ঘোস্টিংয়ের পর অরবিটিং মানেই কি ফিরে আসা? সোশ্যাল মিডিয়া যেভাবে প্রাক্তন সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলছে

· Prothom Alo

ঘোস্টিংয়ের পর হঠাৎ সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রাক্তনের উপস্থিতি। ফিরে আসার ইঙ্গিত, নাকি নিছক কৌতূহল? ‘অরবিটিং’ নামে পরিচিত এই আচরণে সম্পর্ক শেষ হলেও ডিজিটাল যোগাযোগ পুরোপুরি থামে না। ফলে সোশ্যাল মিডিয়াই অনেক সময় প্রাক্তন সম্পর্ককে আরও জটিল, বিভ্রান্তিকর ও মানসিকভাবে ক্লান্তিকর করে তোলে।

ডেটিং অ্যাপে পরিচয়, কয়েকটি ভালো ডেট, নিয়মিত কথা সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল। তারপর হঠাৎ কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই যোগাযোগ বন্ধ। ফোনে বা মেসেজ নেই, কল নেই, কোনো উত্তরও নেই। এভাবেই শুরু হয় ‘ঘোস্টিং’। কিন্তু কিছুদিন পর দেখা গেল, সেই মানুষটিই আবার নিয়মিত আপনার সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট, স্টোরি বা ছবি দেখছেন। তাহলে কি তিনি ফিরে আসতে চাইছেন?

Visit esporist.org for more information.

সবসময় এমন নয়। বরং ঘোস্টিংয়ের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় এভাবে উপস্থিত থাকা অনেক সময় নতুন করে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। সম্পর্কবিষয়ক গবেষণায় এই আচরণকে ‘অরবিটিং’ বলা হয়। সরাসরি যোগাযোগ বন্ধ রেখেও অনলাইনে অন্য ব্যক্তির জীবনের আশপাশে ঘুরে বেড়ানো।

ঘোস্টিং আসলে কী?

সহজভাবে বললে, কোনো সম্পর্ক বা যোগাযোগের ক্ষেত্রে হঠাৎ কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়াই ঘোস্টিং। বিশেষ করে ডেটিং অ্যাপ ও সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে এই প্রবণতা আরও পরিচিত হয়ে উঠেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মনোবিজ্ঞানী গিলি ফ্রিডম্যান ও ডারসি পাওয়েলের ২০২৪ সালের গবেষণা-পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, ঘোস্টিং হচ্ছে খুব একটা পছন্দের নয় এমন সম্পর্ক ভাঙার কৌশল। যিনি ঘোস্টিংয়ের শিকার হন, তাঁর মধ্যে বিভ্রান্তি ও কষ্ট তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে যে ব্যক্তি ঘোস্ট করেন, তাঁর ক্ষেত্রে সহজে সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসা, সরাসরি প্রত্যাখ্যান এড়িয়ে যাওয়া কিংবা নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের মতো বিভিন্ন কারণ কাজ করে।

সবচেয়ে কঠিন বিষয় হলো, এখানে সম্পর্ক শেষ হওয়ার বিষয়টা পরিষ্কার না। অর্থাৎ সম্পর্কটি কেন থামল, কী ভুল হয়েছিল, কেন আগ্রহ হারাল এসব প্রশ্নের উত্তর না পাওয়ায় অনেকেই নিজের মতো করে কারণ খুঁজতে থাকেন।

তাহলে আবার সোশ্যাল মিডিয়ায় কেন ফলো করছে?

এখানেই আসে ‘অরবিটিং’ শব্দটি। ইতালির ইউনিভার্সিটি অব মিলানো-বিকোক্কার গবেষকদের মতে, ঘোস্টিংয়ের পর কেউ যদি সরাসরি কথা না বলেও আপনার সোশ্যাল মিডিয়া ফলো করতে থাকে, স্টোরি দেখে বা পোস্টে লাইক দেয়, সেটিকে ‘অরবিটিং’ বলা যায়। অর্থাৎ মানুষটি আপনার সঙ্গে সম্পর্কের যোগাযোগ বন্ধ করেছে, কিন্তু ডিজিটালভাবে পুরোপুরি অদৃশ্য হয়নি।

এর ফলে সবচেয়ে বেশি যে সমস্যা তৈরি হয়, তা হলো বিভ্রান্তি। একটি স্টোরি ভিউ দেখেই মনে হতে পারে ‘সে কি আমাকে আবার মিস করছে?’ ‘ফিরে আসতে চাইছে?’ ‘তাহলে যোগাযোগ করছে না কেন?’

গবেষণায় দেখা গেছে, এই ধরনের অনলাইন উপস্থিতি মানুষকে সম্পর্কের সমাপ্তি মেনে নেওয়ার বদলে নতুন করে নানা অর্থ খুঁজতে বাধ্য করে। ফলে আগের ঘোস্টিংয়ের সঙ্গে যুক্ত অনিশ্চয়তাও আরও দীর্ঘ হতে পারে।

স্টোরি ভিউ মানেই কি সে আপনাকে ফিরে পেতে চায়?

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো। একটি স্টোরি ভিউ দিয়ে কারও উদ্দেশ্য নিশ্চিত করা যায় না। কেউ কৌতূহল থেকে স্টোরি দেখতে পারেন, অভ্যাসবশত দেখতে পারেন, সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করতে গিয়ে আপনার স্টোরি সামনে আসতে পারে। আবার কারও মনে আপনার প্রতি আগ্রহ থাকতেও পারে। কিন্তু শুধু একটি ডিজিটাল ইঙ্গিতের ওপর ভিত্তি করে এসবের মধ্যে কোনটি সত্যি, তা বলা সম্ভব নয়।
তাই ‘সে স্টোরি দেখছে মানেই আমাকে চায়’এই সমীকরণটি ঠিক নয়। বরং সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হলো বাস্তব আচরণ। তিনি কি সরাসরি যোগাযোগ করছেন? আগের আচরণের জন্য কোনো ব্যাখ্যা দিচ্ছেন? নিজের ভুল স্বীকার করছেন? আবার যোগাযোগ করলে কি ধারাবাহিক থাকছেন? এসব প্রশ্নের উত্তরই স্টোরি ভিউয়ের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

গবেষণা বলছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় নজর রাখা উল্টো কষ্ট বাড়াতে পারে
২০২৬ সালে ‘কম্পিউটারস ইন হিউম্যান বিহেভিয়ার’ জার্নালে প্রকাশিত কানাডার ম্যাকমাস্টার ইউনিভার্সিটির সোশ্যাল সাইকোলজিস্ট তারা সি. মার্শালের গবেষণায় ৭৬২ জন অংশগ্রহণকারীকে নিয়ে চারটি স্টাডি করা হয়।

গবেষণায় দেখা যায়, সাবেক সঙ্গীর সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট ইচ্ছা করে দেখা যেমন বিচ্ছেদের পর মানসিক কষ্ট, নেতিবাচক অনুভূতি ও ঈর্ষা বাড়ায়। তেমনি অনিচ্ছাকৃতভাবে তাঁর পোস্ট বা স্টোরি সামনে আসাও কিছু ক্ষেত্রে নেতিবাচক অনুভূতিকে বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে ইনস্টাগ্রাম ও স্ন্যাপচ্যাটের মতো প্ল্যাটফর্মে সাবেক সঙ্গীকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে বা একই দিন বা পরের দিন পুরনো বিচ্ছেদজনিত কষ্টগুলো আবার ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় ফিরে আসে।

অর্থাৎ, সোশ্যাল মিডিয়ায় একজন মানুষকে চোখের সামনে রাখলে সম্পর্ক শেষ হওয়ার পরও মানসিকভাবে দূরে সরে যাওয়া কঠিন হতে পারে। এ কারণেই গবেষক পরামর্শ হিসেবে আনফলো, মিউট কিংবা প্রয়োজন হলে ব্লকের মতো ডিজিটাল সীমারেখার কথা বলেছেন।

তাহলে দ্বিতীয় সুযোগ দেবেন কি?

ঘোস্টিংয়ের পর কেউ আবার আপনার জীবনে ফিরতে চাইলে শুধু ইনস্টাগ্রাম স্টোরি দেখার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। বরং দেখতে হবে, তিনি বাস্তবে কী করছেন। হঠাৎ একটি ‘হাই’ মেসেজ পাঠিয়ে আবার কয়েক দিন পর অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছেন, নাকি স্পষ্টভাবে কথা বলছেন? কেন যোগাযোগ বন্ধ করেছিলেন, তার উত্তর দিচ্ছেন? আগের আচরণের দায় নিচ্ছেন? ভবিষ্যতে কী চান, সেটাও পরিষ্কার করছেন?
কারও সত্যিকারের আগ্রহ থাকলে সাধারণত শুধু স্টোরি ভিউতে থেমে থাকার প্রয়োজন হয় না। যোগাযোগ করার, নিজের অবস্থান বোঝানোর এবং বিশ্বাস ফেরানোর চেষ্টা থাকে।

‘ব্লক’ করতেই হবে, এমন নয়

ঘোস্টিংয়ের পর সবাইকে ব্লক করতে হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। তবে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, সোশ্যাল মিডিয়ার এই ছোট ছোট বিষয় যেন আপনার মানসিক শান্তি নষ্ট না করে।

একজন মানুষ আপনার স্টোরি দেখল কি না, লাইক দিল কি না, অনলাইনে এল কি না। এসব হিসাব করতে করতে যদি আপনি আবার সেই পুরোনো সম্পর্কের অনিশ্চয়তায় ফিরে যান, তাহলে মিউট বা আনফলো করার মতো সীমারেখা তৈরি করাই ভাল। এটি আপনাকে মানসিক ভাবে সুস্থ রাখবে। যদি আপনি প্রাক্তনকে নিয়ে সত্যি সত্যিই পুনরায় ভাবতে চান। তাহলে ‘সে কেন আমার স্টোরি দেখছে?’ এই প্রশ্নটি না করে।

আপনার প্রশ্ন হওয়া উচিত, ‘এই মানুষটি কি বাস্তব জীবনে আমাকে অনুভব করে, সম্মান দেয় এবং তার এই অনুভূতি কি ক্ষনিক নাকি সবসময়ের জন্য?’ কারণ ইনস্টাগ্রামের একটি ভিউ হয়তো ক্ষনিকের কৌতূহল দেখাতে পারে, কিন্তু একটি সুস্থ সম্পর্কের জন্য প্রয়োজন তার চেয়ে অনেক বেশি আবেগ, কৌতূহল ও আগ্রহ।

সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস

ছবি: পেকজেলসডটকম

Read full story at source