ময়ূরাক্ষী যখন ভাসে টাঙ্গুয়ার হাওরে
· Prothom Alo

কিছু ভ্রমণ শুধু নতুন কোনো জায়গার সঙ্গে পরিচয় করায় না, খুলে দেয় কল্পনার দরজাও। টাঙ্গুয়ার হাওরে তরী ময়ূরাক্ষীর যাত্রা তেমনই—যেখানে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যায় হুমায়ূনের গল্প, পাঠকের ভালোবাসা আর এক স্বপ্নের বাস্তব রূপ।
Visit extonnews.click for more information.
কিছু ভ্রমণ শুধু কোনো জায়গায় নিয়ে যায় না, মানুষের ভেতরেও একটা পথ খুলে দেয়। টাঙ্গুয়ার হাওর আমার কাছে ঠিক তেমনই। সেখানে গিয়েছিলাম তরী ময়ূরাক্ষী দেখতে; ফিরে এসেছি গল্প আর অনুভূতি নিয়ে। যে গল্পে আমি একা নই। আমার সঙ্গে ছিলেন মিসির আলী, হিমু, রূপা, বাকের ভাই, মোনা—আর ছিলেন স্বয়ং হুমায়ূন আহমেদ। ছিলেন তাঁর অসংখ্য পাঠকও, যাঁরা জানেন, কিছু নাম উচ্চারণ করলেই বাস্তবের ভেতর কল্পনার একটা দরজা খুলে যায়।
ময়ূরাক্ষী।
এই নামটা শুনলেই হুমায়ূন আহমেদের পাঠকদের মনে ভেসে ওঠে হিমুর সেই কল্পনার নদী। যে নদীর ঠিকানা বাংলাদেশের মানচিত্রে নেই, অথচ অসংখ্য পাঠকের মনের ভেতর তার প্রবাহ থেমে নেই। সেই ময়ূরাক্ষীই টাঙ্গুয়ার হাওরে নতুন অর্থ পেয়েছে তরী ময়ূরাক্ষী হয়ে।
এটা শুধু একটি হাউসবোট নয়। একজন পাঠকের দীর্ঘদিনের ভালোবাসা, একটি স্বপ্ন, ভ্রমণের নেশা আর হাওরের প্রতি গভীর টানের ভাসমান রূপ।
যে গল্পের শুরু বইয়ের পাতা থেকে
আকরাম হোসেন রিপনের গল্প শুরু কোনো ব্যবসায়িক পরিকল্পনা দিয়ে নয়, বরং বইয়ের পাতা থেকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন বাংলাদেশের নানা প্রান্তে। সীতাকুণ্ডের পাহাড় থেকে বান্দরবানের অরণ্য, সাদা পাহাড় থেকে দেশের নানা প্রান্তের অচেনা পথ—কাঁধে ক্যামেরা নিয়ে প্রকৃতিকে দেখেছেন একজন শখের আলোকচিত্রী হিসেবে।
তাঁর ভ্রামণিক পরিচয়ও তাই আলাদা—হন্টক রিপন।
ভ্রমণের প্রতি ভালোবাসা থেকেই একসময় তৈরি করেন জোছনাতরী নামে একটি ভ্রমণগোষ্ঠী। পাহাড়-অরণ্যের পথে ভ্রমণপিপাসু মানুষদের নিয়ে ঘুরতে ঘুরতেই পরিচয় হয় তাঁর জীবনসঙ্গী চিকিৎসক কাজী জিনাত আরা রিশার সঙ্গে। ফলে তাঁর কাছে ভ্রমণ শুধু জায়গা বদলের নাম নয়, জীবনের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তৈরি হওয়ারও একটি পথ।
হাওরে ভাসে ময়ূরাক্ষীনব্বইয়ের দশকের কৈশোর পেরিয়ে বড় হওয়া আকরাম সেই প্রজন্মের মানুষ, যারা বইয়ের চরিত্রদের সঙ্গেই বড় হয়েছেন। পুরান ঢাকার অলিগলি, বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালীর অপু, হুমায়ূন আহমেদের হিমু ও মিসির আলী—সব মিলিয়ে তাঁর কল্পনার পৃথিবী তৈরি হয়েছিল বইয়ের ভেতরেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে সেই কল্পনার পথই ধীরে ধীরে বাস্তব ভ্রমণের পথে রূপ নিতে শুরু করে।
তারপর আসে ২০১৭ সাল।
যে বিকেলে হাওরের প্রেমে পড়া
২০১৭ সালে প্রথমবার সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরে যান আকরাম। তখনো তিনি জানতেন না, এই সফর একদিন তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্নের ভিত্তি হয়ে উঠবে।
তাহিরপুর থেকে ছোট্ট নৌকায় করে এগিয়ে যাচ্ছিলেন ওয়াচ টাওয়ারের দিকে। দুই পাশে ভারতের পাহাড়, সামনে নীল পানির বিস্তৃতি। হিজলগাছের সারির ফাঁক দিয়ে হঠাৎ চোখে পড়ে ছোট্ট একটি ছেলে। একটি ছোট নৌকায় বসে মাছ ধরছে, আর নিজের মনে গান গাইছে।
দৃশ্যটি খুব সাধারণ। কিন্তু কিছু সাধারণ দৃশ্যই মানুষের মনে অসাধারণভাবে থেকে যায়।
আমি যখন আকরামের মুখে সেই গল্প শুনছিলাম, মনে হচ্ছিল, কিছু দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা পড়ে না। সেগুলো মানুষের ভেতরে গিয়ে থেকে যায়।
সেই মুহূর্তটিই তাঁর কাছে হয়ে উঠেছিল হাওরের প্রেমে পড়ার মুহূর্ত।
আর তখন থেকেই মনে হয়েছিল, হাওরকে শুধু ঘুরে দেখলে হবে না, একদিন এর বুকের ওপর নিজের একটি ঠিকানা তৈরি করতে হবে।
ময়ূরাক্ষী থেকে তরী ময়ূরাক্ষী
আকরাম হোসেন নিজেকে উদ্যোক্তার আগে একজন পাঠক হিসেবে পরিচয় দেন। হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস পড়তে পড়তেই তাঁর মনে ময়ূরাক্ষী নামটির সঙ্গে তৈরি হয়েছিল গভীর এক সম্পর্ক।
বাস্তবে সেই নদী বাংলাদেশে নেই। কিন্তু পাঠকের কল্পনায় তার অস্তিত্ব এতটাই জীবন্ত যে নিজের স্বপ্নের কোনো ঠিকানার নাম রাখতে হলে ময়ূরাক্ষীই যেন সবচেয়ে স্বাভাবিক নাম।
তার সঙ্গে যুক্ত হলো তরী।
স্বপ্নের নদীতে ভাসতে হলে একটি তরী তো লাগবেই।
হাওরে বারবার যাওয়ার সময় আরেকটি বিষয়ও তাঁর চোখে পড়েছিল। প্রকৃতি যেখানে এত অসাধারণ, সেখানে আরামদায়ক ও পরিচ্ছন্নভাবে থাকার সুযোগ সীমিত। আধুনিক শৌচাগার, থাকার জায়গা কিংবা প্রকৃতির সঙ্গে মানানসই একটি সুন্দর অভিজ্ঞতার প্রয়োজন ছিল।
তখন ভাবনাটি আরও স্পষ্ট হয়—এমন একটি ভাসমান ঘর তৈরি করা যায়, যেখানে আরাম থাকবে, কিন্তু সেই আরাম যেন প্রকৃতিকে আড়াল না করে।
এই ভাবনা থেকেই তরী ময়ূরাক্ষী।
২০২২ সালে সেই স্বপ্ন বাস্তব রূপ পায়। বোটটি তৈরি করতে সময় লাগে প্রায় ছয় মাস।
যেদিন প্রথম পানিতে ভাসে তরী ময়ূরাক্ষী, সেদিন সেটি আর শুধু কাঠ, লোহা আর নির্মাণসামগ্রীর কাঠামো ছিল না। বহুদিন ধরে বুকের ভেতর লালন করা একটি স্বপ্ন সেদিন সত্যিই জলের ওপর ভাসছিল।
আকরাম বলছিলেন, ভবিষ্যতে আরও অনেক বোট তৈরি হতে পারে। কিন্তু প্রথম নিজের হাতে তৈরি একটি বোটকে পানিতে ভাসতে দেখার অনুভূতি আলাদা। সেটি জীবনের সঙ্গে থেকে যায়।
বোটের ভেতরে ঢুকলেই অন্য এক পৃথিবী
বোটের ভেতরে অন্য জগততরী ময়ূরাক্ষীর ভেতরে ঢুকেই প্রথম যে বিষয়টি চোখে পড়ে তা হলো আলো।
ঝলমলে আলো নয়। বাঁশে মোড়ানো ল্যাম্পের মৃদু আলো। আকরামের ইচ্ছা ছিল এখানে প্রবেশ করলেই যেন মনে হয় শহরটা একটু দূরে সরে গেছে।
কাঠের আবহ, নরম আলো, খোলা জানালা আর চারপাশের জলরাশি মিলে এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে বসে থাকলেই মনে হয় সময়ের গতি কিছুটা ধীর হয়ে গেছে।
হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসে সাধারণ ঘর, বারান্দা, বৃষ্টি, জোছনা কিংবা জানালার বাইরের দৃশ্যও অনেক সময় গল্পের চরিত্র হয়ে ওঠে। তরী ময়ূরাক্ষীর ভেতরে বসে সেই বিষয়টিই বারবার মনে হচ্ছিল। এখানে নীরবতাও যেন সাজসজ্জার অংশ।
নামগুলোও যেন হুমায়ূনের বইয়ের পাতা
তরী ময়ূরাক্ষীর সবচেয়ে আবেগঘন বিষয়গুলোর একটি এর কক্ষগুলোর নাম।
ডেক পেরিয়ে করিডর ধরে এগোতে এগোতে প্রতিটি কক্ষের নাম যেন হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যজগতের দিকে নিয়ে যায়—উড়াল পঙ্খী, সমুদ্রবিলাস, মেঘের উপর বাড়ি, আশাবরী, শ্রাবণ মেঘের দিন, রূপার পালঙ্ক, ছায়াবীথি, বহুব্রীহি।
মাঝের লিভিং স্পেসটির নাম বৃষ্টিবিলাস।
নামটির মধ্যেই যেন একটা দৃশ্য তৈরি হয়ে যায়। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে, সামনে হাওর, আর আপনি বসে আছেন এমন একটি জায়গায়, যার নাম বৃষ্টিবিলাস।
এখানে বৃষ্টি দেখা যায়, জোছনা উপভোগ করা যায়, আর হাওরের জলজ জীবন চোখের সামনে ধীরে ধীরে বদলে যেতে দেখা যায়।
আর আছে একটি লাইব্রেরি। সেখানে সাজানো শুধু হুমায়ূন আহমেদের বই।
একজন ভক্তের শ্রদ্ধা জানানোর এর চেয়ে ব্যক্তিগত উপায় আর কী হতে পারে!
হাওর, গান আর হুমায়ূনের প্রিয় সুর
হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসের নামেপ্রকৃতি আর গানের সম্পর্ক বোধ হয় মানুষের সৃষ্টির শুরু থেকেই।
হন্টক রিপনের কাছের মানুষেরা প্রায়ই এই বোটে আসেন। শুক্রবার-শনিবারের ব্যস্ততা বাদ দিলে অন্য সময় এখানে বসে গানের আসরও জমে।
রাধারমণ, শাহ আবদুল করিম, হাসন রাজা—হাওরের মানুষের জীবন, প্রেম, বিরহ আর দর্শন থেকে উঠে আসা গানগুলো যখন হাওরের বুকেই গাওয়া হয়, তখন অভিজ্ঞতাটা অন্য রকম হয়ে যায়।
আর এই শিল্পীদের গান যে হুমায়ূন আহমেদেরও খুব প্রিয় ছিল, সেই যোগসূত্রটি তরী ময়ূরাক্ষীর পরিবেশকে আরও অর্থবহ করে তোলে।
এখানে গান শুধু বিনোদন নয়। চারপাশের প্রকৃতির সঙ্গে মিশে গিয়ে সেটিও যেন ভ্রমণের অংশ হয়ে ওঠে।
হারিয়ে যাওয়া পালতোলা নৌকার স্মৃতি
হাওরে এখন আর নেই পালতোলা নৌকাএকসময় টাঙ্গুয়ার হাওরে পালতোলা নৌকা ছিল খুব পরিচিত দৃশ্য। এখন সেই দৃশ্য অনেকটাই হারিয়ে গেছে।
তরী ময়ূরাক্ষীর নকশায় সেই পুরোনো স্মৃতিকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা আছে।
একজন প্রবীণ মাঝির কাছ থেকে পালতোলা নৌকা চালানোর কৌশল জেনে সেই ভাবনাকে বোটের নকশার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
এটি শুধু সাজসজ্জার বিষয় নয়। হাওরের হারিয়ে যেতে থাকা একটি দৃশ্যকে স্মরণ করারও চেষ্টা।
চারদিকে শুধু জল আর আকাশ
তরী ময়ূরাক্ষীর সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য সম্ভবত তার খোলা বিন্যাস।
চার দেয়ালের ভেতরে থেকেও চারপাশকে আলাদা করা যায় না। সকালের কুয়াশা, বিকেলের সোনালি আলো, দূরের পাহাড়ের নীল রেখা, রাতের আকাশ আর মায়াময় জোছনা—সবই যেন এই ভাসমান ঘরের অংশ।
ডেকে দাঁড়িয়ে আমার মনে হচ্ছিল শহরে আমরা কত দেয়াল বানিয়ে বাঁচি।
হাওরে এসে বুঝলাম, কখনো কখনো সবচেয়ে সুন্দর ঘরটির চারপাশে কোনো দেয়ালই থাকে না।
হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসে প্রকৃতির এই দৃশ্যপটগুলোই তো পাঠককে টেনে নিত। বৃষ্টি, জোছনা, নদী, নৌকা, নিস্তব্ধতা—সাধারণ দৃশ্যগুলো তাঁর গল্পের ভেতর অন্য এক আবহ তৈরি করত। তরী ময়ূরাক্ষীর সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো, এখানে সেই দৃশ্যপট কল্পনা করতে হয় না। চোখের সামনেই থাকে।
হাওরের স্বাদও আলাদা
তরী ময়ূরাক্ষীর অভিজ্ঞতা শুধু চোখ আর মনের জন্য নয়, স্বাদের জন্যও।
হাওরের টাটকা মাছ আর স্থানীয় সবজি যত্ন করে রান্না করে পরিবেশন করা হয়। শহরের রেস্তোরাঁয় খাওয়া খাবারের সঙ্গে এর তুলনা করা কঠিন। বিশেষ করে টাটকা মাছের স্বাদ নেওয়ার পর শহরে ফিরে ফ্রিজে রাখা মাছের স্বাদ সত্যিই অনেকটা পানসে মনে হতে পারে।
কারণ, এখানে খাবারের স্বাদে শুধু রান্না নেই, আছে জায়গাটার নিজস্বতা।
একটি হাউসবোটের চেয়ে বেশি কিছু
তরী ময়ূরাক্ষীকে শুধু থাকার জায়গা হিসেবে দেখলে এর সবচেয়ে বড় গল্পটি চোখের আড়ালে থেকে যাবে।
কারণ, এটি একজন কল্পনাবিলাসী অভিযাত্রী এবং পাঠকের স্বপ্নের বাস্তব রূপ।
একজন মানুষ হুমায়ূন আহমেদের ময়ূরাক্ষীকে বইয়ের পাতায় আটকে রাখতে চাননি। তিনি নিজের ভালোবাসা দিয়ে সেই নামটিকে টাঙ্গুয়ার হাওরের জলের ওপর একটি ঠিকানা দিয়েছেন।
আমার ভ্রমণটাও তাই শুধু একটি হাউসবোট ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতা হয়ে থাকেনি।
সন্ধ্যায় আকাশজুড়ে জোছনা। দূরের পাহাড়ের রেখা ধীরে ধীরে অন্ধকারে মিশে যাচ্ছে। হাওরের জল তখন প্রায় আয়নার মতো স্থির। চারদিকে এমন এক নীরবতা, যেখানে নিজের ভাবনার শব্দও শোনা যায়।
সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, হিমু কোথাও হাঁটছে না। মিসির আলী কোনো রহস্যের উত্তর খুঁজছেন না। রূপা অপেক্ষা করছেন না। বাকের ভাই কিংবা মোনা কেউই এই দৃশ্যের মধ্যে নেই।
তবু তাঁরা সবাই যেন কোথাও আছেন।
আছেন সেই মানুষটির লেখার ভেতর, যিনি কয়েক প্রজন্মের পাঠককে প্রকৃতি, মানুষ, প্রেম, নিঃসঙ্গতা, রহস্য আর কল্পনার সঙ্গে নতুন করে পরিচয় করিয়েছেন।
টাঙ্গুয়ার হাওর আমাকে প্রকৃতি দেখিয়েছে। আর তরী ময়ূরাক্ষী আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছে, সবচেয়ে সুন্দর ভ্রমণ কখনো কখনো কোনো গন্তব্যে পৌঁছানোর নয়।
বরং একটি প্রিয় গল্পের ভেতরে কিছুক্ষণের জন্য সত্যিই ঢুকে পড়ার।
আর সেই গল্পের জলের নাম—ময়ূরাক্ষী।
ছবি: তরী ময়ূরাক্ষী ও লেখক