ডেঙ্গুতে মেয়ের অবস্থা খারাপ হচ্ছে—এমন কোনো লক্ষণই বুঝতে পারেননি চিকিৎসক মা–বাবা

· Prothom Alo

চিকিৎসক মুহাম্মদ ওমর ফারুক রায়হানের কাছে ডেঙ্গু নিয়ে কেউ পরামর্শ চাইলে বলতেন, পেটে ব্যথা আছে কি না, রক্ত বমি হচ্ছে কি না, পায়খানার সঙ্গে রক্ত যাচ্ছে কি না—এসব খেয়াল রাখতে হবে। এই চিকিৎসকের মেয়ে ফামইয়া মাশনুর রুমাইসার ডেঙ্গু হওয়ার পর এসব কোনো লক্ষণই দেখা যায়নি। অবস্থা খারাপ হচ্ছে, তা বুঝতে পারার আগেই মেয়েটা মারা গেল।

Visit palladian.co.za for more information.

ফামইয়া মাশনুরের বয়স হয়েছিল ৮ বছর ১০ মাস ১৪ দিন। রাজধানীর আইডিয়াল স্কুলের বনশ্রী শাখায় তৃতীয় (ইংলিশ ভার্সন) শ্রেণিতে পড়ত। ২৯ সেপ্টেম্বর সকালে জ্বর বাড়ে। তিন দিনের মাথায় ১ অক্টোবর বিকেলে সে মারা যায়।

মুহাম্মদ ওমর ফারুক রায়হান জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের অ্যানেসথেসিয়া ও আইসিইউ–বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত আছেন। রাজধানীর ভিশন আই হাসপাতালে চক্ষুবিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত আছেন তাঁর স্ত্রী ফারজানা সুলতানা। এই দম্পতির বড় মেয়ে ছিল ফামইয়া মাশনুর। আগামী ১৭ নভেম্বর জন্মদিন পালনের জন্য মেয়ে কক্সবাজারে ঘুরতে যাবে, কেক কাটবে, মা–বাবা আর ছোট বোনের সঙ্গে সময় কাটাবে—এমন অনেক পরিকল্পনা করে রেখেছিল। মায়ের সঙ্গে গিয়ে জন্মদিনে পরবে বলে নিজের ও বোনের জন্য জামাও কিনে রেখেছিল।

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ফামইয়া মাশনুর রুমাইসা রাজধানীর আইডিয়াল স্কুলের বনশ্রী শাখায় তৃতীয় (ইংলিশ ভার্সন) শ্রেণিতে পড়ত ছবি: পরিবারের কাছ থেকে পাওয়া

মুহাম্মদ ওমর ফারুক প্রথম আলোকে বলেন, ‘মেয়ের ডেঙ্গু পজিটিভ হওয়ার পর ওর অবস্থা খারাপ হচ্ছে—এমন কোনো সাইনই (লক্ষণ) তো ছিল না। বুঝতেই তো পারলাম না। স্কয়ার হাসপাতালে নেওয়ার পর পিআইসিইউতে আধা ঘণ্টাও ছিল না, তার আগেই মারা গেল।’

এই চিকিৎসক দম্পতির ছোট মেয়ে ফারজিন মাহনুর ওয়ারিসার বয়স ৫ বছর ৮ মাস। সারাক্ষণ বোনের সঙ্গে খুনসুটিতে মেতে থাকত। বড় বোন গোসল করিয়ে দিত। বোন কোথায় চলে গেছে, তা বুঝতেই পারছে না ফারজিন। বোনকে সে ‘ইয়া’ বলে ডাকত। তাকে বলা হয়েছে, ইয়া আল্লাহর কাছে চলে গেছে। সে তার মতো করে কিছু একটা বুঝে নিয়েছে।

মা ফারজানা সুলতানা সারা ঘরে মেয়ের স্মৃতি হাতড়ে বেড়াচ্ছেন। মেয়েটা গুছিয়ে স্মৃতি ধরে রাখতে পছন্দ করত। কোনো জিনিস সহজে ফেলতে চাইত না। এখন ঘরময় শুধু স্মৃতি না, মেয়েটাও স্মৃতি হয়ে গেছে।

ওমর ফারুক ও ফারজানা সুলতানা দম্পতি জানান, ২৭ সেপ্টেম্বর রোববার রাতে ফামইয়া মাশনুর জ্বর জ্বর লাগছে বলে জানায়। পরদিন সোমবার সকালে জ্বর বাড়ে। স্কুলে যেতে পারে না। মঙ্গলবার পরীক্ষায় ডেঙ্গু পজিটিভ আসে। বাসায় ক্যানুলা করে স্যালাইন দেওয়া হয়। ওমর ফারুক জরুরি কাজে ঢাকার বাইরে থাকায় বুধবার কোনো পরীক্ষা করা হয়নি।

জন্মদিনে পরার জন্য এই পোশাক পছন্দ করে কিনে রেখেছিল মাশনুর রুমাইসা। ওই পোশাক আলমারিতেই রয়ে গেছে। তার আর পরা হয়নি

ওমর ফারুক জানান, বৃহস্পতিবার মেয়ে খারাপ লাগছে বলে। খিঁচুনি শুরু হওয়ার পরপর তাকে বনশ্রীতে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে শিশুদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা পিআইসিইউ না থাকায় আরেক হাসপাতাল ঘুরে পরে স্কয়ার হাসপাতালে পিআইসিইউ পাওয়া যায়। যানজট ঠেলে এ হাসপাতালে আসতে আসতে মেয়ের অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়। নাক দিয়ে রক্ত পড়া শুরু হয়। তারপর তো সব শেষ। এর আগ পর্যন্ত এসব কোনো লক্ষণই ছিল না। সবার সঙ্গে কথা বলেছে, দাদির পাঠানো ডাব খেয়েছে।

মা ফারজানা সুলতানা সারা ঘরে মেয়ের স্মৃতি হাতড়ে বেড়াচ্ছেন। মেয়েটা গুছিয়ে স্মৃতি ধরে রাখতে পছন্দ করত। কোনো জিনিস সহজে ফেলতে চাইত না। এখন ঘরময় শুধু স্মৃতি না, মেয়েটাও স্মৃতি হয়ে গেছে।

এই মা–বাবা মেয়ের এভাবে চলে যাওয়াকে নিজেদের কপাল আর এতটুকুই আয়ু ছিল বলে নিজেদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। মারা যাওয়ার আগের দিন আমের জুস খেতে চেয়েছিল, খেতে পারেনি, জন্মদিনের জামা কিনলেও তা আলমারিতেই পড়ে রইল, এমন আক্ষেপগুলো শুধু একটু পরপর মাথাচাড়া দিয়ে মনে করিয়ে দিচ্ছে তাঁদের। গত বছরের এই সময় পরিবারের সবাই মিলে হজ করতে গিয়েছিলেন, জুলাই মাসে সাজেকে বেড়াতে গিয়ে মা–বাবা ও বোনের সঙ্গে মেয়ে সর্বশেষ সেলফিটা তুলেছিল—এমন স্মৃতিগুলো ভুলতে পারছেন না তাঁরা।

ফামইয়া মাশনুরের বয়স হয়েছিল ৮ বছর ১০ মাস ১৪ দিন। রাজধানীর আইডিয়াল স্কুলের বনশ্রী শাখায় তৃতীয় (ইংলিশ ভার্সন) শ্রেণিতে পড়ত। ২৯ সেপ্টেম্বর সকালে জ্বর বাড়ে। তিন দিনের মাথায় ১ অক্টোবর বিকেলে সে মারা যায়।

ওমর ফারুক বলেন, ‘মেয়েটা খুব সংবেদনশীল ছিল। অসুস্থতার মধ্যে বমি করার পর বাসায় কাজের সহায়তাকারীর সামনে জামা পাল্টে দিলে সে মাকে বলেছিল, ওই আপুর সামনে জামা পাল্টানোতে তার লজ্জা লাগছে।’ এই বাবা বলেন, মেয়ের ডেঙ্গু হওয়ার আগে তার মায়ের ডেঙ্গু হয়। বাসায় ক্যানুলা করে স্যালাইনসহ অন্যান্য ব্যবস্থা নিলে ভালো হন। কিন্তু মেয়ের বেলায় কোনো ব্যবস্থাই কাজে লাগেনি।

বৃষ্টিতে ভিজতে পছন্দ করত মাশনুর রুমাইসা। এগুলো এখন মা–বাবার কাছে কেবলই স্মৃতি

হাসপাতালগুলোতে পিআইসিইউ থাকলে, সরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত সেবা পাওয়া গেলে এবং ডেঙ্গুর মৌসুম শুরুর আগে থেকেই এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে সরকার পর্যাপ্ত উদ্যোগ নিলে হয়তো পরিস্থিতি পাল্টে যেত বলে মনে করছেন মুহাম্মদ ওমর ফারুক রায়হান। বনশ্রীতে নিজের বাসার পাশেই ময়লার ভাগাড় এবং সেখানে পানি জমে থাকে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এগুলো তো দেখার কেউ নেই।

মুহাম্মদ ওমর ফারুক রায়হান বলেন, কষ্ট হবে বলে মেয়েকে পড়া নিয়ে কখনো চাপ দেওয়া হতো না। বার্ন ইনস্টিটিউটে কাজের অভিজ্ঞতায় পুড়ে যাওয়া ছোট ছোট শিশুদের দেখে মেয়ে রান্নাঘরে ঢুকলে যদি মেয়েরও কিছু হয়ে যায়, সেই ভয়ে থাকতেন। মেয়ে যাতে রান্নাঘরে না যায়, তা নিয়ে বারবার বলতেন। এই বাবার আক্ষেপ, মেয়েটা ছোট্ট এক মশার কামড়ে সেই কষ্ট পেয়েই মারা গেল।

Read full story at source