাকছে না। অথচ প্রকৃত ভোটারকে তাড়াহুড়া করে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করার ক্ষতি ভোটার তালিকায় মৃত ব্যক্তির নাম থাকার ক্ষতির চেয়ে অনেক বেশি।

ভোটাধিকারই ভারতীয় গণতন্ত্রের ভিত্তি। জনসংখ্যা বাড়ার সময় ভোটার তালিকা সংকুচিত হওয়া, প্রযুক্তিগত কারণে বাদ দেওয়া ১০ জনের মধ্যে ৯ জনের ভুল প্রমাণিত হওয়া এবং কোনো নাগরিকের নিজের দোষ না থাকা সত্ত্বেও লাখ লাখ মানুষের ভোটাধিকার ঝুঁকির মুখে পড়া—এসব ঘটনা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য গুরুতর উদ্বেগের কারণ।

ভোটার তালিকা পরিশুদ্ধ করা অবশ্যই বৈধ প্রশাসনিক উদ্দেশ্য। কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় প্রকৃত নাগরিক বাদ পড়ে গেলে সেটি আর নিছক প্রশাসনিক ভুল থাকে না। এসআইআর কার্যক্রম তাই পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন, অথবা প্রয়োজনে তা পরিত্যাগ করতে হবে।

  • শশী থারুর ভারতের তিরুবনন্তপুরম থেকে নির্বাচিত কংগ্রেসের লোকসভা সদস্য।

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

Read full story at source