এত বিকল্প পেরিয়ে কেন ম্যাডিনসন? নেপথ্যে অসাধারণ এক গল্প

· Prothom Alo

অস্ট্রেলিয়ার স্পোর্টস ব্রডকাস্টার ও ধারাভাষ্যকার স্যাম টাগওয়েলের এক্সটা বেশ ছাঁচাছোলা। শুরুটা করেছেন এভাবে, ‘অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট দল নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমরা এখন আনুষ্ঠানিকভাবে এক চরম হাস্যকর পর্যায়ে পৌঁছে গেছি।’

Visit bettingx.club for more information.

কেন হাস্যকর, সে ব্যাখ্যা আছে এরপরই, ‘নিক ম্যাডিনসন, বয়স ৩৪ বছর: তাঁর শেষ টেস্ট খেলার পর ১০ বছর কেটে গেছে, গত ১৮ মাসে কোনো প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলেননি; কিন্তু গত সপ্তাহে ওয়ানডে কাপে একটি ভালো ইনিংস খেলেছেন, আর তাতেই নাকি টেস্ট দলে জায়গা পাওয়ার জন্য যথেষ্ট হয়ে গেল!’

মূল খবরের অনেকটাই স্পষ্ট এখানে। আট বছর পর দক্ষিণ আফ্রিকায় টেস্ট সিরিজ খেলতে গেছে অস্ট্রেলিয়া। প্রথম টেস্টে ক্যামেরন গ্রিনকে না পাওয়ার শঙ্কা আর জশ ইংলিসের চোটে সিরিজ থেকে ছিটকে যাওয়ার কারণে স্কোয়াডে দুজনকে যুক্ত করেছে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া। সেই দুজনের একজন ম্যাডিনসন। ৩৪ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার সর্বশেষ লম্বা দৈর্ঘ্যের ক্রিকেট খেলেছেন ২০২৫ সালের মার্চে, তিন টেস্টের ছোট্ট ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচটিও এক দশক আগের।

আরও বিস্ময়কর হলো, অস্ট্রেলিয়ার নির্বাচকদের হাতে বিকল্পের অভাবও ছিল না। বাংলাদেশের বিপক্ষে সর্বশেষ টেস্ট সিরিজে দলের সঙ্গে থাকা জেক ওয়েদারাল্ড ছিলেন। ছিলেন অস্ট্রেলিয়া ‘এ’ দলের হয়ে ভারত সফরে থাকা স্যাম কনস্টাস, নাথান ম্যাকসুয়েনি, পিটার হ্যান্ডসকম্ব, জেসন সাংহা ও ক্যাম্পবেল কেলাওয়েরাও। অথচ তাঁদের কাউকে না নিয়ে নির্বাচকেরা বেছে নিলেন হিসাব–নিকাশের বাইরে থাকা ম্যাডিনসনকে।

কে এই ম্যাডিনসন?

ম্যাডিনসনের অস্ট্রেলিয়া দলে ডাক পাওয়ায় পেছনে গত সপ্তাহের একটি ইনিংস যে ভূমিকা রেখেছে, সেটা সহজেই বোঝা যাচ্ছে। ওয়ানডে কাপে নিউ সাউথ ওয়েলসের হয়ে ভিক্টোরিয়ার বিপক্ষে ১১ চার ও ৮ ছক্কায় ১২৬। কিন্তু এটুকুই কি দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে টেস্ট দলে জায়গা পাওয়ার জন্য যথেষ্ট?

আসল উত্তরটা দিতে পারবেন নির্বাচকেরা। তার সেটি জানার আগে ঘুরে আসা যেতে পারে ম্যাডিনসনের জীবনের গত দশ বছরের গল্পে। যেখানে সবচেয়ে বড় অধ্যায় বছর দুয়েক আগের।

২০২৪-২৫ মৌসুমের শেষে ম্যাডিনসনের জীবনে নেমে আসে কঠিন এক সময়। ধরা পড়ে টেস্টিকুলার ক্যানসার। অস্ত্রোপচার করালেও কাজ হয়নি। ক্যানসার ছড়িয়ে পড়ে শরীরে, শুরু করতে হয় কেমোথেরাপি।

স্ত্রী বিয়াঙ্কা তখন দ্বিতীয় সন্তানের অপেক্ষায়। বড় সন্তানকে দেখাশোনা করতে তাঁকে চাকরিও ছেড়ে দিতে হয়। আর ম্যাডিনসনকে নিয়মিত যেতে হতো হাসপাতালে।

কেমোথেরাপির ফল, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই মাথার চুল উধাও। ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় রাতে চোখ থেকে ঘুমও উধাও। শরীরও দুর্বল হয়ে পড়ে, দিনের বড় একটা সময় কাটত ঘুমিয়ে।

ক্যানসার জয় করে অস্ট্রেলিয়া দলে ফিরলেন ম্যাডিনসন

পরে এক সাক্ষাৎকারে ম্যাডিনসন বলেছিলেন, বাড়ির কোনো কাজই করতে না পারায় তাঁর অপরাধবোধ হতো। ক্রিকেট দূরের কথা, স্বাভাবিক জীবনযাপনই কঠিন হয়ে উঠেছিল।

সেই জায়গা থেকে ফিরে আসতে পারবেন কি না জানতেন না। তবে ফিরেছেন। এমনকি শেষবার কেমোথেরাপি নেওয়ার মাত্র ১০ দিন পর ব্যাট হাতে চলে যান নেটেও। এরপর গত ৩ জানুয়ারি সিডনি থান্ডারের হয়ে বিগ ব্যাশের ম্যাচেও। ছয় মাস আগেও মাঠে ফেরা নিয়ে নিশ্চিত ছিলেন না যে মানুষটি, কয়েক মাস পর তিনিই ম্যাচ জেতানো রান করলেন মেলবোর্ন রেনেগেডসের বিপক্ষে।

কিন্তু ক্যানসারই ম্যাডিনসনের ক্রিকেটজীবনের একমাত্র বাধা ছিল না।
২০১৬ সালের নভেম্বরে অ্যাডিলেডে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে অভিষেক। মাত্র তিন টেস্ট খেলার পরই মানসিক স্বাস্থ্যের কারণে ক্রিকেট থেকে বিরতিতে যেতে হয়েছিল তাঁকে। পরে ঘরোয়া ক্রিকেটে ফিরে ২০১৮-১৯ ও ২০২১-২২ মৌসুমে আবারও আলোচনায় আসেন। অস্ট্রেলিয়া ‘এ’ দলের দরজাও খুলে গিয়েছিল তাতে। এর মধ্যেই আবার ২০১৯ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে একটি ম্যাচ থেকে সরে দাঁড়ান মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নিতে।

চোটও কম ভোগায়নি তাঁকে। ২০১৮ সালে ঝাই রিচার্ডসনের বলে আঘাত পেয়ে হাত ভেঙেছিল। ২০২৩ সালের প্রথম দিনে এসিএল চোটে পড়ে আবারও দীর্ঘ বিরতি। সেই চোটে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট থেকে দূরে থাকতে হয়েছিল এক বছরের বেশি সময়।
কিন্তু ফিরে এসে যেন নিজেকে নতুন রূপে আবিষ্কার করেন ম্যাডিনসন। পাঁচ ইনিংসে করেছিলেন তিনটি সেঞ্চুরি। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত শেফিল্ড শিল্ডে অন্তত ২০ ইনিংস খেলা ব্যাটসম্যানদের মধ্যে তাঁর ব্যাটিং গড় ছিল ৫২.৩৭—সেই সময়ে শুধু ক্যামেরন গ্রিনের গড় ছিল বেশি। অর্থাৎ টেস্ট দলে ফেরার স্বপ্ন বাস্তবভিত্তি পেয়েছিল ভালোমতোই।

কিন্তু এরপর ফর্ম হারানো, আর কিছুদিন পরই এল মৃত্যুর দরজা ঘুরিয়ে আনা ক্যানসার।
এল কেমোথেরাপি। এল দীর্ঘ বিরতি।

অস্ট্রেলিয়ার হয়ে তিনটি টেস্ট খেলেছেন নিক ম্যাডিনসন

ম্যাডিনসন ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ফিরলেন টি-টুয়েন্টি দিয়ে। এরপর গত মাসে ফিরলেন ৫০ ওভারের ক্রিকেটে। নিউ সাউথ ওয়েলসের হয়ে দ্বিতীয় ম্যাচেই ১২৬ রান, ভিক্টোরিয়ার বিপক্ষে ২৫ সেপ্টেম্বরের এই ইনিংস যেন ম্যাডিনসনের একটি ঘোষণাও—তিনি এখনো শেষ হয়ে যাননি।

আক্রমণাত্মক টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান হিসেবে ওপেনিং ও মিডল অর্ডার দুই জায়গাতেই খেলার অভিজ্ঞতা আছে ম্যাডিনসনের। অস্ট্রেলিয়ার কোচ অ্যান্ড্রু ম্যাকডোনাল্ড ও নির্বাচকপ্রধান জর্জ বেইলির পছন্দের ব্যাটিং দর্শনের সঙ্গেও সেটি মেলে। বেইলির ভাষায়, ম্যাডিনসন ব্যাটিং অর্ডারের বিভিন্ন জায়গায় ‘নমনীয়তা’ দিতে পারেন।

দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে অস্ট্রেলিয়ার এখন এটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ক্যামেরন গ্রিন প্রথম টেস্টে খেলতে পারবেন কি না, শঙ্কা আছে। জশ ইংলিস তো ছিটকেই গেছেন। ফলে মূল স্কোয়াডে থাকা ব্যাটিং বিকল্পগুলোর ওপর চাপ বেড়েছে। ম্যাডিনসনকে কাজে লাগানো যাবে যেকোনো জায়গাতেই।

তবে ম্যাডিনসনের এই ফেরার ডাককে শুধু ‘প্রয়োজনের ফল’ বলে ইতি টানা যায় না। একজন ক্রিকেটারকে ১০ বছর পর টেস্টের দরজায় ফেরাতে হলে শুধু একটি সেঞ্চুরির চেয়ে বেশি কিছু লাগে। লাগে অতীতের পারফরম্যান্স, বর্তমান সামর্থ্যের আভাস এবং নির্বাচকদের বিশ্বাস যে তিনি আবারও সেই জায়গায় ফিরতে পারেন।

ম্যাডিনসনের গত ১০ বছরের গল্পে সেটিই পেয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার নির্বাচকেরা। মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্রিকেট থেকে সরে গেছেন। চোটে পড়ে মাসের পর মাস মাঠের বাইরে থেকেছেন। ক্যানসারের চিকিৎসায় হারিয়েছেন চুল, শক্তি, স্বাভাবিক জীবনযাপনের ছন্দ। প্রতিবারই আবার ব্যাট হাতে ফিরেছেন।

টাগওয়েলের চোখে হয়তো এটি অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট দল নির্বাচনের ‘হাস্যকর’ এক সিদ্ধান্ত। কিন্তু ম্যাডিনসনের চোখে টেস্ট দুনিয়ায় ফিরে আসার আরেকটি সুযোগ।

কপিলদের আহ্বানের পর ক্যানসার-আক্রান্ত গায়কোয়াড়কে ১ কোটি রুপি দিচ্ছে বিসিসিআই

Read full story at source