৩৬ কোটি টাকায় নির্মাণ শেষে তালাবদ্ধ সুনামগঞ্জের ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি
· Prothom Alo
দুই বছরের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে পাঁচ বছরে। এরপর কেটে গেছে আরও প্রায় তিন বছর। ঝকঝকে সাদা ভবনগুলোর দেয়ালে কালচে রং ধরেছে, কোথাও ধসে পড়েছে পলেস্তারা। তালাবদ্ধ ভবনের ভেতরে জমেছে ধুলাবালু, বাসা বেঁধেছে পোকামাকড়। এগুলো বুঝিয়ে দেওয়ার মতো ‘কর্তৃপক্ষ’ মিলছে না। প্রায় ৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই প্রতিষ্ঠান কবে চালু হবে, এটি নিশ্চিত করে বলারও যেন কেউ নেই।
এই অবস্থা সুনামগঞ্জ ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজির (আইএইচটি)। অথচ হাওরের জেলা সুনামগঞ্জে স্বাস্থ্যশিক্ষার প্রসার ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন অনেকে।
Visit truewildgame.com for more information.
সুনামগঞ্জ পৌর শহরের সরকারি কলেজের পেছন দিকে আলীপাড়া এলাকায় প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান। তিন একর জমির ওপর ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে আইএইচটি ক্যাম্পাসের নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রকল্পের ব্যয় ছিল প্রায় ৩৬ কোটি টাকা।
সুনামগঞ্জ আইএইচটি–এর ছাত্রী হোস্টেলজেলা স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, নির্মাণকাজটি করেছে মেসার্স বিবিএল অ্যান্ড এমটি (জেবি)। শুরুতে টানা কাজ চললেও পরে বিভিন্ন সময়ে কাজ বন্ধ ছিল। এভাবে নানা কারণে দুই বছরের কাজ শেষ হতে সময় লাগে প্রায় পাঁচ বছর। ক্যাম্পাসে ছোট–বড় আটটি ভবন আছে। সব কটিই এখন তালাবদ্ধ।
মোহাম্মদ রাজু আহমেদ, সদস্য, সনাক সুনামগঞ্জতিন বছর ধরে ভবনগুলো পড়ে আছে, এটি দুঃখজনক। সুনামগঞ্জে এমনিতেই শিক্ষার সুযোগ কম। তাই এই বিশেষ প্রতিষ্ঠান দ্রুত চালু হওয়া দরকার।সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রতিষ্ঠানটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্বাস্থ্যশিক্ষা বিভাগের অধীন। মধ্যে এটি জেলা সিভিল সার্জনের কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এটিও শেষ পর্যন্ত হয়নি। এরপর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক একবার এসে পরিদর্শন করে গেছেন। তারপরও প্রতিষ্ঠানটি এখনো চালু হয়নি।
প্রতিষ্ঠানটি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে জটিলতার কথা স্বীকার করেছেন স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সুনামগঞ্জ কার্যালয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী খালেদ মো. সাইফুল্লাহও। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি যত দ্রুত এটি হস্তান্তর করতে। তার আগে কিছু সংস্কারকাজ করতে হবে। ভবনগুলো এভাবে পড়ে থাকলে আরও ক্ষতি হবে।’
আইএইচটির একাডেমিক ভবনের দেওয়ালে পড়েছে শ্যাওলা, মেঝেতে জমে আছে ময়লাশুরু হয়নি কার্যক্রম
৮ সেপ্টেম্বর দুপুরে ওই এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ থেকে আলীপাড়া এলাকায় যে সড়ক গেছে, তার ডান পাশে প্রতিষ্ঠানটি। সীমানাপ্রাচীরে ঘেরা। মূল ফটকে তালা দেওয়া। ডাকাডাকির পর সেলিম আহমদ নামের এক মধ্যবয়স্ক লোক এসে ফটক খুলে দেন। তিনি জানালেন, তাঁরা দুজন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ভবনগুলো দেখাশোনার কাজ করছেন।
মূল ফটক পেরোলেই হাতের বাঁ পাশে চারতলা বড়সড় একাডেমিক ভবন। ভবনটির সামনের সব কাচের দরজায় তালা দেওয়া। মেঝেতে ময়লা জমে আছে। ভবনের দেয়ালগুলোর বিভিন্ন স্থানে রং উঠে গেছে। সামনে এগোলে চারতলা ছাত্রাবাস। পূর্ব পাশে পাশাপাশি আরও দুটি তিনতলা ভবন। এগুলো কোয়ার্টার (বাসভবন)। ক্যাম্পাসের মাঝামাঝি রয়েছে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তার জন্য একটি দোতলা কোয়ার্টার ভবন।
খালেদ মো. সাইফুল্লাহ, উপসহকারী প্রকৌশলী, স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, সুনামগঞ্জআমরা চেষ্টা করছি যত দ্রুত এটি হস্তান্তর করতে। তার আগে কিছু সংস্কারকাজ করতে হবে। ভবনগুলো এভাবে পড়ে থাকলে আরও ক্ষতি হবে।ক্যাম্পাসের উত্তর দিকে বড় ছাত্রীনিবাস। এটির পশ্চিমে গ্যারেজ ও বিদ্যুতের সাবস্টেশন। ক্যাম্পাসে বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবস্থা আছে। সেলিম আহমদ বললেন, ‘কাজকাম তো শেষ। আমরা এখন শুধু এগুলো দেখে রাখছি।’
ক্যাম্পাসের পাশের বাসিন্দা মিজানুর রহমান নামের এক ব্যক্তি জানালেন, বছরখানেক আগে ঢাকা থেকে কিছু লোক এসে এটি দেখে গেছেন। তাঁদের ধারণা ছিল, এটি দ্রুত চালু হবে; কিন্তু হয়নি।
সুনামগঞ্জ আইএইচটি–এর প্রধান ফটকসবকিছু আটকে আছে জনবল নিয়োগে
মূলত জনবল নিয়োগ না হওয়ায় এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান এত দিনেও চালু হয়নি। এটি চালু করতে একজন অধ্যক্ষসহ সব মিলিয়ে ৫০ জনের মতো লোকবল দরকার। এ জন্য পদ সৃজন ও অনুমোদন প্রয়োজন। এসবের কোনোটি এখনো হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
আইএইচটির মতো প্রতিষ্ঠানে মূলত এসএসসি পাসের পর শিক্ষার্থীরা ভর্তি হতে পারে। এখানে একজনকে মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট হিসেবে গড়ে তুলতে ল্যাবরেটরি, ফিজিওথেরাপি, রেডিওলজি ও ইমেজিং, রেডিওথেরাপির মতো কয়েকটি বিষয় পড়ানো হয়।
সুনামগঞ্জে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের দক্ষ কর্মীর সংকট আছে। স্থানীয় শিক্ষার্থীরা এসব বিষয়ে পড়াশোনার সুযোগ পেলে এই সংকট সহজে পূরণ হবে। পাশাপাশি কর্মসংস্থান বাড়বে।
সুনামগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম বলেন, সুনামগঞ্জ জেলায় স্বাস্থ্য বিভাগে চিকিৎসক, নার্স, মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টসহ সব পদেই লোকের অভাব আছে। প্রতিষ্ঠানটি হলে অনেক ছেলেমেয়ে এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে কাজের সুযোগ পাবে।
প্রতিষ্ঠানটি চালুর বিষয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেছেন বলে জানান সুনামগঞ্জ সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সদস্য মোহাম্মদ রাজু আহমেদ। তিনি বলেন, তিন বছর ধরে ভবনগুলো পড়ে আছে, এটি দুঃখজনক। সুনামগঞ্জে এমনিতেই শিক্ষার সুযোগ কম। তাই এই বিশেষ প্রতিষ্ঠান দ্রুত চালু হওয়া দরকার।
স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সুনামগঞ্জ কার্যালয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. ইফতে খায়ের আলম বলেন, প্রকল্পের নির্মাণকাজ শেষ। মূলত প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ না হওয়ার কারণেই এটি চালু হচ্ছে না। লোকবল নিয়োগ হলেই এটি চালু হবে।