ইসলামে মানুষ ও মানবতা

· Prothom Alo

ইসলামের মূল প্রতিপাদ্য হলো মানুষ ও মানবতা। ইসলাম সব মানুষের জন্য সর্বজনীন ধর্ম। কোরআনুল কারিমে আল্লাহ–তাআলা সম্বোধন করেছেন, ‘হে মানুষ! (নাস)’, ‘হে মানবমণ্ডলী! (ইনসান)’ হজরত মুহাম্মদ (সা.) বিশ্বনবী ও ‘রহমাতুল্লিল আলামিন’। তিনি আখেরি নবী ও সর্বশেষ রাসুল। বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী সব মানুষই তাঁর উম্মত।

ইসলাম অর্থ আনুগত্য ও শান্তি, মুসলিম অর্থ অনুগত ও শান্তিকামী লোক। ইমান অর্থ বিশ্বাস স্থাপন ও নিরাপত্তা বিধান, মুমিন অর্থ বিশ্বাসী ও নিরাপত্তা বিধানকারী ব্যক্তি। ‘আমান’ অর্থ নিরাপত্তা, ‘আমানত’ অর্থ বিশ্বস্ততা ও নির্ভরযোগ্যতার সঙ্গে সংরক্ষিত ও সুরক্ষিত। ‘ধর্ম’-এর আরবি হলো ‘দ্বীন’, ‘দিয়ানাত’ অর্থ নৈতিকতা; ‘দিন’ অর্থ কর্মফল, বিচার, ফলাফল, বিচার ও পরিণতি। ধর্মের মূল কথা নীতিনৈতিকতা, বিশ্বস্ততা ও মানবতা। ধর্মের উদ্দেশ্য হলো দুনিয়ার জীবনে শান্তি এবং পরকালে মুক্তি লাভ। এ জন্য প্রয়োজন মানবীয় সদ্‌গুণাবলির বিকাশ ও প্রবৃত্তির নিয়ন্ত্রণ।

Visit h-doctor.club for more information.

সদ্‌গুণাবলি হলো কৌমার্য, সতীত্ব, শক্তি, সত্য ও বাস্তবসম্মত। মুখ্য সদ্‌গুণাবলি হলো বিমৃষ্যকারিতা (ফলাফল চিন্তা করে কাজ করা), তিতিক্ষা (ধৈর্য), মিতাচার (সংযম) ও ন্যায়বুদ্ধি (সত্যজ্ঞান বা ধর্মজ্ঞান)। ধর্মীয় সদ্‌গুণাবলি হলো বিশ্বাস, আশা ও ভালোবাসা (সহৃদয়তা)।

মানুষ হলো প্রবৃত্তিসমন্বয়ে গঠিত ব্যক্তিসত্তা। প্রবৃত্তিসমূহ হলো ‘ষড়্‌রিপু’: কাম (কামনা, বাসনা), ক্রোধ, লোভ, মোহ (আসক্তি, বিভ্রম), মদ (দম্ভ, আত্মম্ভরিতা), মাৎসর্য (হিংসা, পরশ্রীকাতরতা)। নৈতিকতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত বিষয়গুলো হলো সুশাসন, ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, অহিংসা, ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা, শান্তি-শৃঙ্খলা ও সুরক্ষা। মানুষ বিশ্বাস দ্বারা পরিচালিত হয়। অবিশ্বাসীর নৈতিকতা সম্পূর্ণ ঐচ্ছিক ব্যাপার; বিশ্বাসীর জন্য নৈতিকতা বাধ্যতামূলক ও অপরিহার্য বিষয়।

ইসলাম সবাইকে স্নেহ, ভালোবাসা ও সম্প্রীতির বাঁধনে আবদ্ধ রাখতে চায়। আবদ্ধ রাখতে চায় বিশ্বভ্রাতৃত্বের সেতুবন্ধে। ইসলাম ঘোষণা দিয়েছে, দুনিয়ার সব মানুষ এক আদমের সন্তান। অতএব সৃষ্টিগতভাবে কারও ওপর কারও প্রাধান্য নেই। আল্লাহর কাছে সর্বাধিক সম্মানিত সেই ব্যক্তি, যে সর্বাধিক পরহেজগার।

ধর্ম এসেছে শান্তির বাণী নিয়ে। ধর্মের দৃষ্টিতে সব মানুষ পরস্পর ভাই ভাই। কারণ, তারা সবাই একই পিতা-মাতার সন্তান। ধর্মে হিংসা, বিদ্বেষ ও হঠকারিতা নেই। ধর্ম চায় প্রেম, ভালোবাসা ও মায়া-মমতার বন্ধনে পরস্পরের সঙ্গে মিলেমিশে বসবাস করা। পৃথিবীর সব মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব, সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা। একতাবদ্ধতা এবং মিলেমিশে থাকাকে বলা হয় উখওয়াত বা ভ্রাতৃত্ব। দেশ–জাতি–অঞ্চল–ভাষা–বর্ণনির্বিশেষে সব মানুষ মিলেই গড়ে ওঠে ভ্রাতৃত্ব।

ইসলামের উদার দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই ইসলামি ভ্রাতৃত্ব বিশ্বভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় উপযোগী ও অনুকূল। ইসলাম পূর্ববর্তী সব নবী-রাসুলকে বিশ্বাস করে এবং সম্মানের চোখে দেখে। ইসলামি ভ্রাতৃত্বের অন্যতম লক্ষ্য হলো বিশ্বমানবতার ঐক্য। কোরআন-হাদিসে ঐক্যের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘তোমরা আমার রজ্জুকে আঁকড়ে ধরো; পরস্পরে বিচ্ছিন্ন হয়ো না।’ (সুরা আলে–ইমরান, আয়াত: ১০৩)

ধর্মীয় সমাজব্যবস্থায় অনুপম ভ্রাতৃত্বের একটি বৈশিষ্ট্য হলো পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য। সাম্য ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় ভ্রাতৃত্বের গুরুত্ব অপরিসীম। ধর্মীয় ভ্রাতৃত্বে বংশমর্যাদার পার্থক্য নেই, নেই দেশ ও ভাষার পার্থক্য। ইসলামি দর্শনে অনুপম ভ্রাতৃত্বে আরব-অনারব, ধনী-গরিব তথা সব মানুষ পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ। রাসুল (সা.) বলেন, ‘অনারবদের ওপর আরবদের শ্রেষ্ঠত্ব নেই, আরবদের ওপর অনারবদের শ্রেষ্ঠত্ব নেই।’ (বুখারি ও মুসলিম)

ইসলাম সবাইকে স্নেহ, ভালোবাসা ও সম্প্রীতির বাঁধনে আবদ্ধ রাখতে চায়। আবদ্ধ রাখতে চায় বিশ্বভ্রাতৃত্বের সেতুবন্ধে। ইসলাম ঘোষণা দিয়েছে, দুনিয়ার সব মানুষ এক আদমের সন্তান। অতএব, সৃষ্টিগতভাবে কারও ওপর কারও প্রাধান্য নেই। আল্লাহর কাছে সর্বাধিক সম্মানিত সেই ব্যক্তি, যে সর্বাধিক পরহেজগার।

বিশ্বের সব মানুষ এক ও অভিন্ন, এক দেহ এক প্রাণের মতোই। নবী (সা.) বলেছেন, ‘মুসলমান ভাই ভাই, সে অন্যের প্রতি জুলুম করে না, তিরস্কার করে না। যে তার ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণ করবে, আল্লাহ–তাআলা তার প্রয়োজন পূরণ করবেন। যে কারও দুঃখ-কষ্ট লাঘব করবে, আল্লাহ–তাআলা কিয়ামতের দিনে তার দুঃখ দূর করবেন। যে কারও দোষ গোপন করবে, আল্লাহ–তাআলা হাশরের দিনে তার দোষ গোপন রাখবেন।’

  • অধ্যক্ষ মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী

    সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি; সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম

    [email protected]

Read full story at source