মোম জোছনায় কুহুর মূর্ছনা, সুরে ভাসল টেক্সাস
· Prothom Alo

পর্দা উঠতেই মঞ্চের পটভূমিতে চোখে পড়ে জোছনাস্নাত লেকের পাশে অসংখ্য জোনাকিবেষ্টিত এক বিশাল বৃক্ষ। প্রকৃতির সঙ্গে মিল রেখে সাজানো আরণ্যক মঞ্চসজ্জা, আলো-আঁধারি আর কুয়াশাচ্ছন্ন পরিবেশে উপবিষ্ট শিল্পী ও সংগতকারীরা—সব মিলিয়ে দৃশ্যটি মনকে আর্দ্র করে, আবিষ্ট করে। এই নান্দনিক মঞ্চায়ন যেন দৈনন্দিন জীবনের যান্ত্রিকতা থেকে হেঁচকা টানে দর্শককে বের করে এনে এক কুহকের ভেতরে ঠেলে দেয়, প্রস্তুত করে ‘মোম জোছনা’ শীর্ষক একক সংগীতানুষ্ঠানের জন্য।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের ডালাস শহরের আর্ভিং আর্ট সেন্টারের ডুপ্রি থিয়েটারে ৩ অক্টোবর পুরো হলভর্তি প্রায় ২৫০ জন দর্শক উপভোগ করেন শিল্পী নাবিলা নূর কুহুর এই একক সংগীতসন্ধ্যা। মঞ্চসজ্জা থেকে গানের নির্বাচন—আয়োজনের প্রতিটি স্তরেই ছিল একটি নির্দিষ্ট আবহ নির্মাণের চেষ্টা।
Visit saltysenoritaaz.org for more information.
জোছনা আর রাতের থিম বেছে নেওয়ার পেছনে ছিল প্রকৃতির এই অনন্য নৈসর্গিক সৌন্দর্যকে গানের মধ্য দিয়ে উদ্যাপন করার ভাবনা—একসঙ্গে স্মৃতিকাতর হয়ে ওঠা, পুরোনো অনুভূতিগুলোকে নতুন করে ছুঁয়ে দেখা। গান এই অনুষ্ঠানের মূল উপজীব্য হলেও, দর্শকদের সামনে কেবল একের পর এক গান পরিবেশন নয়, বরং একটি স্বতন্ত্র ও স্মরণীয় অভিজ্ঞতা তুলে ধরাই ছিল কুহুর আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য।
নাবিলা নূর কুহুর পরিবেশনায় মঞ্চে উঠে আসে বাংলা আধুনিক গান, রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি, বাংলা ও ইংরেজি পপ-রক, হিন্দি চলচ্চিত্রের কালজয়ী রোমান্টিক সুর, এমনকি কুহুর নিজস্ব মৌলিক গানও। ‘অবাক ভালোবাসা’, ‘ফেরারী মন’, ‘আমায় প্রশ্ন করে’ ও ‘আমার ভিনদেশি তারা’র মতো বাংলা গানের পাশাপাশি নজরুলগীতি ‘নিশি নিঝুম ঘুম নাহি আসে’ এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার নিশীথ রাতের বাদলধারা’ পরিবেশনায় যোগ করে ভিন্ন ভিন্ন আবেগের মাত্রা। গানের বৈচিত্র্য কুহুর সংগীতরুচি ও বিস্তৃত চর্চার পরিসরকে সামনে নিয়ে আসে।
এ ছাড়া ছিল গজল ‘হোশওয়ালোঁ কো খবর ক্যা’ এবং ‘ফিক্স ইউ’, ‘আ থাউজেন্ড ইয়ারস’-এর মতো আন্তর্জাতিক জনপ্রিয় গান। প্রেম, বিরহ, স্মৃতিকাতরতা, নিঃসঙ্গতা ও অপেক্ষার আবহে সাজানো এই সংগীত-পরিক্রমা বাংলা, হিন্দি ও পাশ্চাত্য সংগীতের নানা ধারা ও সময়কে একসূত্রে গেঁথে দেয়। কিবোর্ড ও গিটারের পাশাপাশি ভায়োলিন, স্যাক্সোফোন এবং পূর্ণাঙ্গ ড্রামসের সংগত সংগীতায়োজনে আনে বৈচিত্র্য ও ব্যাপ্তি। সব মিলিয়ে, গানের নির্বাচন ও মঞ্চের আবহ একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছিল; অনুষ্ঠানটি তাই নিছক একটি সংগীত পরিবেশনার গণ্ডি ছাড়িয়ে পেয়েছিল একটি সুপরিকল্পিত বিষয়ভিত্তিক আয়োজনের রূপ।
সংগীত নিয়ে কুহুর পথচলা ২৫ বছরেরও বেশি সময়ের। ছায়ানটে শুদ্ধসংগীতে ছয় বছরের কোর্স সম্পন্ন করেছেন। বুয়েটে নগর পরিকল্পনা নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। পরে আমেরিকায় উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে বর্তমানে টেক্সাসের একটি বড় শহরের নগর পরিকল্পনা বিভাগের পরিচালক হিসেবে কর্মরত। পেশাগত জীবনের এই ব্যস্ততার মধ্যেও সংগীতকে তিনি অন্তরে লালন করেছেন, ছেলেবেলা থেকে নিয়মিত চর্চা করে চলেছেন। ‘মেলোডি’ নামের একটি ব্যান্ডের প্রধান কণ্ঠশিল্পী ও কর্ণধার তিনি। স্থায়ীভাবে আমেরিকায় বসবাস করলেও বাংলাদেশের বিভিন্ন প্লেব্যাকে নিয়মিত কণ্ঠ দিচ্ছেন। পেশাগত দায়িত্ব ও সংগীতের প্রতি এই দীর্ঘদিনের নিবেদন তাঁর জীবনের দুটি স্বতন্ত্র অথচ সমান্তরাল যাত্রার পরিচয় বহন করে।
কুহুর ‘মোম জোছনা’ নিঃসন্দেহে একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। প্রবাসের মঞ্চে সুরের মায়ায় মানুষকে কিছুক্ষণের জন্য দৈনন্দিন জীবনের গণ্ডি পেরিয়ে অন্য এক অনুভবের জগতে নিয়ে যাওয়ার এই প্রয়াসে ছিল আবেগ, নিবেদন ও শৈল্পিক যত্নের পরিচয়। জোছনাস্নাত সেই সন্ধ্যা তাই কেবল কিছু গানের পরিবেশনা হয়ে থাকেনি; হয়ে উঠেছিল স্মৃতি, অনুভব আর সুরে ভেসে থাকার এক সম্মিলিত অভিজ্ঞতা।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]