ভয়ে বা দুশ্চিন্তায় জ্বর আসে কেন?
· Prothom Alo

পরীক্ষা, চাকরির পরীক্ষা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতার আগে হঠাৎ জ্বর আসে অনেকের। সংক্রমণ ছাড়াই এমন জ্বর হতে পারে মানসিক চাপ ও উদ্বেগের কারণে। একে বলা হয় সাইকোজেনিক ফিভার।
আমাদের মধ্যে অনেকেই আছেন, যাঁদের লেখাপড়া ভালো, মনোযোগে কোনো ঘাটতি নেই, প্রস্তুতিও ভালো। কিন্তু পরীক্ষার ঠিক আগের দিন হঠাৎ জ্বর এসে গেল। কখনো জ্বরের তীব্রতা এত বেশি হয় যে পরীক্ষা দেওয়াই সম্ভব হয় না। আবার কেউ কেউ জ্বর নিয়েই পরীক্ষায় বসেন, ফলে প্রত্যাশিত ফলও আসে না। এ ধরনের জ্বরকে বলা হয় সাইকোজেনিক ফিভার বা স্ট্রেস-ইনডিউসড হাইপারথার্মিয়া। এটি একটি সাইকোসোমাটিক অবস্থা, যেখানে মানসিক চাপ, উদ্বেগ বা তীব্র আবেগের প্রভাবে শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যেতে পারে, অথচ এর পেছনে সংক্রমণ বা অন্য কোনো শারীরিক কারণ নাও থাকতে পারে।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
প্রতীকী ছবিতবে বিষয়টি শুধু পরীক্ষার্থীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতার আগে খেলোয়াড়দেরও এমন শারীরিক প্রতিক্রিয়া হতে পারে। চাকরিপ্রার্থী, জনসমক্ষে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে যাওয়া ব্যক্তি কিংবা তীব্র মানসিক চাপের মধ্যে থাকা মানুষের মধ্যেও এমনটা দেখা যেতে পারে। অর্থাৎ প্রতিযোগিতা, উদ্বেগ বা বড় কোনো প্রত্যাশার সঙ্গে যুক্ত মানসিক চাপ এ ধরনের শারীরিক প্রতিক্রিয়ার একটি কারণ হতে পারে।
অনেক ক্ষেত্রে চাপের পরিস্থিতি কেটে গেলে শরীরের তাপমাত্রাও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসে।
কীভাবে হয়?
মানসিক চাপ বা আবেগীয় উত্তেজনার সময় মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস এবং সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম সক্রিয় হয়ে ওঠে। শরীর তখন একধরনের ‘স্ট্রেস রেসপন্স’-এর মধ্যে যায়। এর ফলে—
• হৃদস্পন্দন বেড়ে যেতে পারে
• রক্তনালি সংকুচিত হতে পারে
• স্ট্রেস হরমোন, যেমন কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিনের নিঃসরণ বাড়তে পারে
• শরীরে তাপ উৎপাদন ও তাপ নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আসতে পারে।
এর ফলে শরীরের তাপমাত্রা কিছুটা বেড়ে যেতে পারে। সংক্রমণজনিত জ্বরের সঙ্গে এর পার্থক্য হলো, এখানে মূল ভূমিকা রাখে মানসিক চাপ ও স্নায়ুতন্ত্রের প্রতিক্রিয়া।
তবে শুধু তাপমাত্রা বেড়েছে বলেই সেটিকে সাইকোজেনিক ফিভার বলা যায় না। সংক্রমণসহ অন্যান্য শারীরিক কারণ আগে বাদ দিতে হয়।
কেমন হতে পারে?
মানসিক চাপের মাত্রা ও ব্যক্তিভেদে এর প্রকাশ ভিন্ন হতে পারে। কারও ক্ষেত্রে অল্প সময়ের জন্য শরীরের তাপমাত্রা বাড়তে পারে। আবার দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ থাকলে দীর্ঘস্থায়ীভাবে শরীরের তাপমাত্রা কিছুটা বেশি থাকতে পারে।
এ ধরনের শারীরিক প্রতিক্রিয়া তরুণ নারীদের মধ্যে তুলনামূলক বেশি দেখা যায় বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এটি যে কোনো বয়স ও লিঙ্গের মানুষের হতে পারে।
লক্ষণ কী?
শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি দেখা দিতে পারে—
• শরীরে অতিরিক্ত গরম অনুভূত হওয়া
• মুখ লাল হয়ে যাওয়া
• অতিরিক্ত ঘাম
• মাথাব্যথা
• ক্লান্তি
• ঘুমের সমস্যা
• বমি বমি ভাব বা পেটে অস্বস্তি
• দ্রুত হৃদস্পন্দন।
সংক্রমণজনিত জ্বরের ক্ষেত্রে যেমন কাশি, গলাব্যথা, সর্দি বা শরীরব্যথার মতো উপসর্গ থাকতে পারে, সাইকোজেনিক ফিভারে সেগুলো সাধারণত থাকে না। আবার মানসিক চাপ বাড়লে তাপমাত্রা বাড়তে এবং চাপ কমলে তাপমাত্রা কমতে দেখা যেতে পারে।
কীভাবে মুক্তি পাওয়া যায়?
সাইকোজেনিক ফিভারের ক্ষেত্রে চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো মানসিক চাপ ও উদ্বেগের কারণ চিহ্নিত করে তা কমানো। তবে জ্বরের পেছনে অন্য কোনো শারীরিক কারণ আছে কি না, সেটি প্রথমে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
মানসিক স্বাস্থ্যসেবা
কগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপি বা সিবিটি উদ্বেগ ও চাপ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর হতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী সাইকোথেরাপি বা কাউন্সেলিংও নেওয়া যেতে পারে। উপসর্গ বেশি হলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ প্রয়োজন হতে পারে।
স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট
মেডিটেশন ভাল কাজ দেয়দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপ কমাতে নিয়মিত কিছু অভ্যাস গড়ে তোলা উপকারী। যেমন—
• মেডিটেশন ও মাইন্ডফুলনেস
• গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম
• যোগব্যায়াম বা প্রগ্রেসিভ মাসল রিলাক্সেশন
• নিয়মিত হাঁটা ও ব্যায়াম
• পর্যাপ্ত ঘুম
• সুষম খাবার
• অতিরিক্ত ক্যাফেইন এড়িয়ে চলা
• মানসিক চাপের উৎস চিহ্নিত করে তা মোকাবিলার চেষ্টা করা।
শিশু ও তরুণদের ক্ষেত্রে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত চাপও কমানো গুরুত্বপূর্ণ।
ওষুধের প্রয়োজন হতে পারে?
কিছু ক্ষেত্রে উদ্বেগ বা অন্য কোনো মানসিক সমস্যার চিকিৎসায় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ ব্যবহার করা হতে পারে। তবে কোন ওষুধ প্রয়োজন, তা রোগীর উপসর্গ ও শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে। তাই নিজে থেকে অ্যানজায়োলাইটিক, অ্যান্টিডিপ্রেস্যান্ট বা অন্য কোনো ওষুধ খাওয়া উচিত নয়।
শুধু মানসিক চাপের কারণে জ্বর হয়েছে ধরে নিয়ে জ্বরনাশক ওষুধও বারবার খাওয়া ঠিক নয়। জ্বরের প্রকৃত কারণ আগে নির্ণয় করা জরুরি।
ঘরোয়া উপায়ে কী করা যায়?
পর্যাপ্ত পানি পান করামানসিক চাপের সঙ্গে শরীরে অস্থিরতা তৈরি হলে আরামদায়ক পরিবেশে বিশ্রাম নেওয়া, ধীরে ধীরে গভীর শ্বাস নেওয়া এবং শরীরকে শিথিল করার চেষ্টা করা যেতে পারে। পর্যাপ্ত পানি পান ও স্বাভাবিক খাবার চালিয়ে যাওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
কেউ কেউ কুসুম গরম পানিতে পা ডুবিয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকা বা চোখ বন্ধ করে শান্ত পরিবেশে বিশ্রাম নেওয়াকে আরামদায়ক মনে করতে পারেন। তবে এটিকে সাইকোজেনিক ফিভারের প্রমাণিত চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। অস্বস্তি বাড়লে বা তাপমাত্রা বেশি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
অনেক ক্ষেত্রে মানসিক চাপের পরিস্থিতি কেটে গেলে শরীরের তাপমাত্রাও স্বাভাবিক হয়ে আসে। তবে সমস্যা বারবার হলে বা দীর্ঘস্থায়ী হলে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসার সমন্বয় সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
অজানা কারণে জ্বর হলে প্রথমেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে জ্বর বেশি হলে, দীর্ঘস্থায়ী হলে বা অন্য কোনো শারীরিক উপসর্গ দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক নয়। সংক্রমণসহ অন্যান্য গুরুতর শারীরিক কারণ বাদ দেওয়ার পরই চিকিৎসক সাইকোজেনিক ফিভারের সম্ভাবনা বিবেচনা করতে পারেন।
মানসিক চাপের কারণে শরীরে শারীরিক উপসর্গ দেখা দেওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। তাই এ ধরনের সমস্যায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নেওয়ার ক্ষেত্রে সংকোচেরও কারণ নেই। শরীর ও মন একে অন্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত—মানসিক চাপের প্রভাব শরীরেও পড়তে পারে।
লেখক: খাদ্য ও পথ্য বিশেষজ্ঞ; প্রধান নির্বাহী, প্রাকৃতিক নিরাময় কেন্দ্র
ছবি: পেকজেলসডটকম