নোবেল পুরস্কারের এ টু জেড: মনোনয়ন থেকে পুরস্কার তুলে দেওয়া পর্যন্ত কী ঘটে
· Prothom Alo

বছরের এই সময়ে নোবেল পুরস্কার কমিটিগুলো বিজয়ী বিজ্ঞানী ও ব্যক্তিদের নাম ঘোষণা করে। বিজয়ী নির্বাচন করার পুরো বিষয় খুব গোপনীয়তার মধ্যে হয়ে থাকে। বিজয়ী ব্যক্তিদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয় ডিসেম্বরের বিশেষ আয়োজনে। সম্মাননার পাশাপাশি নোবেল বিজয়ী পান ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা। সঙ্গে চমৎকার একটি বাঁধাই করা শিল্পকর্ম ও একটি খাঁটি সোনার পদক দেওয়া হয়। কিন্তু বিশ্বজুড়ে সেরা ব্যক্তিদের এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার কীভাবে দেওয়া হয়, জানা আছে কি? কারা তাঁদের নোবেল পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করেন?
নোবেল পুরস্কার আসলে কী
Visit rouesnews.click for more information.
প্রতিবছর অক্টোবর মাসে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের পাশাপাশি সাহিত্য এবং শান্তিতে বিশেষ অবদানের জন্য নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। যাঁরা নিজেদের নতুন কোনো আবিষ্কার বা কাজ দিয়ে সারা বিশ্বের মানুষকে উপকৃত করেছেন, তাঁদেরই মূলত নির্বাচন করা হয়।
সুইডিশ রসায়নবিদ ও প্রকৌশলী আলফ্রেড নোবেল এটা চালু করেন। আলফ্রেড নোবেল ডিনামাইট আবিষ্কারের জন্য পরিচিত। মৃত্যুর ঠিক এক বছর আগে, ১৮৯৫ সালের নভেম্বরে তিনি তাঁর উইলে বিশাল অঙ্কের সম্পদ দিয়ে যান। তাঁর রেখে যাওয়া ৩১ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনা (আজকের হিসাবে যা প্রায় ১৯০ মিলিয়ন পাউন্ড) সম্পত্তি থেকে পাঁচটি বিষয়ে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসাবিজ্ঞান, সাহিত্য ও শান্তিতে নোবেল দেওয়ার নির্দেশ ছিল। পরবর্তী সময়ে ১৯৬৯ সালে সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৩০০ বছর পূর্তিতে তাদের বিশেষ অর্থায়নে অর্থনীতিতেও নোবেল দেওয়া শুরু হয়।
একটি নোবেল পুরস্কার সর্বোচ্চ তিনজন বিজ্ঞানীর মধ্যে ভাগ করে দেওয়া যেতে পারে। এই বিষয়ে নোবেল কমিটির রসায়ন বিভাগের সাবেক প্রধান বেংট নর্ডেন দারুণ এক মন্তব্য করেছিলেন। তিনি জানান, একজন একক বিজ্ঞানী যখন এই পুরস্কার পান, সেটিকেই বিজ্ঞানের জন্য দারুণ বিষয় মনে করা হয়। কারণ, এতে তিনি পুরো একটি আবিষ্কার বা গবেষণাক্ষেত্রের আইকন বা প্রতীকে পরিণত হন।
মৃত্যুর তিন দিন পরে যিনি নোবেল পেয়েছিলেনকীভাবে এবং কত সময়ে নির্বাচিত হন নোবেল বিজয়ী
পুরো বিজয়ী নির্বাচন প্রক্রিয়া শেষ হতে সময় লাগে প্রায় ১৬ মাস। পুরস্কার দেওয়ার আগের বছরের সেপ্টেম্বর মাসেই গোপন চিঠি বা অনুরোধপত্র পাঠায় নোবেল কমিটি। অর্থাৎ কমিটি এখনই আগামী বছরের পুরস্কারের জন্য কাজ শুরু করে দিয়েছে।
আগের বছরের সেপ্টেম্বরে জীবিত নোবেলজয়ী, অ্যাসেম্বলি সদস্য ও নির্দিষ্ট কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের কাছে গোপনে মনোনয়ন ফরম পাঠানো হয়। ফরম জমার শেষ সময় ৩১ জানুয়ারি। তবে এসব নথি অন্তত ৫০ বছরের জন্য সম্পূর্ণ গোপন রাখা হয়। জমা হওয়া নামের ওপর ভিত্তি করে একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করে বিশেষজ্ঞ দল। এতে মূল গুরুত্ব পায় বিজ্ঞানীদের নতুন আবিষ্কার বা উদ্ভাবন।
সব নাম জমা হওয়ার পর নোবেল কমিটি সেই তালিকা ছোট করতে থাকে। মনোনীত ব্যক্তিদের কাজ নিয়ে গভীর গবেষণা চালানো হয়। কারণ, কোনো আবিষ্কার সত্যি সত্যি যুগান্তকারী কি না এবং মূল কৃতিত্ব কার, তা নিশ্চিত হওয়া খুব জরুরি। অনেক সময় ল্যাবের প্রধানের নামে নিবন্ধ ছাপা হলেও আসল উদ্ভাবনী ধারণাটি হয়তো কোনো শিক্ষার্থী বা তরুণ গবেষকের হতে পারে। এসব বিচার-বিশ্লেষণ করতেই অনেকটা সময় পার হয়ে যায়।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আসল গবেষক বা বিজ্ঞানীদের চিহ্নিত করা। কারণ, নিয়ম অনুযায়ী একটি নোবেল সর্বোচ্চ তিনজনের মধ্যে ভাগ করা যায়। এই তিনজনের নিয়মের কারণে অনেক সময় মূল দলের অনেকেই বাদ পড়েন, যা নিয়ে বেশ বিতর্কও রয়েছে। তবে পুরস্কারের সম্মান ধরে রাখতে নোবেল ফাউন্ডেশন এই কঠোর নিয়ম চালু করেছিল।
দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ শেষে নোবেল কমিটি যখন একমত হয়, তখন অক্টোবরের প্রথম সোমবার থেকে একের পর এক বিজয়ীদের নাম প্রকাশ করা শুরু হয়। প্রতিদিন সুইডেনের সময় বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে একে একে চিকিৎসাবিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, সাহিত্য ও শান্তিতে নোবেলবিজয়ীদের নাম জানানো হয়। পরের সপ্তাহে ঘোষণা করা হয় অর্থনীতিতে নোবেলপ্রাপ্তদের নাম।
এরপর ডিসেম্বরের ১০ তারিখ আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকীতে সুইডেনের স্টকহোমে জমকালো আয়োজনে নোবেল বিজয়ীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় ১৮ ক্যারেটের স্বর্ণপদক ও সম্মাননা সনদ। তবে শান্তি পুরস্কারটি প্রদান করা হয় নরওয়ের অসলোতে।
আমার প্রিয় শিক্ষক জামিলুর রেজা চৌধুরীকেউ কি চাইলেই নোবেল পেতে পারেন
নোবেল পুরস্কার পাওয়ার জন্য কোনো নির্দিষ্ট বয়স বা আনুষ্ঠানিক যোগ্যতার নিয়ম নেই। তবে সবচেয়ে বড় শর্ত হলো মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিরা কখনো নিজের নাম নিজে প্রস্তাব করতে পারেন না। ২০১৯ সালে জন গুডএনাফ নামের এক বিজ্ঞানী ৯৭ বছর বয়সে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি আবিষ্কারের জন্য রসায়নে নোবেল পেয়েছিলেন।
অনেকে মনে করে নোবেল পুরস্কার হলো আজীবন কাজের স্বীকৃতি বা সম্মাননা। কিন্তু বিষয়টি একদম তা নয়। সাবেক নোবেল কমিটির প্রধান বেংট নর্ডেন জানান, বিজয়ী হতে হলে তাঁর আবিষ্কারটি এমন হতে হবে, যা বিজ্ঞানের নতুন কোনো দুয়ার খুলে দেয় কিংবা মানুষের চিন্তাভাবনা পুরোপুরি বদলে দেয়। সেই সঙ্গে সেই কাজের প্রভাব যেন দীর্ঘদিন স্থায়ী হয়। আলফ্রেড নোবেল তাঁর উইলে আগের বছরের কাজের জন্য নোবেল দেওয়ার কথা বললেও, বাস্তবে কোনো আবিষ্কারের প্রভাব ও গুরুত্ব বুঝতে বেশ কয়েক বছর সময় লেগে যায়। তাই আবিষ্কারের অনেক বছর পর নোবেল দেওয়া হয়।
নোবেল পুরস্কার হাতে নেলসন ম্যান্ডেলা (বাঁয়ে) ও এফ ডব্লিউ ডি ক্লার্ককারা দিতে পারেন নোবেল মনোনয়ন
সবাই কিন্তু নোবেলের জন্য নাম পাঠাতে পারেন না। কেবল তাঁরাই নাম প্রস্তাব করতে পারেন, যাঁদের কাছে নোবেল কমিটি গোপন চিঠি বা আমন্ত্রণপত্র পাঠায়। প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে প্রায় তিন হাজার চিঠি পাঠানো হয় আর তার বদলে তিন শর মতো প্রস্তাব জমা পড়ে। বিশেষ করে তরুণ ও সজাগ গবেষকদের কাছে এই চিঠি বেশি পাঠানো হয়। যাতে বিজ্ঞানজগতের নতুন সব খবরাখবর উঠে আসে।
কাদের এই চিঠির মাধ্যমে মনোনয়ন দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে, তা রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি ঠিক করে। সাধারণত সাবেক নোবেলজয়ী, নামকরা অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধানেরা এই সুযোগ পান। আর এই আমন্ত্রিত ব্যক্তিদের তালিকাও প্রতিবছর পরিবর্তন করা হয়। যাতে গবেষণায় নিষ্ক্রিয় থাকা ব্যক্তিদের বাদ দেওয়া যায়।
সূত্র: নোবেল প্রাইজ অর্গ, কেমিস্ট্রি ওয়ার্ল্ডতুমি কি রাত জাগো, নাকি তুমি ভোরের পাখি